স্বাস্থ্য খাতে দেশের অর্জন

  ডা. নুজহাত চৌধুরী

১১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:৪৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ হাসিনার সরকার উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। মহাকাশ বিজয়, সমুদ্র বিজয় তো দৃশ্যমান ছিল পুরো জাতির সামনে। কিন্তু চোখের আড়ালে এমন অনেক কাজ হয়ে গেছে, যার সুবিধা আমরা পাচ্ছি। কিন্তু এই উন্নতির কারণটা ঠিক আমরা জানিও না, খুঁজে দেখিও না। তেমন একটি ক্ষেত্র স্বাস্থ্য খাত। তাই একজন ডাক্তার হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের অর্জনগুলো জাতির সামনে তুলে ধরা উচিত বলে আমি মনে করি।

এই সরকার তার পর পর দুটি টার্ম মিলিয়ে উন্নয়নের জন্য ‘রূপকল্প ২০২১’ সাল হয়ে মিশন ‘ইনোভেশন ২০৪১’ ছাড়িয়ে এখন পরিকল্পনার বিস্তার করে ফেলেছেন ২১০০ সাল পর্যন্ত ‘ডেল্টা প্লান ২১০০’-এর মধ্য দিয়ে। ভাবছেন এতে আপনার কী? ভাই, গড় আয়ু এখন ঠেকেছে ৭২.৮ বছরে। আপনি এবার প্রথম ভোটার হলে কম করে হলেও ৫০ বছরের উপর এই পরিকল্পনার অংশীদার তো আপনারাই। তাই আপনাদের জন্যই এ পরিকল্পনার সুফল তোলা আছে।

ইউএনডিপি ২০১৮ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২.৮-এ উন্নীত হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে মাতৃমৃত্যু হ্রাস, শিশুমৃত্যু হ্রাস, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবায় সরকারি সুবিধার উৎকর্ষ লাভকে। সীমাবদ্ধ সম্পদ ও বিপুল জনগোষ্ঠী নিয়ে এ অর্জন যে প্রশংসনীয় ব্যাপার তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সবাই স্বীকার করেন। এর প্রমাণ, স্বাস্থ্য খাতের এই অর্জনের জন্য তিনটি জাতিসংঘ পুরস্কুারসহ ১৬টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত। এর ভেতর এমডিজি অ্যাওয়ার্ড, সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির প্রণয়ন এই সরকারের এক উল্লেখযোগ্য অর্জন। ২০০০ সালে সর্বশেষ হালনাগাদকৃত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি এই সরকারের মেয়াদকালে ২০১১ সালে যুগোপযোগী করা হয়েছে। একইভাবে উল্লেখ করা যায় ওষুধ নীতির কথা। বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের কথা গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করা যায়। নিজ জনগণের চাহিদার সিংহভাগ মেটানোর পর যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৪৫টি দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে।

এ পর্যন্ত ৩২ বিলিয়ন ডলারের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে। শুধু ২০১৭ সালে ৩ হাজার ১৯৬ কোটি ১২ লাখ টাকার ওষুধ রপ্তানি হয়েছে। নিজ চোখে প্রতিদিন দেখি কত তরুণ ওষুধশিল্পে কাজ করে সম্মানজনক জীবনযাপন করছেন। বাংলাদেশর ওষুধশিল্পের মালিকদের প্রসার নিজ চোখেই তো দেখছি। রোগীদের কাছে গর্বের সঙ্গে বলি, বিদেশি ওষুধ লাগবে না, আমাদের দেশের ওষুধই অনেক ভালো।

একই ধারাবাহিকতায় জনসংখ্যানীতির উল্লেখ করতে হয়। আরও উল্লেখ করতে হয় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আমাদের সাফল্যের কথা। বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৭%। নারীপিছু গড় সন্তান জন্মদানের হার ২.০৫-এ হ্রাস পেয়েছে। নিজের ভাইবোনের সংখ্যা হিসাব করে এই অর্জনের গুরুত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব সবাই ভেবে দেখবেন আশা করি। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণ কোনো চাট্টিখানি কথা নয়। আমাদের মধ্যে অনেকেই কথায় কথায় বিদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার তুলনা করেন। তারা তখন জনসংখ্যার সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতার তুলনাটা মাথায় রাখেন না। ডাক্তার-রোগী, ডাক্তার-সেবিকা আনুপাতিক হারের বিষয়টি একবারও ভাবেন না।

আশার কথা হলো, এই সরকারের আমলে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বেড়েছে ৭ শতাংশ, যা অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। ৩ হাজার কোটি টাকার থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এ সরকারের আমলে ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১৫ হাজার ৫৯৬ জন। নতুন নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১৫ হাজার। সেবিকাদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে যেন আরও বেশিসংখ্যক মেধাবী ছাত্রছাত্রী নার্সিং পেশায় আসার জন্য উৎসাহিত হন। তরুণ চিকিৎসকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, আরও ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন।

আমি যখন ২০তম বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরিতে ঢুকেছিলাম, মনে আছে, আত্মীয়স্বজন অনেকেই বলেছিলেন, এই চাকরি করে কী লাভ! ঢুকছি মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে, বেরও নাকি হবো মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে। একাধিক ডিপিসির মাধ্যমে আজ প্রমোশনের জট খুলে গেছে।

মানসিক সুস্বাস্থ্যের গুরুত্ব আমরা ডাক্তাররা খুব ভালো বুঝি। যে কোনো রোগী সুস্থ করতে হলে তার মানসিক সুস্থতার জন্য আমাদের চিকিৎসা শিক্ষায় আমরা ‘কাউন্সেলিং’ শেখাই আমাদের ছাত্রদের। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের এই রক্ষনশীল সমাজের ভ্রান্ত আচরণের দেয়াল ভেঙে দিয়েছে এই সরকার। এ জন্য বঙ্গবন্ধুর পৌত্রী সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে ধন্যবাদ দিতে চাই। শুধু অটিজম নয়, এর সঙ্গে সঙ্গে সব ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে জাতীয় জীবনে, ভেঙে যাচ্ছে ট্যাবু, মানুষ বেরিয়ে আসছে কুসংস্কার থেকে, মুখ বন্ধ করে মানসিক রোগকে অস্বীকার করার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। আমার এক পরিচিত নারীর প্রথম সন্তান অটিস্টিক।

তিনি সরকারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এখন তার সেই সন্তানকে নিয়ে আসেন। তিনি চোখে পানি নিয়ে আমাকে বলেছিলেন, তার এই সন্তানকে যে ঘরে লুকিয়ে রাখতে হয় না, এর জন্য তিনি এই সরকারের কাছে চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকবেন। এই রকম ব্যক্তিগত পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাতের যুগান্তকারী পরিবর্তন যে কত বড় আশীর্বাদ, তা নিশ্চয়ই সবাই বুঝবেন।

এই সরকারের এক ভিশনারি পদক্ষেপ হলো কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনা। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে এই কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পটি জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার গ্রহণ করেন এবং প্রায় ১০ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়। কমিউনিটি ক্লিনিকের কনসেপ্টটি আমাদের এই দরিদ্র দেশের জন্য খুবই উপযোগী একটি উদ্যোগ। কমিউনিটির সবার অংশীদারিত্ব থাকায় এটা গরিব দেশের জন্য টেকসই একটি উদ্যোগ। প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনা চিকিৎসাসেবাকে নিয়ে যাচ্ছে তৃণমূলের প্রত্যেকের দোরগোড়ায়।

বর্তমানে ১৭ হাজার ৭৭৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু আছে। এই সুবিধা যদি দেশের মানুষকে আমরা অব্যাহতভাবে দিয়ে যেতে চাই, তবে অবশ্যই এ সরকারের শাসনের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। মনে করিয়ে দিতে চাই, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার এসে কমিউনিটি ক্লিনিকের মতো জনবান্ধব মানবিক উদ্যোগকে শুধু রাজনৈতিক রোষে বন্ধ করে দিয়েছিল। যে সমতাভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল, শহীদ চিকিৎসকরা গণমানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার যে স্বপ্ন দেখেছিলেনÑ কমিউনিটি ক্লিনিক ওই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার এক বড় মাধ্যম হয়ে উঠবে বলে বিশ্বাস করি।

অন্যদিকে বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রসারে ১০টি নতুন বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল হয়েছে। এর ভেতর বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই, রাজধানীর চানখাঁরপুলের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কথা উল্লেখ করা উচিত। ২০১৪ সালে লাগাতার সরকারবিরোধী আন্দোলনের নামে জনগণকে পেট্রলবোমা মেরে পুড়িয়ে হত্যা করে বিএনপি-জামায়ত জোট। বিশ্ব হতবাক হয়ে তা দেখেছে। হৃদয়ে প্রচ- মনঃকষ্ট নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নেন এই হাসপাতাল তৈরি করার। গড়ে তোলেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতাল। নিজের রাজনৈতিক বিরোধীদের দেশের মানুষবিরোধী নির্মম এই আগুনসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কী অভূতপূর্ব মানবিক এই প্রতিকার বঙ্গবন্ধুকন্যার! সত্যিই শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হওয়ার মতোই বিষয়।

চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে সরকারি হাসপাতালে নতুন ১০ হাজার ৯৮৩ শয্যা বাড়ানো হয়েছে। রাজধানীতে ৪টি নতুন জেনারেল হাসপাতাল চালু করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ৩০টি বিভিন্ন ধরনের হাসপাতাল নির্মিত হয়েছে, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও ২০৮টি নতুন হাসপাতাল নির্মিত হয়েছে, যা চিকিৎসাসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণে সাহায্য করবে। ২৪টি নতুন মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করা হয়েছে, যা নিশ্চিতভাবেই দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার চাহিদা মেটাতে সাহায্য করবে। এর পাশাপাশি মেডিক্যাল শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে ‘ওভারসাইট কমিটি গঠিত হয়েছে। এটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে চিকিৎসক-শিক্ষক হিসেবে মনে করি।

ডিজিটাল বাংলাদেশের ডিজিটালাইজেশনের উন্নয়ন স্বাস্থ্য খাতকেও উন্নত করছে। সব হাসপাতালে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ই-গভর্ন্যান্স ও ই-টেন্ডারিং চালু করা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোকে অটোমেশনের আওতাধীন করা হচ্ছে। গোপালগঞ্জের শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল কেন্দ্র করে অনলাইন চক্ষুসেবা কার্যক্রম চালু করতে ‘ভিশন সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। অনলাইনে মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ভর্তি প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। ১৬২৬৩ নম্বর ব্যবহারের মাধ্যমে মোবাইল ফোনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত তথ্য প্রদান চালু হয়েছে। এই সেবার মাধ্যমে দেশের যে কোনো প্রান্তে অ্যাম্বুলেন্স সেবাও পাওয়া যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ৩২ লাখ সেবা প্রহণ হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতের একটি খবর আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুব সুখী করেছে। সম্প্রতি অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য চিকিৎসাপ্রাপ্তি সহজলভ্য করতে শেখ হাসিনা হেলথ কার্ড বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে টাঙ্গাইলের কিছু জায়গায় এই কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। ৫০টি রোগের চিকিৎসার খরচ এই কার্ডের মাধ্যমে বহন করা হবে। পর্যায়ক্রমে তা সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এমন কথাগুলো যখন পড়ি, এই কর্মসূচিগুলো যখন দেখিÑ তখন আশায় বুক ভরে যায়। একদিকে অতিদরিদ্র ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমছে। অন্যদিকে তাদের প্রতি সেবার হাত প্রসারিত হচ্ছে। আশা করি, একদিন বঙ্গবন্ধুকন্যার হাত ধরে এ দেশের সব মানুষ সব চিকিৎসাসেবা পাবে। কোনো মানুষ অর্থের অভাবে চিকিৎসাবঞ্চিত হবে না। বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবা পৌঁছে যাবে দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায়। এটিই তো ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, সব শহীদের স্বপ্ন।

ডা. নুজহাত চৌধুরী : সহযোগী অধ্যাপক (চক্ষু)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে