শিকেয় তোলা আনন্দগান

  ড. আজাদুর রহমান

০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:৪২ | প্রিন্ট সংস্করণ

পর্যাপ্ত সবুজ কামিজের মতো উজাড় করা গাছগাছালি, গেরুয়া ধানমাঠ, নীল জলেশ্বরী আর পাথারিখেজুর নিজভাষায় বয়ান করছে। রেওয়াজ করে দেখা দিচ্ছে সাদা বক আর খয়েরি শালিক। হঠাৎ করেই লম্বা ঘের। কোথায় গিয়ে ঠেকেছে কে জানে? জলাভূমি ছেড়ে ক্ষেত তার পর জলাভূমি, ফের ধানক্ষেত লাফ দিয়ে দিয়ে থিতু হয়েছে জঙ্গলের পায়ের তলায়। ভাবতে গিয়ে ঝাপসা হয়ে আসে গুটিধরা গ্রাম। পিচ, ইট বিছানো পথ, কোথাও বা পুরোটাই কাদা, ভাঙাচুরা আর খানাখন্দকে জবরদস্ত হাঙ্গামাÑ সব মিলিয়ে রোদছায়ার ঝিলিমিলি মাড়িয়ে নোনা হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে বাউ-ুলে মোটরসাইকেল। যতই বনবর্তী হচ্ছি ততই নোনা বাড়ছে, দেখা মিলছে কেওড়া গরানের।

জেলা শহর থেকে আশাশুনি হয়ে খুলনার পাইকগাছায় ঢুকে তবে বনবর্তী গ্রাম বোরহানপুর। গ্রাম্য পথঘাট আর নৌপারাপার মিলে তাও প্রায় ৭০ কিলোর ঘটনা। পাড়ার শুরুতেই হযরত বেহারার বাড়ি। খসেপড়া সুপুরিপাতায় আড়াল তুলে আঁটসাঁট আঙিনার পর দাওয়াসহ মাটিঘর। হযরতের বাড়িতে এ নিয়ে আমার দুবার হলো। হযরতদের বেকারই বলা চলে। বেহারা করিম সরদারের কথাই ধরা যাক। কিছু একটা না করলে বউবাচ্চা খাবে কী? বাধ্য হয়ে ঘাসের ব্যবসা করেন তিনি। মামুলি কারবার। ঘেরে অযাচিত শ্যাওলাঘাস যখন কামলারা তুলে সাফ করতে থাকে তখন সেই ফ্যালনা ঘাস কুড়িয়ে গৃহস্থের কাছে বিক্রি করে যা হয় তাই দিয়ে জীবিকা। বাঁচতে গিয়ে করিমকে এখন ব্যাপক জোড়াতালি দিতে হয়। বছরদশেক আগেও অবস্থা এ রকম ছিল না। গাতাধরা জীবনে দলগত আনন্দ ছিল। যুগ যত আধুনিক হলো তাদের প্রয়োজনও তত ফুরোতে থাকল। যেটুকু পেশাগত সম্মান ছিল, শেষপাতে এসে তাও উবে গেল। মনের জোর বাড়াতে নামের শেষে ‘সরদার’ উপাধি যোগ করলেও সমাজের অন্য লোকরা ‘সরদার’ তো দূরের কথা ‘বেহারাও’ বলে না, বলে ‘কাহার’। বেহারা বাদেও দক্ষিণাঞ্চলে আরেক পদের ‘কাহার’ আছে যারা মাঠে মাঠে শূকর চড়ায়। চেনার সুবিধার জন্য আলাদা লোকপরিচয় হয়েছে ‘কাউরা’।

দবির সরদারের কষ্টটা কম নয়Ñ ‘দ্যাকেন আমরা নাচগান, বাজনাবাজি করতি করতি বিয়ের বাড়িতি যাপো। যাইয়ে পর আমাদের রাকে নিচে। কুনো খোঁজখবর করে না। বাপদাদার আমলে মান মইর্যাদা যাও একটুকুন ছিল এখন কোনো মইর্যাদা নাই। বেহারা বলে লোকজন আমাদের ছেলিমেইয়ের সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক করে না।’

সমাজের অনাদর-অবহেলা দবির, হযরত কিংবা করিমরা মানলেও প্রজন্মের ছেলেরা মানবে কেন! করিমের ছেলের মতো অন্যরাও পুড়িয়ে দিয়েছে তাদের বাপদাদার আদি পালকি। পুড়িয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি তারা বরং টানে পড়ে ফের যাতে পালকি ধরতে না হয় সেজন্য ভ্যান বাওয়া, পরের জমিতে জোন (কিষাণ) খাটা, মাছ বিক্রি এমনকি ফালতু ঘাস বেচার মতো পেশাকে বেছে নিয়েছে তারা। হযরত সরদার আঙুল উঁচিয়ে ছেলের বউকে দেখিয়ে কথা তোলেনÑ ‘এয়িতো গাজী বংশের মেয়ে। পালকির কাজ করি না, তাই আর সমস্যা নাই।’ এতক্ষণে করিম, জহর, সানোয়ার, মসলেমরাও টুপটাপ করে জমা পড়েন মজমায়। ভরদুপুরে জাবরকাটা স্মৃতিগুলো পরস্পর মুখ থেকে মুখে লাফাতে থাকে।

ছেলেরা রাগে-অভিমানে করিমদের সাধের পালকি পুড়িয়ে দিলেও হযরত-করিমদের মনের ভেতর দলা পাকানো স্মৃতিকে তো ওভাবে পুড়িয়ে নিঃশেষ করা যায় না। দলের সবাই জড়ো হলে পুরনো ছবিগুলো যেন জ্যান্ত হয়ে এসে দাঁড়াতে থাকে বাস্তবের দোরগোড়ায়। দবির, গানের রাজা ছিলেন তিনি। বয়সের ভারে গাইতে না পারলেও ন্যুব্জ হাতে করিম সরদারকে ইশারা করেন। করিম লাজুকভাবে ওজর তোলেনÑ ‘চাচা উ গান আমি কবে গায়িছি, এখন কি আর মনে আছেনি।’ জবাব শুনে কলতলা থেকে করিমের বউ গলা বাড়ায়Ñ ‘মেয়েআলার বাড়িত যে গানটা গায়িলে সেইটে গাও।’ এক সময় বারান্দার খুঁটিতে ঠেস দিয়ে করিম আপনিতেই গান ধরেনÑ

ছেলেতে কয় বাপেরে কাছে/আমার বিয়ের ভাব লেগেছে/আমার শাড়ি গয়না লাগবে না /মনোরে, ওমন ঘটক লেগেছে।/চারজনের ঘাড়ে উঠে, দোলনায় চহড়িরে/ বিয়ে করতে যাবো আমি রংপুরের শহরেÑ

করিম মাথা দোলান। দলের অন্যরা আঙুল চটকে পায়ের পাতায় তাল ঠুকে আওয়াজ তোলেন। এ হলো চলার গান। চলতিপথে পালকি কাঁধে টান দিতে হয়। ঢোল, ঠুংরি, চাকতি, জোয়ারি, বাঁশি অর্থাৎ আট বেহারার হাতেই কোনো না কোনো তালযন্ত্র থাকবে। একজন প্রধান গানদার। যিনি কিনা গানের কলি টেনে সুর করে জায়গা মতন ছেড়ে দেন। কলির দ্যোতনা ধরে তখন সঙ্গী বেহারারা অন্তরা গাইতে থাকেন। দলে একজন করে নাচদারও থাকে। নাচদার নাচ করতে করতে নানান কীর্তিকলাপ দেখান। যেমনÑ নাচতে নাচতে লাফ দিয়ে উঁচুতে ধরে রাখা পালকির হাতলের ওপর পা তুলে উল্টো হয়ে ঝুলে পড়েন এবং ঝুল খাওয়া অবস্থাতেই গামলার পানিতে মুখ ডোবান। দর্শকরা মজা দেখার জন্য গামলায় আগ থেকেই রেজগি পয়সা রেখে দেয়। এ রকম রেজগিওয়ালা পানিভর্তি গামলাতে চুমুক দিয়ে কে কত রেজগি তুলতে পারে সেটাই হলো নাচদারের বাহাদুরি। যত বাহাদুরি, তত মজা। নাচদার পানিতে চুমুক দিয়ে চোঁ চোঁ করে পানির সঙ্গে রেজগি তুলে গালের মধ্যে জমা করতে থাকেন। এ শুধুই নাচদারের পাওনা।

চেনা দাওয়ায় খেজুরপাতার পাটি পেতে গোল হয়ে আমাদের আলাপ-সালাপে এক সময় মেয়েছেলেরাও কথা তোলেন। কথার লাইন থাকে না। এলোমেলো হয়ে যায় গল্পগুলো। ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা পাড়ার লোক যতক্ষণে গল্পের সুতো তুলে দেন, ততক্ষণে বাচ্চাকাচ্চাদের পায়ের চাপে হযরতের কাদা আঙিনা প্যাঁচপ্যাঁচে হয়ে যায়।

বোরহানপুরে প্রায় ত্রিশ ঘর কাহারের বসবাস। সব মিলিয়ে পাঁচ-ছয়টা দল ছিল। এখন আর কোনো দল নেই। কিছুদিন আগেও গদাইপুরে কয়েক ঘর কাহার ছিল বটে। কিন্তু কোনো পালকি আর অবশিষ্ট নেই। পালকি আছে শাহাপাড়াতে। বেলা গড়ালে অগত্যা করিমদের কাছ থেকে পথের বর্ণনা জেনে আবারও শাহাপাড়াকে মনে করে মোটরসাইকেল ছাড়তে হলো।

... ইটবিছানো পথটা নদীর ঘাটে এসে শেষ হয়ে যায়। ঘাটোয়ালকে মোটরসাইকেলের ভাড়া দিতে দিতে যা জানতে পারলাম তা হলো, শাহপাড়াটা নদী পার হয়েও কিলো দুই পরে। নদীর জল ঘোলা, মাঝে মাঝে ঢেউ উঁচু হয়ে নেমে যাচ্ছে। এত নরম স্বভাবী নদী তেমন চোখে পড়ে না। গেঁয়ো সহযাত্রীকে জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই এ নদীর নাম কী? বললেন, শিববাটি। পরে জেনেছি এটি আসলে কপোতাক্ষ। মাইকেল মধুসূদনের কপোতাক্ষ। গ্রামবাসীরা এতই নদী ন্যাওটা যে, আদর করে একে গ্রামের নামে ডাকেন। শাহাপাড়াতে যখন পৌঁছলাম তখন টাটকা বিকাল। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ এগিয়ে এলেনÑ ‘বাবাজি বসেন তো টংয়ের ওপর, লোক সব এহানেই ডাকাচ্ছি।’

সরদার সাত্তারের বাড়িতে দুটো পালকি রাখা আছে। দেখেই বোঝা গেল কত পুরনো ওগুলো। দীর্ঘদিন কামাইকাজ নেই। বয়োজ্যেষ্ঠ লোকমান সরদারের বয়স ছিয়াশি হলেও মনে আনন্দ আছে। যৌবনে চড়া টান দিতে পারতেন তিনি। ছবের সরদারও কম নয়! বুকের লোম পেকে সাদা হয়ে গেছে! তাতে কী! মনে তো রঙ আছে! ছবেরের বাবা গোবরধনের গানের গলা এমন সুমধুর ছিল যে, কোনো এক বিয়েতে নাকি বর খুশি হয়ে বিশ বিঘা জমি লিখে দিয়েছিল। কৌতূহলে বললাম, কে জমি দান করেছিল? প্রশ্ন শুনে ছবের ক্ষ্যাপা চোখ বড় বড় করে তাকানÑ ‘শোনেন, আমার বাবা গান গায়িলো। বর ছিল পাশের গ্রামের আসির গাজী। উনি এয়িতে মারা গ্যাছেন। গান শুনি তেনায় এত খুশি হয়িলো যে, বিশ বিঘা জমি আমার বাপের কাছে দান করিল।’ উত্তেজিত ছবের থামেন নাÑ ‘এ বাবাজি শোনেন, একোনো সেই জমি আমরা খাচ্চি।’

এক সময় শাহপাড়ার খুব নামডাক ছিল। ভালো বেহারা দল পেতে একহাঁটু কাদা মাড়িয়ে বহু দূরের লোকরাও বায়না করতে আসত। এমনকি ভারত থেকেও লোক আসত। শুধু বিয়ে নয়! জমিদার-জোতদাররাও এখানে-ওখানে যেতে পালকি নিতেন। ডাকসাইটের ডাক্তার-কবিরাজরা রোগী দেখতে পালকিতে উঠতেন। তাছাড়া অসুস্থকে হাসপাতালে নিতেও পালকি লাগত। পালকি ছাড়া নতুন বউয়ের নাইয়র পর্যন্ত হতো না। পয়সা কম হলেও মানুষ খুশি হয়ে কমবেশি উপঢৌকন দিত। সামান্য দু-চার কাঠা ভিটেমাটি যে কারোর ছিল না, তা নয়। সেসব চেষেচুষে মোটামুটি ভালোই চলে যেত দিনপথ। এখন তারা কর্মহীন অভাবী, পেশাচ্যুত নিচুতলার জনমানুষ। দুুঃখের গল্পগুলো বেশিক্ষণ চলতে পারল না। সবকিছু ছাপিয়ে বৃদ্ধ লোকমান গান ধরলেনÑ

হাতে লাঠি, কান্দে ছাতি/ঐ আসতিছে প্রাণের পতি/যোগী ভিক্ষে দাও, ভিক্ষে দাও..।

গান থামে না। জো উঠে গেছে। সাদাকালো মুখগুলোর দিকে চেয়ে থাকি। ভাবি, হেলায় হেলায় কি নিভে যাবে আমাদের প্রান্তিক মানুষরা! আমার কল্পনা ছুঁয়ে খসে পড়ে একটি আনন্দগান।

য় ড. আজাদুর রহমান : গবেষক ও সাহিত্যিক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে