২৮ বছর বন্ধ ডাকসু নির্বাচন

ভিসিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা

  মেহেদী হাসান

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০১:১৯ | আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:৪৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় রাজনীতিসহ সব ক্ষেত্রে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তুলতে এক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসুর) নির্বাচন হচ্ছে না প্রায় ২৮ বছর ধরে। এ অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২৬ শিক্ষার্থী ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে হাইকোর্টে রিট করেন।

সেই রিটের চূড়ান্ত শুনানি করে হাইকোর্ট আট মাসেরও বেশি সময় আগে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু হাইকোর্টের নির্দেশ অনুসারে আজও ডাকসু নির্বাচন হয়নি। এ অবস্থায় রিটকারীদের পক্ষ থেকে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি ড. মো. আক্তারুজ্জামানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে মামলা হয়েছে।

মামলার অপর দুই অভিযুক্ত হলেন বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রক্টর ড. এ কে এম গোলাম রাব্বানি ও ট্রেজারার ড. কামাল উদ্দিন। বুধবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই আবেদন করেন রিটকারী পক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। আগামী রবিবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি ড. কে এম হাফিজুল আলমের বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হতে পারে। এর আগে গত ৪ সেপ্টেম্বর আদালত অবমাননার অভিযোগে এই তিনজনকে আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠানো হয়।

মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘আমরা তিনজনকে আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠিয়েছিলাম। উপাচার্যের পক্ষে একজন আইনজীবী একটি জবাব দিয়েছেন। জবাবে তো তারা বলবে যে, ওই নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদক্ষেপ নিয়েছি বা নিচ্ছি। কিন্তু সে রকম কোনো জবাব না দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আইনি নোটিসে আমরা যে বক্তব্য দিয়েছি, তা তারা অস্বীকার করছেন। নির্বাচনের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেননি, এটা নিশ্চিত হয়েই এই মামলাটা করা হয়েছে।’

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ডাকসু গঠিত হয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এক টাকা চাঁদা দিয়ে এর সদস্য হতে হতো। এভাবেই যাত্রা শুরু হয় দেশের স্বাধিকার, ভাষার সংগ্রাম ও স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার ডাকসুর। মোট ৩৬ বার ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর প্রথম ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালে।

সর্বশেষ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালের ৬ জুন। এরপর  থেকে বন্ধ আছে এই নির্বাচন। দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের অবস্থাও একই। এ ধারায় চলছে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কলেজও। ডাকসুসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় আগামী প্রজন্ম নেতৃত্ব শূন্যতায় পড়তে পারে বলে আশংকা করছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩ অনুযায়ী সিনেটের ১০৪ সদস্যের মধ্যে ৫ জন থাকবেন ছাত্র সংসদের প্রতিনিধি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামে ছাত্রস্বার্থ সংরক্ষণে ভূমিকা পালন করতেন এই ছাত্র প্রতিনিধিরাই। কিন্তু এখন ডাকসু নির্বাচন না থাকায় সিনেটে নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিও নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের অনেক দাবি-দাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপিত হয় না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাকসু কার্যকর না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কমছে দিন দিন। ঠিক মতো গবেষণা হচ্ছে না। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে অপরাজনীতির শিকার হয়ে যেসব শিক্ষার্থীর মৃত্যু হচ্ছে, তার বিচারেও গতি থাকছে না। অযৌক্তিকভাবে বেতন-ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদ করারও কেউ নেই। হচ্ছে না আগের মতো এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটিস বা সহ-শিক্ষা কার্যক্রম।

ডাকসুর দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী আবু রায়হান খান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আসলে চায় না ডাকসু নির্বাচন হোক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের নির্বাচন হয় নিয়মিত। কিন্তু যাদের জন্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়, সেই ছাত্রদেরই ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না প্রায় ২৮ বছর ধরে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি-দাওয়া পেশ করার কোনো প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছে না। ফলে তারা বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায্য অধিকার থেকে।

জানা গেছে, ডাকসু নেই, তবু  প্রতি বছর এই সংগঠনের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৪৮ লাখ টাকা আদায় করছে কর্তৃপক্ষ। এর সঙ্গে রাখা হয় আলাদা বরাদ্দও। এভাবে গত ২৮ বছরে বিশ্ববিদ্যালয় কোষাগারে ১১ কোটি টাকা জমা হয়েছে বলে দাবি শিক্ষার্থীদের। অথচ কর্তৃপক্ষ বলছে এই খাতে আদায় করা কোনো টাকা কোষাগারে জমা নেই।

এদিকে হাইকোর্টের আদেশের পর আগামী বছরের মার্চ মাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রভোস্ট স্ট্যান্ডার্ড কমিটির বৈঠকে প্রত্যেক হলের শিক্ষার্থীদের ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার জন্য সিন্ডিকেটে প্রস্তাব তোলা হয়। প্রস্তাব পাস হওয়ার পর এ বছরের ৩০ মের মধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার জন্য প্রত্যেক হলের প্রভোস্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হলেও এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়নি হল প্রশাসন।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগ ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ঢাবি হচ্ছে গণতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতি চর্চার প্রাণকেন্দ্র। আমরা আগেও ডাকসু নির্বাচনের পক্ষে ছিলাম, এখনো আছি। আমরা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে সব রকমের সহযোগিতা করব।

ঢাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মেহেদী তালুকদার বলেন, হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেটা মানল না। মনে হয় এই সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসু নির্বাচন দিবে না।

ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসু নির্বাচন নিয়ে অতীতের মতো টালবাহানা শুরু করেছে। এ ব্যাপারে উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, আদালত তার নিজস্ব গতিতে চলে। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কিভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন করা যায়, সেই প্রক্রিয়া ধরে এগোচ্ছি। ভোটার তালিকার কাজ চলছে। ডাকসুর নির্বাচন এবার অবশ্যই হবে।

উল্লেখ্য, ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করতে চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এছাড়া ওই নির্বাচনের সময় আইনশৃক্সক্ষলা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে