এক অসাধারণ উত্থানের নাম আজকের বাংলাদেশ

  ড. আতিউর রহমান

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:৪৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৯ সেপ্টেম্বর গুলশানের একটি হোটেলে সুইজারল্যান্ড-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের আয়োজনে একটি মতবিনিময় অনুষ্ঠানে মূল বক্তা হিসেবে কিছু কথা বলেছি। ওই চেম্বারের সভাপতি নাকিব খান ছাড়াও সুইস দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কূটনীতিক, সংশ্লিষ্ট চেম্বারের সহসভাপতি ও অন্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অনুষদের ডিন প্রফেসর শিবলী রুবাইত ইসলামও বক্তব্য রাখেন। ওই অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশের ‘শ্মশান বাংলা’ থেকে ‘সমৃদ্ধ বাংলাদেশে’ রূপান্তরের এক অসাধারণ উত্থানের গল্প বলেছিলাম। সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প শুনে, বিশেষ করে বিদেশিদের প্রথমে অবাক এবং পরে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে দেখেছি। আসলে আমাদের স্বদেশের কিছু প্রভাবশালী গণমাধ্যমের নেতিবাচক প্রতিবেদন দেখতে দেখতে তারাও ‘হতাশার বাংলাদেশকে’ই দেখে চলেছেন। ছাইভস্ম থেকে উঠে আসা ফিনিক্স পাখির মতো ‘আরেক বাংলাদেশে’র গল্প তারা মনে হলো খুব কমই শুনেছেন। নিঃসন্দেহে গল্পের শুরু ১৯৭১। সাধারণ মানুষের সন্তানরা জাতির পিতার ডাকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সমৃদ্ধ ও সাম্যের বাংলাদেশের আশায়। মূলত কৃষক সন্তানদের এই মুক্তিসংগ্রাম ছিল বিপুল আত্মত্যাগে ভরা। একই সঙ্গে অফুরন্ত প্রাণশক্তির প্রকাশও ঘটেছিল হিরণ¥য় ওইসব দিনরাত্রিতে। সোনার বাংলা অর্জনের স্বপ্নের এক অবিস্মরণীয় বিস্ফোরণ ঘটেছিল ওই সময়টায়। পুরো সমাজে বপন করা হয়েছিল বিরাট এক ‘আশার স্বপ্ন’। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের বাস্তবতাও ছিল খুবই কঠিন। দেশের প্রকৃতি বৈরী। ঝড়-বৃষ্টি-বন্যা লেগেই ছিল। আন্তর্জাতিক পরিবেশও প্রতিকূল। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ছিল ক্ষিপ্ত। চীন জাতিসংঘে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অস্বীকার করে ভেটো দিয়ে চলেছে। বন্দর, রেলপথ, জলপথ, সড়কপথ বিধ্বস্ত। এক কোটিরও বেশি শরণার্থী স্বদেশে ফিরে এসেছেন। দেশের ভেতরেও লাখ লাখ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রবল খাদ্যাভাব। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এক ডলারও রিজার্ভ ছিল না। হেনরি কিসিঞ্জারের নেতৃত্বে গঠিত ‘স্টেট ডিপার্টমেন্টের’ একটি কমিটি ওই সময় এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশ হবে এক ‘আন্তর্জাতিক তলাবিহীন ঝুড়ি।’ বৈরী প্রকৃতির স্বল্প জাগয়ায় এত মানুষের বাস। তাই খাদ্য ঘাটতির এই দেশে যতই খাদ্য সাহায্য দেওয়া হোক তা শেষ পর্যন্ত সবাইকে বাঁচাতে পারবে না। দুর্ভিক্ষ-দুর্বিপাকের নিরন্তর শিকার হবে দেশটি। আশপাশের দেশে শরণার্থীর ভিড় লেগেই থাকবে। সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা হুমকি জোরদার হবে। তারও কিছু সময় পর বিশ্বব্যাংকের দুই দিকপাল অর্থনীতিবিদ ফাল্যান্ড ও পার্কিনসন বললেন, বাংলাদেশে যদি উন্নয়ন হয় তা হলে বিশ্বের যে কোনো দেশই উন্নতি করতে পারবে। কী তাচ্ছিল্য! বাহাত্তর সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৪৭ বছর। ওই সময় ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষের দরিদ্র, অশিক্ষা, অপুষ্টি, অস্বাস্থ্য নিত্যসঙ্গী। পুরো অর্থনীতির আকার মাত্র আট বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সেই দেশটিকে শক্ত হাতে পুনর্নির্মাণে হাত দেন জাতির পিতা। মাত্র সাড়ে তিন বছরেই অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, শরণার্থীদের পুনর্বাসন, বন্ধু দেশ থেকে খাদ্য সাহায্য ও উন্নয়ন সহায়তা ত্বরান্বিতকরণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিচার বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন, শিক্ষা কমিশন, সংবিধান, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, শিল্পের জাতীয়করণসহ কৃষির উন্নয়নসহ অর্থনীতি ও সমাজকে দ্রুতই পুনর্জীবিত করেন। মূলত দুর্যোগ ও মার্কিন খাদ্য সাহায্য বন্ধ করে দেওয়ায় চুয়াত্তরে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। সেই দুর্ভিক্ষ শক্ত হাতে মাত্র কয়েক মাসেই মোকাবিলা করে বঙ্গবন্ধুর সরকার। ওই দুঃখজনক অভিজ্ঞতা মনে রেখেই পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু ডাক দেন এক ইঞ্চি জমিও পতিত রাখা যাবে না। ওই ডাকে সাড়া দিয়ে পরিশ্রমী কৃষকরা আমন ফসলের বাম্পার উৎপাদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন। আর ঠিক সেই যুগসন্ধিক্ষণে আগস্টের এক কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে তার প্রিয় স্বদেশবাসীর কাছ থেকে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। তিনি আর ওই বাম্পার আমনের সুফল তার ঝুড়িতে তুলতে পারলেন না। এর পর স্বদেশ চলতে থাকে ‘উদ্ভট এক উটের পিঠে’ বাংলাদেশবিরোধী এক অন্ধকার গন্তব্যের পানে। দীর্ঘ একুশ বছর পর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দায়িত্ব পান ফের বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে পরিচালনার। দেশ আবার এগোতে থাকে জনকল্যাণের পথে। গরিবহিতৈষী পথে। নানা ষড়যন্ত্রের কারণে পাঁচ বছর পর আবার ঘটে তার শাসনের ছন্দপতন। আবার দেশ চলে যায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তির হাতে। তার পরের ইতিহাস সবারই জানা। সামরিক সমর্থিত অনির্বাচিত সরকারের হাত থেকে অযথা নিগৃহীত জননেত্রী শেখ হাসিনা বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন ২০০৯ সালের শুরুতেই। এর পর থেকে স্বদেশ এগিয়ে চলেছে এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে। শাসনব্যবস্থার নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের এক অনুকরণীয় রোল মডেলে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। কী বৈশিষ্ট্য ওই মডেলের? উচ্চ তবে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, ঐতিহ্যবিশ্বাসী অথচ প্রযুক্তিপ্রেমী, আত্মনির্ভরশীল অথচ সহযোগিতায় বিশ্বাসী বাংলাদেশের এই নয়া উন্নয়নকৌশল সারাবিশ্বেই আজ সমাদৃত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী উন্নয়নকৌশলের মূলে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা-চেতনা। আর রয়েছে মাটি ও মানুষ। ‘দিন বদলের সনদ’ তিনি দিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে তিনি প্রেক্ষিত পরিকল্পনার (২০১০-২০২০) আওতায় পর পর দুটো পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সর্বশেষ তিনি গ্রহণ করেছেন একশ বছর মেয়াদি ব-দ্বীপ পরিকল্পনা। জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত মোকাবিলার উদ্দেশ্যে নদী ব্যবস্থাপনা, প্রতিবেশ ও পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে এক বহুমাত্রিক সমন্বিত পরিকল্পনা তিনি হাতে নিয়েছেন। ২১০০ সাল নাগাদ সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যভেদী এই পরিকল্পনাই বলে দেয় প্রধানমন্ত্রী কতটা স্বাপ্নিক এবং পরিবেশবান্ধব। টেকসই উন্নয়নের জন্য তিনি নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। উন্নয়নের ‘প্যারাডাইম’ বা ধারণা তিনি বদলে ফেলেছেন। কৃষক, শ্রমিক, খুদে উদ্যোক্তাসহ সৃজনশীল মানুষের প্রতি অর্থবহ সমর্থন, ব্যক্তি খাতসহ রাষ্ট্রের বাইরের অন্য খাতগুলোকে সহযোগী করে এবং সরকারকেও সাহসী ও উদ্যোগী করে তিনি এই নয়া আদলের উন্নয়নকৌশলকে জনকল্যাণের জন্য নিবেদন করে এগিয়ে চলেছেন। ফলে আমাদের ম্যাক্রো ও মাইক্রো অর্থনীতিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যেখানে জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৫ শতাংশ, গত এক দশকে তা ৬.৫ শতাংশেরও বেশি হয়েছে। গত তিন বছর থেকে প্রবৃদ্ধি গড়ে ৭ শতাংশেরও বেশি। চলতি বছর তা আট শতাংশ ছুঁইছুঁই করছে। এই হার পৃথিবীর সর্বোচ্চ হারের তিনটি দেশের একটি। এই সময়ে মাথাপিছু আয় তিনগুণ বেড়ে আঠারশ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এডিপির আকার বেড়েছে ৬ গুণের মতো। সরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে ৭ গুণ। বেসরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে ৫ গুণ। জাতীয় সঞ্চয় বেড়েছে ৫ গুণের মতো। আমদানি ও রপ্তানি আয় বেড়েছে ৫ গুণেরও বেশি। বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। রেমিট্যান্সও বেড়েছে তিনগুণ। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ২০০৮ সালের ১২ শতাংশ থেকে কমে হালে পাঁচ শতাংশের সামান্য ওপরে নেমে এসেছে। ফলে ভোক্তার প্রকৃত আয় ও ভোগ বেড়েছে তিনগুণ। বাহাত্তরের আট বিলিয়ন ডলারে অর্থনীতির আকার এখন ২৮০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। গত দশ বছরেই তা তিনগুণের মতো বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দারিদ্র্য নিরসন ও জীবনের গড় আয়ুর ওপর। গত দশ বছরে দারিদ্র্য কমেছে ৩৫ শতাংশ থেকে ২২ শতাংশে। আশা করছি, সামনের বছর দারিদ্র্য ২০ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। অতিদারিদ্র্য এই সময় কমেছে ২২ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশে। সামনের বছর তা হয়তো দশ শতাংশের কাছাকাছি চলে আসবে।

ক্রমবর্ধমান হারে প্রকৃত আয় বেড়ে যাচ্ছে বলে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। বোস্টন কনসালটেন্সি গ্রুপের এক গবেষণায় ধরা পড়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল নাগাদ এই ধরনের সচ্ছল মানুষ (যাদের মাথাপিছু আয় হবে পাঁচ হাজার ডলারের বেশি) বাড়বে ১০.৫ শতাংশ। এই হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। এদের বলা হয় ‘ম্যাক’ (মিডিয়াম অ্যান্ড অ্যাডভান্সড কনজুমারস) জনগোষ্ঠী। বর্তমানে বাংলাদেশে দশটি শহর আছে যেখানে তিন লাখ ‘ম্যাক’ জনগোষ্ঠীর বাস। ২০২৫ সাল নাগাদ এমন শহর বেড়ে হবে ৩৩। এই ম্যাক জনগোষ্ঠী ব্র্যান্ডের পণ্য কেনে। প্রযুক্তিবান্ধব এই জনগোষ্ঠীর ৬৮ শতাংশই ইন্টারনেট সংযুক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার করে। এরা ভিন্ন ধাঁচের ভোক্তা। তাদের চাহিদার কথাও মনে রেখে ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন ঘটাতে হবে নয়া উদ্যোক্তাদের। বিশেষ করে বিদেশি উদ্যোক্তারা এদের চাহিদার ধরন মাথায় রেখে এগোবে। প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য ও সেবা বিক্রির ধুম পড়ে যাবে বাংলাদেশে।

অন্যদিকে যারা জীবনে কখনো ব্যাংকের দরজায় পৌঁছতে পারত না সেই নিম্ন আয়ের মানুষদের মধ্যে প্রায় সবাই এখন মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিং করে। দিন দিনই তাদের সংখ্যা বাড়ছে। এভাবেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দিগন্ত প্রসারিত হচ্ছে। ৬ কোটির বেশি মোবাইল ব্যাংক হিসাবধারী গরিব মানুষ (রিকশাওয়ালা, ভিখারি, গৃহকর্মী, গার্মেন্টসকর্মী, ভাসমান শ্রমিক) এখন প্রতিদিন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এক হাজার কোটিরও বেশি টাকা শহর থেকে গ্রামে পাঠাচ্ছেন। ফলে গত এক দশকে গ্রামীণ অর্থনীতির বিরাট পুনর্জাগরণ ঘটেছে। ঈদ, পার্বণে এই অর্থ লেনদেনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। গ্রাম ও শহরের সংযোগ বেড়েছে বলে উভয় অর্থনীতি সে সময় দারুণ চাঙ্গা থাকে।

তবে এখনো প্রচুর চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রতিবছর ষোলো লাখ মানুষের নয়াকর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক জ্বালানির বদলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস গড়ে তোলা, শুধু গার্মেন্টসের ওপর নির্ভরশীল না থেকে চামড়া, সিরামিক, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের মতো আরও রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রসার ঘটানোর মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সাহস আমাদের দেখাতে হবে।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য ২০৩০ সাল নাগাদ আমাদের কৃষি উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে; বিনিয়োগ সম্পর্কিত নিয়মনীতি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী ও চটপটে করে গড়ে তুলতে হবে; সর্বোপরি আর্থিক খাতের অনিয়ম ও খেলাপি ঋণের বোঝা লাঘব করে তাকে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অর্থপাচার, চাঁদাবাজি, মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণ করে সুশাসন ও সামাজিক শান্তির ভিত্তি সুদৃঢ় করতে হবে। এই বাধাগুলো ডিঙিয়ে আমরা আরও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে চাই। সে জন্য আমাদের বেশ কিছু উদ্যোগ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিতে হবে :

এক. আগামী দিনের অর্থনীতি হবে ডিজিটাল ও ই-কমার্সভিত্তিক। তাই প্রযুক্তিনির্ভর ই-কমার্স, এফ-কমার্সকে এগিয়ে নেওয়ার মতো অসংখ্য তরুণ উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও বাজার সংযোজন দিয়ে নব্য অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় নীতি-সমর্থন জোরদার করতে হবে।

দুই. রপ্তানিমুখী বড় উদ্যোগের পাশাপাশি খুদে ও মাঝারি উদ্যোগের মাধ্যমে উদ্ভাবন জোরদার করে ম্যাক্রো-অর্থনীতিকে গতিময় করে রাখতে হবে।

তিন. আগামী দিনে ব্যক্তি খাতের ভূমিকাই হবে মুখ্য। তাদের জন্য সহজে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

চার. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করে ব-দ্বীপ পরিকল্পনার কৌশল অবলম্বনে নয়া প্রতিবেশ-সহায়ক সবুজ প্রবৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে মূলধারায় রূপান্তরিত করতে হবে।

পাঁচ. প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো হয়ে উঠবে ‘গেম চেঞ্জার’। প্রযুক্তির সংযোজন বেশি হবে তেমন বিদেশি উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে এসব অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত গড়ে তুলতে হবে। তাদের সঙ্গে সম্পূরক অবকাঠামো সংযোজনকেও প্রাধান্য দিতে হবে। তা না হলে ওইসব অঞ্চলে উৎপাদিত পণ্য সহজে বন্দরে ও স্বদেশের বাজারে পৌঁছতে পারবে না।

ছয়. অন্তত আরও দুই দশক ধরে গার্মেন্টসশিল্পের দাপট বজায় থাকবে। তাই তাকে সামাজিক ও পরিবেশগত ‘কমপ্লায়েন্ট’ করে গড়ে তুলতে সবুজায়নের দিকে ঝুঁকতেই হবে।

সাত. তথ্যপ্রযুক্তি খাত হবে আমাদের আগামী দিনের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত। আমাদের রয়েছে তরুণ ও প্রযুক্তিপ্রেমী শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। তারাই এগিয়ে নিয়ে যাবে এই খাতকে। তাই এদিকে নীতি-সহায়তা বাড়াতে হবে।

আট. খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কৃষিকে আরও যান্ত্রিক করতে হবে। কৃষির বহুমুখীকরণ ও আধুনিকীকরণের চলমান নীতি-সমর্থনকে আরও বেগবান করতে হবে।

নয়. শহরগুলো পরিবেশসম্মত করতে হবে। বড় নগরের আশপাশে স্মার্ট উপনগর গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে নগরে দারিদ্র্য বাড়বে। বাড়বে জীবন চলার কষ্ট।

দশ. আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রসারে মনোযোগী হতে হবে। এদিকে আমরা বর্তমানে দৃষ্টি দিচ্ছি। আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রসারের বর্তমান ধারাকে আরও গতিময় করতে হবে।

এগারো. ‘দেশপ্রেমিক হিসেবে প্রত্যেকেই কর দেব’Ñ এই স্লোগান সর্বব্যাপী করা চাই। সে জন্য কর-জিডিপি সমানুপাত দুই ডিজিটে নিয়ে যেতে হবে।

আরও বলতে চাই, গুণমানের শিক্ষা ছাড়া দেশকে উন্নত করা সহজ হবে না। সরকার উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন করে উদ্ভাবনীমূলক যুগোপযোগী শিক্ষার সুযোগ প্রসারে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এটা করতে গিয়ে যেন ইউজিসিকে দুর্বল করা না হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসনও যেন বিঘিœত না হয়। পাশাপাশি আরও বেশি করে প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক, প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। ব্যক্তি খাতকেও গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিলে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে অনুদান দিতে হবে। কর্মীদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব তাদের নিতে হবে। তা না হলে প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই বিশ্বে টিকে থাকাই দায় হবে। তবে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশ বেশ খানিকটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। নিশ্চয় এই সুযোগের সদ্ব্যবহারে আমরা তৎপর থাকব। নতুন করে বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ করার সুযোগ করে দিতে হবে।

সবশেষে বলব, বাংলাদেশ খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে আমাদের স্বদেশের এই উত্থানকে যেন আমরা স্বাগত এবং সমর্থন জানাই। জয়তু দ্রুত অগ্রসরমান বাংলাদেশ।

য় ড. আতিউর রহমান : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ

[email protected]

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে