৭ জুনের হরতাল ও ৬ দফা প্রসঙ্গ

  মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

১০ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১০ জুন ২০১৮, ০০:৩৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

৫২ বছর আগের কথা। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন। এটি ছিল এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি তারকাখচিত দিন। সেদিন আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবিতে দেশব্যাপী হরতাল ডেকেছিল। ৭ জুনের সেই হরতালে পিকেটিং করার সময় আমি গ্রেপ্তার হয়েছিলাম। ‘মোবাইল সামারি কোর্ট’ আমাকে ১ মাসের কারাদ- দিয়ে সে রাতেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছিল। বয়স আমার তখন ১৮ বছর। ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট কাসের ছাত্র। সেবার অবশ্য খুব স্বল্প সময়ের জন্য বন্দি থাকতে হয়েছিল। কিন্তু সেটিই ছিল আমার জীবনের প্রথম কারাবাস। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, আমি তো কখনই আওয়ামী লীগ করিনি, করতাম না। আমি গোপনে ছিলাম নিষিদ্ধ ঘোষিত ও ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ থাকা কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী। সে সময় আমি প্রকাশ্যে ছিলাম ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় সদস্য। এতদসত্ত্বেও আমি কেন তা হলে সেদিন আওয়ামী লীগের ডাকা ৬ দফা দাবির সমর্থনে হরতালে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলাম? তা করেছিলাম এ কারণে যে, ৬ দফা ছিল গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের ইস্যুতে ‘ন্যায্য দাবি’। একটি ন্যায্য দাবিতে, মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নামলে, তা সে মূল শত্রু ছাড়া যার আহ্বানেই রাজপথে নামা সেই সংগ্রামী ‘মানুষের’ পাশে থাকাটি সাধারণভাবে প্রগতিশীলদের কর্তব্য।

কী ছিল সেই ৬ দফা দাবির ঐতিহাসিক তাৎপর্য, সে কথা সঠিকভাবে জানা প্রয়োজন। ৬ দফার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বাড়িয়ে দেখা যেমন অনুচিৎ হবে, তেমনই তাকে কমিয়ে দেখাও হবে ভুল। কিন্তু ৬ দফার তাৎপর্য সম্পর্কে জানা-বোঝা তো দূরের কথা, ৬ দফাতে কোন কোন দাবি অন্তর্ভুক্ত ছিল সে কথাও বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক কর্মীরা তেমন একটা জানেন না। জানার আগ্রহও তাদের খুব একটা নেই। রাজনীতিকে ‘ইতিহাস চর্চাশূন্য’ ও ‘রাজনৈতিক জ্ঞানশূন্য’ নিছক ‘ক্ষমতাকেন্দ্রিক’ ও ‘ব্যবসায়িক বিবেচনাভিত্তিক’ বিষয় হিসেবে পর্যবসিত করে তোলার কারণেই এমনটি হয়েছে। রাজনীতিতে ‘রাজনীতি’ ফিরিয়ে আনতে হলে এসব কথা জানা একান্ত আবশ্যক। অন্যথায় রাজনীতির বর্তমান রুগ্নতা দূর হবে না।

৬ দফা সম্পর্কে প্রথমেই এ কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন যে, অনেকে এ কথা দাবি করা সত্ত্বেও ৬ দফা কোনো ‘মুক্তিসনদ’ ছিল না। ৭ জুনের হরতালও ছিল না বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামের প্রথম কর্মসূচি। তবে একই সঙ্গে এ কথাও সর্বাংশে সত্য যে, ৬ দফা ও ৭ জুনের হরতাল নিঃসন্দেহে ছিল আমাদের মুক্তি-সংগ্রামের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় ‘ঐতিহাসিক উল্লম্ফনের’ মতো একটি মাইলফলক।

১৯৬৬ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেছিলেন। তার নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মৃত্যুর পর ততদিনে আওয়ামী লীগে তিনি তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন।

৬ দফা উত্থাপিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বাঙালির মননে বিদ্যুৎসম চমক সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ৬ দফা বাঙালির ‘মুক্তিসনদ’ ছিল। বাঙালির ‘মুক্তিসনদ’ রচিত হয়েছিল আরও পরে, মুক্তিযুদ্ধের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। বলা যায়, সেই ‘মুক্তিসনদ’ নির্মাণের পথ তৈরি করার ক্ষেত্রে ৬ দফার ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক অবদান। সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও বলা যায় যে, স্বায়ত্তশাসনের দাবির ক্ষেত্রেও ৬ দফা বাঙালির একমাত্র কিংবা প্রথম দাবিনামা ছিল না। অনেকের মাঝে এমন একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, ‘শেখ মুজিব’ ৬ দফা পেশ করার মাধ্যমে এ দেশে সর্বপ্রথম পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা উত্থাপন করেছিলেন। কথাটি সত্য নয়। প্রকৃত সত্য হলো এই যে, পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও তার স্পষ্ট রূপরেখা দালিলিকভাবে প্রথম উপস্থাপন করা হয়েছিল ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারে।

১৯৫৪ সালে রচিত যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার ১৯নং দফাটি ছিল নিম্নরূপÑ

‘...লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান ও সার্বভৌমিক করা হইবে এবং দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত আর সমস্ত বিষয় (অবশিষ্টাত্মক ক্ষমতাসমূহ) পূর্ববঙ্গ সরকারের হাতে আনয়ন করা হইবে এবং দেশরক্ষা বিভাগের স্থলবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পশ্চিম পাকিস্তানে ও নৌবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন করা হইবে এবং পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র নির্মাণের কারখানা নির্মাণকরত পূর্ব পাকিস্তানকে আত্মরক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হইবে। আনসার বাহিনীকে সশস্ত্রবাহিনীতে পরিণত করা হইবে।’

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় পূর্ববঙ্গকে ‘স্বায়ত্তশাসন’ প্রদান ও ‘সার্বভৌমিক’(!) করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছিল। যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিষয়গুলো কীভাবে কেন্দ্রীয় (পাকিস্তানি) সরকার ও পূর্ববঙ্গের সরকারের মধ্যে বণ্টন করা হবে তা স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছিল। দেশরক্ষার ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গকে কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তাননির্ভরতা থেকে মুক্ত করে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করা যায়, এই প্রস্তাবনায় সে বিষয়ে একটি স্পষ্ট পথনির্দেশ প্রদান করা হয়েছিল। বস্তুত ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে যে কাঠামোগত রূপরেখা বর্ণিত হয়েছিল সেই ধারাতেই, তার দাবিগুলেকে আরও স্পষ্ট ও ‘ধারালো’ভাবে লিপিবদ্ধ করে, ১২ বছর পরে আওয়ামী লীগের ৬ দফা কর্মসূচি রচিত হয়েছিল।

এ ক্ষেত্রে ইতিহাসের অন্য আরেকটি কথাও মনে রাখা প্রয়োজন। কথাটি হলো, এ দেশের কমিউনিস্ট পার্টি আরও আগে, ১৯৪৭ সালে পার্টিশনের পর পরই, ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়-লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’ বলে সেøাগান তুলেছিল। সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বকে প্রতিক্রিয়াশীল আখ্যায়িত করে পাকিস্তানকে একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র হিসেবে সে মূল্যায়ন করেছিল। এই ‘কৃত্রিমতা’ চিরস্থায়ী হবে না বলেও সে বিশ্লেষণ করেছিল। পাকিস্তানি শাসকদের ‘শক্তিশালী কেন্দ্রের’ তত্ত্বের সে বিরোধিতা করেছিল। কমিউনিস্টদের সেসব তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে, এ কথা যদি কেউ দাবি করেন যে, কমিউনিস্টরাই সে সময়ের বাঙালির স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের দাবিতে সর্বপ্রথম সোচ্চার হয়েছিল, তা হলে তার সে কথা মোটেও ফেলে দেওয়া যায় না। কিন্তু সে কথা বাদ দিলেও এ কথা সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দালিলিকভাবে প্রথম উত্থাপিত হয়েছিল ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায়। এ কথাও এ প্রসঙ্গে জানা থাকা প্রয়োজন যে, এই ২১ দফা রচনায় এ দেশের কমিউনিস্টদের অবদান ছিল প্রধান।

আওয়ামী লীগের ৬ দফা কর্মসূচিতে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় প্রদত্ত স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখাকে কতক ক্ষেত্রে আরেকটু স্পষ্ট ও ‘ধারালো’ করা হয়েছিল। বিশেষত মুদ্রা সম্পর্কে দুটি বিকল্প প্রস্তাবনা এবং কর আদায়ের ব্যবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রা ও বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্কে অতিরিক্ত কিছু ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল। এ পর্যায়ে ৬ দফা কর্মসূচিটি অনেকটা পূর্ণাঙ্গভাবে উদ্ধৃত করা অপ্রাসঙ্গিক বা বাহুল্য হবে না।

“আওয়ামী লীগের ৬ দফা কর্মসূচি

এক. ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা করতে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকার ফেডারেশনরূপে গড়িতে হইবে। তাতে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার থাকিবে। সকল নির্বাচন সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের সরাসরি ভোটে অনুষ্ঠিত হইবে। আইনসভাসমূহের সার্বভৌমত্ব থাকিবে।

দুই. ফেডারেশন সরকারের এখতিয়ারে কেবল দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্রীয় ব্যাপার এই দুটি বিষয় থাকিবে। অবশিষ্ট সমস্ত বিষয় স্টেটসমূহের (বর্তমান ব্যবস্থায় যাকে প্রদেশ বলা হয়) হাতে থাকিবে।

তিন. [এই দফায় মুদ্রা সম্পর্কে দুটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর যে কোনো একটি গ্রহণের প্রস্তাব রাখা হয়]

(ক). পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি সম্পূর্ণ পৃথক অথচ সহজে বিনিয়োগযোগ্য মুদ্রার প্রচলন করিতে হইবে। এই ব্যবস্থা অনুসারে কারেন্সি কেন্দ্রের হাতে থাকিবে না, আঞ্চলিক সরকারের হাতে থাকিবে। দুই অঞ্চলের জন্য দুটি স্বতন্ত্র ‘স্টেট’ ব্যাংক থাকিবে।

(খ). দুই অঞ্চলের জন্য একই কারেন্সি থাকিবে। এ ব্যবস্থায় মুদ্রা কেন্দ্রের হাতে থাকিবে। কিন্তু এ অবস্থায় শাসনতন্ত্রে এমন সুনির্দিষ্ট বিধান থাকিতে হইবে যাতে পূর্ব পাকিস্তানের মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হইতে না পারে। এই বিধানে পাকিস্তানের একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থাকিবে। দুই অঞ্চলে দুটি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক থাকিবে।

চার. সকল প্রকার ট্যাক্স-খাজনা-কর ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকিবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। ফেডারেল সরকারের সে ক্ষমতা থাকিবে না। আঞ্চলিক সরকারের আদায়ী রেভিনিউর নির্ধারিত অংশ আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ফেডারেল তহবিলে অটোমেটিক্যালি জমা হইয়া যাইবে। এই মর্মে রিজার্ভ ব্যাংকসমূহের ওপর বাধ্যতামূলক বিধান শাসনতন্ত্রেই থাকিবে। এইভাবে জমাকৃত টাকাই ফেডারেল সরকারের তহবিল হইবে।

পাঁচ. [এই দফায় বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যাপারে শাসনতান্ত্রিক বিধানের সুপারিশ করা হয়:]

১. দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক পৃথক হিসাব রাখিতে হইবে।

২. পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পূর্ব পাকিস্তানের এখতিয়ারে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানের এখতিয়ারে থাকিবে।

৩. ফেডারেশনের প্রয়োজনীয় বিদেশি মুদ্রা দুই অঞ্চল হইতে সমানভাবে অথবা শাসনতন্ত্রে নির্ধারিত হারাহারি মতে আদায় হইবে।

৪. দেশজাত দ্রব্যাদি বিনাশুল্কে উভয় অঞ্চলের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি চলিবে।

৫. ব্যবসা-বাণিজ্য সম্বন্ধে বিদেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের, বিদেশে ট্রেড মিশন স্থাপনের এবং আমদানি-রপ্তানি করিবার অধিকার আঞ্চলিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করিয়া শাসনতান্ত্রিক বিধান করিতে হইবে।

ছয়. [এই দফায় পূর্ব পাকিস্তানে মিলিশিয়া বা প্যারা-মিলিটারি রক্ষীবাহিনী গঠনের সুপারিশ করা হয়।]”

৬ দফায় ছিল প্রধানত দুটি ইস্যু- ‘গণতন্ত্র’ ও ‘স্বায়ত্তশাসন’। ২১ দফায় গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের এ দুটি ইস্যু ছাড়াও ছিল অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক নানাবিধ ইস্যু। সেসবের মধ্যে ছিলÑ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা, বর্ধমান হাউসকে (যেটি এখন বাংলা একাডেমি ভবন এবং সে সময় যেটি ছিল প্রাদেশিক সরকারপ্রধানের বাসভবন) বাংলা ভাষার গবেষণাগারে রূপান্তরিত করা, শহীদ মিনার নির্মাণ, শহীদ দিবসকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন, শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার সাধন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস করা, দুর্নীতি রোধ করা, কালাকানুনগুলো বাতিল করা, বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করা, আইন পরিষদের ব্যয় হ্রাস করা, জমিদারি প্রথার বিলোপ করা, পাট ব্যবসা জাতীয়করণ করা, কৃষিতে সমবায় চালু করা, কুটির ও হস্তশিল্পের উন্নয়ন করা, বন্যা ও দুর্ভিক্ষ রোধের ব্যবস্থা, শিল্প ও কৃষিতে স্বাবলম্বী হওয়া, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি। গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসন ছাড়াও অতিরিক্ত এসব বিষয় ২১ দফাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব বিষয় কিন্তু ৬ দফায় ছিল না। শুধু এই একটি যুক্তিতেই বলা যেতে পারে যে, ৬ দফা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ন্যায্য দাবিনামা হওয়া সত্ত্বেও তা সর্বাঙ্গীণ ও পরিপূর্ণ একটি আর্থ-সামাজিক কর্মসূচিভিত্তিক দাবিনামা ছিল না। সে কারণে এটিকে গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসন বিষয়ে ‘ন্যায্য দাবি’ বলে আখ্যাায়িত করলেও তাকে ‘মুক্তিসনদ’ বলা যায় না।

১৯৬৬ সালে ৬ দফা দাবিনামা উত্থাপনের পর দেশে আন্দোলনের নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই আন্দোলনে এক সময় ভাটাও পড়তে শুরু করেছিল। এদিকে গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের জন্য গণআন্দোলনের পাশাপাশি শ্রমিক-কৃষকের অধিকার, ছাত্র-শিক্ষক-পেশাজীবীদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া, আমূল ভূমি সংস্কার, ব্যাংক-বীমা-বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়ানো ইত্যাদি দাবিতে চলতে থাকা সংগ্রামগুলো ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত ছিল। ৬ দফায় যেসব দাবির কথা উল্লেখ ছিল তার সঙ্গে এসব আর্থ-সামাজিক ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক দাবি-দাওয়া যোগ দিয়ে সংগ্রামী ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে ১১ দফা দাবিনামা উত্থাপিত হয়েছিল। এই ১১ দফাকে ভিত্তি করেই সংগঠিত হয়েছিল ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। এ ক্ষেত্রে খেয়াল করার বিষয় হলো এই যে, শুধু ৬ দফা দাবিতে জনগণকে গণঅভ্যুত্থানের পথে উদ্বুদ্ধ করা যায়নি। ৬ দফার সঙ্গে আরও র‌্যাডিকাল কর্মসূচি যুক্ত করে ১১ দফা রচনা হওয়ার ফলেই ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান ও আইয়ুব শাহীর পতন ঘটানো সম্ভব হয়েছিল।

আইয়ুব শাহীর পতনের পর, গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭০-এর নির্বাচন। সেই নির্বাচনের রায় বানচাল করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ১৯৭১-এর মার্চে সংগঠিত হয়েছিল গণপ্রতিরোধ ও অভূতপূর্ব ‘অসহযোগ আন্দোলন’। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হয়ে গেলে সেই সর্বাত্মক গণপ্রতিরোধ সংগ্রাম স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র জনযুদ্ধে উত্তোরিত হয়েছিল। সূচিত হয়েছিল বাঙালির সুমহান সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারাকে ধারণকারী তথা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ-সমাজতন্ত্র-গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতার লক্ষ্য ও নীতিকে অবলম্বন করে রচিত ’৭২-এর সংবিধানকেই সে কারণে জাতির ‘মুক্তিসনদের’ সমতুল্য একটি দলিল বলে আখ্যায়িত করা যায়। সেই ‘মুক্তিসনদ’ রচনার পথ তৈরি করার ক্ষেত্রে ৬ দফা ও ৭ জুনের হরতালের ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ অবদান। ঐতিহাসিক বিচারে তার মূল্য খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই।

য় মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে