ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সারচার্জ ও প্রসঙ্গ কথা

  মো. ওমর ফারুক রিপন

১২ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৮, ০২:০৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

করব্যবস্থা পৃথিবীর প্রায় সব রাষ্ট্রেই সরকারের রাজস্ব আদায়ের একটি বহুল প্রচলিত পন্থা। রাষ্ট্রের সুনাগরিক হিসেবে কর প্রদান আপনার কর্তব্য এবং সরকারের মৌলিক অধিকার বটে! সরকারকে জনস্বার্থে বহুবিধ কার্যসম্পাদন করতে হয়, যার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বৃহদংশ আদায় হয় করব্যবস্থার মাধ্যমে। কর আদায়ের মাধ্যমে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা অর্থ একীভূত করে তার কার্যকরী উপযোগ সম্ভব হয়। কর জনগণের ওপর বাধ্যকর তবে জরিমানাস্বরূপ নয়। রাষ্ট্রপ্রদত্ত সুবিধার মাত্রা নির্বিশেষে আপনাকে কর প্রদান করতে হবে। করের বিনিময়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রত্যক্ষ সুবিধা সরকারের কাছ থেকে না পেলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়তে বা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের লক্ষ্যে আয় নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করলেই ব্যয়ের অত্যাবশ্যকতা বা অতিমৌলিক প্রয়োজন উপেক্ষা করে হলেও আপনাকে কর প্রদান করতে হবে। করের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যতা বা সমতার নীতির কথা উল্লেখ থাকলেও রাজস্ব ঘাটতির প্রয়োজনে কালেভদ্রে ওই নীতি উপেক্ষিত হয় বটে! যে কোনো লক্ষ্যমাত্রায় মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব বিবেচনা করা হলেও কর প্রদানকারীর করযোগ্য আয় নির্ণয়ে অনুমোদিত বিয়োজনের প্রশ্নে তা বরাবরই উপেক্ষিত।

১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশের ধারা ১৬/এ-তে বলা হয়েছে, সংসদের কোনো আইনে যদি এরূপ বিধান করা হয়, কোনো কর বছরের আয়ের ওপর কোনো এক বা একাধিক হারে সারচার্জ আরোপিত হবে, তবে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ওইরূপ বা ওইসব হারে, ক্ষেত্র মোতাবেক, সংশ্লিষ্ট আয় বছর বা আয় বছরগুলোর মোট আয়ের ওপর তা আরোপ করা হবে।

অর্থ আইন অনুসারে যদি কোনো ব্যক্তি করদাতার (আয়কর অধ্যাদেশের ধারা ৮০ অনুযায়ী) পরিসম্পদ, দায় ও খরচের বিবরণীতে প্রদর্শিত নিট পরিসম্পদের (সম্পত্তি-বহির্দায়) মূল্যমান নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে তা হলে তিনি প্রযোজ্য আয়করের ওপর নির্দিষ্ট হারে আয়করের অতিরিক্ত হিসেবে সারচার্জ প্রদান করবেন।

২০১১ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম সারচার্জ আরোপ করা হয় এবং পরবর্তীকালে প্রায় প্রতিবছরই এর স্তর, হার ও পরিধি বিস্তার করা হয়। বিগত বছরগুলোর পরিবর্তন/সংযোজন সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও ২০১৮ সালের অর্থ আইনের আলোকে সংযোজন আলোচনা-পর্যালোচনার দাবি রাখে।

আবির্ভাবের বছর, ২০১১ সালে নিয়ম করা হয় ব্যক্তি করদাতার নিট পরিসম্পদের মূল্যমান ২ কোটি টাকা অতিক্রম করলে তিনি প্রযোজ্য আয়করের ওপর ১০ শতাংশ হারে সারচার্জ প্রদান করবেন। ২০১৩ সালের অর্থ আইনে সারচার্জের ভিত্তিকে ৩টি স্তরে বিভক্ত করে আদায়ের হার (%) বৃদ্ধি করা হয়। ২০১৪ ও ১৬ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে সারচার্জের ভিত্তিকে যথাক্রমে ৫ ও ৬টি স্তরে বিভক্ত করে আদায়ের হার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হয়।

২০১৫ সালের অর্থ আইনে এলাকা ও ভিত্তিস্তর নির্বিশেষে নিট পরিসম্পদের মূল্যমান ২.২৫ কোটি টাকা অতি?ম করার ক্ষেত্রে ন্যূনতম সারচার্জের বিধান করা হয় ৩,০০০ টাকা, যা ২০১৮ সালে দুস্তরে ৫,০০০ টাকায় উন্নীত করা হয়। এ ক্ষেত্রে নিট পরিসম্পদের মূল্যমান ২.২৫ কোটি টাকা অতিক্রম করে ১০ কোটির মধ্যে থাকলে ন্যূনতম সারচার্জ হবে ৩,০০০ টাকা এবং ১০ কোটির অধিক নিট পরিসম্পদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সারচার্জের পরিমাণ হবে ৫,০০০ টাকা। ২০১৭ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে সব ধরনের তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারক করদাতার তামাক সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় থেকে অর্জিত আয়ের ওপর ২.৫০ শতাংশ হারে সারচার্জ আরোপ করা হয়, যা নিট পরিসম্পদের ওপর আরোপিত অঙ্কের অতিরিক্ত হিসেবে প্রদান করতে হবে।

**২০১৮ সালের অর্থ আইনে বিধান করা হয়, কারো নিট পরিসম্পদের মূল্যমান যাই হোক না কেন, তিনি ১০% হারে সারচার্জ প্রদান করবেন, যদি তার নিজের নামে একাধিক মোটর গাড়ি (প্রাইভেট কার, জিপ বা মাইক্রোবাস) থাকে বা কোনো সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট ৮,০০০ বর্গফুটের অধিক আয়তনের গৃহসম্পত্তি থাকে!

ব্যত্যয়ের বিষয় হলো, ব্যক্তিপর্যায়ে অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান ছাড়া হাতবদল হওয়া পুরনো গাড়ি ঋণ নিয়ে বা নিজ তহবিল থেকে ক্রয়ের মাধ্যমে রেন্ট-এ-কারের ব্যবসায় থেকে আয় উপার্জন করে প্রান্তিক পর্যায়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। এ ধরনের অনেক ব্যক্তি করদাতার নিট পরিসম্পদের মূল্যমান কোটি টাকা অতিক্রমের আশা সুদূরপরাহত। ব্যক্তিশ্রেণির অনেক করদাতা ন্যূনতম জীবনমান বজায় রাখার তাগিদে চালিয়ে নেওয়ার মতো হালসম্পন্ন গাড়ির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন, বিলাসিতা বা বিলাসবহুল গাড়ির মালিকানা তাদের স্বপ্নসাধ্যের অতীত।

সিটি করপোরেশন এলাকা নির্বিশেষে মোট ৮,০০০ বর্গফুটের অধিক আয়তনের গৃহসম্পত্তি থাকলেই ১০ শতাংশ হারে সারচার্জ প্রদান বা আরোপের যে বিধান করা হয়েছে তা বিশদ ব্যাখ্যার দাবি রাখে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার সঙ্গে যেমন অন্যান্য সিটি করপোরেশন এলাকার গৃহসম্পত্তির তুলনা

প্রহসনমূলক তেমনি গুলশান-বনানী-বারিধারা-খুলসী-পাঁচলাইশ এলাকার মতো বনেদি এলাকার সঙ্গে অন্যান্য এলাকার তুলনাও বাঞ্ছনীয় নয়। উপরন্তু নিজ ক্রয় বলে বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ২/২.৫ কাঠার প্লটে ৬/৫ তলাবিশিষ্ট গৃহনির্মাণ করলেই আপনি ৮,০০০ বর্গফুটের গর্বিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে সারচার্জের আওতায় আসবেন। ওই গৃহ আপনি নিজ অর্থে না ঋণের অর্থে নির্মাণ করলেন তা বিবেচ্য কিনা স্পষ্ট নয়। আপনার গৃহসম্পত্তিটি ঢাকা সিটি করপোরেশনের গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় নাকি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অধিভুক্ত ভৌত অবকাঠামোগত সুবিধাবহির্ভূত এলাকায় অবস্থিত বা ন্যূনতম জীবনমান উপযোগী নাকি অপ্রয়োজনীয় বিলাসবহুল তাও বিবেচ্য নয়। আপনি উল্লিখিত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা হলে সারচার্জ প্রদানের বিরল সম্মান অর্জন করবেন অথচ বৃহদাকার কোম্পানি হিসেবে একরকে একর আবাদি জমি ক্রয়-দখল করে প্রাচীর দিয়ে ঘিরে যুগ যুগ ফেলে রেখে আবাদে ব্যাঘাত ঘটালেও কোনো সারচার্জ প্রদান করতে হবে না।

করদায়িতার ক্ষেত্রে ব্যক্তি করদাতার বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগ করা হলেও সারচার্জ আরোপ করার ক্ষেত্রে তা বিবেচনা করা হয়নি। যেমনÑ পুরুষ, মহিলা, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ইত্যাদি। তা ছাড়া ন্যূনতম করদায়িতার ক্ষেত্রে এলাকাভিত্তিক অঙ্কে পার্থক্য রাখা হলেও সারচার্জের ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। গাড়ির সংখ্যা বা গৃহসম্পত্তির আয়তন ও এলাকা বিবেচনায় মৌলিক প্রয়োজনীয়তা ও বিলাসবাহুল্যতার প্রভাব, মূল্যমান ইত্যাদি বিবেচনা করে স্তরভুক্তি বা শ্রেণিবিন্যাস করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিধান বাস্তবায়ন হলে মধ্যবিত্তের করের বোঝা বাড়বে।

ব্যক্তি করদাতার নিট পরিসম্পদের মূল্যমান নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে তার মোট প্রদেয় করদায় থেকে অংশীদারি ফার্ম বা ব্যক্তি সংঘ থেকে প্রাপ্ত মুনাফার রেয়াত, বিনিয়োগ ও অন্যান্য রেয়াত বিয়োজনের পর অবশিষ্ট যে পরিমাণ দাঁড়ায় তার ওপর নিট পরিসম্পদের মূল্যমানের ভিত্তিস্তরের হার প্রয়োগ করে যা নির্ধারিত হবে, তা-ই হবে প্রদেয় সারচার্জ। আয়করের রিটার্নের সঙ্গে করদাতা সারচার্জ জমার চালান কপি সার্কেল অফিসে জমা দেবেন। তবে আপনার প্রদেয় কর না থাকলে সারচার্জ প্রযোজ্যতা হারাবে।

মো. ওমর ফারুক রিপন : কলাম লেখক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে