গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র

  মাসুদ কামাল হিন্দোল

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:৪৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক গণতন্ত্রের স্বর্ণযুগে আজও মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশে রাজতন্ত্র চলছে। কোনো কোনো দেশে রাজতন্ত্রকে বিভিন্ন আদলে সংস্কারও করা হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, যখন কোনো দেশেই রাজা থাকবে না তখন থাকবে তাসের পাঁচ রাজা আর ইংল্যান্ড বা যুক্তরাজ্যের রাজা। যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না আমাদের উপমহাদেশ সে সাম্রাজ্যেরই উপনিবেশ ছিল। রাজা-রানি অনেক দেশে না থাকলেও রাজতান্ত্রিকের সে ধারা আজও চলছে। উপমহাদেশের দেশগুলোতে গণতন্ত্র নামমাত্র থাকলেও এর ছদ্মাবরণে চলছে রাজতন্ত্রই। নেতৃত্ব ও গুণাবলির চেয়ে উপমহাদেশে উত্তরাধিকারের মূল্যায়ন করা হয় বেশি। বিস্ময়করভাবে সার্কভুক্ত বেশ কয়েকটি দেশে উত্তরাধিকারের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কাকতালীয় হলেও উত্তরাধিকারসূত্রে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলংকার রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটেছে। সে ধারা আজও অব্যাহত আছে।

উপমহাদেশের সুপার পাওয়ারখ্যাত ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জওহরলাল নেহেরু। তিনি তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে সঙ্গে রেখে রাজনীতি শিখিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী ছায়ার মতো লেগেছিলেন বাবার সঙ্গে। পরবর্তীকালে ইন্দিরা ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তার স্ত্রী জনগণের বিরোধিতার মুখে প্রধানমন্ত্রী না হয়ে পার্টিপ্রধানের পদে থাকেন ইতালির বংশোদ্ভূত সোনিয়া গান্ধী। রাহুল গান্ধী দীর্ঘদিন দলের সঙ্গে থাকার পর কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। শুরু থেকে মায়ের সঙ্গে থেকে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী দুজনেই রাজনীতি শিখেছেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ার পর তার কন্যা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী বেনজির ভুট্টো পাকিস্তান পিপলস পার্টির হাল ধরেন। নেহেরুর মতো ভুট্টোও মেয়েকে পাশে রেখে রাজনীতি শিখিয়েছেন। পরবর্তীকালে বেনজির দুবার ১৯৮৮ ও ১৯৯২ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। বেনজিরের মৃত্যুর পর তার স্বামী আসিফ আলী জারদারি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বর্তমানে রাজনীতিতে আলোচিত হচ্ছেন বেনজির ও আসিফ আলী জারদারির ছেলে বেলাওয়াল। মাত্র ১৯ বছর বয়সে দেশের সবচেয়ে পুরনো পারিবারিক পরম্পরায় রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যান হন বিলাওয়াল ভুট্টো। সর্বশেষ নির্বাচনে তার দলের অবস্থান তৃতীয়। তার বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি তাকে পেছন থেকে পরিচালনা করছেন।

১৯৫৩ সালে শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী সলোমান বন্দরনায়েক বৌদ্ধভিক্ষুর হাতে নিহত হন। স্বামীর মৃত্যুর পর শ্রীমাভো বন্দরনায়েক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১৯৬০-৬৫, ’৭০-৭৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বন্দরনায়েকের কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গাও শ্রীলংকা সরকারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯৪ সালের ১২ নভেম্বর থেকে ২০০৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৩ বছর দেশটির রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শ্রীলংকার প্রথম নারী ও পঞ্চম প্রেসিডেন্ট। কুমারাতুঙ্গার এক মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।

১৯৮১ সালে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তার সহধর্মিণী খালেদা জিয়া বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী দলের হাল ধরেন। ১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধাানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। পরে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আরও দুবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। খালেদা জিয়ার বড় বোন, ছোট ভাই ও বোনের ছেলে রাজনীতিতে আসেন। তার বড় ছেলে তারেক রহমান প্রথমে সিনিয়র ১নং যুগ্ম-মহাসচিব এবং পরে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান)। তারেক রহমান প্রবাসে থাকায় গুজব রয়েছে বিএনপির হাল ধরতে পারেন তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান। ভবিষ্যতে হয়তো তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানও রাজনীতিতে এগিয়ে আসবেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার মৃত্যুর একুশ বছর পর তার জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এ ছাড়া ২০০৮ ও ২০১৪ সালেও প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা। শেখ হাসিনার ছোট বোন রেহানাও রাজনীতিতে আসছেন এমন গুজব রয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে পরিবারতন্ত্র যে সহসাই বিদায় নিচ্ছে এমনটা ভাবার অবকাশ কম। বড় বড় রাজনৈতিক দল পরিবারতন্ত্রকেই আঁকড়ে ধরে থাকতে চাচ্ছে। শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়ার বিকল্প নেতৃত্ব এখনো দল দুটিতে গড়ে ওঠেনি। সিনিয়র নেতারা প্রাকৃতিকভাবে বিদায় নিলেও তাদের উত্তরাধিকার এগিয়ে আসবেন স্বাভাবিকভাবেই। অন্তত আগামী আরও এক যুগ বা তারও বেশি সময় উত্তরাধিকারের রাজনীতির জোয়ার থাকবে বাংলাদেশে। অব্যাহত থাকবে গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের ধারা। তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

উপমহাদেশ থেকে রাজতন্ত্রকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হলেও গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে উপমহাদেশে চলছে গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র। এ গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিটি দেশে দু-তিনটি পরিবারের মাঝেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ভবিষ্যতে এ উত্তরাধিকারের রাজনীতির যে কোনো পরিবর্তন হবে সে লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। আগামীতে ভারতে গান্ধী পরিবার, পাকিস্তানে নওয়াজ বা বেনজির পরিবার, বাংলাদেশে মুজিব বা জিয়া পরিবার আর শ্রীংলকায় কুমারাতুঙ্গা পরিবারের সদস্যরাই রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ আলোকিত করবে। রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে উপমহাদেশে গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র সহসা বৃত্তের বাইরে আসতে পারবে না। উপমহাদেশের রাজনীতি সাত-আটটি পরিবারকে ঘিরেই আবর্তিত হবে।

আসলে কথিত গণতন্ত্রের কোনো স্থানও নেই, চর্চাও নেই। গণতন্ত্রের আড়ালে বা আবডালে সব দেশে চলে রাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র। এ উপমহাদেশ দীর্ঘ সংগ্রাম করে রাজতন্ত্রের ইন্দ্রজাল থেকে মুক্তি পেলেও তাদের ঘাড়ে সওয়ার হয়েছে গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র। অতীতের একক পরিবারের স্থলে স্থান পেয়েছে কয়েকটি পরিবার। পার্থক্য এই যা। রাজতন্ত্র আর গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। বিশ্বব্যাপী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনসাধারণ এখন সোচ্চার। উপমহাদেশে যখন গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার তোড়জোড় চলছে পূর্ণোদ্যমে, তখন খোদ রাজতন্ত্রের সূতিকাগারেই প্রকাশ্য রাজতন্ত্রের বিরোধিতার আওয়াজ উঠেছে এবং রাজতন্ত্রের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে আগেও কথা ওঠেনি তা নয়।

২০০০ সালে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দি গার্ডিয়ান। রাজতন্ত্র একটি মানবাধিকার বিরোধী প্রতিষ্ঠান। এ অভিযোগ তুলে পত্রিকাটি মামলা করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে গার্ডিয়ান একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশ করে, সেখানে বলা হয়, ব্রিটেনের ৬০ শতাংশ মানুষ এখন আর রাজার প্রজা হয়ে থাকতে চায় না। তারা দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। অবশ্য কিছু লোক এখনো আছেন যারা চিরকাল প্রজা থেকে যেতে চান। ব্রিটিশ রাজপরিবারের ভিত্তিমূলে এমন অনেক বিধান আছে যেগুলো মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী। এ ছাড়া রাজতন্ত্র উৎখাতের অপরাধের একমাত্র শাস্তি দেশান্তর। রাজদ্রোহের অপরাধে অতীতে অনেককে জীবন দিতে হয়েছে। পত্রিকাটি রাজতন্ত্র বহাল থাকা উচিত কিনা সে প্রশ্নে গণভোট দাবি করেছিল।

নেপাল থেকে রাজতন্ত্র উৎখাত হয়েছে। সৌদি রাজতন্ত্রও খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। আরব বসন্তের ঢেউও উঠেছিল মধ্যপ্রাচ্যে। ভারতের কংগ্রেসে রাজতান্ত্রিকতা চান না অনেক নেতা। তার পরও রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের মতো প্রাচীন বড় দলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। পাকিস্তানের মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) নেতারা পদচ্যুত দলীয়প্রধান নওয়াজ শরিফকে ‘আজীবন নেতা’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। দলের প্রধান হয়েছেন নওয়াজের ভাই শাহবাজ শরিফ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাচিত করায় আলোচিত এবং সমালোচিতও হয়েছে।

উপমহাদেশের গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দৌড়ঝাঁপ আর পৃথিবী থেকে রাজতন্ত্র উৎখাতের আন্দোলন দুটোই একই সময়ে সমান্তরালভাবে চলছে। পরিবারতন্ত্র, গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র আর রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, মিডল ইস্ট, যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশের সাধারণ মানুষ। গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আর রাজতন্ত্র উৎখাতের সফলতা বা ব্যর্থতা দেখার জন্য ভবিষ্যতের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে আমাদের।

য় মাসুদ কামাল হিন্দোল : সাংবাদিক ও রম্যলেখক

[email protected]

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে