সেই থেকে স্বপ্নের বাংলাদেশের পথচলা শুরু

  ড. এম এ মাননান

১০ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:৪৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

এখনো ভুলিনি আমরা সেদিনের কথা, যেদিন বঙ্গবন্ধু তুমি তোমার দুপা রেখেছিলে বাংলার বুকে একটি স্বাধীন দেশের জনক হিসেবে। তুমিই তো ছিলে সাত কোটি বাঙালির প্রাণ, নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের অবিসংবাদিত জননেতা, স্বাধীনতার ঘোষক আর বাংলাদেশের স্থপতি। তোমার অপরাধ ছিল অসহনীয় শাসকদের চোখে। কারণ তুমি চেয়েছিলে বাংলার মানুষ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শোষণের হাত থেকে মুক্ত হোক, স্বাধীন জাতি হিসেবে বাঙালিরা পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। এ অপরাধে তারা তোমাকে জেলে পুরল। বিভিন্ন সময়ে তুমি প্রায় ১৮টি বছর জেলে কাটালে, নিজের জীবন-যৌবন দেশমাতৃকার সেবায় উৎসর্গ করলে। তার পরও পাকিস্তানি শাসকদের অত্যাচার থামেনি। তারা তোমাকে একাত্তরের ২৫ মার্চের রাতে নিয়ে গেল পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে। তোমার অপরাধ ছিল তুমি বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীনতা চেয়েছিলে। জেলের কুঠরির সামনে তোমার চোখের সম্মুখেই তারা তোমার জন্য কবর খুঁড়ে রাখল তোমাকে হত্যা করে মাটিচাপা দেবে বলে। অকুতোভয় তুমি, একটুও ঘাবড়ালে না। নয় মাসের বেশি কারাবন্দি থাকার পর তারা তোমাকে আন্তর্জাতিক চাপে ছেড়ে দিল। আর বিবিসির কল্যাণে বাহাত্তরের ৮ জানুয়ারি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের দিশেহারা মানুষগুলো যখন জানল তাদের মহানায়ক বেঁচে আছেন এবং তিনি দেশে শিগগিরই ফিরবেন, তারা যে তখন কীরূপ আবেগাপ্লুত হয়েছিল তা বোঝানো যাবে না কাউকে। অখ- পাকিস্তানের বিলুপ্তি ঘটিয়ে ’পূর্ব পাকিস্তান’ নামক শব্দটির কবর রচনা করে পাকিস্তান থেকে লন্ডন এবং সেখান থেকে দিল্লি হয়ে রৌদ্রকরোজ্জ্বল মধ্যাহ্নে একটি ব্রিটিশ বিমানে করে এসে ঢাকার আকাশে কয়েকবার চক্কর দিয়ে (যা রেসকোর্স ময়দানের সভাস্থল থেকে দেখেছি) তেজগাঁও কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে অবতরণ করলে ১০ জানুয়ারি। বিমানবন্দর চত্বরে সমবেত লাখো মানুষ অবাক নয়নে দেখল তাদের সামনে বিমান থেকে নামছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, হিমালয়ের মতো উঁচু যার সম্মান।

তুমি নামলে, জনতার প্রতি অশ্রুসজল নয়নে তাকালে, লাল-নীলে মাখামাখি একটা খোলা ট্রাকে দাঁড়ালে, রাস্তার দুপাশে দাঁড়ানো হর্ষোৎফুল্ল জনতার প্রতি হাত নেড়ে নেড়ে শুভেচ্ছা জানাতে জানাতে পড়ন্ত বিকালে পৌঁছলে রেসকোর্স ময়দানের নৌকাসদৃশ মঞ্চে, ঠিক সেই জায়গায় যেখানে একাত্তরের ৭ মার্চ দিয়েছিলে যুগান্তকারী অলিখিত ভাষণ; যা শুধু শাসকদের গাত্রদাহই সৃষ্টি করেনি, বিশ্বের বোদ্ধা ব্যক্তিদের নজরও কেড়েছিল। তুমি কী জানো পিতা, তোমার সে ভাষণটি ২০১৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে? একই মঞ্চে দাঁড়িয়েই তুমি আবার ২৯০ দিন পর লাখো লাখো সমাগতদের উদ্দেশে জাতির পুনর্গঠনের জন্য দিকনির্দেশনা দিলে। দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসার সময় পালাম বিমানবন্দরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পাশে দাঁড়িয়ে তুমি তোমার ভাষণে যে কাব্যিক নান্দনিকতা দেখিয়েছ তা আজও আমরা ভুলিনি। তুমি সেদিন বলেছিলে : ‘আমার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এই সান্ত¡নায় যে অবশেষে অসত্যের ওপর সত্যের, উন্মাদনার ওপর প্রকৃতিস্থতার, কাপুরুষতার ওপর শৌর্যের, অবিচারের ওপর ন্যায়বিচারের, অমঙ্গলের ওপর মঙ্গলের হয়েছে জয়।’

তুমি এলে বীরের বেশে, উঠলে রেসকোর্স ময়দানের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের) মঞ্চে, ভেজা কণ্ঠে অভিবাদন জানালে সবাইকে। নিশ্চয়ই মনে আছে পিতা, সে মঞ্চের ওপর ঋজুভঙিতে দাঁড়িয়ে অশ্রুবিগলিত কণ্ঠে অনেক কথার মাঝে স্বাধীন বাংলাদেশের রূপরেখা ব্যাখ্যা করলে আর সবাইকে নবসৃষ্ট বাংলাদেশের পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করতে বললে। সবাইকে জানালে দেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখার স্বরূপ, যা ছিল প্রেরণাদায়ী আর আগামীর ইঙ্গিতবাহী। কী চমৎকার ছিল তোমার সে ভাষণ, একাত্তরের ৭ মার্চের অবিস্মরণীয় ১৯ মিনিটের অলিখিত কবিত্বময় ভাষণের পর এত সুন্দর ভাষণ আমরা শুনিনি আর কোনো দিন। দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত ছিলে তুমি, তবুও সে-ই দৃঢ় কণ্ঠ, আগের বজ্রকণ্ঠ আগের মতোই তেজোদীপ্ত, ভাষণে তোমার প্রস্ফূটিত রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদৃষ্টি। সদ্য স্বাধীন দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তোমার সংক্ষিপ্ত ভাবনাগুলো ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ সেøাগানের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হলো সারা রেসকোর্স ময়দানে। সে-ই থেকে শুরু হলো মুক্ত মানুষের নবজীবনের যাত্রা, তোমার স্বপেরœ বাংলাদেশের পথ চলা।

স্বপ্নের দেশটিকে সোনালি আলোয় উদ্ভাসিত করার অভিলাষ পূরণ করার সময় পাওনি বলে তোমার অতৃপ্ত আত্মা নিশ্চয়ই গুমরে গুমরে কাঁদছে। দেখে যাও পিতা, যা তুমি করে যেতে পারোনি তা তোমার আদরের হাসু করে দেখিয়েছে। হাসু তোমার সে খুকুটি নেই, যাকে তার ছোট্ট বোনটিকে সহ রেখে চলে গেলে হায়েনাদের বুলেট বুকে নিয়ে। তোমার হাসু এখন বিশ্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়কের মধ্যে একজন, উন্নয়নের রূপকার, বাংলার মানুষের হৃদয়ের মণি, নিপীড়িত মানুষের স্বপ্নস্রষ্টা। তোমার দেখে যাওয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত, এক আশা-ভরসাহীন দেশ আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তোমার যোগ্য কন্যার হাতের পরশে, দেখে যাও একবার এসে। জানো কী তুমি তোমার কন্যা কী করেছে? তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলাকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত করেছে, মাথাপিছু আয় ১৭৫১ ডলারে বৃদ্ধি করেছে, ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তৈরি করে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের পাঁচটি দেশের একটিতে রূপান্তরিত করেছে, দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশে এনে ঠেকিয়েছে। তার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতৃত্বে মাত্র ১০ বছরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলা। তুমি কী কখনো কল্পনা করেছ টুঙ্গিপাড়ার বাইগার নদীর তীরে হাওয়ায় ভেসে ছুটতে ছুটতে সফেদ ঢেউ গুনতে গুনতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়া তোমার ছোট্ট হাসু তোমারই অসমাপ্ত রাজনীতির উত্তরাধিকার বহন করে একদিন মহাকাশে স্যাটেলাইট ছেড়ে ছোট্ট দেশটির পতাকাকে মহাকাশে উড্ডীন করে বিশ্বকে চমকে দেবে? দেখো তাকিয়ে, নিন্দুকদের চেহারায় ধুলোর ঝাপটা দিয়ে তোমার কন্যা দৃশ্যমান করেছে ডিজিটাল বাংলাদেশ আর স্বপ্নের পদ্মা সেতু। সবচেয়ে বড় কথা, তোমার কন্যা মানুষকে নিত্য-আকালের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছেন আর প্রমাণ করেছেন যে নেতৃত্বের ভিশন, সবলতা আর স্বচ্ছতা থাকলে অবশ্যই উন্নয়নের দিশা পাওয়া যায়। নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জনের পর এখন তোমার হাসু আগামী তিন বছরের মধ্যে ছোট্ট দেশটাকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখছেন এবং সে মতে উদ্যোগও নিয়েছেন। হয়তো অবাক হবে শুনে যে, তোমার মেয়ের নেতৃত্বে দেশ এখন একশত বছর পর কী হতে চায় তার স্বপ্ন দেখছে।

তুমি থাকবে অমর হয়ে আমাদের সবার হৃদয়ে, চিরকাল ধরে। বাংলার মানুষ কখনো ভুলবে না তোমার মতো মহামানবকে যতদিন সূর্য উঠবে পূর্ব দিকে, লোনা জলরাশিতে সিক্ত থাকবে সাগর-মহাসাগর, নীল গগনের বিস্তৃত জমিনে জ্বলজ্বল করতে থাকবে লক্ষ তারা, থাকবে মৌসুমি হাওয়ায় ধবল-কৃষ্ণ মেঘের আনাগোনা, ঝরো ঝরো বৃষ্টিতে নদীতে নাচবে জলতরঙ্গ। সুখে থাকো পিতা। মহান স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করছি তোমার আত্মার মাগফিরাত আজ তোমার স্বদেশে প্রত্যাবর্তন দিবসে।

ড. এম এ মাননান : শিক্ষাবিদ, কলাম লেখক ও উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে