ঢাকায় বন্ধুর হাতে খুন ছাত্রলীগ নেতা, পরকীয়ার সন্দেহ

  ইউসুফ সোহেল

০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৩:৪৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

মহাখালীতে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাজধানীর ১৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগ সভাপতি মো. রাকিব হোসেন হামজাকে (২৮) কুপিয়ে খুন করা হয়। স্থানীয়দের ধারণা, নিহতের বন্ধু স্বেচ্ছাসেবক লীগ কর্মী শফিকুল ইসলাম সজীবই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। কারণ হামজা তার স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত বলে সন্দেহ ছিল সজীবের। হামজার ওপর হামলা চলাকালে তাকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হন নূর ইসলাম।

অবশ্য ঘটনার পর রাত ২টার দিকে হতাহতদের খোঁজখবর নিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে গিয়েছিলেন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। এ সময় তিনি বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মনোবল দুর্বল করতে এ হামলা করা হয়েছে বলে মনে করছেন তিনি। আর পুলিশের ধারণা রাজনৈতিক নয়, পারিবারিক কোনো বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন হামজা। হামজাই ছিলেন হত্যাকারীদের টার্গেট।

তাকে বাঁচাতে এসে আহত হয়েছেন নুর ইসলাম। রাকিব হত্যার ঘটনায় রাজনৈতিকই শুধু নয়, পূর্বশত্রুতার জের, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক দ্বন্দ্ব আছে কিনা এসব বিষয়ই খতিয়ে দেখছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। হামজার ভাই মো. রনি জানান, তাদের বাবা বিটিসিএলের লাইনম্যান পদে কর্মরত। গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চণ্ডপাড়ায়। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে রাকিব মেজো।

তিনি পরিবারের সঙ্গে মহাখালী বিটিসিএল কলোনির কল্যাণ-৬০৪ নম্বর বাসায় থাকতেন। তেজগাঁও সরকারি কলেজের ম্যানেজমেন্ট থেকে ফার্স্টক্লাস নিয়ে বিবিএ পাস করার পর সরকারি তিতুমীর কলেজে এমবিএ ভর্তির আবেদন করেছিলেন রাকিব।

প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে রনি জানান, গত বৃহষ্পতিবার রাত ১২টার দিকে টিঅ্যান্ডটি কলোনির মাঠে ব্যাডমিন্টন খেলা শেষে ফেরার পথে বাসার অদূরেই দুলাল সিকদারের বাড়ির সামনে হামজাকে একা পেয়ে বিএনপির স্থানীয় কর্মী সজীবসহ ৩ থেকে ৪ দুর্বৃত্ত মুখে কাপড় বেঁধে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপায়। এ সময় এগিয়ে আসেন হামজার বন্ধু নুর ইসলাম। তাকেও ছুরিকাঘাত করে দুর্বৃত্তরা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্থানীয়রা তাদের ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাত সোয়া ১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক হামজাকে মৃত ঘোষণা করেন। গতকাল বাদ জুমা টিএনটি কলোনি মসজিদে রাকিবের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। অ্যাম্বুলেন্সে করে রাতেই মরদেহ গ্রামের বাড়ি পাঠানো হয়েছে। আজ শনিবার সকালে সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

নিহতের বন্ধু ফয়সাল আহমেদ রাব্বি আমাদের সময়কে বলেন, মহাখালীর কড়াইল বস্তির মোশারফ বাজার এলাকার বাসিন্দা সজীবই কুপিয়েছে হামজা ও নূর ইসলামকে। এ সময় সজীবের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা জসিমও ছিল। তারা প্রায়ই হামজাকে হত্যার হুমকি দিত। সজীব মাদকাসক্ত ও নানারকম অপকর্মের সঙ্গে জড়িত বলেও জানান রাব্বি। জানা গেছে, সজীব রবির একটি শাখায় কর্মরত। ঘটনার পরেই সে গা-ঢাকা দিয়েছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রমতে, সজীব অনেক আগে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সক্রিয় কর্মী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কড়াইল বস্তির একাধিক বাসিন্দা জানান, ২০ বছর ধরে বস্তির মোশারফ বাজার এলাকায় সপরিবারে আছেন সজীব। তিনি আগে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও বর্তমানে তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের স্থানীয় সক্রিয় কর্মী। বছর পাঁচেক আগে সজীবের বাসায় গিয়ে তার বোনের ছেলেকে পড়াতেন হামজা। সেই সূত্রে দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে বন্ধুতা। এক সঙ্গেই চলাফেরা করতেন তারা। দুবছর আগে সজীবের সঙ্গে বিয়ে হয় তাহমিদা আক্তার মিমের। তাদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। বিয়ের আগেই মিমের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল সহপাঠী হামজার।

তাদের বন্ধুতা একপর্যায়ে প্রেমে গড়ায়। সূত্রমতে, সজীবের সঙ্গে মিমের বিয়ের পরও হামজা-মিম পরস্পরের প্রেমে লিপ্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করে আসছিলেন সজীব। এ নিয়ে এলাকায় বেশ কয়েকবার হট্টগোলও হয় সজীব ও হামজার মধ্যে। পারিবারিকভাবে বনিবনা না হওয়ায় গত বছর নিজ বাড়ি ছেড়ে স্ত্রীকে নিয়ে বাড্ডায় পৃথকভাবে বসবাস শুরু করেন সজীব। একপর্যায়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে অবনতি ঘটে; নির্যাতনের অভিযোগ এনে সজীবের বিরুদ্ধে বনানী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন মিম।

সেই থেকে আলাদা থাকতে শুরু করেন এই দম্পতি। কিন্তু সজীবের অভিযোগ ছিল, রাকিবের সঙ্গে মিমের সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। সম্প্রতি স্ত্রীকে তালাক দেন সজীব। সজীবের বৈবাহিক বিচ্ছেদ ঘটলেও রাকিব পরকীয়ার সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলেন, যা সজীব হয়তো সহ্য করতে পারেননি। এলাকায় সজীব ও রাকিব দুজনই ভালো মানুষ হিসেবেই পরিচিত। রাজনৈতিক বা অন্য কোনো বিষয়ে কারও সঙ্গে তাদের কোনো ঝামেলা রয়েছে বলে জানা নেই স্থানীয়দের। স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া সন্দেহে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগ কর্মী সজীবের হাতে ছাত্রলীগ নেতা রাকিব খুন হয়েছেন বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। গতকাল শুক্রবার রাতে বিমানযোগে রাজীবের দেশত্যাগের কথা রয়েছে বলেও কড়াইল বস্তির একাধিক বাসিন্দা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে।

‘সজীব সেখ’ নামে অভিযুক্ত সজীবের ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা গেছে, তিনি রবিতে কর্মরত। বিবাহিত হলেও বৈবাহিক অবস্থার স্থলে তিনি লিখেছেন সিঙ্গেল। বৃহষ্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মেয়ের সঙ্গে নিজের ৫টি ছবি আপলোড করে নিজ ওয়ালে তিনি শেষ পোস্ট করেন। ওয়ালে লেখেন, ‘রাত ৪টা ৫০ মিনিটের ঘটনা ঘুম নাই’। তার আইডি ঘেঁটে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিখা গেছে তাকে। এমনকি সংঘটনটির বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়েও দেখা গেছে সজীবকে।

অভিযুক্ত রাজীবের মা নুরজাহান বেগম ও বড় বোন জরিনা বেগম আমাদের সময়কে বলেন, রবির অফিস থেকে চিল্লায় যাবে বলে বৃহস্পতিবার সকালে বাসা থেকে বের হয়ে যায় সজীব। সজীব আলাদা থাকলেও কারও সঙ্গে তার স্ত্রী মিমের পরকীয়া চলছিল বলে আমাদের জানা নেই। তবে মিম যে সজীবের বিরুদ্ধে জিডি করেছিলেন, তা স্বীকার করেন তারা। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বাসায় এসে তল্লাশি করেছে পুলিশ। সজীবকে না পেয়ে তারা সজীবের বাবা ও বড় ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে। হত্যাকাণ্ডে সজীবের সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে তারা বলেন, একটি পক্ষ সজীবকে ফাঁসানোর জন্য হয়তো তার নাম বলছে। 

বনানী থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. সাইহান ওলিউল্লাহ জানান, ছাত্রলীগ নেতা রাকিব হত্যাকাণ্ডের তদন্তে দুটি কারণ প্রাধান্য পাচ্ছে। একটি হলো পারিবারিক দ্ব›দ্ব, অন্যটি অভিযুক্ত একজনের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কের অভিযোগের জেরে রাকিবের দ্ব›দ্ব। তা ছাড়া দলীয় কিংবা অন্য কোনো সংগঠনের কারও সঙ্গে দ্বন্দ্বে তিনি খুন হয়েছেন কিনা, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে পারিবারিক কোনো বিরোধ থেকে এ ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। রাকিব হত্যার পেছনে যে কারণই থাক না কেন, হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে। তদন্ত সাপেক্ষে সম্ভাব্য সব ধরনের তথ্য নিয়ে হত্যাকারীদের আটক করা হবে। এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা না গেলেও তাদের গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও পরিদর্শক সাইহান ওলিউল্লাহ জানান।

রাজীবের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনে বনানী থানার এসআই আব্দুল মালেক উল্লেখ করেন, রাকিবের ঠোঁটের বাম পাশ থেকে বাম চোয়ালসহ থুতনি পর্যন্ত গভীর, মাথার পেছনে কয়েক জায়গা এবং ঘাড়, বাম হাতের কনুই, কব্জি ও বুকের কয়েক জায়গায় কাটা জখম রয়েছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে