নারী ক্রিকেটারদের এশিয়া কাপ জয় অন্য বার্তাও দিয়ে গেল সমাজে

  অঘোর মন্ডল

১১ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১১ জুন ২০১৮, ০১:৫১ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের আরেকটা বার্তা এলো কুয়ালালামপুর থেকে। সেই বার্তা বাংলাদেশ ক্রিকেট প্রশাসনের কর্তাদের কানে পৌঁছাল কিনা জানি না। কারণ বাংলাদেশ ক্রিকেট প্রশাসনের অন্দরমহলে নারী-পুরুষের বৈষম্যটা প্রকট। দুই ডজনের বেশি পরিচালক আছেন ক্রিকেট বোর্ডে। কিন্তু সেখানে একজন নারীর জায়গা হয়নি। অথবা আমাদের ক্রীড়া প্রশাসন একজন যোগ্য নারীকে খুঁজে পায়নি ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক হওয়ার জন্য! অথচ এই দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা, জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী। সেখানে বিসিবির পরিচালক হওয়ার জন্য কোনো নারী ক্রীড়া সংগঠককে পাওয়া যায় না! একুশ শতকের দুইয়ের দশকে দাঁড়িয়ে সত্যিই অবিশ্বাস্য!

তবে শুনতে আরও অবিশ্বাস্য মনে হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ট্রফিটা এলো উপেক্ষিত থাকা সেই নারীদের হাত ধরে। প্রথম বারের মতো বাংলার নারীরা এশিয়া কাপ জিতল। জয়তু সালমা-জাহানারা-শামীমা। বাংলার অপরাজিতা নারী ক্রিকেটারদের সাফল্যগাথার শুরু হলো কুয়ালালামপুর থেকে। অভিনন্দন, শুভেচ্ছার বন্যায় হয়তো ভাসবেন বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটাররা। কিন্তু তারা কি খুব সহজে ভুলতে পারবেন তাদের প্রতি যে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়ে আসছে কয়েক বছর ধরে! আর্থিক বৈষম্যের কথা ঠিক টাকার অঙ্ক দিয়ে বোঝাতে গেলে নিজেদেরই লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যায়। এই নারী ক্রিকেটাররাই মাত্র বছর দেড়েক আগে তাদের খাবারের বিল নিয়ে মুখ খুলেছিলেন। তার প্রতিক্রিয়াটা আরও খারাপ হয়েছিল তাদের জন্য। সেই সময়ের নারী ক্রিকেট কমিটির এক দাপুটে কর্মকর্তা তার ক্ষমতার দাপটও দেখিয়েছিলেন। সেই উপেক্ষা-অবজ্ঞার জবাব দিতে বেশি সময় নিলেন না নারী ক্রিকেটাররা। অভিনন্দন সেই সব নারীকে যারা মুখে নয়, ব্যাট-বল হাতে জবাব দিলেন বৈষম্যমূলক আচরণের।

সম্প্রতি সময়ে তরল ফেমিনিজমের একটু প্রাবল্য দেখা যায় অনেক জায়গায়। সেটা রাজনীতি থেকে গণমাধ্যম এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ প্রায় সব জায়গায়। একটা সস্তা আওয়াজ তোলা হয়, আরে মেয়েরাও ছেলেদের সমান! কথাগুলে যারা বেশি বলেন, বিশ্বাসটা তারাই কম করেন। আসলে কথাগুলো বলা হয় সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য। এবং সত্যি কথা হচ্ছে, এসব কথায় কাজও হচ্ছে। অবশ্য তাতে খুব বেশি দোষেরই বা কী আছে। প্রাণপণ পুরুষতান্ত্রিকতা থেকে যদি গণমাধ্যমের মধ্যে দিয়ে কিছুটা হলেও নারীতান্ত্রিক চিন্তার সূচনা হয়, খারাপ কী? ফেমিনিজমের মুদ্রাদোষটা না হয় একটু বাড়লই।

বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়নের কথা বেশ জোরেশোরে বলা হচ্ছে। যার একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেন্ডার সমতা। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে বৈষম্যের সীমারেখা মুছে গেছে বা মিলিয়ে গেছে সেটা বলার মতো অবস্থা হয়নি। বরং সামাজিক কুসংস্কারের কারণে ক্রীড়াঙ্গনে নারীরা অনেক পেছনে। কিন্তু সেই পেছনের সারি থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা এশিয়া কাপ জিতে এবার সামনের সারিতে চলে এলেন। কিন্তু সামনের সারিতে যারা চলে এলেন সেই নারী ক্রিকেটররা কিংবা নারী ফুটবলারদের কী দিচ্ছে সমাজ এবং রাষ্ট্র? পুরুষ ক্রিকেটররা ট্রফি নয়, একটা সিরিজ জিতলেই গাড়ি-বাড়ি, নগদ অর্থ, গণভবনে সংবর্ধনা সবই পান। কিন্তু মালয়েশিয়ার মাটিতে যারা ভারতের মতো ক্রিকেট পরাশক্তিকে দুই দুইবার হারিয়ে এশিয়া কাপ ক্রিকেটের ফাইনাল জিতল, তারা কী পান সেটা দেখার কৌতূহল দমন করা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে।

সমাজের অন্যদের কথা বাদ দিন। দায় কম কি আমাদের গণমাধ্যমেরও? নারীরা এশিয়া কাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ একের পর এক ভারত, পাকিস্তানের বিপক্ষে জিতেছে, কিন্তু মিডিয়ায় তাদের জন্য কতটুকু নিউজপ্রিন্ট খরচ করা হয়েছে। কতটা এয়ার টাইম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তাদের জন্য টেলিভিশনে! কোনো পরিসংখ্যানের প্রয়োজন পড়বে না, নির্দ্বিধায় বলা যায়, খুব বেশি কিছু জায়গা পায়নি মিডিয়ায় তাদের সেই সাফল্যের গল্পগুলো। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী থেকে বিসিবি সভাপতি সবাই অভিনন্দন জানাচ্ছেন তাদের। অভিনন্দন প্রাপ্য সালমা-জাহানারাদের। সেটা দিতে কেউ কার্পণ্য করছেন না এটা ইতিবাচক। কিন্তু এই ইতিবাচক চিন্তাভাবনাটা কতটা সময়ের জন্য। যতক্ষণ এশিয়া কাপ জয়ের স্মৃতিটা টাটকা থাকবে ততটুকু সময়! সত্যি কথা হচ্ছে বাংলাদেশের নারীরা এশিয়া কাপ জিতলেও স্বীকার করতে হবে নারী ক্রিকেটের প্রতি আমাদের ঠিক না আছে প্যাশন, না আছে সমীহ, হয়তো একটা সস্নেহ প্রশ্রয় আছে। এশিয়া কাপ জিতেছে তাই হয়তো আমরা সগর্বে বলব, ‘তোমরাই রিয়াল চ্যাম্পিয়ন!’ আমাদের ক্রীড়াপ্রেমী প্রধানমন্ত্রী হয়তো একটু খোঁচা মেরে রসিকতার সুরেই বলবেন, “পুরুষ ক্রিকেটাররা আফগানিস্তানের কাছে ‘কাবুলিওয়াশ’ হলো। কিন্তু আমাদের নারীরা এশিয়া কাপ জিতে এলো।” কিন্তু গণভবনে ডেকে তাদের আলাদা সংবর্ধনা দিয়ে কি ফ্ল্যাটের চাবি বা গাড়ির চাবি তুলে দেওয়া হবে এই অপরাজিতাদের হাতে? হয়তোবা দেওয়া হবে। হয়তোবা হবে না। শুধু শুষ্ক অভিনন্দনেই খুশি থাকতেও হতে পারে নারী ক্রিকেটারদের। বিসিবি পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু কী দেওয়া হবে, সেটা তাৎক্ষণিকভাবে কেউ জানাতে পারলেন না।

পুরুষ দল জিতলে হয়তো কোটি কোটি টাকার পুরস্কার ঘোষণা করতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগত।

অর্থকড়ি, সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক মর্যাদায় পুরুষ ক্রিকেটারদের তুলনায় নারী ক্রিকেটাররা কোথায় সেটা দেখতে হলে দুরবিন লাগাতে হবে চোখে। কারণ এই সমাজে সাকিব-মুশফিক-মাশরাফিরা তারকা, মহাতারকা। মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী তাদের এমপি বানানোরও স্বপ্ন দেখেন। এবং তাদেরও স্বপ্ন দেখান মন্ত্রীরা। আর সালমা-জাহানারা স্বপ্ন দেখেন দেশের হয়ে খেলার। ট্রফি জয়ের। আর নিজের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মোটামুটি একটু সম্মান নিয়ে বাঁচার। তাও যদি এই সমাজ সেই সুযোগটা তাদের দেয়। কারণ উন্নয়নশীল দেশের রাস্তায় পা রাখা বাংলাদেশে এখনো একজন নারীকে ক্রিকেট বা ফুটবল মাঠে পা রাখার সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি।

আবার উল্টো দিকে নারীকে এখনো আমরা ‘নারী’ হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত। তাদের মানুষ হিসেবে প্রাপ্য মর্যাদা দিতে কেন যেন অনেক কার্পণ্য এই সমাজের। আবার নারীদের এ সাফল্যে এমন একটা ভাব মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় যাতে মনে হতে পারে তাদের এ সাফল্য সোনামণিদের সাফল্য! এই অ্যাপ্রোচটাও নারীর প্রতি আরেক ধরনের অপমান। পুরুষ দল হারলে বা জিতলে বাঙালির আবেগের যে দ্বিমুখী বহির্প্রকাশ তার ছিটেফোঁটা খুঁজে পাওয়া যায় না নারীদের জয়-পরাজয়ে। এবার হয়তো বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্য তাদের হাত ধরে এলো তাই একটু বাড়তি আবেগ দেখা যাবে। কিন্তু হারলে বলা হতো, আরে নারী ক্রিকেটার ওরা। আর কতটা কী করবে! কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা নারীরাই কিন্তু দেড়শ কোটি মানুষের ভারতের নারী ক্রিকেটারদের চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে। তাদের হারিয়েছে। দেশে ট্রফি নিয়ে ফিরছে। অতএব একটা বার্তা ওরা দিল, আমাদের নারীরাও পারেন। সেটা রাজনীতির মাঠ থেকে খেলার মাঠ। উঠে আসছেন তারা। এবার সময় এসেছে তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়ার। তার জন্য মানসিকতা পাল্টাতে হবে ক্ষমতার অলিন্দে থাকা লোকজন থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরের মানুষের। এবং তার শুরুটা হওয়া উচিত পরিবার থেকেই। মেয়েকে মেয়ে হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখার চোখটা আমাদের আছে কিনা সেটাও এক বড় প্রশ্ন। উত্তর খুঁজতে হবে সমাজকেই।

সাকিব-মাশরাফিরা জিতলে মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে। আর হারলে তাদের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করা হয়, রাগে-ক্ষোভে-হতাশায়। অথচ সালমা-জাহানারা যা করলেন তার জন্য খানিকটা তারল্যমিশ্রিত আবেগ হয়তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন মিডিয়ায়। কিন্তু গোটা সমাজকে কতটা নাড়া দিতে পারল সেটা ঠিক বুঝে ওঠা গেল না। তার কারণও হয়তো ওরা নারী! যতটুকু আবেগ দেখানো হচ্ছে সেটা কি শুধু তারা নারী ক্রিকেটার সে কারণে? নাকি তারাই বাংলাদেশ ক্রিকেটকে অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে গেলেন সেটা বুঝে। যদি প্রথমটাই কারণ হয়, তা হলে সেটাও নারীর প্রতি এক ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ। তারা নারী, শুধু সে কারণেই তাদের একটু বাড়তি স্বীকৃতি দেওয়া পরোক্ষভাবে নারীকেই অপমান করা। ছোট করা হয় তাদের কৃতিত্বকে। নারীকে নারী না ভেবে মানুষ ভাবলে তার জন্য বাড়তি সম্মান বা বাড়তি অপমান করার কিছু থাকবে না। সালমা খাতুনদের এশিয়া কাপ জয় থেকে যদি সেই শিক্ষাটা আমরা পাই তা হলে শুধু ক্রিকেট নয়, গোটা সমাজের জন্য মঙ্গল।

পাদটীকা : নারী ক্রিকেটারদের এই সাফল্যকে বেশি বড় করতে গিয়ে তাদের মাথায় সহানুভূতির হাত বোলানোর দরকার নেই। তাদের প্রাপ্য সম্মান এবং শ্রদ্ধাটুকু দিয়েই যেন সাফল্যটা উদযাপিত হয়।

য় অঘোর মন্ডল : সিনিয়র জার্নালিস্ট এবং কলাম লেখক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে