নিরাপদ হোক মানুষের ঘরে ফেরা

  বিশ্বজিত রায়

১৩ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ জুন ২০১৮, ০০:৪৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

পবিত্র ঈদুল ফিতরের মহোৎসব মহিমায় যুক্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। সিয়াম সাধনার পুণ্যময় ব্রত শেষে এক আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনে আপনজনের সান্নিধ্যে আসার প্রহর গুনছে দেশের কোটি মুসল্লি। জীবিকার সন্ধানে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজে নেওয়া মানুষগুলো অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে প্রিয়জনের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার সর্বোত্তম সুযোগটা কখন আসবে। কখন আসবে সেই সুখাচ্ছন্ন সময় এই প্রতীক্ষায় কাটছে কর্মময় জীবন। বাড়িতে রেখে আসা মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান ও ভাই-বোনের সঙ্গে কখন গিয়ে মিশবে স্বজনশূন্য খরার চূর্ণ প্রাণ, কখন দেখা মিলবে বহুদিন ধরে অদেখা অতি পরিচিতজনের মুখাবয়ব, কখন হৃদয়ে এসে লাগবে আদর-সোহাগের হাত বুলানো পরশ, কখন কর্ণগোচর হবে স্ত্রী-সন্তানের আহ্লাদে আত্মহারা কণ্ঠের ডাক, কখন ঘটবে পতিপতœীর দুজোড়া চোখের মধুমাখা মিলন, কখন মিশে হবে একাকার মমতায় মোড়ানো সজীব দেহগুলো। রমজানের পুণ্যরক্ষিত রোজা শেষে পবিত্র ঈদুল ফিতরের ঈদোৎসব করে দেয় সেই সুযোগটা।

ঈদ আনন্দ উৎসবের এই যাত্রায় দূর-দূরান্তের কর্মস্থল থেকে ছুটে এসে জীবিকাধারী মানুষগুলো আপনভূমে আপনজনের সঙ্গে মিলিত হবে। উপভোগ করবে ঈদ আয়োজনীয় রঙিন খেলা। নাড়ির টানে কর্মস্থল থেকে ছুটে আসা পরিশ্রান্ত মানুষগুলোর এই ঈদযাত্রা কতটুকু মঙ্গলময় হবে? নির্ভীক নিরাপদ হবে তো ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা। গাড়ি, লঞ্চ, ট্রেন, যে যেভাবে পারে সে সেভাবেই রওনা হচ্ছেন বাড়িমুখো পথে। বাড়ি ফেরার এক ক্লান্তিহীন প্রতিযোগিতায় শামিল হচ্ছেন পরবাসী লাখো মানুষ। কর্মখাতিরে অন্যত্র বসবাস করা প্রিয় মানুষের স্পর্শহীন পিপাসিত প্রাণগুলো একটু স্বীয় সন্ধানে হন্যে হয়ে ছুটছে গন্তব্যে। ব্যতিব্যস্ততার একগুঁয়েমি জীবনটা অপেক্ষার তরীতে বসে ভাসতে থাকে ঈদের মতো কোনো আনন্দমুখর বৃহৎ অনুষ্ঠান যাত্রায় যাত্রী হতে।

ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে কষ্টের কঠিনতম বাস্তবতা মেনে নিয়ে মাটির টানে এগিয়ে যায় সবাই। টিকিট পাওয়া না পাওয়ার হিসাব বাদ দিলে সামনে চলে আসে পথিমধ্যে দুর্ঘটনার বিভীষিকাময় বিষয়টি। বাড়ি ফিরতে গিয়ে প্রতিবছর যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় হত হওয়ার কথা শোনা যায়, তাতে মন আরও দুর্বল হয়ে আসে। কখনো বাড়ি ফিরতে আবার কখনো ঈদ আনন্দ শেষে কর্মস্থলে ফেরার পথে অকালে প্রাণ দিতে হচ্ছে শত মানুষকে। তখন আনন্দের বদলে নেমে আসে শোকের ছায়া। প্রিয়জনহারা মানুষগুলোর ক্ষেত্রে আনন্দের ঈদ মুহূর্তেই রূপ নেয় বিষাদে। এই বিষাদময়তা কখনো কাম্য নয়।

আনন্দ যাত্রায় যাত্রীবেশী প্রাণটা যদি এভাবে প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাওয়ার আগেই অকালে ঝরে যায় কিংবা আনন্দ আয়োজন শেষে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে কর্মঘরে যাওয়ার পথে শেষবিদায়ের চিরন্তনী পথের পথিক হতে হয়, তা হলে এর জবাব কী হতে পারে। কেন ঘটল এমন? স্বজনহারা ব্যথিত প্রাণ যদি এমন প্রশ্ন করে বসে, তা হলে এর জন্য সন্তোষজনক উত্তর কী তা ভেবে দেখতে হবে। প্রাণবিপন্ন এই ক্ষতি কোনো কিছুর বিনিময়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। অপূরণীয় এই ক্ষতির কারণ খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসবে বেপরোয়া চালকের বেপরোয়া গতি, রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, মাদকসেবী ও অনভিজ্ঞ চালক, রাস্তা অতিক্রমের গতিসম্পন্ন প্রতিযোগিতা ইত্যাদি ইত্যাদি।

পত্রিকান্তরে সড়কের বেহাল দশাসংশ্লিষ্ট সংবাদ মনে চিন্তার উদ্বেগ ঘটায়। মনে প্রশ্ন জাগে, ঈদযাত্রায় যাত্রী ও যানবাহনের বাড়তি চাপ কি সহ্য করতে পারবে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো। রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে চলা অসংখ্য পথের ধারা কি যান চলাচলের সম্পূর্ণ উপযোগী। এ-সংক্রান্ত সংবাদ ভাষ্য মনে কিছুটা অস্বস্তির জন্ম দিয়ে যায়। খবরে বলা হয়, ‘ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলায় যাতায়াতের জন্য প্রধান দুটি মহাসড়ক হচ্ছে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-চট্টগ্রাম বা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। দুটি মহাসড়কের অনেক স্থানেরই এখন বেহাল দশা। এমনিতেই খানাখন্দে ভরা; আবার একটু বৃষ্টি হলে নতুন নতুন গর্তের সৃষ্টি হয়। এতে যানবাহন চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে এবং যানজট লেগেই থাকে। প্রতিনিয়ত ঘটছে নানা দুর্ঘটনাও। ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ ও চার লেনে উন্নীতকরণ কাজের জন্যও যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। এমন অবস্থায় সড়কে পণ্যবাহী ভারী যানবাহন চলাচল অনেকটা অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এতে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। কয়েক দিনের মধ্যে সড়ক-মহাসড়কের সংস্কারকাজে উন্নতি না হলে আসন্ন ঈদযাত্রায় যাত্রী ভোগান্তি আরও চরম আকার ধারণ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।’ যাত্রীসাধারণের নিরাপদ পথচলার কথা চিন্তা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে দায়িত্বশীলদের আরও তৎপর হওয়া দরকার।

ঈদের ছুটিতে ফাঁকা হয়ে পড়বে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব শহর। বছরজুড়ে কমবেশি উৎসব আয়োজন থাকলেও ঈদের মতো আনন্দযাত্রায় একেবারে শহর খালি করে বাড়িমুখো হওয়ার প্রতিযোগিতা কোনো উৎসবই দেখাতে পারে না। তাই এ ঈদ উৎসবটিকে ঘিরে যাত্রাপথের নিরাপদ নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয় বারবার। সব ভাবনা দূরে ঠেলে এবারের ঈদযাত্রা হবে মঙ্গলজনক আনন্দঘন এই আশায় রইলাম। এর জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু, সুন্দর ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ। ঈদ আনন্দকে আরও নির্বিঘœ করতে সরকারের দায়িত্বশীল সব সংস্থাকে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। সবশেষে বলব, নিরাপদ হোক মানুষের ঘরে ফেরা।

য় বিশ্বজিত রায় : কলাম লেখক

[email protected]

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে