কিমের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক প্রসঙ্গে

  চিররঞ্জন সরকার

১৪ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ জুন ২০১৮, ০০:২১ | প্রিন্ট সংস্করণ

উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উনকে বলা হয় একজন ‘প্রবল একনায়ক’ আর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সীমাহীন আনপ্রেডিক্টেবল’ হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ তিনি কী বলবেন বা করবেন আগে থেকে ধারণা করা কঠিন। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এই দুই বিশ্বখ্যাত ব্যক্তি সিঙ্গাপুরে বৈঠকে বসেছেন। চুক্তিও একটা করেছেন। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং আনের সঙ্গে এক ঐতিহাসিক শীর্ষ বৈঠক এবং চুক্তি স্বাক্ষরের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তাদের মধ্যে ‘দারুণ ভালো’ আলোচনা হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তার গ্যারান্টির বিনিময়ে কিম জং আন পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করার অঙ্গীকার করেছেন।

আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট এবং উত্তর কোরিয়ার কোনো নেতা মুখোমুখি বসে কথা বলবেন কমাস আগেও তা অকল্পনীয় ছিল। আলোচ্য বৈঠকটি এর আগে একবার নির্ধারিত হওয়ার পরও দুপক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটির জেরে তা প্রায় ভেস্তে গিয়েছিল। কিন্তু বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকটি করে আদৌ কোনো লাভ হলো কিনাÑ তা নিয়ে বিশ্বজুড়েই সন্দেহ যেমন প্রবল, আশাবাদী হওয়ার কারণও দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।

শীর্ষ বৈঠকের মূল বিষয় ছিল : পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং উত্তেজনা হ্রাস। স্বাক্ষরিত চুক্তিতে বলা হয়, দুই দেশ নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য সহযোগিতা করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়াকে নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেবে। মি. কিম কোরিয়ান উপদ্বীপকে সম্পূর্ণরূপে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার জন্য তার অবিচল এবং দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। উল্লেখ্য, আমেরিকার প্রধান দাবি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ। উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রসম্ভার, তৈরির সাজসরঞ্জাম, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তাদের হাতে তুলে দিতে হবে। পক্ষান্তরে উত্তর কোরিয়ার দাবিÑ ১৯৫৩ সালের কোরিয়া যুদ্ধের যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তিতে রূপান্তর করতে হবে, দক্ষিণ কোরিয়ায় আমেরিকার ঘাঁটি ও অস্ত্রসম্ভার সরাতে হবে এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠাতে হবে।

দুই দেশ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং উত্তেজনা হ্রাস বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে বটে, কিন্তু কীভাবে এটা করা হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। অনেক বিশ্লেষকই বলছেন, মাত্র দেড় পৃষ্ঠার এই দলিলটি অস্পষ্ট এবং এর ভেতরে সারবত্তা কিছু নেই। অনেকে এমনটাও বলছেন যে, এটা ট্রাম্পের একটা চালও হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখন আর একমাত্র পরাশক্তি নয়, সাম্প্রতিক সময়ে তাদের ক্ষমতা ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে, তাই আমেরিকা এখন চাইছে বিশ্বের দু-একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তাদের লক্ষ্য যেন তারা হাসিল করতে পারে। তারই অংশ হিসেবে এই বৈঠক ও চুক্তি হতে পারে।

অনেকে এমনও বলছেন যে, খেয়ালি ট্রাম্প দেশে ফিরে গিয়ে এ চুক্তি বাতিলও করে দিতে পারেন। আসলে কিম বা ট্রাম্প তাদের দুজনকেই বোঝা দায়! বৈঠক-পরবর্তী সময়ে দুজনই কি শান্তির পথে থাকবেন? কিম পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে কতটা গুরুত্ব দেবেন? তার দেশে মজুদ থাকা পরমাণু ধ্বংস করতে আদতে রাজি হবেন কিম? আবার উত্তর-দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তে যে প্রায় সাড়ে ৫৮ হাজার মার্কিন সেনা মজুদ রয়েছে, তা সরিয়ে নিতে রাজি থাকবেন ট্রাম্প? এই বৈঠকে কি মেটাবে দুই কোরিয়ার দ্বন্দ্ব? এসব ব্যাপারে কোনো কিছুই গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায় না।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে আমেরিকা এক অনিশ্চিত গন্তব্যে চলেছে। এই খামখেয়ালি রাষ্ট্রনায়ক গোটা বিশ্বকে চটিয়ে চলেছেন। সদ্যসমাপ্ত জি-৭ সম্মেলনে তো তিনি রীতিমতো হৈচৈ বাধিয়ে দিয়েছেন। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেলের সঙ্গে করমর্দন করেননি, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে ‘দুর্বল’ ‘অসৎ’ চরিত্রের বলে সমালোচনা করেছেন, বাণিজ্য শুল্ক নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এতদিন বাণিজ্য নিয়ে মার্কিন ষুক্তরাষ্ট্রের মূল সংঘাতটা ছিল চীনের সঙ্গে। এবার সেই সংঘাতের পরিসর ছড়াল আরও বড় জায়গায়। যদিও হুঙ্কার দিয়ে ট্রাম্প বলছেন, এক হাজারবার যদি বাণিজ্য যুদ্ধ হয়, তবে এক হাজারবারই জিতবে মার্কিন ষুক্তরাষ্ট্র।

ট্রাম্পকে নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির প-িতদের মধ্যে নানা আলোচনা হচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, হেড অফিসের বড়বাবুকে তার নিজের গোঁফ নিজেকেই সামলে রাখতে হয়। এখনকার বড়বাবু কিন্তু সে ব্যাপারে বড্ড ঢিলেঢালা। আগেকার মার্কিন প্রেসিডেন্টদের তুলনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প মানুষটা অনেকটাই আলাদা। সত্যিই। তার চলনে, বলনে, কাজে-কর্মে।

গেল বছর জুন মাসে পরিবেশ, জলবায়ু এবং বিশ্বের উষ্ণায়নসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্যারিস চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা। ‘কী-হল কী-হল’ বলে আঁতকে উঠেছে বাকি বিশ্ব, এমনকি আধখানা আমেরিকাও। সিরিয়া আর নিকারাগুয়া নেই এই চুক্তিতে। তাই এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে এই দুটি দেশের সঙ্গে যে এক সমতলে নেমে এলো স্বপ্নপুরী মার্কিন দেশ। সমালোচনায় সরব বারাক ওবামা থেকে আল গোরে। প্রতিবাদে মুখর ফেসবুক, অ্যাপেল, ফোর্ড, মাইক্রোসফট, গুগলের মতো কোম্পানিগুলোও। কিন্তু এমনটা তো হওয়ারই ছিল। এ তো ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিই ছিল। তাই যেদিন মার্কিন জনতা ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা করার ভোটটা দিয়ে ফেলেছে, সেদিনই নির্দিষ্ট হয়ে গেছে এই ভবিতব্য। সোজা কথা, গ্রিনহাউস গ্যাস কমানোর জন্য মোটা টাকা খরচ করতে রাজি নয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা। ঐতিহাসিকভাবে সে দেশ পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কার্বন ডাই-অক্সাইডের জোগান দিলেও এখন এর জন্য ডলার খরচ করার চেয়ে মেক্সিকোর সীমানা বরাবর পাঁচিল তুলে দেওয়াটা অনেক বেশি প্রয়োজন। এই অক্টোবরেই ইউনেসকো থেকেও নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে আমেরিকা। কারণ বলা হয়েছে সংস্থাটির ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব। একই সঙ্গে ইসরায়েলও নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে ইউনেসকো থেকে। ইউনেসকোর মতে পূর্ব জেরুজালেম এক দখলিকৃত এলাকা এবং তা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সম্পৃক্ত। ওয়েস্ট ব্যাংকের ভেতরে থাকা হেব্রনকে ইউনেসকো বলেছে প্যালেস্টাইনের অংশ। ইত্যাদি, ইত্যাদি।

তবু না হয় ইসরায়েলের রাগ করার কারণ বোঝা গেল। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন? আসলে সে দেশে ইসরায়েলপন্থী লবি বেশ শক্তিশালী, দীর্ঘদিন ধরেই। সেই ২০১১তেই যখন ইউনেস্কো সদস্যপদ দেয় প্যালেস্টাইনকে, তখনই মার্কিন কংগ্রেস ইউনেসকোকে টাকা-পয়সা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। সেটা কিন্তু বারাক ওবামার শাসনকাল। তাই আজ ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে তার চূড়ান্ত পরিণতি হলেও মার্কিন দেশের এই চালচিত্র হঠাৎ করে আকাশ ভেঙে এসে উপস্থিত হয়নি। আমেরিকার কাছে ইউনেসকোর পাওনা বাড়তে বাড়তে এখন এসে দাঁড়িয়েছে ৫৫০ মিলিয়ন ডলার। সে টাকা তো বিশ বাঁও জলে।

এসবই যে মার্কিন অর্থনীতির এক ভঙ্গুর রূপের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ, তা বুঝলেও আমাদের বিস্ময় কমে না। অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গে মানসিকতার এই অবক্ষয়ের জন্য। প্যারিস পরিবেশ চুক্তি থেকে আমেরিকার সরে আসাকে অতিবিরক্ত বার্নি স্যান্ডার্স দেখেছিলেন ‘আমেরিকান নেতৃত্বের সিংহাসন ত্যাগ’ হিসেবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা ঘর সামলানোতে বেশি মন দিয়েছে। কিন্তু তা কি পৃথিবীর নেতৃত্ব দেওয়ার দায় আর মোহ পরিত্যাগ করেই? এমনিতে এতদিন ধরে আমেরিকা যে পৃথিবীর ওপর কর্তৃত্ব ফলিয়ে এসেছে তা তো অনেকটা এই জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এসবের মাধ্যমেই। এর আগে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে সেখানে আমেরিকার বেশি অনুদান দেওয়া নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের বিশ্বদর্শন নিয়ে ইতোমধ্যেই কম্পন অনুভূত হচ্ছে বিশ্ব আর্থিক সংস্থাগুলোর আলোচনায়। উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও হাঁসফাঁস করছে।

নেতৃত্বকে টিকিয়ে রাখা কিন্তু সহজ নয়। টাকা-পয়সাই হোক বা রাজনৈতিক কারণ, দায়িত্ব ছেড়ে পালিয়ে গেলে নেতার তকমাটাও হারাতে হবে। বিশ্ব নেতৃত্বের সিংহাসনে আমেরিকার ‘খড়ম’ বসিয়ে পৃথিবী চালাবে না কোন ‘ভরত’। শূন্যতা তো প্রকৃতির ধর্ম নয়, কেউ না কেউ তা পূর্ণ করবেই। হয় অ্যাঙ্গেলা মের্কেল আর ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর নেতৃত্বে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন, নয়তো ইউরোপের উত্তরে পুতিনের রাশিয়া, নতুবা এশিয়ার উত্তরের চীনা ড্রাগন অথবা অন্য কেউ। ট্রাম্প যখন আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা, চুক্তি এসব থেকে খরচ কমিয়ে তার দেশের মহান নবজাগরণে ব্যস্ত, পৃথিবীর উল্টোদিকে শি জিনপিং তখন ডাক দিচ্ছেন মেক চায়না গ্রেট এগেইন। চীনের সামরিক এবং অর্থনৈতিক শক্তির প্রবল সাম্প্রতিক উচ্ছ্বাস নিয়েই। আন্তর্জাতিক চুক্তি আর সংস্থাগুলো থেকে বাঁধন ছিঁড়তে ছিঁড়তে আমেরিকা তাই বাকি পৃথিবীকে অনেকটাই অন্যভাবে চলতে শিখিয়ে দিচ্ছে। আমেরিকাকে বাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে, লড়াই করতে, বাঁচতে। শক্তির ভরকেন্দ্রটা তাই বদলে যাচ্ছে, যাবে। সেটা কী হবে এই মুহূর্তে বলা যদিও অসম্ভব।

ঘুম ভেঙে শুধু আমেরিকাই একদিন দেখবে যে তার ‘গোঁফ’ চুরি গিয়েছে, ওয়াশিংটন আর পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক শক্তি নয়! আর এটা ট্রাম্প জমানাতে ঘটলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই!

এই আশঙ্কা থেকে বাঁচতেই কি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তির ব্যাপারে ট্রাম্প এমন মরিয়া? আর ক্ষমতার জন্য নিজের আত্মীয়-পরিজনকে যিনি অবলীলায় হত্যা করতে পারেন, সেই ‘রহস্যপুরুষ’ কিম কি ট্রাম্পকে সেই অবাধ সুযোগ দেবেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে