sara

জাদুবাস্তব উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ

  পিয়াস মজিদ

০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০১:৪৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

শহীদুল জহিরের প্রথম উপন্যাস জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার (১৯৮৮) প্রস্তাবনা বা সমাপ্তি-বাক্য কোনোরকম সরল মীমাংসায় গিয়ে শেষ হয় না। কারণ এ উপন্যাস বাংলাদেশের
 রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের অনেক অমীমাংসিত অধ্যায়কে সামনে নিয়ে আসতে চায়। মুক্তিযোদ্ধা
পরিবারের সদস্য আবদুল মজিদের স্যান্ডেল ছিঁড়ে যাওয়ার প্রতীকে আসলে জাজ্বল্য হয় স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে মুক্তিযুদ্ধের মহান স্বপ্নমালার ক্রমশ খান খান হয়ে যাওয়ার করুণ কাহিনি।
জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কাহিনি ১৯৭১-এর, আবার ২০১২-এরও। এই উপন্যাসের পটভূমি যেমন আরমানিটোলা, লক্ষ্মীবাজার, নয়াবাজার, সিদ্দিকবাজার, জিঞ্জিরা, পাটুয়াটুলি, নারিন্দা, ইংলিশ রোড, সোয়ারিঘাট, চক সার্কুলার রোড, চম্পাতলী, ভিক্টোরিয়া পার্ক, রায়সাবাজার, ওয়ারি, কলতাবাজার, মালিটোলার মতো পুরান ঢাকায় অলিগলি-তস্যগলি, পাড়ামহল্লা, তেমনি একই সঙ্গে গোটা বাংলাদেশই এর পটভূমি। কারণ স্থান ও কালের সীমাবদ্ধ পরিসরকে আলোচ্য আখ্যান সবেগে ছিন্ন করে। বাস্তব ও কল্পনার বিভাজক রেখাসকল গুঁড়িয়ে দেয়। এই উপন্যাস স্বপ্ন দেখা ও স্বপ্ন ছিনতাইয়ের বাস্তবতা যুগপৎ জাজ্বল্য করে।
একজন বদু মওলানার প্রতীকে এখানে রঙ-বেরঙের ঘাতক-দালালের চেহারা পরিষ্কার ভেসে ওঠে পাঠকের চোখের সামনে। বদু মওলানার মতো নিবেদিত রাজাকার কীভাবে একাত্তরের পর সাধারণ ক্ষমার বদৌলতে বীরদর্পে ফিরে আসে লক্ষ্মীবাজারের শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরী লেনেÑ এই উপন্যাস শুধু সে মর্মান্তিক দৃশ্যই আমাদের দেখায় না, একই সঙ্গে বদু মওলানার মতো রাজাকারদের জিঘাংসার শিকার নিহত মোমেনার মায়ের প্রতিবাদী সত্তাও সাকার করে। বদু মওলানাকে উদ্দেশ করে ‘থুক দেই, থুক দেই, থুই দেই মুখে’র মধ্য দিয়ে মোমেনার মা’র মতো লক্ষ শহীদ জননীর গণঘৃণাই যেন বর্ষিত হয়।
যেন ভুলে না যাই যে নব্বইয়ের দশক অর্থাৎ জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার রচনাকাল ছিল বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে যুদ্ধপরাধীদের পুনর্বাসনের করালকাল। এবং এর কিছুকাল পরেই মোমেনার মার মতোই জাহানারা ইমাম নামের এক শহীদ জননী বদু মওলানার মতো স্বাধীনতার শত্রুদের বিচারের ডাক দেন। মহৎ-শিল্পী শহীদুল জহির দিব্যি ভবিষ্যৎ দেখেছেন। রাজাকারের মুখে থুতু নিক্ষেপের ছলে মোমেনার মা যেন প্রশ্নবিদ্ধ সাধারণ ক্ষমাকে প্রত্যাখ্যান করে এই ঘৃণ্য ঘাতকদের বিচারের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করে দিলেন হাড় ও খুলির পাহাড় আর রক্তের নদী ভরা বাংলার জাগ্রত বিবেকের কাছে।
খ- খ- নানা বাস্তব বিদ্যুচ্চমকের মতো খেলে যায় জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার পাঠকের চেতনায়। এই যেমন অতীতের ঘাতক সমকালে এসে ‘রাজনীতিতে চিরদিনের বন্ধু অথবা চিরদিনের শত্রু বলে কিছু নেই’ তত্ত্ব আউড়ে মিশে যায় রাজনীতির মূলস্রোতে। আর এর বিপরীতে রক্তস্নাত স্বদেশে এক শহীদ পরিবারের সদস্য জনৈক আবদুল মজিদকে তখন ভাবতে হয় মুক্তিযুদ্ধ আমাদের এ কেমন বাস্তবতা উপহার দিল, যেখানে মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারে কোনো তফাত থাকে না। তখন যুদ্ধাপরাধী বদু মওলানার দাপট দেখে ঘৃণায়-গ্লানিতে নিজ মহল্লা ছেড়ে আবদুল মজিদের পরিবারকে পালিয়ে যেতে হয়।
তবে এই পলায়নই শেষ কথা কিংবা হেরে যাওয়া নয়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও চেতনাকে বিস্মরণের বিরুদ্ধে লড়াইটা জারি থাকে। তাই রাজাকারদের হাতে নিহত মোমেনার হতভাগ্য ভাই আবদুল মজিদ তার মেয়ের নাম রাখে মোমেনা। যেন মোমেনাই রাজাকারদের হাতে ধ্বস্ত স্বদেশমাতার করুণ প্রতিকৃতি।
চেক কথাশিল্পী মিলান কুন্ডেরা উপন্যাসকে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম হিসেবে বিবেচনা করেন। শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও আমাদের সে ইঙ্গিতই দেয়।

 

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে