স্বপ্ন এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়

  অঘোর মন্ডল

১০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৮, ০১:৩৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

শরৎবাবু ‘পথের দাবি’ লিখে কতটা আলোচনায় এসেছিলেন জানি না। কিন্তু নাম না জানা হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী পথের দাবি জানিয়ে শিরোনাম হয়ে গেল। পথের দাবি তারা পথে দাঁড়িয়েই জানাল। বাংলাদেশ দেখল। গোটা বিশ^ দেখল। গণমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেসব কিশোরের ছবি এলো। সেই ছবির ব্যবহার, অপব্যবহার সবই হলো এবং যথেচ্ছারভাবে! তাদের দাবির ব্যাখ্যা হলো। অপব্যাখ্যা হলো। তাদের সেই পথের দাবির প্রতি সমর্থন জানানো হলো। সহানুভূতি জানানো হলো। আবার তাদের নিয়ে রাজনীতিও শুরু হলো! নিরাপদ সড়কের যে দাবি নিয়ে তারা পথে নামল, সেখানে রাজনীতির বিষবাষ্প ছড়ানো হলো। ফেসবুক-টুইটার-ফোনালাপে যে যার মতো করে স্কুলপড়–য়াদের দাবিকে বাঁক বদল করে দিতে চাইলেন। যাদের পিঠে স্কুলব্যাগ সেই কিশোর-কিশোরীর পিঠে সওয়ার হলেন আমাদের রাজনীতিবিদরা!

একদল তাদের পিঠে চড়ে সরকারকে নাড়া দিয়ে ফেলে দিতে চাইলেন। আর যারা ক্ষমতায় অন্ধ তারা নিজেদের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে তাদের সাংবাদিকদের মুখোমুখি বসিয়ে দিলেন। যেভাবে তারা গণমানুষের রাজনীতিকে রোজ গণমাধ্যমের সৌজন্যে বাঁচিয়ে রাখতে চান। নিজেরা বেঁচে থাকতে চান। পাঁচ-সাতজন কিশোর ধানম-িতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ে এসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন। জানালেন, সেখানে কাউকে আটকে রাখা হয়নি। কারো চোখ তুলে ফেলা হয়নি। অরাজনৈতিক একটা দাবির কথা জানাতে তারা পথে নেমেছিল। রাজনৈতিক কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে তাদের আগামী দিনের নেতা হওয়ার সিঁড়িটা চেনানো হলো কী! এই সিঁড়িতে আগামীতে তারা পা রাখবে কিনা সেটা তারা জানে। তবে তাদের সৌজন্যে একটা ভালো কাজও হলো। ক্ষমতান্ধ রাজনীতিবিদরা হয়তো বুঝতে পারলেন, তাদের কথা মানুষ এখন খুব একটা বিশ^াস করেন না। তাই পথের দাবি জানাতে যারা পথে নেমেছিল, তাদের প্রতি কোনো অসদাচরণ করা হয়নি। অমানবিক, অসংবেদনশীল কোনো ব্যবহার করা হয়নি, সেটা বলার জন্য সেসব কিশোরকেই ডাকা হলো! আর এসব ডাকাডাকির মূল কারণ, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ছবি। বিভিন্নজনের ফেসবুক লাইভ। ইত্যাদি। যে কারণে ফেসবুক চব্বিশ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখা হলো। ফাইভ-জির স্বপ্ন দেখানো বাংলাদেশকে নামিয়ে আনা হলো টু-জির পথে! কিন্তু নিরাপদ পথের দাবি কী তাতে পথ হারাল! আবার যারা কিশোর-কিশোরীদের পথে দেখে ক্ষমতার পথ খুঁজতে চান তারা কি কোনো পথের দিশা পেলেন!

ফেসবুক বন্ধ করে দেওয়া রাজনীতির কূটচাল কিনা জানি না। আবার ফেসবুকে লাইভ করা, ছবি ভাইরাল করা, গুজব ছড়ানো বন্ধের জন্য ফেসবুক বন্ধ রাখা নিয়ে তর্ক চলতে পারে। পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি আছে। তবে কোনটা বাস্তব আর কোনটা গুজব সেটা বুঝবে মানুষ তার মন-মনন-মস্তিষ্ক-বিবেকবুদ্ধি দিয়ে। কিন্তু আমাদের সেই মন-মনন-মস্তিষ্কে-বুদ্ধি-বিবেচনায় মেদ জমেছে। আমাদের হাত-পা-মন-মনন-মস্তিষ্ক সবকিছু বন্দি ডিজিটাল হাতকড়ায়! জীবন-সমাজ, রাজনীতি সব জায়গায় ডিজিটাল এফেক্ট। তাই কোনটা গুজব আর কোনটা সত্যি সেটা আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। বিশ^াস-অবিশ^াসের দোলাচলে দুলি। ফেসবুক খুলি। তাতেই সমাজের চেহারা দেখার চেষ্টা করি। নিজের চেহারা সমাজকে দেখানোরও চেষ্টা করি। আসলে আমরা এখন ফোনের ক্যামেরায় নিজেকে দেখতে চাই। অন্যকে দেখাতে চাই। সমাজকে দেখাতে চাই। কিশোর-যুবক, তরুণ, বৃদ্ধ সবাই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ে বুঁদ হয়ে থাকছি। গণমাধ্যমের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ছে অনেক দ্রুতগতিতে। কিন্তু এখানে নেই কোনো এডিটর। নেই কোনো সেন্সর। তাই কোনটা খবর আর কোনটা গুজব সেটা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। তাই গুজব আর বাস্তব একই সময়ে সাধারণ মানুষের সামনে এসে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যাচ্ছেন!

তবে পথের দাবিতে পথে দাঁড়ানো কিশোরদের খবর খুঁজতে গিয়ে খবরের শিরোনাম হয়ে গেলেন সংবাদকর্মীরা। মুখোশ পরে, হেলমেট মাথায় দিয়ে, হাতে দা নিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানোর চলমান ছবিকে আপনি গুজব বলবেন কীভাবে? সাংবাদিকদের ওপর হামলার নিন্দা আর প্রতিবাদে সংবাদকর্মীরাই এখন পথে দাঁড়িয়েছেন। প্রতিবাদ করছেন। এখন পথিককে আর পথ খুঁজতে হচ্ছে না। পথই যেন পথিককে ডাকছে। তবে সঠিক পথে ছুটতে হলে মন-মনন-মস্তিষ্কে জমে থাকা মেদ ঝরাতে হবে। কারো মেদ ক্ষমতার বাড়তি কোলেস্টেরল। কারো মেদ ঘরে বসে বসে ক্ষমতার স্বপ্ন দেখতে দেখতে। মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট চব্বিশ ঘণ্টা বন্ধ রাখা সেটা না হয় একদিনের উপবাস। ডিজিটাল ডায়েটের ওয়ার্মআপ। তাতে আর কতটুকুু কী মেদ ঝরছে। জীবন আর সমাজকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ে ক্যামেরার চোখে দেখা আর দেখানোর প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। সেটা সাধারণ মানুষ থেকে রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনজীবী বাদ থাকছেন কে? তাই স্কুলপড়–য়া ছাত্রছাত্রীদের পথের দাবির গায়েও রাজনীতির রঙ লাগিয়ে দিলাম আমরা! রাজনীতি নয়; ওদের দাবিটা নিরাপদ পথের। যে পথে এখন দুর্ঘটনার নামে মৃত্যুর মিছিল চলছে প্রতিদিন।

নিরাপদ সড়কের দাবি সবার। প্রতিটি নাগরিকের। যিনি যে পথেই চলুন, সেই পথটা নিরাপদ থাকবে সেটা আশা করা অন্যায় কিছু নয়। নিরাপদ পথের দাবিতে পথে দাঁড়ালে সেটাও কোনো অপরাধ নয়। কারণ তারা পথে নেমেছিল কোনো রাজনৈতিক দাবি নিয়ে নয়। স্বজনহারানোর শোককে শক্তি করেই তারা শুধু বিচার চেয়েছে। কোনো সরকারের পতন চায়নি। তাদের পথছাড়া করতে যারা পথে দা-ছুরি নিয়ে নামল, তারা ভিন্ন গ্রহ থেকে আসেনি। তাদের খুঁজে বের করার ক্ষমতা কী সরকারের বিশাল পুলিশ বাহিনীর নেই?

আছে। সেটা বিশ^াস করতে আবার কষ্ট হয়। কারণ এই পুলিশ যদি অনেক কিছু পারত, তা হলে পথে নেমে স্কুলছাত্রছাত্রীরা গাড়ির লাইসেন্স আছে কিনা এটা দেখবে কেন? মন্ত্রীর গাড়ির ড্রাইভারের লাইসেন্স নেই সেটা ওরা এই ক্ষমতান্ধ সমাজকে দেখিয়ে দিল। আসলে পুলিশকে দোষ দিয়েই বা লাভ কী! চাকরিটাই জোগাড় করতে হয়েছে তাদের বেশিরভাগের অন্যপথে। মন্ত্রী-আমলা-বিচারপতি, ভিআইপিদের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে ওরা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা ভুলে যান। আর কোনো গাড়ির লাইসেন্স ঠিক আছে কী নেই কিংবা কোন ড্রাইভারের লাইসেন্স মেয়াদ উত্তীর্ণ সেটা দেখতে চাওয়ার সাহস তারা দেখাবেন কীভাবে? মন্ত্রী, এমপিরা নিজেরাই দেখেন না তাদের ড্রাইভারের লাইসেন্স ঠিক আছে কিনা! বিচারপতির গাড়ি চলে রাস্তার উল্টোদিক দিয়ে। সাংবাদিক লেখা স্টিকার লাগানো গাড়ি ট্রাফিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলে যাচ্ছে। সেই সমাজে ক্ষমতাসীন নেতা, মন্ত্রী, এমপিদের মালিকানায় থাকা পরিবহনের চালকের কী দায় পড়েছে লাইসেন্স ঠিক করার। কিংবা ট্রাফিক আইন মেনে গাড়ি চালানোর! ওরা তাই ক্ষমতার রেসে নেমে পড়ে রাজপথে। তাতে প্রতিদিন সাধারণ মানুষ গাড়ির চাকায় পিষ্ট হচ্ছেন। প্রাণ হারাচ্ছেন। ড্রাইভার পালিয়ে যাচ্ছেন। মামলা দিনের পর দিন আদালতে ঝুলে থাকছে। কিছু আইনজীবী বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে কিছু বাড়তি পয়সা পাচ্ছেন। বাস মালিক মন্ত্রী স্বার্থ-সংঘাতের কথা ভুলে গিয়ে বিভিন্ন দেশের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান দিচ্ছেন হাসতে হাসতে টেলিভিশনে। সেই হাসির অনেকরকম অর্থ খুঁজে বেড়াচ্ছেন গণমাধ্যমকর্মী থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুঁদ হয়ে থাকা মানুষগুলো। ক্ষমতার দাপটে মন্ত্রী-এমপি, আমলা, নেতাকর্মী অনেকেই অন্ধ হয়ে আছেন। আর সাধারণ মানুষ যারা ক্ষমতার বাইরে তারা বুঁদ হয়ে আছেন ফেসবুক, টুইটারে। যে কারণে প্রকৃত বাস্তবতা থেকে আমরা প্রতিদিন দূরে সরে যাচ্ছি। কেউ কারো হাসি ভাইরাল করছি। কেউ কারো রক্তমাখা মুখ ভাইরাল করছি। কেউ লাইক দিচ্ছি। কেউ লাইভ করছি! এই হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের জীবন। এভাবেই প্রতিদিন বেজে চলেছে আমাদের জীবনের রিংটোন! সেই টোনটা যে বেসুরে বাজছে, সেটা অল্প কিছু সময়ের জন্য হলেও বুঝিয়ে দিল পথের দাবিতে পথে নামা কিশোর-কিশোরীরা।

আবার ওরা বুঝিয়ে দিল আমরা চাইলে এই শহরের অলি-গলি-পাকস্থলী সব কত সুশৃঙ্খল হতে পারে। সুন্দরভাবে চলতে পারে। কিন্তু সুন্দরভাবে চলা আর চলতে দেওয়া এটা প্রশাসনের অলিন্দে বসে থাকা মন্ত্রী-আমলা থেকে সাধারণ মানুষ সবাইকে চাইতে হবে। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নগরবাসীর পথের অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না। আবার সেই পথে কারো জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকারও কাউকে দেওয়া যাবে না। তিনি মন্ত্রী-এমপি, ভিআইপি, সিআইপি, ব্যবসায়ী যার গাড়িই চালান না কেন। পথে, সেতুতে, উড়াল সেতুতে সাধারণ মানুষের জীবনের গতি স্বাভাবিক রাখার জন্য সরকারের একটা মন্ত্রণালয়ও আছে। যার নাম সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। সেই মন্ত্রণালয়ের একজন মন্ত্রীও আছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, গণপরিবহন, সড়ক পরিবহন নিয়ে কথা উঠলেই গণমাধ্যমের ক্যামেরায় ভেসে ওঠে নৌপরিবহনের দায়িত্বে থাকা হাসিমাখা এক মন্ত্রীর মুখ! আর সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ক্যামেরাসঙ্গী করে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বেড়ান! সোশ্যাল মিডিয়াজীবীদের এক অংশ আবার এদের হাঁটাহাঁটি কিংবা হাসাহাসির ভিডিও পোস্ট করছেন। সেগুলো ভাইরাল হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বুঁদ হয়ে থাকা আমরা কি তা হলে প্রকৃত বাস্তবতাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি!

কিন্তু স্কুলপড়–য়া কিশোর-কিশোরীরা আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরল অন্য এক বাস্তবতা। তাদের চিন্তা-চেতনায় এখনো ডিজিটাল মেদ জমেনি। তাই ওরা পথের দাবিতে পথে নামতে পারল। ওরা পথে নেমে যা দেখাল; আমরা যদি তার মাঝে রাজনীতির রঙ না খুঁজে নিজেদের চোখ কচলে নিয়ে বাস্তবতা খোঁজার চেষ্টা করি, তা হলে আগামী দিনের স্বপ্নের বাংলাদেশের ছবিটা দেখতে পাব। ওরা পথে নেমে সেই স্বপ্নটা দেখিয়ে গেল। ওরা স্বপ্ন দেখাল। আমরাও সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখতে চাই। স্বপ্নই এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়। পথ চেনায়। যদিও সাতচল্লিশ বছরের বাংলাদেশে বেশিরভাগ সময় আশার বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেছে বাস্তবতা।

য় অঘোর মন্ডল : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে