এ কী কথা শুনি আজ...

  মাহফুজুর রহমান

১২ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৮, ০২:০৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছোটবেলার একটি কথা মনে পড়ছে। সরকার মশা নিধনের জন্য গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে ডিডিটি ছিটিয়ে দিত। বছরে অন্তত একবার আমরা এই ডিডিটিঘেরা পরিবেশে বাস করার সুযোগ পেতাম। স্বাস্থ্য বিভাগের লোকরা এসে ঘরের বেড়া থেকে শুরু করে ভাতের হাঁড়ি পর্যন্ত সবখানে ডিডিটি ছিটিয়ে মশাদের বারোটা বাজানোর ঘোষণা দিতেন। মশারা অবশ্য সেই ঘোষণার বিষয়ে তেমন মনোযোগী ছিল বলে মনে হয় না। এসব ডিডিটি খেয়ে মশাদের মৃত্যুর খবর তেমন একটা জানা যায়নি। বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপদে আজও মশাদের সরব এবং সকামড় উপস্থিতি থেকে এটাই প্রতীয়মান হয়।

বসন্ত তাড়ানোর জন্য আমাদের দুই বাহুতে টিকা দেওয়া হতো। একটা গোলাকার ধারালো যন্ত্র দিয়ে নির্মমভাবে দেওয়া হতো এই টিকা। দুই বাহুর চারটি পয়েন্টে ওষুধ লাগিয়ে গোলাকার যন্ত্রটি টুস করে চেপে ধরে একটা মোচড় দেওয়া হতো। এর পর ব্যথা, জ্বর, প্রলাপ, বার্লি-সাগুর অত্যাচার সয়ে দিন পনেরো পরে মাথা তুলতে পারার স্মৃতি আর বাহুতে মাসাবধি ঝুলে থাকা দগদগে ঘায়ের দাগ নিয়ে আমরা এখনো পৃথিবীতে বেঁচে আছি। তবে এই টিকার দাগওয়ালা প্রজন্ম ধীরে ধীরে ইহধাম থেকে বিদায় নিচ্ছে। এখন আর টিকাদানকারীরা এতটা নির্মমতা দেখান না।

পাকিস্তান আমল পেরিয়ে বাংলাদেশের সূচনালগ্নে খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় চালু হয় গভীর নলকূপ কর্মসূচি। দেশের বিভিন্ন জেলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আয়োজনে গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য ঋণ বিতরণ করা হয়। সেই গভীর নলকূপ ব্যবহার করে ভূতল থেকে পানি উঠানো হয়েছে এবং খাদ্যের উৎপাদন বেড়েছে বটে; কিন্তু পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ফলে মানুষের পরিচয় ঘটেছে আর্সেনিক নামক একটি বিষের সঙ্গে। এখন দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ হাতে-পায়ে মারাত্মক ঘা নিয়ে জীবন ধারণ করছেন। আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়েছেন তারা। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর কোনো দায় বর্তায়নি। কারণ তারা তো আর জোর করে ঋণ দেয়নি। কিন্তু এই গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য ঋণ সহজলভ্য করা হলে দেশের হতদরিদ্র চাষিরা সমবায় বানিয়ে ঋণ নেবে, একশ্রেণির ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে গভীর নলকূপ আমদানি করে গরিবদের কাছে উচ্চমূল্যে বিক্রি করবে এবং আরও ধনী হবে, আর শেষমেশ আর্সেনিকের কূপটা গরিবদের ঘাড়েই পড়বেÑ এটা ভাবার দায়িত্ব কার ছিল? এ ব্যাপারে কেউ কি কোনো গবেষণা করেছিলেন? নাকি বিশ্বব্যাংক ঋণ দিয়ে আমাদের কৃতার্থ করায় আমরা কেবলই মাথা পেতে নিয়ে ধন্য হয়েছিলাম?

পৃথিবীর প্রতিটি দেশই তাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার কাজে সর্বতোভাবে তৎপর থাকে। একবার অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সময় সঙ্গে করে বুটের হালুয়া নিয়ে গিয়েছিলাম। ইমিগ্রেশনের পর কাস্টমস বিভাগের কর্মীরা খাবার বহনকারীদের সুদীর্ঘ লাইনে দাঁড় করিয়ে আদ্যোপান্ত নিজেরা পরীক্ষা করেছে, আবার দুর্ধর্ষ কুকুরদের দিয়ে পরীক্ষা করিয়েছে। খাবার নিয়ে ঘণ্টা দেড়েকের এই বিড়ম্বনার শেষ পর্যায়ে আমি হালুয়াকে ধর্মীয় খাবার ব্যাখ্যা দিয়ে এবং বিদেশগামী স্বামীদের মঙ্গল কামনায় সারারাত জেগে তাদের প্রিয়তমা স্ত্রীরা এই খাবার তৈরি করে দেন বলে ব্যাখ্যা দিয়ে মুক্তি পেয়েছিলাম। আর সেই কঠিন পরীক্ষার ভেতর দিয়ে কোনো গাছ বা বিচি নিয়ে যাওয়ার তো কোনো উপায়ই দেখিনি। বাংলাদেশেও এই পরিবেশ রক্ষা কর্তারা এয়ারপোর্টে আছেন। কিন্তু তাদের নাকের ডগা দিয়েই বিদেশ থেকে নানারকম চারাগাছ আর বীজ নিয়ে আসা হচ্ছে। এ রকমই একটি গাছের নাম ইউকেলিপটাস। পৃথিবীর কোন প্রান্ত থেকে এই ধূসর বর্ণের অপরিচিত গাছটি বাংলাদেশে এসেছে, কে জানে! তবে দেশের সর্বত্র যখন ইউকেলিপটাস মাথা উঁচু করে অন্যসব গাছকে ছাড়িয়ে গিয়েছে তখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গাছ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এর পানির চাহিদা অত্যধিক। ভূগর্ভের সব পানি সে নাকি একাই খেয়ে ফেলে। এই রাক্ষসে পানিখেকো গাছ যেখানে জন্মাবে সেখানে আর কোনো গাছ হবে না। আশপাশের অন্য গাছগুলো পানি খেতে না পেয়ে মরে যাবে। যদি এ কথা সত্য হয়ে থাকে তা হলে সরকারের পক্ষ থেকে আইন করে ইউকেলিপটাস নিধন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটি করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশে এখন নতুন নতুন নানা প্রজাতির মাছ জলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এগুলোর অনেকগুলোই বিদেশ থেকে এসেছে। এর মধ্যে বলা যেতে পারে আফ্রিকান মাগুরের কথা। যারা এই মাগুর মাছটি বাংলাদেশে নিয়ে এসেছেন তারা হয়তো এর সাইজ দেখে ভেবেছিলেন যে, পরিবারে একটি মাগুর মাছ রান্না করা হলে দু-তিন দিন আর কোনো চিন্তা নেই। সেই মাগুর এখন আমাদের পুষ্টি দেওয়ার বদলে অন্য মাছদের খেয়ে নিজের পুষ্টি নিয়েই ব্যস্ত।

এবার আসা যাক ফরমালিন প্রসঙ্গে। বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরে মাছ, ফলমূল আর শাকসবজিতে ফরমালিন দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এসব পচনশীল খাদ্যদ্রব্য এখন ঘরে বসে দীর্ঘদিন যৌবন ধরে রাখতে পারে। এ নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তার কোনো শেষ নেই। বিভিন্ন বাজারে গিয়ে মোবাইল কোর্ট ফরমালিনযুক্ত খাবার ধ্বংস করে আমাদের দুশ্চিন্তার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে তুলছেন। ঢাকার কোনো কোনো বাজার ভিআইপিদের দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফরমালিনমুক্ত’ বলে ঘোষণা দিয়ে সাইনবোর্ড টানিয়েছে। কিছুদিন আগে মালিবাগ বাজারের বাইরে ফরমালিনমুক্তির সাইনবোর্ড ঝুলানো হলো। এই বাজারের পাশেই রাস্তার উল্টোপাশে রেলগেট বাজারে তেমন কোনো সাইনবোর্ড লাগানো হয়নি। তাই ধরে নিলাম, এই বাজারটি ‘ফরমালিনযুক্ত’। আমি দুটো বাজারেই ঘুরে পাবদা মাছের দাম জানতে চাইলাম। ‘ফরমালিনমুক্ত’ বাজারে যে সাইজের পাবদা মাছের দাম সাতশ টাকা কেজি, সেই সাইজের পাবদা ‘ফরমালিনযুক্ত’ বাজারে মাত্র চারশ টাকা কেজি। আমি মাছওয়ালার কাছে জানতে চাইলাম, একই বাজার থেকে মাছ কিনে এনে ওদিককার দোকানিকে ফরমালিন মাখার খরচ বহন করতে হয়। তা হলে তাদের তো খরচ বেশি পড়ে। আপনাদের তো ফরমালিন মাখার খরচ নেই। তা হলে দাম বেশি চাইলেন কেন? এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারলেন না।

আমাদের এই ‘ফরমালিন’ ভাবনা থেকে মুক্তি প্রদানের জন্য সম্প্রতি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ পত্রপত্রিকায় একটি বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেছে। তারা বলছেন, ‘ফলমূল ও শাকসবজি সংরক্ষণে বা টাটকা ও সতেজ রাখতে ফরমালিন ব্যবহার করা হয় মর্মে জনমনে কিছু বিভ্রান্তির সঞ্চার হয়েছে। ফলে ফলমূল ও শাকসবজি গ্রহণে ভোক্তাদের মাঝে এক ধরনের ভীতি লক্ষ করা যাচ্ছে।’ তারা বলছেন, ফলমূল বা শাকসবজি সংরক্ষণে ফরমালিনের কোনো ভূমিকা নেই। প্রাকৃতিকভাবেই প্রত্যেক ফলমূল ও শাকসবজিতে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় (গড়ে ৩-৬০ মিলিগ্রাম/কেজি মাত্রায়) ফরমালডিহাইড থাকে যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়।

খাদ্য কর্তৃপক্ষ আরও বলছেন, ‘এ বিষয়ে সম্প্রতি ঋঅঙ-এর সহযোগিতায় পরিচালিত গবেষণালব্ধ ফলাফলে দেখা যায়, দেশের ফলমূল, শাকসবজিসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যে ফরমালডিহাইডের উপস্থিতি নিজ নিজ খাদ্যপণ্যের প্রাকৃতিক মাত্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং একজন প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি গড়ে যে পরিমাণ ফরমালডিহাইড দৈনিক খাবার থেকে গ্রহণ করে, তা সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক কম।’

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ যেহেতু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, তাই কথাগুলো তারা দায়িত্ব নিয়েই বলেছেন বলে আমরা আশা করব। অর্থাৎ ফলমূল ও শাকসবজিতে এখন যে পরিমাণ ফরমালিন আছে বা দেওয়া হচ্ছে তা সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক কম। এ কথার ভিত্তিতে আমরা যদি নিশ্চিন্তে ফলমূল ও শাকসবজি খেতে থাকি এবং এতে যদি কারো স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় তা হলে খাদ্য কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই সে দায়িত্ব মাথা পেতে নেবে।

আবার অতীতের কথাগুলো মনে করতে ইচ্ছে করছে। সেই ডিডিটি ছড়ানো থালাবাসন, ডেকডেকচি ব্যবহার করে আমরা যখন মশার ওষুধ বলে কথিত ডিডিটি খেয়েছি, তাতে আমাদের স্বাস্থ্যগত যে ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়ে সবাই চুপ কেন? এখন পণ্যের গায়ে লেখা থাকে, ‘এতে ক্ষতিকর ডিডিটি নেই।’ এর মানে হলো ডিডিটি ক্ষতিকর।

আবার ইউকেলিপটাস বা আফ্রিকান মাগুর নামের রাক্ষসে মাগুর দেশে নিয়ে আসায় যে ক্ষতি হয়েছে তার সাজা কে বহন করবে? জাতিকে এই মাগুর আর ইউকেলিপটাসের বোঝা বইতে হবে কেন?

ফলমূল আর শাকসবজিতে সহনীয় মাত্রার ফরমালিন যদি দেওয়া হয়েই থাকে তা হলে মোবাইল কোর্ট বাজারে গিয়ে এগুলো ধ্বংস করে কেন? সহনীয় মাত্রার ফরমালিন ছিটিয়ে দেওয়া ব্যবসায়ীরা এতে যে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন সে দায়িত্ব কার? আবার অনেকগুলো মারাত্মক অসুখ-বিসুখে ডাক্তাররা বলছেন, সীমাহীন ফরমালিন খেয়েই রোগী দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছেন। সহনীয় মাত্রার ফরমালিন খেয়ে দুরারোগ্য ব্যাধিতে রোগী আক্রান্ত হলেন কেন? এর দায়িত্ব কে নেবে?

আমরা শঙ্কিত, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কারো পক্ষে ওকালতি করতে গিয়ে এই বিজ্ঞাপনটি প্রচার করছে না তো? এ বিষয়টিই বা দেখার দায়িত্ব কার?

এতগুলো প্রশ্নের উত্তর হলো, সব দায়-দায়িত্ব বহন করবে আমাদের নিরীহ ভোক্তারা। সহনীয় মাত্রার ফরমালিন খেয়ে তাদের সুস্থ থাকতেই হবে। আর যারা অসুস্থ হবেন, সেটা তাদেরই দোষ। কারণ তাদের পেটের যন্ত্রপাতি ধোলাইখাল প্রযুক্তিতে নির্মিত। এ জন্য সহনীয় মাত্রার ফরমালিনও তাদের পেটে সহ্য হয়নি। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ অন্তত তাই বলবে।

 

মাহফুজুর রহমান : কথাসাহিত্যিক ও রম্যরচনা লেখক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে