শিক্ষার উন্নয়ন জাতির অগ্রগতি

  মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

১০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৮, ০১:০৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে রয়েছে নানা সংকট। স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত লেখাপড়ার উল্লেখযোগ্য মানোন্নয়ন নেই। শিক্ষার নামে চলছে বাণিজ্য। ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি, পাঠাভ্যাসে অমনোযোগ, শিক্ষকের পাঠদানে নিরুৎসাহ, শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রাইভেট পড়ানোÑ এ সবই শিক্ষা বিস্তারে অন্তরায়। কোচিং সেন্টারগুলো দখল করে নিয়েছে শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম। নেমে এসেছে অনিয়ম, অরাজকতা। একসময় শুরু হয়েছিল নকলের মহামারী। বর্তমানে নকলপ্রবণতা কমে গেলেও শুরু হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের জয়জয়কার। এ থেকে বাদ যাচ্ছে না দেশের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক বিসিএস পরীক্ষাও। শিক্ষাঙ্গনে চলছে মারামারি, হানাহানি, দখল, টেন্ডার বাণিজ্য, শিক্ষক দলাদলি। শিক্ষাক্ষেত্রে অবনতিশীল পরিবেশের অন্যতম কারণ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের পাঠদানে অবহেলা। শ্রেণিকক্ষে যথাযথভাবে শিক্ষাদানের বদলে আজকাল অনেক শিক্ষক প্রাইভেট টিউশনির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। তারা নিজ বাড়িতে, এমনকি স্কুলে বসেই শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ান বাড়তি অর্থের বিনিময়ে, কখনো বা শিক্ষায়তনের নির্ধারিত ক্লাস বাদ দিয়েই। সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কোচিং সেন্টারগুলোর সঙ্গে সরকারি বা বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। শিক্ষকতাকে তারা নিচ্ছেন এক লাভজনক বাণিজ্য হিসেবে। আর সে কারণে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের লেখাপড়া বাদ দিয়ে কোচিং সেন্টার থেকে শিক্ষার নামে সহজলভ্য পণ্য ক্রয়ে উঠেপড়ে লেগেছে। অভিভাবকরাও হয়ে পড়েছেন জিম্মি। বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে কোচিং সেন্টারের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও বাইরে পার্টটাইম কাজের অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাওয়া উদ্বেগজনক। এর কারণ শ্রেণিকক্ষে লেখাপড়ার প্রতি শিক্ষার্থীদের অমনোযোগ এবং কোচিং সেন্টারমুখিতা। ইতিপূর্বে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি নায়েমের উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বেসরকারি কলেজ শিক্ষা ও তার ব্যবস্থাপনায় হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। দেশের মোট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগই বেসরকারি কলেজ, যা গভর্নিং বডি দ্বারা পরিচালিত। অনেক ক্ষেত্রে গভর্নিং বডির কার্যকলাপের ওপর সরকারি পর্যায়ে তেমন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বেসরকারি কলেজের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর সত্যিকার যোগ্যতা ও মেধা সব সময় যাচাই করা হয় না। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের পরীক্ষার ফলাফলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দেখা যায়, স্নাতক পরীক্ষায় পাসের শতকরা হার খুব কম সময়ই পঞ্চাশের ওপরে ওঠে। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীই পাবলিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাসের পর অনেক শিক্ষার্থীর জীবনে আর কখনো স্নাতক ডিগ্রি লাভ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

আজ শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক উচ্চশিক্ষিত, মেধাবী শিক্ষক এসেছেন। শিক্ষাঙ্গনের অবকাঠামোগত মানোন্নয়নও ঘটেছে যথেষ্ট। যুক্ত হয়েছে অনেক প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা। তার পরও শিক্ষায়তনে শিক্ষার পরিবেশ বিঘিœত হওয়ার পেছনে রয়েছে স্কুল ও কলেজ শিক্ষকদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতি। একজন শিক্ষক স্কুলে শ্রেণিকক্ষে সঠিক পাঠদান থেকে বিরত থেকে তার দায়দায়িত্বের প্রতি উদাসীন হবেন, শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াবেন, তা কোনোমতে মেনে নেওয়া যায় না। সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একজন শিক্ষক ন্যায়নিষ্ঠভাবে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন, শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবেন, এটাই বাস্তবসম্মত এবং একান্ত কাম্য। শিক্ষকের আদর্শেই গড়ে উঠবে শিক্ষার্থীর আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্যও তাই। এ ব্যাপারে সন্তানের মা-বাবা, অভিভাবকদের রয়েছে অপরিসীম দায়দায়িত্ব। তাদের সন্তানের লেখাপড়ার দিকে যতœশীল হতে হবে, দিতে হবে পর্যাপ্ত সময়। ঘরে বসে নিজের সাধ্যমতো লেখাপড়া শেখাতে হবে। শুধু স্কুল বা গৃহশিক্ষক, কোচিং সেন্টারের ওপর সন্তানকে গড়ে তোলার দায় চাপিয়ে নিজেদের নিশ্চুপ ঘরে থাকলে চলবে না।

শিক্ষাক্ষেত্রে সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনতে শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাজমান সব অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বেসরকারি স্কুল-কলেজ ব্যবস্থাপনার সার্বিক উন্নয়ন, কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক উন্নয়ন, মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানসহ যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষকের নিয়োগ দান ও কৃতী শিক্ষকদের ইনসেনটিভ দিতে হবে। শিক্ষকদের দিতে হবে বিষয়ভিত্তিক উচ্চতর শিক্ষা ও উন্নত প্রশিক্ষণ। শিক্ষকদের দিয়ে ক্লাসে সঠিক পাঠদান প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে নিশ্চিত করতে গৃহশিক্ষক ও কোচিং সেন্টারনির্ভর শিক্ষার অবসান ঘটাতে হবে। এসব দেখভালের জন্য কঠোর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া অত্যাবশ্যক। তাদের শরীরচর্চার জন্য খেলার মাঠ, অভ্যন্তরীণ ও মাঠে খেলাধুলায় অংশগ্রহণ এবং প্রতিযোগিতা উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি। পাশাপাশি ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষক-অভিভাবকদের মাঝে এক সেতুবন্ধ গড়ে তুলতে পারলে তা শিক্ষাক্ষেত্রে সংকট নিরসনে সহায়তা করবে। সে লক্ষ্যে শিক্ষক-অভিভাবক সংগঠন গড়ে তুলে নির্দিষ্ট বিরতিতে অভিভাবক শিক্ষকদের মাঝে মতবিনিময়, শিক্ষাসংক্রান্ত সমস্যা চিহ্নিত করে এর সমাধানের পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানোর জন্য সর্বস্তরে উপযুক্ত বিষয়বস্তুসমৃদ্ধ পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্তিসহ এর সঠিক পাঠদান নিশ্চিত করা জরুরি।

একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। দেশের নতুন প্রজন্মের লেখাপড়া শেষে একটি সনদপ্রাপ্ত হয়ে রুটি-রুজির ব্যবস্থা করাই শুধু শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য নয়, একজন শিক্ষার্থীকে চরিত্রবান, সৎ, দেশপ্রেমিক ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই হোক শিক্ষার মূল লক্ষ্য। সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠীই সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ার নিয়ামক শক্তি।

য় মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ : প্রাবন্ধিক

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে