অনলাইন ভোটিং প্রক্রিয়া কীভাবে ঠিক করা যায়, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে

  সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:২২ | প্রিন্ট সংস্করণ

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। অবসর গ্রহণ করার পর ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। এবার নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে ‘সার্চ কমিটি’র সদস্যও ছিলেন। আমাদের সময়ের সঙ্গে আলোচনায় নির্বাচনী পদ্ধতি, গণতন্ত্র, শিক্ষাব্যবস্থা, তারুণ্য, সাহিত্য বিভিন্ন প্রসঙ্গে তার গুরুত্বপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রণজিৎ সরকার

আমাদের সময় : নির্বাচন কমিশনার নির্ধারণ করার জন্য আপনি সার্চ কমিটির সদস্য ছিলেন? যে কর্মকর্তাদের নিয়োগ হয়েছে এখন পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম দেখে আপনার কি মনে হয় যোগ্য লোক দায়িত্ব পেয়েছেন?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : নির্বাচন কমিশনার হওয়ার জন্য সার্চ কমিটি যাদের নাম প্রস্তাব করেছি তাদের প্রতি আমাদের আস্থা ছিল। অবশ্য তালিকায় আমার আরও কিছু পছন্দের নাম ছিল। তাদের মধ্য থেকে অন্তত দুজনকে বেছে নিলে হয়তো আরও ভালো হতো। কমিশন কাজ করছে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে। সরকার যদি সহায়ক শক্তি না হয় তা হলে নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে তেমন কিছু করা সম্ভব নয়। কমিশন যা করছে তাতে আমি মোটামুটি সন্তুষ্ট। বেশি সন্তুষ্ট আমি কোনোক্রমেই হতে পারব না। আরও ভালো কাজ করা যেত। তাদের কয়েকটা পদক্ষেপ ভুল ছিল। সে ভুলগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সামনের দিনগুলোতে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করে যদি কমিশন একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে পারে তা হলে সার্চ কমিটির সম্মানটা থাকবে।

আমাদের সময় : নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন হওয়া উচিত কিনা?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সংবিধানে তেমন কিছু নেই। আমি মনে করি সুস্পষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনসহ বিচারপতি ও সব সাংবিধানিক পদে নিয়োগ দিতে হবে। আমেরিকায় একজন রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ক্ষেত্রেও তাকে সিনেট কমিটির কাছে সাক্ষাৎকার দিতে হয়। বিচারপতি নিয়োগের পর তাকেও সিনেট কমিটির কাছে সাক্ষাৎকার দিতে হয়। আমাদের দেশেও এ রকম একটা বিধান থাকা উচিত। একটা নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণে জাতীয় সংসদের একটা কমিটিতে তাদের হাজিরা দিতে হবে। কমিটি যোগ্য মনে করলে নিয়োগ দেবে। মর্যাদাপূর্ণ পদগুলোর জন্য অবশ্যই একটা পদ্ধতি বের করে আইনের মাধ্যমে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। তা হলে মানুষের মনে এসব পদে আসীন ব্যক্তিদের নিয়ে আর আস্থাহীনতা থাকবে না। তাদের কাজকর্মও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক হবে।

আমাদের সময় : ইভিএম নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য সব দল ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করছে। এত বিরোধিতা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন কেন ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিল?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে এবার অত্যন্ত অপ্রয়োজনীয় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন প্রযুক্তি দু-এক বছর পরপর পরিবর্তন হয়। হয়তো দেখা যাবে ২০২৪ সালে যে নির্বাচন হবে সেখানে এই ইভিএম আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কারণ বর্তমান ইভিএমের চেয়ে আরও উন্নত ইভিএম চলে আসবে। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা নষ্ট হবে। আমাদের কি সেই নষ্ট করার মতো টাকা আছে? নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য নেই। এবার নির্বাচনে ছয়টি আসনের সব কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহৃত হবে। এই বিষয়টা আগেই বলা উচিত ছিল। এ ছয়টি কেন্দ্রে কোনো কারণে বিতর্কের সৃষ্টি হলে এর দায়ভার কে নেবে? আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশে আছি। আমরা অনলাইন ভোটিংয়ের দিকে যাই না কেন। এতে তেমন কোনো খরচ নেই। আমাদের বরং ইভিএমের চিন্তা বাদ দিয়ে অনলাইন ভোটিং প্রক্রিয়া কীভাবে ঠিক করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। এতে সময় ও কাগজ নষ্ট হবে না। ভোটকেন্দ্রে কোনোরকমের সহিংসতা হবে না। নির্বাচনের পর একাদশ সংসদ বসলে সেখানে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

আমাদের সময় : দেশে এখন একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। এ নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করছে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই কি গণতন্ত্র নিশ্চিত করা সম্ভব?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : গণতন্ত্র একটা চর্চার বিষয়। গণতন্ত্রের জন্য অনেক কিছু করতে হয়। আমরা কি পরিবারে গণতন্ত্র চর্চা করি? আমাদের দলগুলো কি গণতন্ত্র চর্চা করে? তৃণমূলের সঙ্গে কথাবার্তা বলে কি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া হয়? প্রার্থী দেওয়া হয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। আমাদের পরিবারে গণতন্ত্র নেই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণতন্ত্র নেই, দলগুলোতে গণতন্ত্র নেই এবং মিডিয়ায় পর্যন্ত গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্র যদি এতগুলো প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকে তা হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কীভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করি। একটা উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, এটা ঠিক। কিন্তু আমাদের দেশে মানুষ তৈরি আছে, দলগুলো তৈরি নেই। দলগুলো নানারকমের কারচুপির চিন্তা করে। আমাদের দেশের রাস্তার কোনো মানুষকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি নির্বাচনে সহিংসতা চান? তিনি একবাক্য বলবেন, না চাই না। কিন্তু দলগুলো মনে মনে সহিংসতা চায়। তলে তলে সহিংসতার পরিকল্পনা করে। ২০১৪ সালে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সেটা কি কোনো রাজনৈতিক দলের করা উচিত? সেই দলের পক্ষে নিরপেক্ষ অবাধ নির্বাচন চাওয়ার অধিকার কতটুকু থাকে? সেজন্য দলগুলোকে তৈরি হতে হবে। মানুষের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিতে হবে। অথচ মানুষ চাচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচন আর দলগুলো চাচ্ছে নানা কারচুপি করে জয়ী হতে।

আমাদের সময় : তা হলে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : এবারকার নির্বাচন যদি মোটামুটি সুষ্ঠু ও ৪০ শতাংশও গ্রহণযোগ্য হয় তা হলে বলব বড় অগ্রযাত্রা। এবার আমার দুটি বিষয় থেকে মনে হয়েছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ভালো। প্রথমত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে দাবিটা ছিল তা ছিল অযৌক্তিক, কারণ এতে স্বীকার করে নেওয়া হয় আমরা গণতন্ত্র চর্চার জন্য অত্যন্ত অপরিপক্ব। তার পরও নির্বাচন হচ্ছে। আমি আশা করি এই নির্বাচনের মতো আগামী সব নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হবে। দ্বিতীয়ত, এবার সব বড় দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। একটি শক্তিশালী বিরোধী দল এবার সংসদে থাকবে। আমরা যদি পাঁচ বছর জাতীয় সংসদটা প্রাণবন্ত রাখতে পারি তা হলে গণতন্ত্রের সুদিন আসবেই। সরকারকে জনগণের কথা মাথায় রাখতে হবে। আমি বিশ্বাস করি এভাবে চললে ২০২৪-এর নির্বাচন হবে প্রকৃত গণতান্ত্রিক নির্বাচন।

আমাদের সময় : বাংলাদেশে নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা-উদ্বেগ দেখা যায়। কিন্তু আইনের শাসন দ্বারা পরিচালিত কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আপনি কী মনে করেন?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সংখ্যালঘু নির্যাতন শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে হচ্ছে। তার পরও আমাদের দেশে সংখ্যালঘুরা নিরাপদ নন। অহঙ্কারের একটা জায়গা হচ্ছে এই, বাংলাদেশ উপমহাদেশের সভ্য একটা দেশ। তিন কারণে সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়। একটা হয় তাদের জমি দখলের জন্য। ব্যবসা-বাণিজ্য দখলের জন্য। এটা সরকারি দলের লোকজন করেন, বিরোধী দলের লোকজন করেন। দ্বিতীয় হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার কারণে। তৃতীয় কারণ যারা উগ্রপন্থি তাদের আগাসনের জন্য। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্যও সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়। এই কারণেই নির্বাচনের সময় এই নির্যাতন বেড়ে যায়। তাদের ভয় দেখিয়ে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য অথবা ভোটে হেরে প্রতিহিংসা নেওয়ার জন্য। এসবের কোনোটাই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের সবাই মিলে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

আমাদের সময় : এবার নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা কতটুকু সচেতন বলে মনে করেন এবং ভোটের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা কতটুকু ভূমিকা পালন করবে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সামাজিক মাধ্যমের একটা বড় ভূমিকা অবশ্যই আছে। তরুণদের মধ্যে যারা দলে দলে বিভক্ত তাদের নিয়ে আমার কোনো আশা নেই। যারা একটু শিক্ষিত, দেশটাকে নিয়ে ভাবে, তাদের নিয়ে আমি আশাবাদী। এরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়, অন্যের ওপর প্রভাব ফেলাও তাদের পক্ষে সম্ভব। দুই থেকে আড়াই কোটি তরুণ এই নির্বাচনে প্রথম ভোট দেবে। এরা এখন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এরা ভেবে সিদ্ধান্ত নেবে। ডিগবাজি প্রার্থীদের বিষয়ে তারা লক্ষ্য রাখছে। তারাই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে।

আমাদের সময় : রাজনীতিতে দলবদল করেন রাজনীতিবিদরা, আসলে এটা কি ব্যক্তিস্বার্থে নাকি গণতন্ত্রের স্বার্থে হয়?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : ব্যক্তিস্বার্থেই হয়। গণতন্ত্রের স্বার্থে কেউ রাজনীতি করেন না। রাজনীতি যদি হতো দেশের স্বার্থে তা হলে পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ একটা দেশ হতো আমাদের। রাজনীতি কারা করে? একজন এমপি হওয়া মানে কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়া। আমি দেখেছি ১২ হাজার মানুষ এবার এমপি হতে চেয়েছে। ১২ হাজার লোক কী কারণে এমপি হবে? তাদের টাকা আছে। টাকা ঢেলে নির্বাচন করতে চাইছে। দলকে টাকা দিচ্ছে। এটা গণতান্ত্রিক কোনো আচরণ হলো? সেজন্য আমি মনে করি দলবদলটা হচ্ছে নিতান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। আদর্শের প্রশ্নে কেউ দল বদলান না, নিজ স্বার্থেই করেন।

আমাদের সময় : স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কতটুকু উন্নতি হলো?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমি খুব আশাবাদী হতে পারি না। আনন্দিত যে, এখন প্রচুর ছেলেমেয়ে পড়ালেখা করছে। বাংলাদেশের নব্বই-পঁচানব্বই ভাগ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়। মেয়েরাই বেশি পড়ছে। মেয়েদের বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ছে। পাস করে চাকরি করছে, গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে যাচ্ছে। কিন্তু হতাশার জায়গাটা হলো ঝরে পড়ার বিষয়টা। মেয়েরা প্রচুর হারে ঝরে পড়ছে। পরিবারগুলো তাদের শিক্ষায় ধরে রাখতে পারছে না। অথবা বাল্যবিয়েকে ঠেকাতে পারছে না। এখানে দারিদ্র্য একটা কারণ। এই ঝরে পড়া, পিচিয়ে পড়া চলতে থাকলে আমরা কখনো ডিজিটাল বাংলাদেশ আশা করতে পারি না। প্রতিবছর শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ বাড়ছে। কিন্তু শিক্ষার সঠিক মান অর্জিত হচ্ছে না। বাজেট আরও বেশি বাড়াতে হবে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের আমরা যে বেতন দিই তা দিয়ে কখনো সর্বোচ্চ মানের শিক্ষক পাব না। তাই বেতন বৃদ্ধি করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা তরুণদের আকর্ষণ করতে হবে। বিশেষ করে মেয়েদের। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো দরকার। আরও একটা হতাশার ব্যাপার হলো পরীক্ষাময়তা। ছেলেমেয়েদের ক্রমাগত পরীক্ষা নিয়ে তাদের নষ্ট করা হচ্ছে। যারা টিউশনি বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক তারা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে নোটবই, গাইডবইয়ের ব্যবসায়ীরাও। বড় হতাশার জায়গা হলো, আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার আনন্দটার অনুপস্থিতি।

আমাদের সময় : মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একটা উদ্দেশ্যে ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার। আমরা কি সেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই তো বিতর্ক আছে। একটা দেশ স্বাধীন হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। সেখানে একটা দল মুক্তিযুদ্ধ মানতেই চায় না। মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা করে। মুক্তিযুদ্ধে যারা প্রত্যক্ষ গণহত্যা করেছিল, তাদের মন্ত্রী বানানো হয়েছে। এটা কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা নয়? একটি বড় দল যদি এ রকম একটা অবস্থানে চলে যায়, তা হলে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত বৈষম্য ও শোষণমুক্ত একটি দেশ কবে হবে। আওয়ামী লীগও কি বৈষম্য কমাচ্ছে। উন্নতি হচ্ছে বটে কিন্তু লাভটা কার পকেটে যাচ্ছে? লাভটা হচ্ছে পাঁচ শতাংশ মানুষের। পঁচানব্বই শতাংশ মানুষের পকেটে টান। অথচ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, বৈষম্যমুক্ত একটি বাংলাদেশ আমরা চেয়েছিলাম।

আমাদের সময় : কথাসাহিত্য নিয়ে আপনি কিছু বলুন। সাহিত্য নিয়ে তরুণদের মাঝে কোনো আশা দেখতে পাচ্ছেন কিনা?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমাদের অনেক তরুণ আছে যারা ভালো লিখছে। কিন্তু কিছু তরুণ ফেসবুকের কারণে বিভ্রান্ত হচ্ছে। আমি এবার দুটো প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলাম। তরুণ লেখকদের প্রায় ২৭টির মতো বই পড়েছি। ছয় থেকে সাতজন খুব ভালো লিখেছে। বাকিদের ভাষা ব্যবহারে দুর্বলতা আছে। ভাষা নিয়ে কেউ চিন্তা করে বলে মনে হয় না। ভাষার শৃঙ্খলা না থাকলে চিন্তার শৃঙ্খলা থাকে না। ভাষাটা আমার মতো করে ব্যবহার করব। কিন্তু তার অন্তর্নিহিত একটা শৃঙ্খলা থাকবে। অনেকের ক্ষেত্রে প্লট ভালো কিন্তু ভাষার দুর্বলতা প্লটের আকর্ষণ খর্ব করছে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে দেখেছি ভাষা ব্যবহার ভালো কিন্তু প্লট দুর্বল। অনেক তরুণকে হুমায়ূন আহমেদের অনুকরণ করতে দেখছি। হুমায়ূন আহমেদ একজনই ছিলেন। তাকে অনুকরণ করে তো আর ছাড়িয়ে যাওয়া যাবে না। আর যারা ভালো লিখছে তাদের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। যে কোনো সমাজে ১০ শতাংশের বেশি উৎকৃষ্ট লেখা আশা করা যায় না। এই ১০ শতাংশ তরুণ মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে লিখছে। তারা আমাদের কথাসাহিত্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।

আমাদের সময় : আমাদের অনেক তরুণ পাঠ্যপুস্তকের বাইরে পাঠবিমুখ। ইন্টারনেটে আসক্ত। এক ধরনের অস্থিরতা টের পাই আমরা। শিল্প-সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে এই পাঠবিমুখতা কিংবা এই অস্থিরতা আমাদের সমাজ গঠনে কতটুকু প্রভাব ফেলছে?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : শিক্ষাটা তো সনদমুখী আর বাজারমুখী হলে চলবে না। শিক্ষা হচ্ছে সম্পূর্ণ মানুষ তৈরির একটা সক্রিয়তার নাম। শুধু পাঠ্যবই পড়লেই সেই সক্রিয় চিন্তাটা আসে না। অনেকে পাঠ্যবইও ভালো করে পড়ে না। তারা বিকল্প নোটবই ও গাইডবই পড়ে। আমাদের কোচিং সেন্টারগুলো তো দরজা খুলে বসে আছে। বলছে, জিপিএ ফাইভ পাও। বেরিয়ে যাও। অনেকেই মাস্টার্স পাস করেও প্রয়োজনীয় ভাষাজ্ঞান দেখাতে পারছে না। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটা বুদ্ধিহীন তরুণ প্রজন্ম তৈরি করছে, যারা শুধু প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। কিন্তু ক্রিয়ার জায়গায় অপারগ। বিশেষ করে ফেসবুক একটা অসভ্য ও উদ্ভট প্রজন্ম তৈরি করছে। এদের ভাষা ভয়াবহ। আমাদের সবাইকে বোঝাতে হবেÑ প্রযুক্তির ভালো দিক, মন্দ দিক দুটোই আছে। ভালো দিকটা নিতে হবে। মন্দ দিকটা পরিহার করতে হবে। আমি মনে করি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রযুক্তির ভালো-মন্দ নিয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। চীনে স্কুল-কলেজে কেউ স্মার্টফোন নিতে পারে না। প্রয়োজন ছাড়া সেসব ব্যবহার করা যায় না। আমাদেরও সেই রাস্তায় যাওয়া উচিত। প্রতিটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার অভ্যাসটা করতে হবে। লাইব্রেরি থাকবে। সেখান থেকে প্রতি সপ্তাহে একটি বা দুটি বই বাড়ি নিয়ে যাবে। সাত দিন পর বই নিয়ে আলোচনা হবে। সেটার ওপর পরীক্ষার একটা নম্বর থাকবে। তা হলে স্মার্টফোনের প্রকোপ কমবে।

আমাদের সময় : একদশক পর বাংলাদেশটা কেমন দেখতে চান?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : তখন বাংলাদেশকে আমি চাঁদে দেখতে চাই। অনেক দূরে দেখতে চাই। বিশ্বের চোখে আমরা যেন সব ক্ষেত্রে এক নম্বর, সে রকমটা দেখতে চাই। বৈষম্যহীন একটা বাংলাদেশ চাই। বিশ্বের কথা বললাম বটে, বিশ্বের কাছে যাওয়ার আগে আমাদের নিজেদের কাছে যেতে হবে। আমি এমন একটা বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনীতি হবে মানুষের পক্ষে, যেখানে তৃণমূল সব নির্ধারণ করবে। গ্রামটা হবে প্রধান। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হবে বিশ্বমানের। কেউ প্রাইটেভ চিকিৎসা নেবে না। সবার স্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে বিশ্বমানের হাসপাতাল আর স্বাস্থ্যসেবা। দেশে কোনো কোচিং সেন্টার থাকবে না। সব শিক্ষক ক্লাসে পড়াবেন। সাম্প্রদায়িকতা একটা দূর-অতীতের বিষয় হয়ে থাকবে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে