ভোটে নয় পরিচয় জোটে

  ইশতিয়াক আহমেদ

০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর বহু দেশের তুলনায় বাংলাদেশে অনেক জিনিসই অত্যন্ত সুলভে পাওয়া যায়। এ তালিকার শীর্ষে আছে ‘ডায়ালগ’। এ কাজে আমরা ‘সিদ্ধমুখ’। ডায়ালগের মধ্যে আবার জনপ্রিয়তা এবং ব্যবহারের হিসেবে শীর্ষে আছে, ‘দেশের জন্য কিছু করতে চাই’। সমাজের সর্বস্তরের মানুষই এ ডায়ালগ দিতে খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। যে হারে এটা বলা হয়, তার দশ ভাগের একভাগ লোকও যদি তা করত, আমরা অনেক এগিয়ে যেতাম।

আবার এ ডায়ালগ নিয়ে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন আমাদের রাজনীতিকরা। তারা ভোট চায় দেশের জন্য কিছু করবেন বলে। তারা জোট করে দেশের জন্যই কিছু করবেন বলে। আদতে ভোট বা জোট কেবলই যে তাদের নিজেদের জন্য, তা বছরের পর বছর দেখে বুঝেছি বহু আগেই। এবারও সেই জোট হয়েছে ‘দেশের জন্য কিছু করতে’। জোটকারীরা তাই-ই বলছেন।

জোটের কথা বলার আগে দেশের জন্য কিছু করা নিয়ে আব্রাহাম লিংকনের একটা ঘটনা বলে নিই। তার কাছে একবার এক নারী এসে বলেছিলেন, ‘মি. প্রেসিডেন্ট, আপনার উচিত আমার ছেলেকে সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার করে কর্নেল পদে নিয়োগ দেওয়া। কেননা, আমার দাদা লেক্সিংটনে যুদ্ধ করেছেন, আমার চাচা একমাত্র ব্যক্তি যিনি ব্লাডেন্সবার্গে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাননি, আমার বাবা নিউ অরলিয়ান্সে যুদ্ধ করেছেন আর আমার স্বামী মন্টেরিরির যুদ্ধে মারা গেছেন।’ লিংকন সব কথা শুনে প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘আপনার পরিবার দেশের জন্য অনেক করেছে, এখন অন্যদের সুযোগ দেওয়ার সময় এসেছে।’

এবার জোটের দিকে যাওয়া যাক। নির্বাচনী ডামাডোলের শুরু থেকেই জোট নিয়ে দেশে যা চলছে তা সত্যিই অদ্ভুত রকম ব্যাপার। প্রথমদিকে দুই দল জোটের আয়োজন করল। মোটামুটি প্রেমিক-প্রেমিকার মতো একসঙ্গে থাকার দৃঢ়অবস্থান ব্যক্ত করল জাতির সামনে। কিন্তু যেদিন সব ফাইনাল জায়গায় চলে আসার কথা, সেদিন একদল আরেক দলকে না জানিয়ে নতুন জোটে যোগ দিয়ে ফেলল। জোটের এক শরিক বাসায় গিয়ে ফেরত এলেন এবং অভিযোগÑ অন্য শরিক দাওয়াত দিয়ে বাসায় নেই। বেদনাদায়ক ব্যাপার।

প্রকৃতি যেমন শূন্যস্থান পছন্দ করে না, তেমনি রাজনীতিও না। তাই বঞ্চিত দলও তাদের বিপরীত জোটে ঢুকে গেল দরকষাকষি করে। শুরু হলো জোট, পাল্টাজোটের খেলা। যে যাকে পারে তাকেই নিয়ে নিচ্ছে। যে কারণে মাঝখানে এসে জোট বাড়াতে দলগুলোর কোয়ালিটির চেয়ে, কোয়ান্টিটিই বড় হয়ে দেখা দিচ্ছিল। বিষয়টা এমনও হয়ে গিয়েছিল, দল তোমার নাম কী, জোটে পরিচয়। ভোট কোনো বিষয় নয়।

প্রথমদিকে অনেক জোটের আভাস থাকলেও এখন জোট মূলত দুটোতে এসে থেমেছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন একটা, অন্যটা বিএনপি নেতৃত্বাধীন। আর এতে জোটের একটা গতি হলেও ভেতরের দলগুলোর মান-অভিমান নিয়ে প্রায়ই অনেক খবরাখবর বাইরে চলে আসে। আসন নিয়ে ছোট দলকে বড় দলের শাসন, বড় দলকে উদ্দেশ করে ছোট দলের ভাষণ, সব মিলিয়ে জমজমাট জোট। নির্বাচনের এই সময়ে বাংলাদেশকে মোটামুটি জোটমাতৃক দেশ বলা যেতে পারে।

তার ওপর এক জোট অন্য জোটকে যেভাবে প্রতিদিন হুশিয়ারি দিচ্ছে, জানান দিচ্ছে, আমরাই সেরা। জোটে বড় দলের সঙ্গে ছোট ছোট দলের দরকষাকষি এবং নামমাত্র অঙ্কে সন্তুষ্টি থাকা না থাকা নিয়ে জমে উঠেছে নির্বাচনী বাজার। সেটাও বেশ বিনোদন দিচ্ছে জনগণকে। তবে এটা শিক্ষণীয় যে, বড় না হলে দেশে এবং জোটে কারোরই মূল্য নেই তেমন; যেমন মূল্য নেই বাসে কম দামি টিকিট কেনা যাত্রীদের।

সেই গল্পটা বলেই লেখাটা শেষ করি। এক দেশে একবার চলতে চলতে একটা বাস নষ্ট হয়ে গেছে। হেলপার এসে যাত্রীদের বলছেন, যারা ফার্স্টক্লাসের টিকিট কেটেছেন তারা বসে থাকুন। যারা সেকেন্ডক্লাসের টিকিট কিনেছেন তারা নিচে নেমে দাঁড়ান। আর যারা থার্ডক্লাসের কিনেছেন, তারা নেমে আমার সঙ্গে ঠেলুন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে