আনন্দময় শৈশব-কৈশোর

  মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

১২ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৮, ০২:০৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমার এক কিশোর নাতি রয়েছে। শিশুকাল থেকে ও পুরান ঢাকার গে-ারিয়ায় বাস করে আসছে। ওর বয়স এখন পনেরোর কাছাকাছি, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। ওর গে-ারিয়ার বাসা থেকে রিকশায় চড়ে মতিঝিল সরকারি স্কুলের দীর্ঘপথ পেরোতে লাখো গাড়ির ভিড়ের দুপাশে সুউচ্চ অট্টালিকায় বারবার ওর দুচোখ আটকে যায়। ছোট্ট একটি শ্রেণিকক্ষে গাদাগাদি করে বসা এতগুলো সহপাঠীর মাঝে ঘর্মাক্ত দেহে জানালার দিকে তাকিয়ে কেবল দীঘশ^াস নেয়। বাইরের আলো কিছুই চোখে পড়ে না। শ্রেণিশিক্ষকের কথাগুলো ওর কান অবধি পৌঁছায় না। শুধু আনমনা হয়ে সময় কাটায়। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে ছয়তলা ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বারবার উদাস দৃষ্টি নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ধুলোময় আকাশে কিছুই চোখে পড়ে না ওর। পৃথিবীর সবটুকু বাতাস টেনে বুক ভরে নিঃশ^াস নিতে চায় পনেরো বছরের এক কিশোর। বন্ধ ঘরে বারবার যে দম বন্ধ হয়ে আসে ওর। সুউচ্চ ভবনের নিচে সরু রাস্তা, পাশে মজা ডোবা। একদল উলঙ্গ ছেলে গাছের ডাল কেটে ব্যাট বানিয়ে ক্রিকেট খেলে। ওদের পাশ কাটিয়ে টুংটাং বেল বাজিয়ে চলে রিকশার দল। নিচে যাওয়া নিষেধ গৃহবন্দি কিশোরের। বস্তির ছেলেদের সঙ্গে মেশা যাবে না। ওরা সব দিনভর আজেবাজে বুলি আওড়ায়। তবে কার সঙ্গে মিশবে ও, খেলবে কাদের সঙ্গে? ওর বাবা-মা দুজনেই সরকারি চাকুরে। তারা সকালে ঘর থেকে বেরোন, ফেরেন সন্ধ্যায়। ঘরে কিশোরটির ভাই-বোন বলতে কেউ নেই, ও যে বড্ড নিঃসঙ্গ। পনেরো বছরের কিশোরটি বেড়ে উঠেছে একা। ওর বাবা-মা ব্যস্ত তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে। সন্তানকে দেওয়ার মতো বাড়তি সময় কই? বাধ্য হয়ে অন্ধকার ঘরে আলো জে¦লে গৃহবন্দি ছেলেটা কম্পিউটার আর সেলফোনের কি-প্যাড চাপতে থাকে। ভিডিও গেম আর ফেসবুকই এখন শেষ ভরসা ওর। সারাক্ষণ মনমরা হয়ে বসে থাকে পনেরো বছরের কিশোর। কারও সঙ্গে তেমন কথাও বলে না। হাসি নেই ওর মুখে। কোনো আনন্দ-কোলাহলেও খুঁজে পাওয়া যায় না এমন এক স্বাস্থ্যবান, সম্ভাবনাময় কিশোরকে!

দেশের জন্য আজ এক আলোকিত নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে কোটি শিশু-কিশোরের মা-বাবাকে যতœশীল হতে হবে। তাদের শত কর্মব্যস্ততার মাঝেও নিজের সন্তানের জন্য একটু সময় বের করে ওদের সঙ্গ দিতে হবে। লেখাপড়ার বাইরে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিকচর্চার সুযোগ করে দিয়ে সন্তানের মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা করতে হবে। শুধু তাদের সন্তানকে স্কুল আর কোচিং সেন্টারে পাঠিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। ঘরেও কিছু খেলাধুলা, বিনোদনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে একটিবার হলেও সন্তানকে পার্কে ঘুরিয়ে এনে প্রকৃতির সান্নিধ্য লাভের ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিটি স্কুলের জন্য একটি সুন্দর খেলার মাঠ রাখতে হবে। সেখানে ছেলেমেয়েদের নিয়মিত খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। শরীরচর্চা, সাংস্কৃতিকচর্চা, নাচ, গান, নাট্যচর্চার সুযোগ করে দিতে হবে। বার্ষিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের পুরস্কৃত করে উৎসাহ দিতে হবে। ঢাকা শহরের পরিত্যক্ত, বেদখল হয়ে যাওয়া খেলার মাঠগুলোর সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে হবে। এত টাকা খরচ করে বানানো বাড়িঘরের সামনে শিশু-কিশোরদের খেলার জন্য সামান্য হলেও এতটুকু ফাঁকা জায়গা রাখতে হবে। সম্ভাবনাময় নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরকে কোনোভাবেই অর্থলাভের কাছে জিম্মি করা যাবে না।

জীবন অনেক বিস্তৃত, জীবনের পরিধি অনেক ব্যাপক। খেলাধুলা, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে জীবনের স্বরূপ সন্ধানে ব্রতী হতে হয় জীবনের প্রথম লগ্ন থেকে। মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক, যোগাযোগ তা রক্ষা করতে এক বিস্তৃতক্ষেত্র তৈরি করতে হয় জীবনের শুরু থেকে। মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ, অসাম্প্রদায়িক, সৃষ্টিশীল, আলোকিত জীবনের মধ্য দিয়ে মানুষ হিসেবে জন্মলাভের সার্থকতা প্রমাণ করতে হয়। শিশু-কিশোরের মাঝে আলোর ভুবনকে উন্মোচিত করার দায়িত্ব মা-বাবা, শিক্ষক এবং আশপাশের সব দায়িত্বশীল মানুষের। তাই তো একুশের প্রথম প্রহরে যখন শিশু সন্তানকে নিয়ে মা-বাবাকে শহীদবেদিতে ফুল দিতে দেখি, স্বাধীনতা বা বিজয় দিবসে বধ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানও চোখের জল ফেলে, মা-বাবা তার সন্তানকে নিয়ে একুশের বইমেলার ভিড়ে নিমগ্ন হন, আর পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ লাখো মানুষের মিছিলে শিশু-কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ সবাই এক কাতারে শামিল হন, তখন যে নতুন প্রজন্মকে আমাদের মনে এত দুর্ভাবনা তা কেটে যেতে শুরু করে। বিশ^াস করতে ইচ্ছে হয়, আমাদের নতুন প্রজন্ম আজ জেগে উঠছে, সব আঁধার কাটিয়ে ওরাই হবে আলোর পথের যাত্রী।

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ : প্রাবন্ধিক ও গল্পকার

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
ashomoy-todays_most_viewed_news