বাংলাদেশে উন্মাদনা

  ইশতিয়াক আহমেদ

৩০ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ৩০ জুন ২০১৮, ০০:০৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

আজন্ম মাছে-ভাতে বাঙালি চার বছর পর পর শুধু আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলে বাঙালি হয়ে যায়। এই আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল হওয়ার দুই রকম ব্যাপার আছে ভালোও আছে, আছে খারাপও। তবে একটা সময় আমাদের যখন সহনশীলতা বেশি ছিল তখন বিষয়টা খুব আনন্দময় ছিল। সমর্থকরা খুব গঠনমূলক আলোচনা করত। খেলায় জিতলে আনন্দ করত, হারলে মন খারাপ করে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যেত।

পত্রিকায় কলাম লিখতেন তখন দেশের বিখ্যাত ফুটবলাররা। সমর্থকরা সকালে উঠে সেই কলাম পড়ে একটা সিদ্ধান্ত নিত। সবাই কমবেশি তখন এক বাক্যে মেনে নিত উনি যখন বলছেন, ভুল হওয়ার কথা নয়। ধীরে ধীরে আমরা পাল্টে গেছি। এখন কেউ কাউকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। নিজেরাই সবচেয়ে বড় বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠছি ফেসবুকের কল্যাণে। বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রাধান্য পাচ্ছে, যারা সারা বছর ফুটবল দেখার সময় পান না তারাও। ফলে যার যার কাজে সে যে সেরা এই মাপযন্ত্র আর থাকছে না।

সে কারণে আমাদের অনুন্নত ও সুবিধাবঞ্চিত দেশগুলোও ফুটবলে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে ফিফা র্যাংকিংয়ে। আমরা রয়ে গেছি কে বড় বিশেষজ্ঞ, সেই আলোচনায়।

আমাদের আনন্দ উদযাপন এবং সমর্থক হিসেবে কে কত কঠিন, তা প্রমাণের আরেক উপায় ছিল পছন্দের দলের পতাকা ওড়ানো। কে কত বড় পতাকা বানাতে পারে, কে কত উঁচুতে ওড়াতে পারে, তা নিয়ে ছিল আমাদের উন্মাদনা। এখন সেখানে এসেছে উগ্রপন্থা। পতাকা ওড়ানো নিয়ে শারীরিকভাবে একে অপরকে আঘাতও করতে দ্বিধা করছি না আমরা। অথচ আমরা ভুলে যাই বারবার এটা কেবলই খেলা।

এত কিছুর পরও আমাদের উন্মাদনায় যে ভালো কিছু নেই তা নয়। এই এক মাস দেশে অঘোষিত উৎসব চলে। শপিংমলে, ফুটপাতে থাকে প্রিয় দলের জার্সি বিক্রির বিশাল আয়োজন। প্রযুক্তির কল্যাণে অনলাইন শপিং সাইটগুলোও আমাদের পছন্দের দলের রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যায় মাসজুড়ে। জার্সি, টিশার্ট, ক্যাপ, চাবির রিং, মোবাইল কভার থেকে ধরে পারলে ভাত খাওয়ার থালাবাসনও তারা করে দিতে চায় প্রিয় দলের পতাকার রঙে। এমনকি চার-পাঁচশ টাকায় বিশ্বকাপও বিক্রি করছে অনলাইনগুলো। মানে, বিশ্বকাপের আদলে বানানো রেপ্লিকা।

পিছিয়ে থাকে না রেস্টুরেন্টগুলোও। খেলা দেখার আয়োজন থেকে শুরু করে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া আলোচিত দেশের খাবার নিয়ে তারা থাকে এই দৌড়ে।

সঙ্গে থাকে ডিসকাউন্ট। খেলা দেখতে এসে চেকইন দিলে থাকে আয়োজনভেদে নানারকম ডিসকাউন্টও।

তবে সবার উপরে ফুটবল প্রেম সত্য। প্রিয় দলের উপস্থিতি সত্য।

এবারের বিশ্বকাপ উন্মাদনায় বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে একাধিক বাড়ি। ব্রাজিল বাড়ি, আর্জেন্টিনা বাড়ি। বাড়িগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য নিজ দলের পতাকার আদলে রাঙানো বাড়ি আর ঘরের ভেতরে যেন দলের জাদুঘর। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল দুই দলের সমর্থকেরই রয়েছে এমন বাড়ি। এই বাড়ির কারণে কেউ কেউ পেয়ে গেছেন ফ্যানকার্ড, রাশিয়ায় গিয়ে বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ।

বিষয়টা হয়তো ততটা গৌরবের কিছু নয়, কিন্তু আমরা ভালোবাসায় কতটা অকৃপণ জাতি, তা বোঝা যায় এসব থেকে।

এই উন্মাদনায় এগিয়ে আছে দেশের ভক্ত কিশোররা। নিজেদের ওপর নানা পরীক্ষাও চালায় পছন্দের দেশের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে। হাতে, শরীরে প্রিয় খেলোয়াড়ের মুখাবয়বের ট্যাটু, লোগো। চুলের কোনো অংশ কেটে প্রিয় দলের পতাকার আদল বানাতেও দ্বিধা নেই এদের।

তবে বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জায়গা হয়ে যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমগুলো। বিশেষ করে ফেসবুক। প্রথম দিকে আলোচনা, সমালোচনা আর তর্কের জায়গায় থাকলেও কোথাও কোথাও সেটা আপত্তিকর, নোংরামির জায়গায় চলে গেছে। ‘ট্রল’ নামক অদ্ভুত বিষে আক্রান্ত ফেসবুক। এ কারণে এখানে কেউ কেউ দলীয় সমর্থনকে ব্যক্তি আক্রমণে নিয়ে যায়। তৈরি হয় সামাজিক সমস্যা।

আমাদের পরিমিতিবোধ এবং সহনশীলতা কমে আসার একটা বড় নমুনা পাওয়া যায় এখানে।

তবে দিনশেষে খেলাকে মাঠের মাঝে রেখে তার কাছ থেকে আনন্দ নেওয়াই উত্তম কাজ। আগের দিনগুলোয় তাকালে যে শিক্ষা আমরা নিতে পারি।

যেমনÑ একজন ম্যারাডোনা সমর্থকের কথা জানি, তাকে একজন মেসেজ পাঠিয়েছিল একজন কোকেনসেবী, ঋণখেলাপিকে নিয়ে এত মাতামাতি আপনাকে মানায় না।

তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ভাই রে ম্যারাডোনা নিজেই তো একটা কোকেনের নাম। যে নেশায় ডুবে আছি আমরা বহুদিন ধরে। আমাদের আর কীইবা করার আছে?

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে