নারীর আশা-হতাশার বাজেট

নৃ বচন

  ড. জোবাইদা নাসরীন

১৪ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ জুন ২০১৮, ০০:২১ | প্রিন্ট সংস্করণ

৭ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের উন্নয়নের জন্য ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এক লাখ ৩৭ হাজার ৭৪২ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। যা মোট বাজেটের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। মোট বাজেটের ২৫ শতাংশ নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার জন্য ব্যয় করার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে নারী উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া হয় এক লাখ ১২ হাজার ১৯ টাকা, যা মোট বাজেটের ২৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ ছিল। সেই হিসাবে নতুন বাজেটে নারী উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ পয়েন্ট। এই বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বয়স্ক ভাতাভোগীর সংখ্যা পাঁচ লাখ, বিধবা ভাতাভোগীর সংখ্যা এক লাখ ৩৫ হাজার, মাতৃত্বভোগীর সংখ্যা এক লাখ এবং ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তাপ্রাপ্তের সংখ্যা ৫০ হাজার বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া দরিদ্র মায়েদের মাতৃত্বকালীন ভাতা এবং কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মায়েদের ভাতার পরিমাণ ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা করা হয়েছে এবং ভাতা প্রদানের মেয়াদ দুই বছর থেকে তিন বছরে উন্নীত করা হয়েছে।

২০১৪-১৫ সালের বাজেটে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল এক হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, যা ছিল ওই বছরের মোট বাজেটের দশমিক ৬৩ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৪-১৫ সালে এই খাতে বরাদ্দ বেশি দেওয়া হয়েছিল ১৫৫ কোটি টাকা। গ্রামীণ জনপদের নারী ও সুবিধাবঞ্চিত উদ্যোক্তারা যাতে ঋণ পেতে পারে, সে লক্ষ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের আর্থিক সহায়তায় ‘চ্যালেঞ্জ ফান্ড’ গঠন ও বাস্তবায়নে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে ১০০ কোটি টাকার প্রতীকী বরাদ্দ রাখা হয়। গ্রামীণ জনপদের নারী ও সুবিধাবঞ্চিত উদ্যোক্তারা যাতে ঋণ পেতে পারে, সে লক্ষ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের আর্থিক সহায়তায় ‘চ্যালেঞ্জ ফান্ড’ গঠন ও বাস্তবায়নে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে ১০০ কোটি টাকার প্রতীকী বরাদ্দ রাখা হয়।

প্রস্তাবিত বাজেটে নির্বাচনকালীন নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে নারীর রাজনৈতিক অধিকার ও ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিতে সচেতনতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, স্থানীয় পর্যায়ে নারী কৃষি উদ্যোক্তাদের সহায়তার মাধ্যমে দরিদ্র নারী কৃষি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, কৃষিকাজে নারীদের মজুরি বৈষম্য দূর করতে নারী জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা, নারীদের জন্য পাবলিক টয়লেট স্থাপন, পুকুর খনন ও পুনঃখননে নারী কর্মীদের সুযোগ দান, প্রতিবন্ধী মেয়েশিশুদের সহজে ব্যবহার উপযোগী স্যানিটেশন সুবিধার ব্যবস্থা করার সুপারিশ করা হয়েছে। রাজস্ব বাজেট থেকে অর্থায়িত ২৫টি কর্মসূচির মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ঘূর্ণায়মান আকারে ৬৪টি জেলার ৪৮৮টি উপজেলায় মাথাপিছু ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। বাজেট অনুযায়ী ৬৪টি জেলার ৪৯০টি উপজেলায় ১ কোটি গ্রামীণ সুবিধাবঞ্চিত নারীর জন্য তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নারী নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধে ৬৪টি জেলার ৪৮৯টি উপজেলায় ৫ হাজার ২৯২টি ক্লাবের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা এবং সহিংসতা রোধকল্পে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রীর দেওয়া এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ২০০৯ সালে ছিল ৫৪.৩ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা ৬৯.৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নারীর অংশগ্রহণ ২০১০ সালের পর তেমন বাড়েনি; ২০১০ সালের ৩৬.০ শতাংশের তুলনায় সাত বছরে বেড়েছে নগণ্য ০.৩ শতাংশ। এ বিষয়ে মন্ত্রী আমাদের জানান, মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ঘূর্ণায়মান আকারে ৮টি বিভাগীয় শহরে এবং ৬৪টি জেলা শহরে ও ৪২৬টি উপজেলায় তৃণমূল পর্যায়ের ২ লাখ ১৭ হাজার ৪৪০ জন নারীকে আয়বর্ধনমূলক প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে ৬৪টি জেলার ৪৮৮টি উপজেলায় মাথাপিছু ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। রাজস্ব বাজেট থেকে অর্থায়িত ২৫টি কর্মসূচির মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল নির্মাণ ও শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র স্থাপন/সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায় কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল ও শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র নির্মাণ, মিরপুর ও খিলগাঁও কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ, ঢাকার নীলক্ষেতে ১০ তলা কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের নতুন ভবন নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, যশোরে চারটি হোস্টেলের অবকাঠামো উন্নয়ন।

আশার কথা হলো কাগজে-কলমে জেন্ডার বৈষম্য হ্রাসে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ বর্তমানে শীর্ষ অবস্থানে আছে। বিশেষ করে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারী সম্পৃক্ততার বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই উন্নতি লাভ করছে। দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ৪৭, যেখানে ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান ও পাকিস্তানের অবস্থান যথাক্রমে ১০৮, ১০৯, ১১১, ১২৪ ও ১৪৩। ২০১০ সালে এ সূচকে ১৩৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৮২তম।

বিগত এক দশকে নারী শিক্ষার হার অনেক বাড়লেও অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নারীর অংশগ্রহণ এখনো যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নারীর অংশগ্রহণ ২০১০ সালের পর তেমন বাড়েনি। এর কারণও রয়েছে। ২০১০ সালের ৩৬ শতাংশের তুলনায় সাত বছরে বেড়েছে মাত্র ০.৩ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি পেলেও শহরাঞ্চলে নারীর অংশগ্রহণের হার কিছুটা কমেছে। আমাদের প্রতিবছর যত নারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে তাদের মধ্যে শুধু ৩৭% নারী কমজীবনে প্রবেশ করে। আর বাকি অংশ শ্রমবাজার থেকে দূরে থাকে। বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখনো নারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। মজুরিতে অসমতা, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, সব কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সেন্টারের অভাবÑ সবকিছুই নারীর বিপক্ষে কাজ করে এবং ফলাফল হিসেবে এই ৩৭% নারীর মধ্যে প্রায় ১৬% নারী শ্রমবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আবার অনেকে পারিবারিক কারণেও শ্রমবাজার থেকে ফেরত আসে। তাই শ্রমবাজারকে নারীবান্ধব করে তৈরি করাই সবচেয়ে জরুরি বিষয়।

তবে বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অথমন্ত্রী যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং আবাসন, সন্তানদের জন্য দিবাযতœ কেন্দ্র, নারীবান্ধব গণপরিবহন ইত্যাদি সুবিধার মাধ্যমে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর উৎপাদন সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহারের ওপর জোর দেন। তিনি দশ বছর ধরে পরিচালিত জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন উদ্যোগকে মূল্যায়নের লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রণয়নের কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। এ কমিটি সব উদ্যোগকে যাচাই-বাছাই করে কীভাবে তা উন্নীতকরণ ও সংস্কার করা যায়, সে বিষয়ে প্রস্তাব দেবে।

গণপরিবহনে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট হারে আসন সংরক্ষণ ২০২০ সালের মধ্যে নিশ্চিত করা হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ এবং আবাসন, সন্তানদের জন্য দিবাযতœ কেন্দ্র, নারীবান্ধব গণপরিবহন ইত্যাদি সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর উৎপাদন সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার করতে সরকার যে বদ্ধপরিকর সেটিও বলেছেন মন্ত্রী।

তবে এই বাজেটেও লিঙ্গীয় সমতার ওপর জোর দেওয়া হলেও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য কোনো বাজেট আসেনি। এ ক্ষেত্রে একমাত্র সান্ত¡না হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় উপবৃত্তি প্রাথমিক স্তরে ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা, মাধ্যমিক স্তরে ৪৫০ থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ৬০০ থেকে ১০০০ টাকা এবং উচ্চতর স্তরে ১০০০ থেকে বাড়িয়ে ১২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে বাজেট তৈরি করার আগে শহর, গ্রাম, আদিবাসী, দলিত, প্রান্তিক সব বিবেচনায় বিভিন্ন ক্যাটাগরির নারীর বাজেট ভাবনা যাচাই করা জরুরি ছিল। কারণ বাজেটটি জনগণের জন্য। তাদের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিচ্ছবি এই বাজেট।

ড. জোবাইদা নাসরীন : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে