অহঙ্কারের খেলায় দুজনের একসঙ্গে জয় হয় না

  জয়া ফারহানা

১০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৮, ০১:০৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

কামরুন্নাহার মল্লিকা ও মেহেদী হাসান। পেশায় শিক্ষক ও ব্যাংকার। ভিন্ন পেশার এ দুজনের পেশার ভিন্নতার পাশাপাশি রুচি, পছন্দ, সংস্কৃতিও হয়তো ছিল ভিন্ন। হতে পারে সে কারণে দাম্পত্য যাত্রা গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই কোনো এক অনিশ্চিত অনির্দেশ্য সময়ে থেমে গেছেন তারা। কিন্তু রুচি, পছন্দ ও সংস্কৃতির ভিন্নতা নিয়েও দীর্ঘ দাম্পত্যের উদাহরণ কি নেই? আছে। ৩৬০ ডিগ্রির বিপরীত রুচির দুজন মানুষের দীর্ঘ দাম্পত্যের দীর্ঘ তালিকা আছে। আবার রুচির হারমনিতে অনন্য এমন দাম্পত্য শুরু না হতেই বিচ্ছেদের দৃষ্টান্তও আছে। মাঝামাঝি অবস্থানের দৃষ্টান্তও আছে। সব মিলিয়ে দাম্পত্য এক জটিল এবং গোলমেলে ধাঁধা সন্দেহ নেই। মল্লিকা-মেহেদী দম্পতির মনোজগতে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে কোন ইস্যু কাজ করেছে আমরা জানি না। তবে এ ধারণা করাও খুব অসঙ্গত নয় যে, এই দম্পতির নক্ষত্রম-ল নামের পছন্দের একটি কমন গ্রাউন্ড ছিল। ধারণার কারণ দুই সন্তানের নামই তারা রেখেছেন নক্ষত্রের নামে। একজন ধ্রুব। সুলিভানের নক্ষত্রবিষয়ক গ্রন্থে যে ‘ধ্রুব’ পরিচিত হয়ে আছে পোলারিস নক্ষত্র হিসেবে। ছোটটি লুব্ধক। নক্ষত্রম-লের সর্র্বপ্রধান নক্ষত্র। নক্ষম-লের সব নক্ষত্রেরই উদয়-অস্ত আছে। নেই কেবল ধ্রুব ও লুব্ধকের। নামকরণের সময় এ দম্পতি নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন ধ্রুব ও লুব্ধকের মতো জ্যোতির্ময় হবে সন্তানরা। এখনো নিশ্চয়ই চান। তবে এখন চাইছেন পশ্চিমের ‘অ্যাপার্ট ফর্মে’। বাবা-মা এবং সন্তানের চাওয়া মিলছে না।

দুই

প্রাক-দাম্পত্যকালে, প্রেমের দিনগুলোয় প্রত্যেক জুটি প্রতিজ্ঞা করে তাদের যৌথ যাত্রাপথ যত দুর্গম হোক, সেই দুর্গম পথে তারা প্রেমের নিশান উড়াবে। প্রেমই ঢাল হয়ে থাকবে দুঃসহতম কাজে। ‘পাড়ি দিতে নদী হাল ভাঙে যদি, ছিন্ন পালের কাছি, মৃত্যুর মুখে দাঁড়ায়ে জানিব তুমি আছো আমি আছি।’ কিন্তু অধিকাংশ যুগল দাম্পত্যে প্রবেশ করে এই প্রতিজ্ঞা রাখতে মর্মান্তিকভাবে ব্যর্থ হন। কেন? দাম্পত্য কি চেনা বাস্তবতার ভেতর আরেকটি অচেনা বাস্তবতা? অচেনা বাস্তবতা না হলেও নতুন অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই। যেখানে ‘তুমি আছো আমি আছির’ পাশাপাশি দুই পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আরও কিছু স্বজনও থাকেন। এরাই কি প্রেম পর্বের মতো দাম্পত্য পর্বও উপভোগের পথে বাধা? দাম্পত্য কলহ এত সরল বিষয় নয়। বিচিত্র দাম্পত্য সমস্যার উৎসও বিচিত্র ও বহুমাত্রিক। যে প্রেম মোহের মতো, কেবল সেই প্রেমই দাম্পত্যে এসে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়? উত্তর দেওয়া মুশকিল। ঘোরতর প্রেমও দাম্পত্যে ব্যর্থ হতে পারে। রুক্ষ দিনের দুঃখ পাই তো পাব, চাই না শান্তি, সান্ত¡না নাহি চাবোর মতো আশ্বাসের সাহসী বাণী উচ্চারণ করার স্বল্পকালের মধ্যে দম্পতিদের মধ্যে তবে কেন ক্লান্তি নেমে আসে। কী কারণে দাম্পত্যের মায়া ফিকে হয়ে আসে, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। সন্দেহ নেই দ্রুত বদলে যাওয়ার সময় দাম্পত্যের চেহারা বদলে দিচ্ছে। যদি বলি যানজটও দাম্পত্য বিচ্ছেদের একটি কারণ কেউ কি হেসে উড়িয়ে দেবেন? কিন্তু ভাবুন একবার। ঘোর সকালে যাদের অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হয় এবং শহরের বীভৎস যানজট ঠেলে রাতে বাড়ি ফিরতে হয় সেই দম্পতির দাম্পত্য চর্চার সময় কোথায়? ভিন্ন দৃষ্টান্তও আছে। নাসরিন জাহানের উদ্ধৃতি দিই। ‘প্রেমের যে ধারা বাঁধা পড়ে অভ্যেসে, মায়ায়’ প্রবন্ধে নাসরিন জাহান লিখছেন, ‘আরেক দম্পতিকে চিনি। একসময় কী প্রবল প্রেম তাদের। দিনে পঞ্চাশবার ফোন, দশবার দেখা হওয়াÑ শেষে বিয়ে। একপর্যায়ে স্বামীর সর্বক্ষেত্রে ব্যস্ততা বাড়তে থাকলে স্ত্রী তার আসার অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে জানালার পাশে বসে থাকত। দীর্ঘদিন পর সেই দম্পতির সঙ্গে সেদিন দেখা। ছেলেপুলে হয়েছে, সংসার বড় হয়েছে। স্ত্রীটি বলল, ও যত দেরিতে ফেরে ততই শান্তি। ঘরে থাকলে সারাক্ষণ টানটান থাকতে হয়। এটা এখানে কেন, ওটা ওখানে কেন। রীতিমতো অতিষ্ঠ করে তোলে।’

নারী অধিকার কর্মী ও অভিনয়শিল্পী মিথিলা রশীদ সম্প্রতি শাশুড়িদের কাছে খোলা চিঠিতে লিখেছেন, একটি মেয়ে শ্বশুরবাড়ির পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে। এই চেষ্টায় সফল হওয়ার জন্য সব শাশুড়ির পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ‘শাশুড়ির কাছে খোলা চিঠি’ নিয়ে কিঞ্চিত প্রশ্ন আছে। শ্বশুরবাড়িতে শাশুড়িই সব ক্ষমতার মূল কিন্তু নন। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ক্ষমতার উৎস পুরুষ। খোলা চিঠির প্রথম দাবিদার তাই শাশুড়ির আগে শ্বশুর। আবার কেষ্টা বেটার মতো সব দাম্পত্য সমস্যার জন্য শ্বশুরবাড়ির নারী স্বজনদের একচ্ছত্র দায়ী করার কোনো সুযোগ নেই। দাম্পত্যের সম্পর্কে যতজনই ঘনিষ্ঠ থাকুন, মূল মানুষ কিন্তু দুজন। কেন্দ্রীয় এই দুই চরিত্র মোহকালে পরস্পরের প্রতি মোহের মূর্ছনায় যেমন তন্ময় হয়ে থাকেন, তেমন না হলেও দাম্পত্যকে যদি একটু সৃজনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করেন, তা হলেও ভাঙা পরিবারের সংখ্যা কিছুটা কমে বোধহয়। কোনো কোনো দম্পতি স্বল্পকালের দাম্পত্যকে সঠিক বিবেচনা করেন। দাম্পত্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা তাদের কাছে হাস্যস্পদ, গৌণ। ধরে নিতে পারি এই মানসিকতার দম্পতিরা পশ্চিমের প্রবল অনুরাগী। দীর্ঘ দাম্পত্য আবার কারো কাছে ক্লান্তিকর একঘেয়ে বৈচিত্র্যহীন। বৈচিত্র্যপ্রেমীরা নতুন দাম্পত্যে নিত্যনতুন রোমাঞ্চ খুঁজে পান হয়তো, কিন্তু কিছুই কি হারান না? ‘এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না, শুধু সুখ চলে যায়।’ কারো কারো আছে তীব্র অহমবোধ। অহমসর্বস্বরা অহমের ক্ষেত্রে ছাড় দিতে নারাজ। এরা দাম্পত্য ছাড়তে পারেন, কিন্তু অহঙ্কার ছাড়বেন না। অহঙ্কারের দাম্পত্য খেলায় দুজনে একসঙ্গে জিততে চাওয়া খেলোয়াড়ের সংখ্যা বাড়ছে। বিচ্ছেদ বাড়ার এও এক কারণ।

তিন

টলস্টয় লিখেছেন, ‘সমস্ত সুখী পরিবারই একরকম। কিন্তু প্রতিটি অসুখী পরিবারের অসুখের কারণ আলাদা।’ ঠিক কোন অসুখের কারণে এই দম্পতি বিচ্ছেদ চাইছেন আমরা জানি না। জানতেও চাই না। সেটা আমাদের আলাপের বিষয় নয়। কিন্তু মা-বাবার দাম্পত্য কলহকে কেন্দ্র করে এ দুই শিশু যে বার্তা সমাজে পৌঁছতে পেরেছে, তা নিয়ে অবশ্যই আমাদের ভাবতে হবে। প্রাচ্যের দম্পতিরা পাশ্চাত্যের দম্পতিদের মতো নির্মম নন বলে আমাদের প্রাচ্য দেশীয়দের যে গরিমা ছিল, যে অহম ছিল, সেই অহমের বেলুন ফুটো করে দিয়েছে এই দুই শিশু। ঠিক কী কারণে প্রাচ্য দম্পতিদের মধ্যে বিচ্ছেদের এই আন্তর্জাতিক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব বর্তেছে আমাদের সমাজবিজ্ঞানী এবং গবেষকদের ওপর। ক্যারিয়ারের প্রতি অতিমনোযোগ কিংবা সঙ্গীর প্রতি অসহিষ্ণুতা অসহনশীলতা অথবা রুচির ভিন্নতার কারণে প্রায় জ্যামিতিক হারে বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ছে, এমন সরল হিসাব করলে অঙ্ক মিলবে না। আরও গভীর ১েকানো কারণ আছে নিশ্চয়ই। মানুষের আত্মঘাতী প্রবণতা নিয়ে বিশ্বের নামজাদা সব বিশ্ববিদ্যালয় কতশত গবেষণা করেছে। হাজার হাজার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই হাজার হাজার গবেষণা প্রতিবেদন আত্মহত্যার কতশত কারণই না খুঁজে পেয়েছে। তবে আমাদের বিবেচনায় সবচেয়ে মোক্ষম কারণটি আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। অর্থ কীর্তি ও সচ্ছলতার পরও কোনো কোনো মানুষের অন্তর্গত রক্তের মধ্যে বিপন্ন বিস্ময় খেলা করে। বিপন্ন বিস্ময়ে আক্রান্তরা তাদের নিজেদের মুদ্রাদোষে সবার থেকে আলাদা হয়ে যান। দাম্পত্য বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদেরও কি থাকে এমন কোনো বিপন্ন বিস্ময় বা অন্তর্গত রহস্য, যা এখনো নির্ণয় করতে পারেননি সমাজবিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষকরা? হতে পারে। তবে কারণ যেটাই হোক, তা নিয়ে আমাদের কথা বলতে হবে। কারণ ধ্রুব ও লুব্ধকের মতো আরও লাখ লাখ শিশু মা-বাবার দিকে কাতর দৃষ্টি এবং ভাঙা মন নিয়ে তাকিয়ে আছে একটি সুস্থ পারিবারিক পরিবেশের প্রত্যাশায়। তাদের সেই পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে হবে। নিশ্চয়ই ভিনগ্রহের কোনো এলিয়েনরা আমাদের দম্পতিদের মনোজগৎ তছনছ করে দেয়নি। পরিবার ভালোবাসার এক মহাপরাক্রমশালী প্রতিষ্ঠান। ভালোবাসার এ প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতেই হবে।

চার

যদি উল্টো দিকের ফ্ল্যাটে সেবার রানী থাকতেন আর ডেলা জানালায় তার ভেজা চুল ছড়িয়ে রাখত, তবে সেবার রানীও হয়তো ডেলার চুল দেখে ঈর্ষায় মরে যেত। এমন অসাধারণ সৌন্দর্যের চুল ছিল ডেলার। আর যদি বাদশাহ সোলায়মান তার সব ধন-রতেœর মাঝে বসে থাকতেন আর জিম যেতে আসতে তার সোনার ঘড়িটা বের করে সময় দেখত, তবে বাদশাহ সোলায়মানও তাকে হিংসা না করে পারতেন না। জিম ও ডেলা তাদের শ্রেষ্ঠ এই দুই সম্পদ বিক্রি করে দিয়েছিলেন পরস্পরের জন্য। ডেলার চুল হয়তো গোনা যাবে, কিন্তু জিমের প্রতি ডেলার ভালোবাসা গোনা যাবে না। আর জিম? সপ্তাহে যার রোজগার ছিল ৮ পাউন্ড। কিন্তু স্ত্রীর জন্য যে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মূল্যবান ঘড়ি বিক্রি করে উপহার এনেছিলেন হীরা-মুক্তাখচিত মহামূল্যবান হাড়ের চিরুনি। ৮ পাউন্ড হোক আর ৮ লাখই হোক, একজন অঙ্কশাস্ত্র বিশারদ এ ক্ষেত্রে যা উত্তর দেবেন তা মিথ্যা। ও হেনরি বলছেন, এ দম্পতি সেই সব রাজার চেয়ে জ্ঞানী এবং সুখী, যারা উপহার এনেছিল যিশুর জন্য। একুশ শতকের জিম-ডেলারা বড়ই অহমসর্বস্ব পাষাণ প্রাণ। বাইরে থেকে দরজা খুলতে খুলতে ক্লান্ত প্রাণ হলেও অহঙ্কারের খেলায় তারা কিছুতেই হারতে চাইবে না।

য় জয়া ফারহানা : কথাসাহিত্যিক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে