ইতিহাসে সংস্কৃতির প্রাসঙ্গিকতা

  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:৪২ | প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিককালেও অনেকে বিশ্বাস করেন যে, ইতিহাস চক্রাকারে ঘোরে, তবু মার্কসের পরে আজ বলা খুব কঠিন যে, ইতিহাস সামনের দিকে এগোচ্ছে না। (বস্তুত পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নিউটনের যে অবস্থান বা তারও আগে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গ্যালিলিওর, পরে প্রাণিবিদ্যার ক্ষেত্রে ডারউইনের, দর্শনের ক্ষেত্রে মার্কসের অবস্থান সেই রকমেরই।) ইতিহাসের অগ্রসরমাণতায় হেগেলও আস্থাশীল ছিলেন, তারও ছিল দ্বন্দ্বের তত্ত্ব। কিন্তু হেগেল যেখানে মনে করতেন ইতিহাসের অগ্রগতি একটি পরম সত্তার বহির্প্রকাশ বটে, সেখানে মার্কস দেখালেন ইতিহাস বাইরে থেকে তৈরি নয়, মানুষেরই সৃষ্টি।

যাকে আমরা সংস্কৃতি বলি, সে যেহেতু সম্পূর্ণত মানবিক, তাই তাকে থাকতে হয় শ্রেণিতে এবং শ্রেণিতে থাকার দরুন ইতিহাসেও। সংস্কৃতি জিনিসটা কী? সংস্কৃতির একটা নান্দনিক পরিচয় আছে; সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, নাটক, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র সবই তার অন্তর্গত সেই অর্থে। কিন্তু সংস্কৃতি বলতে আরও কিছু বোঝায়, বোঝায় এদের অন্তর্গত আদর্শও, যা নাকি এদের সৃষ্টির অভ্যন্তরে কেবল কার্যকর নয়, রূপের মধ্যেও প্রতিফলিত। তবু সংজ্ঞাটা বোধ করি পূর্ণ হলো না। যথার্থ অর্থে সংস্কৃতি হচ্ছে ব্যাপক অর্থে যাকে পরিবেশ বলি তার সঙ্গে মানুষের সংগ্রামের অভিব্যক্তি। এই অভিব্যক্তি মানুষের সৃষ্টি ও অর্জনের মধ্যে ঘটে, যেমন ঘটে, ওই যে অন্তর্গত আদর্শ তার মধ্যেও। মূল ব্যাপারটা সংগ্রাম, কৃতিতে তার প্রকাশ, আদর্শে তার প্রকাশ। কৃতি থাকলে উৎকর্ষ-অপকর্ষ থাকবে, আদর্শ থাকলে তারও একটি চরিত্র থাকবে। মানুষই কেবল পারে তার পরিবেশের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে, যে দ্বন্দ্বে পরিবেশ বদলায় এবং মানুষ নিজেও বদলে যায়। পশুর জন্য এই দ্বন্দ্বটা সত্য নয়, সেজন্য পশুর কোনো সংস্কৃতি নেই, মানুষের আছে।

সংস্কৃতিরও মূল লক্ষ্য স্বাধীনতাই। প্রয়োজনের জগৎ থেকে স্বাধীনতার জগতে উত্তরণের জন্যই মানুষ সংগ্রাম করে। যে স্বাধীনতা শ্রেণি ও ইতিহাস খর্ব করে দেয়, নষ্টও করে ফেলে, সেই স্বাধীনতা মানুষ অর্জন করতে চায় আত্মসমর্পণ করে নয় (যা পশুরা করে), দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে। যেখানে এই দ্বন্দ্ব নেই, সংস্কৃতি সেখানে অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছেÑ বোঝাতে হবে।

অপসংস্কৃতির ব্যাপারটা বোধ করি খানিকটা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে। পরিবেশের সঙ্গে মানুষের যে দ্বন্দ্ব তার প্রধান মানবিক উপাদান হচ্ছে শ্রম। শ্রম থেকেই সবকিছু উৎপন্ন, সংস্কৃতি তো বটেই। এই উৎস থেকে সংস্কৃতি যখন সরে যায়, শ্রম থাকে না, দ্বন্দ্বও থাকে না, সংস্কৃতি কেবলই অলস শ্রেণির নির্জলা বিনোদনের বস্তুতে পরিণত হয়, তখন তার প্রাণশক্তি বিনষ্ট হয়ে যায়। বাসি ফুলের যে দশা, এই সংস্কৃতিরও অবিকল সেই দশা হয়। এ অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়। পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের একটি সংস্কৃতি জীবন্ত থাকে বটে, কিন্তু সে যেহেতু ওই অধিপতিশ্রেণির দ্বারা শাসিত হয়, তাই তার মধ্যেও সৌন্দর্য যেটুকু থাকে তা অন্তর্হিত হয়ে যেতে চায়। বিশেষ করে আমাদের মতো সাম্রাজ্যবাদকবলিত পশ্চাৎপদ পুঁজিবাদী দেশে অপসংস্কৃতির আরও এক বড় উৎস হচ্ছে পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পণ। সম্পর্কটা দ্বান্দ্বিক থাকে না, বশ্যতার হয়ে দাঁড়ায়। দ্বান্দ্বিক হলে গ্রহণ-বর্জনের ব্যাপার থাকত, সৃষ্টিশীলতা দেখা যেত, গ্রহীতা ও গৃহীত উভয়েই পরিবর্তিত হতো। কিন্তু এখনো দেশি বুর্জোয়ারা যা কিছু পায় বুভুক্ষের মতো গ্রাস করতে চায়, যার ফলে হজম হয় না। সেই রুচিরও অভাব। তদুপরি আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজি এমন নির্মমভাবে প্রবেশ করে যে সবকিছু পণ্যে পরিণত হয়, মুনাফা ছাড়া মানুষ কিছু বোঝে না, তারা বিচ্ছিন্ন হয় পরস্পর থেকে, উৎপাটিত হয় নিজেদের ঐতিহ্য থেকেÑ কচুরিপানার মতো দশা হয়, শোভা থাকলেও মূল্য থাকে না। উৎপাদন যে করবে সে ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। চরিত্র হয়ে দাঁড়ায় পরগাছা দালালের, আত্মমর্যাদাহীন বখাটের। আমাদের দেশে বাংলা ভাষা কেন চলে না, শিক্ষিতের হার বৃদ্ধি পায় না, লোকসংস্কৃতি কেন পণ্য হয়ে বিক্রি হয়, নয়তো অবজ্ঞায় শুকিয়ে মরে, সামন্তবাদী পিছুটান ও ভাববাদী কুসংস্কারগুলো কেন দুর্মর আঠার মতো লেগে থাকেÑ এসবের ব্যাখ্যা ওখানেই পাওয়া যাবে। পুরো ব্যাপারটি এমনই গলিত যে, এর অস্তিত্বে কোথাও কোনো নতুন সৃষ্টি নেই, কেবল একটা কুৎসিত গ্লানি রয়েছে। এর মধ্যে একটা ষড়যন্ত্রও থাকে, সেটা হলো বিদ্যমান শোষণ-ব্যবস্থাটাকে টিকিয়ে রাখার। বাংলাদেশের সমাজে সর্বত্র আজ যে উচ্ছৃঙ্খলতা ও মাস্তানি, বন্ধ্যত্ব ও হতাশা, মানুষ যে একই সঙ্গে দিশেহারা ও ক্ষুব্ধ, তার কারণ সংস্কৃতির এই দৈন্যদশায়ও পাওয়া যাবে, যে দীনতায় গোটা ব্যবস্থাটা আবার সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

সংস্কৃতির ব্যাখ্যা তাই ইতিহাস ও শ্রেণির নিরিখে করাটাই সঙ্গত। বাংলাদেশের অধিপতিশ্রেণির চরিত্র ও উৎপাদন পদ্ধতিতে এর অবসানই বলে দেবে এ দেশের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কী ঘটছে ও কেন ঘটছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য অভিন্ন অবিভাজ্য জাতীয় সংস্কৃতি না খুঁজে শ্রেণি-সংস্কৃতির অনুসন্ধানেই অধিকতর বাস্তবিক ও বিজ্ঞতার পরিচয় দেওয়া হবে। বুর্জোয়ারা যে রাষ্ট্রকে এমনকি বুর্জোয়া পদ্ধতিতেও শাসন করতে অক্ষম তা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। একটি বড় প্রমাণ পাকিস্তান আমলে তো বটেই, স্বাধীন বাংলাদেশেও বারবার সামরিক শাসনের প্রবর্তন। সামরিক শাসন এলে প্রথমেই যা আক্রান্ত হয় সে হলো জনগণের মৌলিক অধিকার। অর্থাৎ স্বাধীনতা। তখন সংস্কৃতি যদি কদর্যরূপে স্থূল হয়ে পড়ে তবে তাতে বিস্মিত হব কেন? এর থেকে উত্তরণের উপায়টা কী? উপায় গণতন্ত্র।

বুর্জোয়ারা বলবেন, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের কথা। বলুন, কিন্তু বলবেন তো সেই গণতন্ত্র আসবে কোন পথে। তারা বলবেন, আসবে নির্বাচনের পথে। আসা উচিত, তবে আসবে কি? বাংলাদেশে কয়েকবার নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু কোনো নির্বাচিত জাতীয় পরিষদই পুরোপুরি কাজ করতে পারেনি। জনগণ বাতিল করেনি এই পরিষদ, বুর্জোয়াদেরই একাংশ করেছে সে কাজ। প্রতিটি নির্বাচনেই মাস্তানরা তৎপর ছিল, কিন্তু ১৯৮৬ নির্বাচনে মাস্তানরা যে খেলা দেখিয়েছে তার তুলনা বিশ্বের অন্যান্য দেশে তো বটেই, আমাদের এই ‘সোনার’ দেশেও পাওয়া মুশকিল। মাস্তানরা নাচে কিসের জোরে? টাকা ও ক্ষমতার জোরে। জনপ্রিয়তার প্রয়োজন নেই, টাকা ও ক্ষমতা থাকাই যথেষ্ট। জনগণ তাদের রায় দেওয়ার কোনো সুযোগই পায়নি। দুর্বৃত্তরা তাদের রায়কে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে। সেজন্য কেবল বিরোধী দলগুলোই নয়, সরকারি দলের ভেতর থেকে একাধিক মত পাওয়া গেছে।

বুর্জোয়া গণতন্ত্রের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কেননা বুর্জোয়াদের এমনকি বুর্জোয়া চরিত্রও নেই, তারা যে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে জনগণকে শোষণ করবে কিংবা দলবদ্ধ ডাকাতদের মতো মিলেমিশে ডাকাতি করবে অতটুকু পারস্পরিক ‘মৈত্রী’ও তারা স্থাপন করতে অপারগ। বুর্জোয়াদের এই সংকট ইতিহাসের মুক্তিকে বিঘিœত করছে ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে আবার এটাও জানিয়ে দিচ্ছে যে, এই শ্রেণি অত্যন্ত দুর্বল, সে যে টিকে আছে তা নিজের সামর্থ্যে নয়, কিছুটা তার আন্তর্জাতিক মুরব্বিদের পৃষ্ঠপোষকতায়, কিছুটা জনগণের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির অভাবে।

ইতিহাস আজ এক ক্রান্তিলগ্নে উপস্থিত। পুরনো জীবনব্যবস্থা কাউকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না। এমনকি শাসকশ্রেণিকেও নয়। যার পরিচ্ছন্ন প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায় বাংলাদেশের নির্বাচনের অপরিচ্ছন্ন ফলাফলের প্রতি সব বুর্জোয়া রাজনৈতিক সংগঠনের দৃষ্টিভঙ্গিতে।

সমাজ ও সংস্কৃতিতে মার্কসবাদকে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে বিপদ থাকে দুটিÑ একটি যান্ত্রিকতার, অপরটি উদারতার। এই দুয়ের মধ্যে আপাত ব্যবধানটা দুস্তর, কিন্তু অন্তরে তারা নিকটবর্তীও বটে; প্রথমত, তারা উভয়েই বিচ্যুত; দ্বিতীয়ত, উভয়েই অলস ও ভীরু। যান্ত্রিকতায় আলস্য ও ভীরুতা কিছুটা উৎকট, সে যা পেয়েছে তাকেই পর্যাপ্ত বলে মেনে নিয়েছে এবং কোনো প্রকার উদ্ভাবনার কিংবা সম্প্রসারণের ঝুঁকি নিতে একেবারে অসম্মত। উদারনীতিও অলস বটে, সেও নতুন পথে এগোতে চায় না এবং অতিসহজেই আপস করে ফেলে আপনভূমি ছেড়ে দেয়, পরমতসহিষ্ণুতার ছদ্মবেশে আপসকামিতাকে লালন করে।

শ্রমজীবীর আন্দোলনে আলস্যের জায়গা নেই, জায়গা নেই আপসকামিতারও; না সে যান্ত্রিক, না উদারনৈতিক, তার লক্ষ্য বুর্জোয়াশ্রেণিকে পরাভূত করে আপন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। এখানে আপসের কোনো স্থান নেই। আপস মানেই মৃত্যু। আলস্যেরও স্থান নেই, আলস্য মানে আপসকামিতা।

নতুন সংস্কৃতি গড়ে না তুললে আমরা স্বাধীনতা পাব না। আমরা গণতন্ত্র চাই কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থা আমাদের গণতন্ত্র দেবে না। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি চাই, তার প্রতিশ্রুতিও এখানে নেই। মানবিক অধিকার চাই, তাও পাচ্ছি না। অনুৎপাদক শ্রেণির রাষ্ট্রনৈতিক আধিপত্য ভেঙে উৎপাদকদের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই শুধু শ্রমিক মুক্ত হবে, সংস্কৃতিতে উৎকর্ষ দেখা দেবে, দারিদ্র্য পালিয়ে যাবে এবং মানুষ মানুষের মতো বাঁচবে। সেই লক্ষ্যে কাজ করার দায়িত্ব পরিহার করা কোনো প্রকৃত সংস্কৃতিসেবীর পক্ষেই সম্ভব নয়।

য় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে