অবিশ্রান্ত আলোর ফোয়ারা ফারুক মাহমুদ

  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

২৩ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৩ জুন ২০১৮, ০১:২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মূলত প্রবন্ধ লেখেন। কিন্তু গল্প দিয়ে লেখার শুরু হওয়ায়, সেই ধাঁচ একেবারে ছাড়তে পারেননি। মাঝেমধ্যে গল্প লেখেন, বিশেষ করে ছোটদের জন্য কলম ধরেন। তার একটি কিশোর উপন্যাসের খোঁজ আমরা জানি, আছে একটি ছোটগল্পের বই। তিনি টেলিভিশনের জন্য একটি দুটি নাটকও লিখেছেন। কিন্তু তার লেখক, খ্যাতি প্রবন্ধের জন্য। বিষয়ের দিকটা তো আছেই। তার প্রবন্ধের ভাষা অভিনব। গল্প দিয়ে লেখক জীবনের সূত্রপাত হওয়ায়, সেই ধাঁচটি প্রবন্ধের মধ্যে শনাক্ত করা যায়। গল্প বলার ছলে তিনি প্রবন্ধের বিষয়গুলোকে সহজ স্বাচ্ছন্দ্যতায় পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারেন। প্রবন্ধের বিষয়ের মধ্যে ‘জটিল বিষয়’ থাকে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেই জটিল বিষয়কে সহজ এক নান্দনিক ভাষায় পাঠক সমাবেশে উপস্থাপন করেন। নিজস্ব ‘কাব্যভাষা’র কারণে কোনো কোনো কবিকে শনাক্ত করা সহজ হয়ে ওঠে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখার ভাষায় একটি চরিত্ররূপ লাভ করেছে। সহজ, স্বচ্ছন্দ, স্বচ্ছ, প্রাণবন্ত এবং নান্দনিক গতিময়তার জন্য তিনি প্রবন্ধ লেখায়ও একটি চমৎকার ভাষাভঙ্গি আয়ত্ত করেছেন। ভাষার দ্যুতিময়তা বিষয়ের চারপাশের এমনকি গভীর অবস্থানের ছায়াসূত্রগুলো দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তোলে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একজন শিক্ষক। শিক্ষক বলতে আমরা বুঝিÑ জ্ঞানসাধক ও জ্ঞান-উৎগ্রাহক, আদর্শের, মূল্যবোধের ধারক। শ্রেণিকক্ষে তো বটেই, তার সংস্পর্শে যারা আসেন, অর্জিত সেই জ্ঞান ও মূল্যবোধের কিছুটা হলেও সঞ্চায়িত হয়। সেই জন্য শুধু তার শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীরাই নয়, যারা তার সংস্পর্মে এসেছিলেন সভা-সেমিনারে তার বক্তৃতা শুনেছেন, তার লেখা বই পড়েছেন, তাদের অনেকে এই শিক্ষক-লেখকের জ্ঞান ও জীবন দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়েছেন, তাকে শিক্ষক হিসেবে মেনে নিয়েছেন। শ্রেণিকক্ষের সরাসরি শিক্ষার্থী ছিলেন তারা তো বটেই, যারা ছিলেন না, তার বক্তব্য ও আদর্শের অনুসারী হয়ে তাকে শিক্ষক বলে জ্ঞান করেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রিয় ‘স্যার’ সবাই তাকে ‘ঝওঈ’ স্যার বলেই গ্রহণ করেছে। সেই অর্থে তিনি সন্তানেরও শিক্ষক, বাবারও শিক্ষক। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, অতিথি, সভাপতি, আলোচক-বক্তা, এরা বসেন উঁচু মঞ্চে, দর্শক-শ্রোতা বসেন নিচের দিকে। আমাদের ছোট-বড় প্রায় সব অনুষ্ঠানের এটাই ধরন। কিন্তু অভূতপূর্ব অনুষ্ঠানটি হলো ভিন্ন রকম আয়োজনে। সবাই বসেছেন একই সমতলে। আলাদা কোনো মঞ্চ নেই। এই ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানটি ছিল সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জন্মদিন উপলক্ষে। এই কৃতী শিক্ষাবিদের জন্ম ১৯৩৬ সালে। সেই হিসাবে গত বছরের ২৩ জুন ছিল তার ৮০তম জন্মবার্ষিকী।

নিজের জন্মদিন পালনে শ্রদ্ধেয় এই শিক্ষকের সায় একেবারে নেই বললেই চলে। কিন্তু প্রিয়জনদের কথা ফেলতেও তো পারেন না। গত কয়েক বছর থেকে তার বাসায়, একেবারে ঘরোয়া পরিবেশে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের জন্মদিন পালিত হয়ে আসছে। কাছের মানুষ প্রিয়জনরাই এর আয়োজক। কিন্তু গত বছরের অনুষ্ঠানটি হলো একটু বড় পরিসরে। ৮০তম জন্মবার্ষিকী বলে কথা। তার অনুরাগীরাও চাইছিলেন অনুষ্ঠানটি একটু জানান দিয়ে বড় পরিসরে হোক। স্যার তো রাজি নন বড় অনুষ্ঠান করার, কিন্তু সবার আবদার রক্ষা করতে কিছু শর্তসাপেক্ষে রাজি হলেন। এক নম্বর শর্ত ছিল, উঁচু মঞ্চ তৈরি করে অনুষ্ঠানে কোনো বিভাজন তৈরি করা যাবে না। সবাই একই সমতলে বসবেন, শুভেচ্ছা বিনিময়। হয়েছিল তা-ই। সময়টা রোজার মাস হওয়ায় ইফতারের আগে অনুষ্ঠান শেষ করার বাধ্যকতা থাকায়, লম্বা বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। বিপুলসংখ্যক মানুষ শুভেচ্ছা জানিয়ে তাদের ভালোবাসার কথা, মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন। মিলনায়তনটি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। অনেকে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। আমাদের অধিকাংশ অনুষ্ঠানের, সে রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক যে কোনো ধরনের অনুষ্ঠানই হোক, শ্রোতারা থাকেন একপেশে। কিন্তু সেদিন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ৮০তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দর্শক-শ্রোতা ছিলেন নানা শ্রেণি-পেশার।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী চিন্তাশীল প্রবন্ধের লেখক হিসেবে বেশি পরিচিত। স্কুলজীবন থেকেই তার লেখালেখির শুরু। তরুণ বয়সে তিনি গল্প লিখতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি অধ্যয়ন করেছেন ইংরেজি সাহিত্যে, পেশাগত জীবনে হলেন শিক্ষক। বিশ্ব সাহিত্যের বিশাল ভা-ারে দীর্ঘ বিচরণের মাধ্যমে তিনি যে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন, তাই বিলাচ্ছেন শ্রেণিকক্ষে, লেখালেখির মাধ্যমে বিশাল শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে। জ্ঞান, পা-িত্য, সৃজনশীলতা, উদার মানবিকতার সংহত এবং শিল্পীত প্রকাশ এবং বিশ্লেষণ-বিস্তৃতির জন্য সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যার তুলনা তিনি নিজেই। মেধার মাধুর্য এবং মননের চর্চার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উদার মানবিকতার মূল্যবোধ। তিনি আবেগকে যেমন যুক্তির মানদ-ে বিচার করতে জানেন, ব্যক্তি আকাক্সক্ষা এবং প্রত্যাশার বিষয়টিকে সবার সামনে আনতে পারেন বাস্তবতার আলো এবং আঁধারের অনুষঙ্গগুলোকে। যুক্তিগ্রাহ্যতাকে মান্য করার মধ্যে যে সাংস্কৃতিক চেতনা, ইতিহাসের শিক্ষা এবং চিরায়ত মূল্যবোধে নবায়নতা রয়েছে, তা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার জীবনাচার, লেখা, চিন্তা ও এর বাস্তব প্রতিফলনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। জ্ঞান অর্জনের সুউচ্চ শিখরে পৌঁছেন, তা বিতরণের সহজতা তার স্বভাবের মধ্যেই সন্নিবেশিত। শিক্ষকের যে গাম্ভীর্য সেটি তার মধ্যে যেমন আছে, আছে স্বাভাবিকতার এক অনন্য সারল্য। শ্রেণিকক্ষে, সভা-সেমিনারে জ্ঞানপুষ্ট গম্ভীর আলোচনার আবহ তৈরিতে তার যেমন নৈপুণ্য আছে, অন্যদিকে তাত্ত্বিক আলোচনার কুফলতাকে বিস্তৃত ও স্বচ্ছ করে তুলে ধরতে পারেন আলাপচারিতায়-আড্ডায়। তিনি গম্ভীর কিন্তু টলটলে জল। এ জলে যেমন আকাশের ছায়া পড়ে, সূর্য আলো ছড়ায়, জ্যোৎস্না ছড়ায় কোমল স্নিগ্ধতা।

সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, সংস্কৃতি নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের নতুন ধারা তৈরি করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি নিজস্ব চিন্তায় যেমন নিষ্ঠ এবং স্পষ্ট, তেমন এসবের উপস্থাপনে নিরলস। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নিরেট স্থিত এবং স্বচ্ছ। সাধারণ জীবনযাপণে তিনি হয়ে উঠেছেন সহজতার এবং অসাধারণ প্রতীক-মানুষ। শ্রেণি বিভক্ত সমাজের শোষণ এবং একরৈখিক চলাচলের বিপক্ষে তার চিরকালীন অবস্থান। শিক্ষা ও সংস্কৃতির জীবন মূর্খতা, জ্ঞাননির্ভর, যুক্তিবাদী সমাজের স্বপ্ন তিনি লালন করে এবং বিশ্বাস করেন পুঁজিবাদী সমাজের অন্ধতা, বঞ্চনা ও শোষণের অযৌক্তিকতার একদিন অবসান হবে। মানবমুক্তির মহামিছিলে অংশগ্রহণ ঘটবে সব শ্রেণির মানুষের। তাত্ত্বিকতার সীমারেখা ছেড়ে মার্কসীয় দর্শনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিটি জোরালো হবে, এর থেকে উত্থিত হবে মানবমুক্তির গান। মানুষের কল্যাণই যার আকাক্সক্ষা, আদর্শিক লড়াইয়ে যার লেখালেখির বিস্তৃতি, তিনি বয়সসীমার ৮০ অতিক্রম করে আমাদের মধ্যে রয়েছেন। আমরা কল্যাণব্রতী এই জ্ঞানতাপশের দীর্ঘায়ু কামনা করছি। তিনি আমাদের আলোর ফোরারা রবীন্দ্রনাথের সেই যে চিরায়ত আকাক্সক্ষা ‘আলো, আরো আলো’ স্যার সেই বিকিরণের উৎস হয়ে থাকুন।

য় ফারুক মাহমুদ : কবি ও সাংবাদিক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে