বাল্যবিবাহে পুড়ছে দেশের ভবিষ্যৎ

  শাকিলা আক্তার

১১ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৮, ০১:০৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুরা দেশরতœ, ওদের করো যতœ। আজকের এই শিশুরাই আগামী দিনের দেশশাসক, কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, কলাম লেখক-লেখিকা, সম্পাদক, আইনজীবী, সমাজসেবক ইত্যাদি। এরাই জাতির সোনালি ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাল্যবিবাহ আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি মারাত্মক ভাইরাসের নাম। বিশ্ব সমাজব্যবস্থায় বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ও পবিত্র বন্ধন, তবে বাল্যবিবাহ দেশ ও জাতির জন্য অভিশাপ। আমাদের যাপিত জীবনে আধুনিকতা ও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও বাল্যবিবাহের প্রবণতা কমেনি। বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে বাল্যবিবাহ, গ্রামগ-ি পেরিয়ে সারাদেশে ব্যাধির মতো ছড়াচ্ছে এই সমস্যা। বাল্যবিবাহ শুধু দরিদ্র, অল্পশিক্ষিত পরিবারেই ঘটছে তা নয়, অনেক শিক্ষিত পরিবারেও ঘটছে হরদম। বাবা-মার অসচেতনতামূলক দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার বাসনা এই বাল্যবিবাহে ধ্বংস হয় একটি মন, একটি পরিবার, একটি সমাজ, সর্বোপরি একটি রাষ্ট্র। আর বর্তমান পৃথিবী হারাচ্ছে আগামীর পৃথিবীকে এবং দেশ হারাচ্ছে উন্নয়নশীল দেশ গড়ার হাতিয়ারগুলো। এক কথায় বলা যায়, বাল্যবিবাহে পুড়ছে দেশের ভবিষ্যৎ। আমাদের দেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গড়তে হলে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতেই হবে। এ জন্য রাষ্ট্র ও জনতার ঐক্যবদ্ধতা দরকার। আমরা জানি, বাল্যকাল বা পূর্ণবয়স্ক হওয়ার আগে যে বিবাহ সম্পন্ন হয় তাকে বাল্যবিবাহ বলে। বাল্যবিবাহ মানেই অন্ধকারে আবদ্ধ হলো যেন তাদের জীবন। বাল্যবিবাহের শিকার ছেলেমেয়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদনের মতো মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, যা তাকে সারাজীবনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইউনিসেফের একটি জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে ৬৪ শতাংশ মেয়ের ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। বাল্যবিবাহের বিভিন্ন কারণ লক্ষ করা যায়, তার প্রধান কারণ দরিদ্রতা, নিরক্ষরতা, সামাজিক চাপ, নিরাপত্তার অভাব, যৌন নির্যাতন, যৌতুক প্রথা, ইভটিজিং, অশিক্ষা, অসচেতনতা, বোঝাস্বরূপভাব, অর্থাভাব, কুসংস্কার, অপরিণত বয়সে প্রেমে জড়িয়ে পড়া, অবহেলা, পুরনো ধ্যান-ধারণা, বেকারত্ব, প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা, পারিবারিক ভাঙন ও অবক্ষয়, প্রশাসনের ব্যর্থতা ইত্যাদি। আজকের শিশু ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। বাল্যবিবাহের পরিমাণ না কমালে, নারীর প্রতি সহিংসতা, মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি, অপরিণত গর্ভধারণ, প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম দেওয়া, অপুষ্টিজনিত সমস্যা, প্রসাবকালীন শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি, প্রসাবকালীন খিঁচুনি, প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা, মানসিক অশান্তি, বিবাহ বিচ্ছেদ, পরকীয়া, আত্মহত্যা, জরায়ুর ক্যানসার ও নবজাতকের বিভিন্ন রোগ হওয়ার সম্ভাবনা, অপরিকল্পিত পরিবার, দাম্পত্য কলহ, পতিতা বৃদ্ধি, নারীর শিক্ষার হার হ্রাস, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ কমে যাওয়াসহ নানাবিধ নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকবে। বাল্যবিবাহ নির্মূল করা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণগুলো চিহ্নিত করে এবং বাবা-মার সদিচ্ছাই পারে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে। শুধু তাই নয়, স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের মাঝে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া, গণমাধ্যমে আন্দোলন গড়ে তোলা, বাল্যবিবাহ বন্ধে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বাল্যবিবাহ রোধে যুবকদের নেতৃত্বে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, প্রশাসন মাইকের মাধ্যমে প্রতিটি ইউনিয়ন এবং গ্রামে বাল্যবিবাহের শাস্তি কী হতে পারে তা যদি প্রচার করত তা হলে অনেক বাল্যবিবাহ রোধ করা সম্ভব হতো। বাবা-মার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ রোধে কাজিরা যদি টাকার কাছে হার না মেনে শপথ নিতেন তা হলে বাল্যবিবাহ নির্মূল করা সম্ভব হতো। অবশেষে আমি অনুরোধ করি সব বাবা-মাকে আসুন, আমাদের দেশের সরকার ও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংগঠন আপসহীনভাবে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছে, আমরা তাদের সঙ্গে শামিল হই এবং বলি আমার মেয়ের বিয়ে আঠারো বছরের আগে নয়, আঠারো বছর পরে হলে ভালো হয়। আমরা বাল্যবিবাহ বন্ধ করব, সোনার বাংলাদেশ গড়তে সন্তানকে সহযোগিতা করব, কন্যাসন্তান মানেই বোঝা নয়, করবে তারা বিশ্ব জয় ইনশাআল্লাহ।

য়শাকিলা আক্তার : শিক্ষার্থী, আব্দুল মান্নান বালিকা উচ্চবিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ, সোনাতলা, বগুড়া

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে