sara

অরিত্রির দুঃখটুকু পাঠ করতে শিখি

  জয়া ফারহানা

০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:২৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

অরিত্রিকে দেখিনি। চিনিও না। তবু বুঝতে পারি তাকে। অনুভব করতে পারি যখন তার বাবাকে শিক্ষকরা অপমান করে তাড়িয়ে দিলেন তখন কীভাবে তার মনেও একটু একটু করে দুঃখ জমছিল, কতটুকু বিষাদ জমেছিল। এই বিষাদ খাঁটি বিষাদ। কেননা তখনি তো সে কেবল বুঝতে শিখেছে বিষাদ জিনিসটা কী। সবে বুঝতে শিখেছে অপমান কী।

সবে পড়তে শিখছে দুঃখ, তার চেয়েও বেশি পাঠ করছে চারপাশের অন্যায়, অনিয়ম, অবিচার ও অব্যবস্থাপনা। এই শহরের হোমরাচোমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন নিয়ে না যাওয়া। অতি উত্তম নিয়ম। মোবাইল ফোনে নকল বহন করার সুযোগ ও সম্ভাবনা সমূলে নিশ্চিহ্ন করার জন্যই এই বিধান। যদিও অরিত্রির মোবাইল ফোন থেকে নকলের যে অভিযোগ উঠেছিল তদন্তে তার সত্যতা মেলেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরপত্রের সঙ্গে মোবাইলে ধারণ করা বিষয়ের কোনো মিল নেই। এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মাথায় মুখস্থের নকলের দোষ নেই।

কাগজ কিংবা অন্য কোনো অনুষঙ্গে বহন করা নকলেরই যত দোষ। অতএব পরীক্ষার হলে মোবাইল নিয়ে গিয়ে অরিত্রি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ভেঙেছে। নিয়ম ভাঙা অপরাধই বটে। তা ছাড়া উপায়ের নৈতিকতার বিচার হওয়া উচিত উদ্দেশ্যের সততার ভিত্তিতে। সেদিক থেকে বিচার করলেও অপরাধী অরিত্রি। তবে কতটুকু অপরাধ? সে অপরাধে অপরাধী একজন শিক্ষার্থীর কতখানি শাস্তি প্রাপ্য? একজন ‘অপরাধী’ শিক্ষার্থীর অভিভাবকের নাজুক মানসিক পরিস্থিতিতে কতটুকু সংবেদনশীলতা নিয়ে একজন শিক্ষক কথা বলবেন? সে শিক্ষাও শিক্ষাব্যবস্থার অংশ কিনা এসব প্রশ্নের জবাব কে দেবে?

ছোট্ট অরিত্রি, কিশোরী অরিত্রি যে অপরাধ করেছে, তার চেয়ে শত-সহস্র, কখনো লক্ষগুণ বড় অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে এ দেশের মাথা, মুণ্ডু, ধর ও লেজরা। একজন অভিভাবককে ডেকে আনা হয়েছে তার মেয়ের অপরাধ জানাতে। এমন স্পর্শকাতর মুহূর্তে একজন অভিভাবকের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে, সে স্বাভাবিক সৌজন্যবোধ যেসব শিক্ষকের নেই তাদের আমরা কোন উপমা দেব? হাতুড়ে শিক্ষক? তবে মুখস্থ বিদ্যার জয়জয়কারের শিক্ষাব্যবস্থা যে মানবিক মানুষ তৈরি করতে পারে না তার প্রমাণ পাওয়া যায় কিছুদিন পরপরই।

আজ অমুক দিগন্তজোড়া খ্যাতিমান স্কুলের শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করল তো কাল করল এভারেস্ট উচ্চতার সম্মানিত স্কুলের শিক্ষার্থী। কেন? রোগের পেছনের কারণ কী? শিক্ষার্থী, অভিভাবক না শিক্ষক? তথাকথিত খ্যাতিমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যে তাদের বাণিজ্যকে চাঙ্গা রাখার জন্য যে কোনো উপায়ে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করছে তারও তো কত শত প্রমাণ পাই। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তরতরিয়ে বেড়ে উঠছে ঝাঁ চকচকে দালানকোঠা, বিজ্ঞাপনের ভাষায় সর্বাধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, ইন্টারনেট লিটারেসি। বিদ্যা জিনিসটি অমৃত।

সুন্দর বিল্ডিং আর ইন্টারনেট লিটারেসি দিয়ে এটা পরিমাপ করার সুযোগ নেই। হায়! সবই আছে সেখানে, নেই কেবল মানবিকতা। যশমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির মানসিকতা তো ছি-ছিক্কার দেওয়ার মতো বাণিজ্যিক। বেছে বেছে তারা এলাকার পয়সাওয়ালা কিংবা ক্ষমতাওয়ালা মানুষটিকে খুঁজে বের করেন সভাপতির চেয়ারটি বরাদ্দের জন্য। পরবর্তী ক্ষমতাবান চেয়ারটি বরাদ্দ পয়সাওয়ালা অভিভাবকের জন্য। অরিত্রির মা-বাবার মতো অভিভাবক যখন এসব ম্যানেজিং কমিটির কাছে কাতর কণ্ঠে মেয়েকে শেষবারের মতো একটি সুযোগ দেওয়ার জন্য অনুনয় অনুরোধ জানান তখন তারা স্কুল কমিটির আইনকানুন, নিয়মনীতি, কঠোর শৃঙ্খলা বোধ, সততা এবং আদর্শ কথাবার্তার মেশিন চালু করে দেন।

কিন্তু যখন তাদের চেয়ে ক্ষমতাবান কারো সন্তান এর চেয়েও বড় কোনো অপরাধ করে তখন তারা হাত কচলে, কেন্নো কেঁচোর মতো তোষামোদি করেন, সর্বোচ্চ সমাদরে আপ্যায়ন করেন। অরিত্রিরা তো এসব দেখছে। দেখছে যে বাবার ক্ষমতা কম, প্রভাব কম, তার হাজার অনুনয়-বিনয়, কাকুতি-মিনতি কিছুই গ্রাহ্য হওয়ার নয়। টিআইবির জরিপে বহুবার উঠে এসেছে মাউশি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির বিস্তর তথ্য।

দুই

অরিত্রি প্রতীক মাত্র। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অরিত্রিদের সম্পর্ক এমনি মাধুর্যহীন, প্রীতিহীন ও আন্তরিকতাহীন। তথাকথিত অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবকদের অপমানের মাধ্যমে তার প্রমাণ দেন। যে কারণে কিছুদিন পরপরই এমন করুণ ঘটনা ঘটতে দেখি। অসুস্থ অভিভাবকের পক্ষে বসার জন্য সামান্য একটি চেয়ার না পাওয়া, শুধু দুঃখজনক নয় নিন্দাজনকও। যে শিক্ষকরা ছাত্রীর ভুল অভিভাবকের কাছে অভিযোগ হিসেবে তুললেন তারা নিজেরাও যে নির্ভুল নন তার প্রমাণ মেলে অরিত্রির অভিভাবকের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণে।

পত্রিকা পড়ে জেনেছি অরিত্রির বাবাকে বসবার জন্য একটি ময়লা চেয়ার দেওয়া হয়েছে আর অসুস্থ মাকে বসতে দেওয়ার প্রয়োজনই মনে করেনি প্রতিষ্ঠান। সাধারণ এই সৌজন্যবোধ যেসব শিক্ষকের নেই তাদের কথা হয়ত দায়ে পড়ে মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু মনে নেওয়া যায় না। প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে কি শিক্ষার্থীরা যা খুশি তাই করবে? নিশ্চয়ই নয়। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, আমি এ দেশের শিক্ষার্থীদের চিনি। তারা যদি শিক্ষকদের কাছ থেকে একটুমাত্র খাঁটি স্নেহ পায় তবে তার কাছে হৃদয় উৎসর্গ করে দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।

আমাদের শিক্ষার্থীদের হৃদয় নিতান্ত সস্তা দামে পাওয়া যায়। তবে শিক্ষকের যোগ্যতা সম্পর্কে তার মনে যদি সামান্য শৈথিল্য আসে তবে তার পক্ষে সেই বিদ্যা অর্জন করা সহজ হয় না। শিক্ষা টেক্সট বুকের বিষয় নয়, অন্তর থেকে অন্তরে সঞ্চারিত হওয়ার বিষয়। শিক্ষকের অন্তরে স্নেহ থাকলে শিক্ষার্থীরা সহজেই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। বিদ্যার প্রতি বিদ্যার্থীর যদি শ্রদ্ধা থাকে তবে যিনি বিদ্যা দান করছেন তার প্রতি শ্রদ্ধা থাকা দরকার সবার আগে। [রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাবিষয়ক প্রবন্ধ : পৃষ্ঠা ২৯৫]। একই বইয়ের ৩৪৪ পৃষ্ঠায় তিনি লিখছেন, না বুঝে বই মুখস্থ করে পাস করা কি চুরি করে পাস করা নয়? পরীক্ষাগারে বইখানা চাদরের মধ্যে নিয়ে গেলেই চুরি? আর মগজের মধ্যে নিয়ে গেলে তাকে কী বলব? আস্ত বই-ভাঙা উত্তর বসিয়ে যারা পাস করে তারাই তো চোরাই কড়ি দিয়ে পারানি জোগায়।

শিক্ষার কেজো কথায় কেবল জোড়াতলির কাজ চলে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় কাজ হয়েছে কল্পনার শক্তিতে। কল্পনার শক্তি তৈরি করাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রাচ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় কল্পনাকে কতটুকু উৎসাহিত করেন শিক্ষকরা? অমলকান্তির কথা তো আমাদের জানা আছে। শব্দরূপ কী, জিজ্ঞেস করলে জানালার বাইরে জামগাছের দিকে তাকিয়ে থাকার অপরাধে যাকে শাস্তি পেতে হতো। নোটবইশাসিত শিক্ষাব্যবস্থায় কেউ উকিল হয়, কেউ ডাক্তার হয়, কেউ শিক্ষক হয়। কিন্তু কেউ অমলকান্তির মতো রোদ্দুর হতে পারে না। সে সুযোগ নেই। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, বিদ্যা জিনিসটা জড় পদার্থের মতো আয়ত্ত করা যায় না, আয়ত্ত করতে হয় উপলব্ধির মাধ্যমে। ছিঁড়ে ছিঁড়ে বাক্য মুখস্থ করা এবং সেই টুকরো করা মুখস্থ বিদ্যার পরীক্ষা দিয়ে পরীক্ষকের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়, কিন্তু টেক্সট বুকসংলগ্ন মন পরাশ্রিত প্রাণীর মতো। এতে নিজের সৃষ্টিশীলতার ক্ষমতা হারিয়ে যায়।

এই শিক্ষা প্রেমিকের প্রীতি নয়, কৃপণের আসক্তি। ইতিহাস পড়ে জেনেছি এই ভারতবর্ষেই মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম উদার দাক্ষিণ্যের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল। সেই দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কালে চীন ছিল সুদূরের দেশ। সেই চীন থেকে হিউয়েন সাঙ এসেছিলেন বাংলাদেশে। গুরু শীলভদ্রের কাছে দীক্ষা নিতে। পশ্চিম থেকে প্রাচ্যে নালন্দা এবং বিক্রমশীলার মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে আসত শিক্ষার্থীরা। প্রাচ্য এবং পশ্চিমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংযোগ ঘটেছিল। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, মানুযের যোগ যদি সংযোগ হয় সে ভালোই নইলে সে দুর্যোগ [শিক্ষাবিষয়ক প্রবন্ধ : পৃষ্ঠা ৩১৫]।

তিন

আমরা কথায় কথায় চুলচেরা বিশ্লেষণ কথাটা ব্যবহার করি। আসলে চুলচেরার বিশ্লেষণটি কী? একটি চুলকে হাজারবার চিরলে যে জিনিস পাওয়া যায় তাকে বলে চুলচেরা বিশ্লেষণ। চুলকে একবার মাত্র চিরতে গিয়ে দেখুন বিষয়টি কত কঠিন। কিন্তু শিক্ষা যখন আত্মার বিষয় না হয়ে সার্টিফিকেট এবং চাকরির বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তখন নিষ্পাপ শিশু-কিশোরদের মনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমন চুলচেরার ভয় ধরিয়ে দেয়। স্কুলে ভর্তি পরীক্ষাব্যবস্থাকে এমন চুলচেরার জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ধরা যাক কোনো কিশোরীকে তার বয়স জিজ্ঞেস করা হলো। সে কি তক্ষণি কাগজ-কলম নিয়ে হিসাব করে বলে দিতে পারবে তার বয়স এখন ১৫ বছর ৩ মাস ১৬ দিন ৪ ঘণ্টা? এমন সূক্ষ্ম উত্তর না হলেই ফেল।

পৃথিবীতে এমন কোন প-িত আছে যে এক কেজি চাল মাপতে গিয়ে বলতে পারে আর দেড়খানা চাল দিলে তবে ঠিক এক কেজি হবে। রোবট শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ওপর এমন অসম্ভব উত্তর দাবি করেন। এমন শিক্ষক কেবল একালে নয়, সেকালেও ছিল। যে কারণে ডারউইন ছিলেন শিক্ষকদের কাছে অবহেলার পাত্র। সবসময় তাকে শিক্ষকদের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে, একে দিয়ে ‘কিচ্ছু’ হবে না। এহেন শিক্ষকের কারণে বিজ্ঞানী নিউটনের মা বহুবার চেষ্টা করেও নিউটনকে স্কুলে ভর্তি করতে পারেননি। এ ধরনের শিক্ষকের যন্ত্রণায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথেরও স্কুল না পালিয়ে উপায় ছিল না। আর অরিত্রিরা মরে বাঁচতে চায়।

জয়া ফারহানা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে