রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নেওয়া কি ঠিক হবে

  ম ইনামুল হক

১২ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৮, ০১:২২ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের (বার্মা) রাখাইন (আরাকান) রাজ্যের অবস্থান। এই রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ১৯৪০-এর দশক থেকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে। এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে দফায় দফায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সম্প্রতি সেখানে Arakan Rohingya Salvation Army নামের একটি বিদ্রোহী সংগঠন গড়ে ওঠে, যারা রোহিঙ্গা রক্ষার নামে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। গত ২৫ আগস্ট ২০১৭ তাদের এক হামলার পর আরাকান থেকে রোহিঙ্গারা দলে দলে চলে আসতে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার প্রথমে মিয়ানমার সরকারকে সামরিক সাহায্য দেওয়ার পক্ষে মত দেয়। রোহিঙ্গা সমস্যা মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গাদের সাহায্যে এগিয়ে যান। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমরা ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারলে ৭ লাখ রোহিঙ্গাকেও খাওয়াতে পারব।’ এর পর আরাকানের রোহিঙ্গারা তাদের সম্পত্তি ও আবাদি জমি ফেলে ব্যাপক হারে বাংলাদেশে আসতে থাকে।

রোহিঙ্গাদের এই দুরবস্থার প্রধান কারণ মিয়ানমার সরকারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনে তাদের জাতীয়তা দিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। রোহিঙ্গা মুসলমানরা খ্রিস্টীয় ১৫শ শতক বা তারও আগে থেকে আরাকানে আছে। ব্রিটিশরা ১৮২৬ সালে আরাকান দখল করে ‘বিভেদ করে শাসন কর’ নীতি অনুসরণ করে। ১৯৪০-এর দশকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বৌদ্ধরা জাপানিদের পক্ষে যায়। জাপানি সৈন্যরা এগিয়ে আসতে থাকলে ব্রিটিশরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়োগ করে বাধা দেয়। মুসলমান ও বৌদ্ধদের মধ্যকার শত্রুতার ফলে ১৯৪২-৪৩ সালে দাঙ্গা হয় এবং উভয়পক্ষের হাজার হাজার লোক মারা পড়ে। এভাবে নৃতাত্ত্বিক ধারায় তারা পরস্পরবিরোধী হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীন হলে যুদ্ধরত অবস্থায় এই দুই গোষ্ঠীকে রেখে ব্রিটিশরা চলে যায়। এ সময় রোহিঙ্গারা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে তাদের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

আমাদের কাছে রোহিঙ্গারা এক বিস্ময়কর জাতি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সারাবিশ্বে এরা ছড়িয়ে আছে। আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া কোথায় নেই? এরা বিভিন্ন দেশের উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী, এদের একটাই জাত। এরা প্রতারণাপূর্ণ অর্থনীতির জালে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছে, তার পর উন্নয়নের জোয়ারে ভিটেমাটি হারিয়ে পড়েছে পথে, সড়ক বা বাঁধে বা রেলের ধারে। তার পর এরাই যুগ যুগ ধরে যাযাবরের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে এক ঠাঁই থেকে অন্য ঠাঁইতে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের পর থেকে বিশ্বসমাজে মানবতা একটা অনেক বড় বুলি, আজকের একবিংশ শতাব্দীতেও। এই মানবতার বুলিতে বাকস্বাধীনতা, নারীর স্বাধীনতা, খয়রাতি অনুদান ইত্যাদি আছে কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হারানো অধিকার ফিরে পাওয়ার কথা নেই। করপোরেট অর্থনীতির সামাজিক দায়িত্ব নামের প্রতারণাপূর্ণ বাজেটে বুদ্ধিজীবীরা কেনা হয়ে যায়, প্রচারে সব ঢাকা পড়ে। দুর্গতদের সাহায্য দেওয়া হয় সাজানো ফটোসেশনের জন্য।

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবে হতে হবে। বাংলাদেশে অনেক জাতির লোকজন আছে, যারা একশ-দুইশ বা পাঁচশ বছর আগে এ দেশে এসেছে। আমরা এ দেশে রাখাইন, মারমা, চাকমাসহ অনেক জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিয়ে শান্তির সঙ্গে বাস করছি। আমরা তাই রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়া, তাদের ফেলে আসা বাড়ি ও আবাদি জমি ফিরে পাওয়াসহ যথাযথ পুনর্বাসন বিষয়ে উভয় দেশের সরকারকে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে প্রস্তুত আছি। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বর্মী সামরিক জান্তা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের (মুসলমানদের) ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলছে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন আগস্ট ২০১৭ মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন ১৯৮২ সংশোধন করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

কফি আনান রিপোর্টে বলা হয়, (পৃষ্ঠা ২৬), ২০১৪ সালে মুসলিমদের নাগরিকত্ব আবেদন ফরমে পূর্বপুরুষ বাঙালি লিখতে বলা হয়। এর ওপর আপত্তি হলে তা স্থগিত হয়ে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে আবার শুরু হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে তা বাতিল করে জুন মাসে নতুন ফরম দেওয়া হলে সেখানেও পূর্বপুরুষ বাঙালি লিখতে বলা হয়। এক বছর নতুন ফরম দেওয়া হয় যাতে পূর্বপুরুষ বাঙালি লিখতে আর বলা হয়নি। কফি আনান রিপোর্টে রোহিঙ্গাদের ওপর পর্যায়ক্রমে কীভাবে নির্যাতন চেপে বসে তার বিবরণ দিয়ে বলা হয় (পৃষ্ঠা ৩০), In 1989, a citizenship inspection process was carried out across Myanmar, and those found to meet the new requirements had their National Registration Cards (NRCs) replaced with new ÒCitizenship Scrutiny CardsÓ (CSCs). The majority of Muslims

in Rakhine with NRCs surrendered their documents, but were never issued with CSCs, rendering them de facto stateless. From 1995, the authorities began issuing Temporary Residency Card (TRCs, or Òwhite cardsÓ) to Muslims in Rakhine State who did not have identity documents, as well as to returning refugees. In early 2015, the Government

invalidated all TRCs, and the Constitutional Tribunal ruled that TRC-holders

were ineligible to vote. In the democratic elections in November 2015,

Muslims from Rakhine were neither allowed to participate as candidates,

nor as voters – unlike in all previous elections since independence in 1948. রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিরসনে ২৩ নভেম্বর ২০১৭ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছে। বিবিসি বাংলা অনুযায়ী দুদেশের স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা দলিলে উল্লেখিত কিছু শর্ত :

১. ০৯-১০-১৬ ও ২৫-০৮-১৭-এর পর বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী ‘বাস্তুচ্যুত রাখাইন রাজ্যের অধিবাসীদের’ ফেরত নেবে মিয়ানমার। দুই মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া শুরু হবে।

২. সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরের তিন সপ্তাহের মধ্যে দুই দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হবে এবং মাঠ পর্যায়ে প্রত্যাবাসনের শর্তাবলি চূড়ান্ত করা হবে।

৩. দুপক্ষই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা টঘঐঈজ-এর সহায়তা নিতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ এখনই এই সংস্থাটির সহায়তা পাবে। মিয়ানমার প্রয়োজন অনুযায়ী টঘঐঈজ-কে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করবে।

৪. প্রত্যাবাসনকারীদের নাগরিকত্ব পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করবে। ১৯৯২-পরবর্তী প্রত্যাবাসন চুক্তি যাচাই প্রক্রিয়ার আদর্শ হিসেবে ধরা হবে।

৫. শুধু স্বেচ্ছায় মিয়ানমার ফিরতে আগ্রহীরা এই সমঝোতার আওতাধীন হবে।

৬. অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় জন্ম নেওয়া (রাখাইনে ধর্ষণের কারণে) শিশুদের বাংলাদেশের আদালতের মাধ্যমে প্রত্যায়িত (সার্টিফাই) করতে হবে।

৭. প্রত্যাবাসনকারীদের প্রাথমিকভাবে সীমিত সময়ের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়স্থলে রাখা হবে।

৮. নাগরিকত্বের প্রমাণ উপস্থাপন করার সাপেক্ষে সবাইকে ফেরত নেবে মিয়ানমার।

আন্তর্জাতিকভাবে যখন রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের এক ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে তখন বাংলাদেশ সরকারের একনেক হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে এক লাখ রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে ২৩১২ কোটি টাকার আশ্রয়ণ প্রকল্প পাস করে। আমরা মনে করি রোহিঙ্গাদের সীমান্ত এলাকা থেকে এনে ভাসানচরে স্থান দেওয়ার উদ্যোগ হঠকারী। বরং মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমঝোতা ও কফি আনান রিপোর্টের ভিত্তিতেই আগাতে হবে। এ লক্ষ্যে মিয়ানমার সীমান্তের ভেতরে তাদের অবিলম্বে ফিরিয়ে নিতে হবে। আমরা অবিলম্বে জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো মিয়ানমারের প্রস্তাবিত ক্যাম্পে বা ভূমিতে সরিয়ে নিতে বলছি। আমরা রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বিবাদ নিরসনের লক্ষ্যে উভয় দেশের নাগরিকদের যৌথ উদ্যোগ প্রস্তাব করছি। ভাসানচরে নির্মিত বাড়িঘরে বরং বাংলাদেশের নদীভাঙন ও উন্নয়ন প্রকল্পে জমি হারানো নিঃস্ব মানুষদের পুনর্বাসন করতে পরামর্শ দিচ্ছি।

য় ম ইনামুল হক : প্রকৌশলী ও আহ্বায়ক, সর্বজন দল

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে