বিশ্বকাপ উন্মাদনা

  ইকবাল খন্দকার

১৪ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ জুন ২০১৮, ০০:২১ | প্রিন্ট সংস্করণ

অনেক বছর ধরেই আমরা বুঁদ হয়ে আছি ক্রিকেটে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ক্রিকেটে উন্নতি করার পর আমাদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়ে গেছেÑ ক্রিকেট এ দেশের মানুষের সবচেয়ে পছন্দের খেলা। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যেই বিশ^কাপ ফুটবলের মৌসুম আসে তখন পাল্টে যায় সব হিসাব-নিকাশ। ক্রিকেট নিয়ে সারাবছর যতটা না উন্মাদনা থাকে, তার শতগুণ বেশি উন্মাদনা শুরু হয়ে যায় এই এক মৌসুমে। অথচ বাংলাদেশ বিশ^কাপ ফুটবল খেলবে কী, এর আশপাশেও নেই। খেলাটা বাংলাদেশের মাটিতে হয় বা হচ্ছে, তাও নয়। তা হলে কেন এই উন্মাদনা? এই প্রশ্নের একটাই জবাব, অন্য কোনো খেলা ফুটবলের জনপ্রিয়তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

ফুটবল জনপ্রিয় ছিল, জনপ্রিয় আছে, জনপ্রিয় থাকবে। অন্য কোনো খেলা নয়, কেবল ফুটবলকেই ভালোবাসেন এমন অনেকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, ফুটবল খেলাটাকে তারা ভালোবাসেন এর সহজ নিয়ম-কানুনের কারণে। অনেক খেলাই আছে, যেগুলোর নিয়ম-কানুন সাধারণ মানুষ সহজে বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু ফুটবল খেলা বোঝেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর এরই সুবাদে এর জনপ্রিয়তা বেড়েছে, বাড়ছে। তবে বিশ^কাপের মৌসুমে এই জনপ্রিয়তা কাল হয়ে দাঁড়ায় অনেক ক্ষেত্রেই। সেটি ফুটবলের দোষ নয়। দোষ অতি আবেগী আর নিয়ন্ত্রণহীন সমর্থকদের। আবার আবেগও দোষের নয়, যতক্ষণ এটি অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়। সমস্যা হচ্ছে, ফুটবলবিষয়ক যে আবেগ, সেটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয়ে দাঁড়াচ্ছে অন্যের ক্ষতির কারণ। অবশ্য এটা নতুন কিছু নয়। সব সময় এমনটাই হতো। তবে আগে যেহেতু ফেসবুকের প্রচলন ছিল না, তাই এত এত সমর্থকের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগটা কম ছিল। এখন ফেসবুক আছে, আছে হাজার হাজার লাখ লাখ সমর্থকের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ। এতে হাতাহাতি হয়তো হয় না, তবে কাদা ছোড়াছুড়ি যে পরিমাণ হয়, তাতে আশঙ্কামুক্ত থাকার সুযোগ থাকে না। বিশ^কাপ ফুটবল শুরু হতে এখনো বেশ কদিন বাকি। অথচ সমর্থকদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়ে গেছে আরও দেড়-দুমাস আগে থেকেই। যেসব দেশ বিশ^কাপে অংশ নিচ্ছে, সেসব দেশের নাগরিকরাও এত আগে থেকে এতটা উন্মাতাল হয়ে ওঠে কিনা, সন্দেহ আছে। তবে তাদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি যে নেই, এটা সন্দেহাতীত। কারণ যে দেশ বিশ^কাপ খেলছে, সে দেশের লোকজন কেবল নিজের দেশকেই সমর্থন করবে। যেখানে একাধিক দলকে সমর্থন করার সুযোগ বা সম্ভাবনা নেই, সেখানে কাদা ছোড়াছুড়ির পরিবেশ তৈরি হওয়ারও কারণ নেই। বাংলাদেশে এই যে কাদা ছোড়াছুড়ি, এর অন্যতম কারণ আমাদের টিমের বিশ^কাপ খেলতে না পারা। আজ যদি আমরা বিশ^কাপের আসরে থাকতে পারতাম, তা হলে সবাই একযোগে বাংলাদেশকেই সমর্থন করতাম।

নিজের দেশের জয়-পরাজয়ে হয়তো উচ্ছ্বসিত কিংবা বেদনাগ্রস্ত হতাম, তবে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ যুদ্ধভাবটা তৈরি হতো না নিঃসন্দেহে। থাক, যা হয়নি বা অদূর ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তা নিয়ে কথা না বলি। তবে যা হচ্ছে, তা নিয়ে কথা বলা যেতেই পারে। বলছিলাম কাদা ছোড়াছুড়ির কথা। যুগ যুগ ধরেই এ দেশের জনসংখ্যার বড় দুটি অংশ ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করে আসছে। কেন করছে, তারা নিজেরাও হয়তো সেভাবে জানে না। জানার দরকারই বা কী। ভালো লাগা-ভালোবাসার তো কোনো ব্যাখ্যা হয় না। থাকে না ‘কারণ’ বর্ণনার ইচ্ছে বা সুযোগ। তবে ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে যে কলহটা তৈরি হয়, এই কলহ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ অবশ্যই থাকে। থাকা উচিত। সেদিন পরিচিত এক ব্রাজিল সাপোর্টার তার ওয়ালে আর্জেন্টিনার সাপোর্টারদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে একটা স্ট্যাটাস দিল। ইনবক্সে গিয়ে বললাম এমন আক্রমণাত্মক স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণ কী? এগুলো তো ঠিক নয়। উত্তর এলো কে বলেছে ঠিক নয়? প্রেম এবং যুদ্ধক্ষেত্র, এই দুই জায়গায় সবকিছু বৈধ। এর পর তিনি আরও কিছু কথা বলে এটাই প্রমাণ করতে চাইলেন, ব্রাজিল টিমের প্রতি তার যে প্রেম আছে, এই প্রেমের বহির্প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে তিনি সবকিছু করতে রাজি এবং প্রস্তুত আছেন। শুধু এই ব্রাজিল সাপোর্টার নন, অন্যান্য টিমের আক্রমণাত্মক সাপোর্টারদের যুক্তিও এমনই উদ্ভট। কিন্তু যুক্তি দাঁড় করানোটাই তো বড় বিষয় নয়। বড় বিষয় হচ্ছে, খেলাকে বিনোদনের জায়গায় রাখতে পারা। খেলা যদি সম্পর্ক নষ্টের কারণ হয়, খেলা যদি রক্তারক্তি এমনকি জীবননাশের কারণ হয়, তা হলে এই খেলা তো ফুটবল খেলা থাকল না। হয়ে গেল অভিশপ্ত মরণখেলা। তাতে লাভটা হলো কী? খেলা খেলার জায়গায়ই থাকল, অথচ আমরা থাকলাম না। কিংবা আমাদের মধ্যকার সুসম্পর্কটা থাকল না। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা এবং জার্সি ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে নানা কথা ভেসে বেড়াচ্ছে। যারা কোনোভাবেই বিষয়টাকে মেনে নিতে পারছেন না তারা বলছেনÑ এটা অপচয়। আবার বলছেন, নিজের দেশের পতাকা না উড়িয়ে অন্যান্য দেশের পতাকা ওড়ানো দেশদ্রোহিতার শামিল। আসলে প্রতিটি বিষয়কেই চাইলে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা যায়। আবার ইতিবাচক দৃষ্টিতেও দেখা যায়। অপচয়ের বিষয়টা নিয়েই বলা যাক। অপচয় হবে কেন? একটা পতাকা কিনতে কয় টাকাই বা লাগে? একটা জার্সির দামই বা কত! আরও বড় ব্যাপার হচ্ছে, যারা জার্সি বা পতাকা বিক্রি করছে, তারা কোন দেশের দোকানদার? অবশ্যই বাংলাদেশের। তার মানে আপনি যে টাকাটা খরচ করছেন জার্সি বা পতাকা কিনতে গিয়ে, সেটা তো দেশেই থাকছে। বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে, তা তো নয়। আর বাসাবাড়িতে বিদেশি পতাকা ওড়ানোর অবৈধতার কথা যে বলছেন, খোঁজ নিয়ে দেখেন, তারা একবারও ভাবছে না নিজের দেশের পতাকার চেয়ে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকার গুরুত্ব বেশি। নিতান্তই সাময়িক বিনোদনের জন্য এটা করছে। আবার অনেকেই সবচেয়ে উঁচুতে ওড়াচ্ছে নিজের দেশের পতাকা, তার পর ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার। সর্বোপরি মানুষের নির্মল বিনোদনের জায়গাটিকে সমর্থন করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত ছোটখাটো ত্রুটিগুলোকে হয়তো ক্ষমা করাই যায়। এক কৃষক প্রতিবারই জার্মানির বিশাল পতাকা বানান। এবারও বানিয়েছেন প্রায় পাঁচ কিলোমিটার লম্বা পতাকা। দরিদ্র এই কৃষককে প্রায় সবাই ‘পাগল’ বলছে। হ্যাঁ, পাগল তো বটেই। প্রকৃত প্রেমিকরা বরাবরই পাগল। আপনি যে যুক্তিতেই ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা জার্মানির সাপোর্টারদের পাগল বলেন না কেন, যত নেতিবাচক বাক্য দিয়েই তাদের উন্মাদনাকে বিশ্লেষণ করেন না কেন, তাদের উন্মাদনা বাড়বে বৈ কমবে না। তাই এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সুযোগে সংঘাতের নতুন পরিবেশ যেন সৃষ্টি না হয়।

ইকবাল খন্দকার : কথাসাহিত্যিক ও টিভি উপস্থাপক

[email protected]

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে