নির্বাচনে শীতকালের প্রভাব

  অজয় দাশগুপ্ত

০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:০৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন যখন শীতকালে হয় তখন নানা ঘটনায় ঋতুর প্রভাব থাকবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে শীত যত গভীর হয় কিছু মানুষের মস্তিষ্কে তখন ব্যামো দানা বাঁধে। শৈশবে আমাদের এলাকায় এমন দু-একজন মানুষ দেখেছিলাম, যাদের বিদ্যাবুদ্ধি এমনকি এককালে মেধা প্রখর থাকার পরও তাদের অভিভাবকরা শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতেন।

তাদের বেফাঁস কথাবার্তা আর আচরণ সমাজ ও এলাকার জন্য কতটা অদরকারি বা ভয়ঙ্কর ছিল জানি না, তবে তাদের বেলায় এমন দুর্ভাগ্য দেখেই বড় হয়েছি আমরা। এখন নির্বাচনের আগে কত মানুষের কথা আর আচরণে এর চেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা। অথচ তাদের বেলায় নিয়ম পুরো উল্টো। তাদের বাঁধবে এমন বুকের পাটা আছে কারো? বরং তারাই স্বাভাবিক মানুষদের ধরে বেঁধে এনে শাস্তি দেয়। তাদের জায়গা মিডিয়ার পুরোভাগে। তাদের কথা শুনে জাতির দিন শুরু হয়, তাদের কথায়ই ঘুমাতে যায় মানুষ।

এ দেশে এখনো জাতীয় ঐকমত্য বলে কোনো কিছু গড়ে উঠল না। বিশেষত এই বিজয়ের মাসে নেতারা যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, ইতিহাস নিয়ে বাজে কথা বলেন আমরা শঙ্কিত হই। আমাদের শঙ্কা বা ভয়ে তাদের কিছু আসে যায় না। তারা দলবদল, পালাবদল আর মুখবদলে ব্যস্ত। একদা বাম নজরুল ইসলাম খান বললেন, জামায়াত নাকি মুক্তিযুদ্ধ করেছে। যদি তার এই কথাটা মানি তা হলে কার সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিল আমাদের? পাক হানাদার বাহিনীকে কারা পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল গ্রাম-গ্রামান্তরে? সেই মরুভূমি পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান বা সিন্ধু থেকে আসা পাকবাহিনী নৌকা চিনত না। নদী কী জানত না, তাদের রাস্তাঘাট দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া দালাল ছিল কারা? কারা গড়েছিল শান্তিবাহিনী? কাদের নির্দেশে, কাদের চিনিয়ে দেওয়ার কারণে দেশ হারিয়েছিল তার সোনার সন্তানদের? এসব তথ্য খান সাহেবের অজানা নয়। জেনে-বুঝেই বলেছেন তিনি। হয়তো শীতের প্রকোপ। নয়তো ধান্দাবাজি।

তিনি তো নস্যি। আমাদের রাজনীতিতে আরও আগে প্রলাপ বকতে শুরু করা বঙ্গবীর নামে খ্যাত মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী আরও এক পা এগিয়ে। এই ভদ্রলোক মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে খেতাব পেয়েছিলেন। এতটাই উৎসাহী ছিলেন যে, বিজয়ের শুরুতেই গোটা দেশকে ফেলে দিয়েছিলেন বিপাকে। অতি উৎসাহে খোলা মাঠে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে রাজাকার দালাল হত্যাকারী তার কারণে বিদেশি মিডিয়ার তোপের মুখে পড়েছিল সদ্য স্বাধীন স্বদেশ। সে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন তাজউদ্দীনের প্রজ্ঞা। সে লোকটি বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর প্রতিজ্ঞা করেছিলেন জীবনে ততদিন গোশত খাবেন না, যতদিন জাতির জনক হত্যার বিচার না হবে। সে শপথ ভঙ্গ করেছিলেন বিচার ও শাস্তির আগেই। এমনই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড।

রাজনীতিতে দলবদল অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং সেটাই দস্তুর। কিন্তু খোলনলচে বদলে তা করতে হবে কেন? বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ইতিহাসকে সম্মান করে বা তার দিকে থেকেও আওয়ামী বিরোধিতা করা যায়। সেটা তারা করছেন না। তাদের টার্গেট একটাই। বঙ্গবন্ধুকন্যার অপসারণ। শীতকালে জেগে ওঠা মানুষের এমন খায়েশ থাকতেই পারে। কিন্তু তার পর? সে তার পরটা ক্লিয়ার নয়। বাংলাদেশ এখন চাইলেই যে কোনো ঝুঁকি নিতে পারে না। আর ষোলো কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলাও সহজ নয়। কারণ মানুষ সব জানে আর বোঝে।

ভোটটা যেহেতু শীতকালে আমরা ভয় পাব এটাই স্বাভাবিক। মানুষের ভেতরও ঋতুর প্রভাব আছে। কারা যে কখন কোনদিকে মোড় নেয় বলা মুশকিল। সাধারণ নির্বাচনে আমজনতাই ভোটার। এই আমজনতা বিষয়টাও গোলমেলে। আপনি যদি দুনিয়ার ইতিহাস দেখেন, জানবেন আমজনতাকে জিজ্ঞেস করে কোনোকালে বড় কিছু হয়নি। করা যায়ও না। তাদের সমর্থন লাগে বৈকি। তবে বড় কাজ করতে হলে ঝুঁকি নিতে হয়। যেটা মধ্যবিত্ত বা সাধারণরা পারেন না। এটাই নিয়ম। সে নিয়মের কারণেই সব দেশে বা অগ্রসর সমাজে কিছু মানুষ সামনে থেকে পথ দেখায়। সে মানুষদের সবাই পছন্দ করবে এমন নয়। বরং তাদের সমালোচনা আর নিন্দাই হবে বেশি। যে যত বেশি কাজ করে তার সমালোচনা ততোধিক। ফলে সমালোচনার বাইরে গিয়ে পছন্দ করার সময় এখন দুয়ারে। এর জন্য যাদের সমর্থন আর সহযোগিতা দরকার তাদের ভেতর আছে শীতকালীন সুবিধাবাদ। এরা গ্রীষ্মের ওয়াজ করেন শীতকালে আর গ্রীষ্মকালে গান শীতের কীর্তন। কীভাবে যে কী হবে তার চিন্তাতেই কেটে যাবে বিজয়ের এই মাস।

তারামন বিবি প্রয়াত হওয়ার দিন বেছে নিলেন ডিসেম্বরের এক তারিখ। এর একটা তাৎপর্য আছে নিশ্চয়ই। মুক্তিযোদ্ধারা এ দেশের সোনার সন্তান। তারা ছিলেন বলেই আমাদের মাথা উঁচু। আমাদের বুক স্ফীত। তারামন বিবি সব হারিয়েছিলেন, শুধু সাহস আর আশা হারাননি। আমরা যদি তাকে শ্রদ্ধা করি বা ভালোবাসি তবে আমাদের উচিত নয় আশাহীন হওয়া। হতাশা না দেয় আয়ু, না কোনো সম্ভাবনা। এ দেশের তরুণ প্রজন্ম যেন বিভ্রান্ত না হয়, যেন তাদের জীবন নানা সংঘাতে দীর্ণ না হয় সে চিন্তা এখনই করতে হবে। সম্প্রতি নানা অজুহাতে তাদের রাগিয়ে দেওয়া আর মাঠে নামানোর কুফল দেখা গেছে। যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল সরকারি দলের কিছু নেতার কারণে। সে কারণে সরকারি দলে যাদের শীতের প্রকোপ আছে তাদের কথা মাথায় রাখা দরকার। এরা মানুষকে রাগিয়ে তোলা ছাড়া আর কী কাজে আসেন?

নির্বাচন যত ঘনীভূত হবে তত আরও জটিলতা আর কুয়াশা তৈরি হবে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। আবার রাজনীতিতে আমজনতার ভোটও মূল্যবান। এ দুই সত্যের ভেতর সেতুবন্ধ তৈরি হয়নি। সেখানেই ভয়। দেশ, জাতি ও ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে হলে শীতকালে সুস্থ থাকা সঠিক রাজনীতি ও পথ বেছে নেওয়ার বিকল্প নেই। এবারের নির্বাচন আমাদের ভয় ও আশঙ্কাকে দূর করে একটা গঠনমূলক বিরোধী দল ও সরকার উপহার দিক। হানাহানি, বিদ্বেষ বা সংঘাতের বাইরে তৈরি হোক জাতীয় ঐক্য। যা না থাকলে বছরের পর বছর কেবল হিংসা আর মারামারি বা চক্রান্তই রাজত্ব করবে। তেমন কিছু চাইনি বলেই মুক্তিযুদ্ধে দেশ মুক্ত হয়েছিল। সে ত্যাগ আর আত্মদান যেন দম্ভ বা ষড়যন্ত্রের কাছে পরাজিত না হয়। বিজয়ের মাসে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

অজয় দাশগুপ্ত : সিডনি প্রবাসী কবি ও কলাম লেখক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে