বাংলাদেশ তুমি কানতাছো যে

  ড. কাজল রশীদ শাহীন

১৩ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ জুন ২০১৮, ০০:৪৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাবা তুমি কানতাছো যে, একরামের মেয়ে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর পায়নি। উত্তর পাবে না কখনই। বাবা একরাম নেই, কে দেবে উত্তর? যারা ওই অডিও কথন শুনেছেন, কিংবা পড়েছেন সংবাদমাধ্যম থেকে, তাদের সবাই ব্যথিত হয়েছেন, ক্ষুব্ধ হয়েছেন, নীরবে-নিভৃতে ফেলেছেন চোখের জল। যার সাক্ষী আর কেউ নয়, সাক্ষী শুধু বাংলাদেশ। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশও ফেলেছে চোখের জল। অসহায় একরামের কান্না যেন বাংলাদেশেরই কান্না। কারণ যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি স্বাধীন হয়েছিল, এক শতাব্দীতে দুইবার স্বাধীনতা অর্জনের অনন্য ইতিহাস গড়েছিল, সেই বাংলাদেশ আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর কতদূর তা আজও আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। এ কারণে বাংলাদেশ আজ কাঁদছে। আর আমরা অসহায় নাগরিকরা প্রশ্ন করছি ‘বাংলাদেশ তুমি কানতাছো যে?’ এই লেখায় বাংলাদেশ কেন কাঁদছে, তার কতিপয় কারণ হাজির করার নিমিত্তে এই লেখা, যদিও তা জারি রয়েছে অনেক দিন ধরে।

বিশাকা প্রকাশনীর মালিক শাহজাহান বাচ্চুকে খুন করা হয়েছে। প্রকাশ্যে বোমা ফাটিয়ে দুর্বৃত্তরা তাকে খুন করে, নির্বিঘেœ চলে গেছে। শাহজাহান বাচ্চুর আরও একটি পরিচয় রয়েছে, তিনি বাম রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মুন্সীগঞ্জ জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক। শাহজাহান বাচ্চুকে হত্যার কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানা না গেলেও একটা বিষয় নিশ্চিত যে মত প্রকাশের জন্যই তাকে খুন করা হয়েছে। এর আগে প্রকাশক হত্যার, প্রকাশকদের ওপর আক্রমণ-হামলার যে ঘটনা ঘটেছে তারই ধারাবাহিকতায় এই হত্যাকা-। মত ও সংস্কার খ-ানোর যে চেষ্টা করতেন শাহজাহান বাচ্চু। যার মধ্য দিয়ে আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন দেখতেন তিনি, তা পছন্দের ছিল না অন্ধকারের বাসিন্দাদের। এ দেশে মুক্ত মত প্রকাশের দায়ে লেখক-প্রকাশকদের হত্যার নজির যেভাবে, যে হারে বাড়ছে, সেই তুলনায় এদের হত্যাকারীদের বিচারের নজির তৈরি হচ্ছে না। যে কারণেই হোক রূঢ় বাস্তবতা হলো, এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় যে বা যারা দায়ী তাদের কাউকেই চূড়ান্ত বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। লেখক হুমায়ুন আজাদ থেকে জাগৃতি প্রকাশনীর ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যাকারী কারোরই বিচার হয়নি। দেশ ছেড়ে প্রবাস জীবন বেছে নিতে হয়েছে শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলকে। খুনের লক্ষ্যেই হামলা হয়েছিল তার ওপর, প্রাণে বেঁচেছেন, তবে দেশে থাকতে পারেননি, হয়েছেন দেশান্তরী। এও তো মৃত্যুরই সমতুল্য। কিংবা এতে প্রকারান্তরে ওদের বিজয় হয়েছে যারা তাকে খুন করতে চেয়েছিল। কারণ তাদের চাওয়া মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়া। এ কারণেই যারা আলোর কথা বলবে, মুক্তচিন্তার কথা বলবে তাদেরকে হয় হত্যা করবে, নয়তো দেশছাড়া করবে।

একরামকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধের বিপক্ষে নানা যুক্তি থাকলেও সরকার কখনো সেসব যুক্তিকে আমলে নেওয়ার চেষ্টা করেনি। বন্দুকযুদ্ধ যদি থাকে তা হলে দেশে আইনের প্রতিষ্ঠা হবে কীভাবে? আমরা আইনের শাসনের কথা বলব আবার বন্দুকযুদ্ধকে উৎসাহিত করব, তা নিশ্চয় কোনোভাবেই হওয়ার নয়। এখন তো অনেকটাই স্পষ্ট যে একরামকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি একরাম হত্যার পর পুলিশের পক্ষ থেকে তার যে পরিচিতি দেওয়া হয়েছে সেখানেও বড় রকমের ভুল রয়েছে। তাহলে একটা মানুষের জীবন কি এতই তুচ্ছ। ইচ্ছা হলো আর রাতের অন্ধকারে তাকে খুন করে ফেলা হলো। এক একরামের ঘটনায় তো যত বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে সবই এখন প্রশ্নবিদ্ধ, সরকার কি তার দায় নেবে? প্রত্যেকটা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের ব্যবস্থা নেবে। পুলিশ-র্যাবের বাইরে গিয়ে অন্যদের দিয়ে একটা নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা নেবে? নেবে না। আর নেবে না বলেই বাংলাদেশ আজ কাঁদছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল প্রেরণা ছিল, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ-রাষ্ট্র বিনির্মাণ। স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও আমরা সেটা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি বলেই ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা যদি সম্ভব হতো, তা হলে বন্দুকযুদ্ধ হতো না। একরামকে মরতে হতো না, সোমবার সন্ধ্যায় শাহজাহান বাচ্চু হত্যার শিকার হতো না। সমাজ রাষ্ট্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রধান ও মৌল শর্ত হলো সেখানে জবাবদিহি থাকতে হবে। ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেটা যেমন অনিবার্য ঠিক তেমনি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি যে সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান তা বলাই বাহুল্য। বিভাগীয় শাস্তির নামেও যে সেখানে শুভঙ্করের ফাঁকির আশ্রয় নেওয়া হয়, তা বলা বাহুল্য। এ কারণেই একরামের মেয়ের প্রশ্নের জবাব নেই তার বাবার কাছে। এ কারণেই বাংলাদেশ কাঁদছে আর কাঁদছে তার কোনো জবাব মিলছে না।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের সর্বত্রই সাম্যের চর্চা হবে। পাকিস্তানের স্বাধীনের দুই যুগের মধ্যে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু যে অবিস্মরণীয় উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারলেন, তার পেছনে ছিল তিনি দুই পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্যকে স্পষ্ট করতে পেরেছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানে যেভাবে উন্নয়ন হয়েছে তার অর্ধেকও হয়নি পূর্ব পাকিস্তানে। এখানকার রাজস্ব খাত থেকে অর্জিত অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে। বঙ্গবন্ধু যে ছয়দফা দিয়েছিলেন, সেই ছয়দফার মূল শক্তিই ছিল বৈষম্য দূর করা। অথচ আজও আমরা বৈষম্য দূর করতে পারিনি। উল্টো সর্বত্র বৈষম্য জেঁকে বসেছে। আমাদের মন্ত্রীরা সারাদেশের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, অথচ কাজে কর্মে আঞ্চলিকতার পরিচয় দেন। আইয়ুব খান-এরশাদের মতো সামরিক স্বৈরশাসকরা এ কাজ করলে আমরা প্রতিবাদ করতে পারি, আন্দোলন করতে পারি, সভা মিটিং মিছিল করতে পারি। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোও যখন আঞ্চলিক প্রীতিতে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেন না। তখন আমরা অসহায় বোধ করি, হতাশ হয়। আমরা দেখি কোন কোন জেলার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন রীতিমতো বিস্ময় জাগানিয়া। আবার কোনো কোনো জেলার প্রধান সড়কের অবস্থা পর্যন্ত সঙ্গিন।

রবিবার দিনটা ছিল বাঙালি জাতির জন্য অন্যরকম এক আনন্দের দিন। এ রকম দিন আর কখনই আসেনি আমাদের কাছে। এশিয়া কাপে বাংলাদেশের মেয়েরা ভারতকে পরাজিত করে হয়েছে চ্যাম্পিয়ন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ রকম বিজয় আমাদের এবারই প্রথম। দেশ ও জাতির কাছে প্রথম আলো নিয়ে এলো বাংলাদেশের মেয়েরা। অথচ সেই উচ্ছ্বাস নিয়েও আমাদের কার্পণ্য দেখা গেল। ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্র কোথাও এই আনন্দ যেভাবে হওয়ার দরকার, সেভাবে হয়নি। অথচ সাকিব-মাশরাফিরা একটা কিছু করলেই আমরা উপঢৌকন আর প্রশংসার বন্যা বইয়ে দেয়। আর সালমারা পৃথিবীকে চমকে দিলেও আমরা সেই অর্থে কিছুই করি না? কারণ কী, ওরা মেয়ে বলে? এই যদি হয় আমাদের মানসিকতা। তা হলে আমরা জরাগ্রস্ত, আমরা অন্ধকারের বাসিন্দা, আমরা এখনো হয়ে উঠিনি সভ্য সমাজের বাসিন্দা। নারী ক্রিকেটার আর পুরুষ ক্রিকেটারদের সুযোগ সুবিধা, বেতন ভাতার দিকে আমরা যদি একটু নজর দিই, তা হলে দেখব পিলে চমকানোর মতো চিত্র। বেতন কাঠামোয় পুরুষ এ ক্যাটাগরি পায় তিন লাখ টাকা। আর নারী এ ক্যাটাগরি পায় ত্রিশ হাজার টাকা। নারী ক্রিকেটারদের এ প্লাস ক্যাটাগরিই নেই। আর তাদের সর্বোচ্চ বেতন ত্রিশ হাজার টাকা। অন্যদিকে ম্যাচ ফি পুরুষ ওডিআই দুই লাখ টাকা। বিপরীতে নারী ওডিআই আট হাজার টাকা। পুরুষের প্রথম শ্রেণির ম্যাচ ৪০ হাজার টাকার বিপরীতে মেয়েদের প্রথম শ্রেণির ম্যাচ ৬০০ টাকা। এই যদি হয় বাস্তবতা। পুরুষ নারীতে যদি হয় এ রকম আকাশ ছোঁয়া ব্যবধান। তা হলে সেই সমাজ-রাষ্ট্রে সাম্য প্রতিষ্ঠা হবে কীভাবে? কীভাবে সবাই পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবে দেশটাকে? কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত প্রত্যয়-প্রত্যাশা ও স্বপ্নগুলো বাস্তব হয়ে উঠবে?

বাংলাদেশ এক সম্ভাবনার নাম। আমাদের রয়েছে বিস্ময়কর সব অর্জন। এই অর্জনে প্রহেলিকার ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে আমরা ভারত থেকেও এগিয়ে। যা অবশ্যই গর্ব ও গৌরবের। এটা যেমন সত্য, ঠিক ততটাই সত্য যে আমরা এখনো মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। ন্যায় এখানে এখনো অধরা, জবাবদিহি এখানে সবার জন্য প্রযোজ্য নয়, আইনের শাসন এখনো প্রশ্নবিদ্ধ, বৈষম্য এখানে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এখনো আলোর পথের যাত্রীরা অন্ধকারের বাসিন্দাদের খড়গের নিচে ভয়ার্ত সময় পার করে। এখানে একরাম তার কন্যার প্রশ্নের জবাব দিতে পারে না। এসবই এ দেশের কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা থেকে মুক্ত হওয়া জরুরি ও অবশ্যম্ভাবী।

বাংলাদেশের বুকে আজ বড় বিষজ¦ালা। বাংলাদেশ আজ কানতাছে। ইতিহাসের ধরন হলো তারা সময়ের সমান্তরালে কিছু জিনিসকে বিচেনায় নেন। সমাজ ও রাষ্ট্র ক্ষমতায় যারা আছেন তারা যদি মনে করেন কান্না দূর করার দায়িত্ব তাদের না, তা হলে সেটা বলতেই পারেন। কিন্তু ইতিহাস সেভাবে বলবে না। ইতিহাস দেখবে বাংলাদেশের ওই কান্নার সময়ে একরামের মেয়ের কান্নার সময়ে, শাহজাহান বাচ্চুর খুন হওয়ার সময়ের সমান্তরালে রাষ্ট্র ক্ষমতায় কারা ছিলেন।

য় ড. কাজল রশীদ শাহীন : সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও গবেষক।

[email protected]

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে