জঙ্গিবাদের থাবায় তছনছ সাজানো সংসার

  হাবিব রহমান

২৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০ | আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

পেশায় ব্যাংক কর্মকর্তা ছিলেন তানভীর কাদেরী। তার স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করতেন। যমজ দুই সন্তান পড়তেন ঢাকার একটি ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে। হাসি-আনন্দে মেতে থাকা পরিবারটিতে হঠাৎ নেমে আসে বিপর্যয়। জঙ্গিবাদের কালো থাবা ছিন্নভিন্ন করে ফেলে পরিবারটিকে। গত ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরের জঙ্গি আস্তানায় পুলিশি অভিযানকালে আত্মহত্যা করেন তানভীর। এক সন্তান নিয়ে স্ত্রী ফাতেমার ঠাঁই হয় কারাগারে। সবশেষ গতকাল রাজধানীর দক্ষিণখানের আশকোনায় পুলিশের জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হয় তানভীর কাদেরীর আরেক ছেলে আফিফ কাদেরী।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল ভোররাতে দণিখানের পূর্ব আশকোনায় ‘সূর্যভিলা’ নামের তিনতলা ভবনে অভিযান শুরু করে পুলিশ। প্রায় ১৬ ঘণ্টার অভিযানে জঙ্গিনেতা তানভীর কাদেরীর ছেলে আফিফ কাদেরীসহ দুই জঙ্গি নিহত হন। চারজন আত্মসমর্পণ করেন।

পারিবারিক সূত্র জানায়, তানভীরের বাড়ি গাইবান্ধার বাটিকামারি গ্রামে। তার বাবার নাম এসএম বাতেন কাদেরী। ১৯৯৪ সালে গাইবান্ধা সরকারি বালক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৯৬ সালে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। ঢাকা কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে পরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন কাদেরী। তার স্ত্রী ফাতেমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে লেখাপড়া শেষ করেন। পরে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনে চাকরি নেন। এ প্রতিষ্ঠানে লাখ টাকার ওপরে বেতন পেতেন ফাতেমা।

পুলিশ জানায়, সবশেষ ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং শাখায় উচ্চ পদে যোগ দিয়েছিলেন তানভীর কাদেরী। এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। বছর দুই আগে হজ পালনে সৌদি আরব গিয়ে দেশে ফিরেই চাকরি ছেড়ে ২০১৪ সালে ‘আল সাকিনা হোম ডেলিভারি সার্ভিস’ নামে একটি ব্যবসা শুরু করেন। মূলত হজ থেকে ফেরার পরই পরিবারটির সদস্যদের আচার-আচরণে পরিবর্তন দেখতে পান আত্মীয়-স্বজন। পুলিশের ধারণা, তানভীরের সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যরাও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েন। এমনকি দুটি শিশুসন্তানেরও মগজধোলাই করা হয়।

তানভীরের পারিবারিক সূত্র জানায়, এই দম্পতির দুই সন্তান আফিফ কাদেরী ও তাহরীম কাদেরী রাজধানীর মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ছাত্র ছিল। তানভীর কাদেরী জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার পর গত এপ্রিলে হিজরত করে পল্লবীর মিল্কভিটা রোডের একটি জঙ্গি আস্তানায় গিয়ে ওঠে। এর আগেই দুই ছেলের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেন তানভীর। ছেলেরা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি স্বজনদের বলতেন, এত পড়াশোনা করে লাভ নেই।

গত ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকার আজিমপুরের একটি বাসায় পুলিশের অভিযানের সময় নিহত হন তানভীর। এ সময় ওই বাসা থেকে আহত অবস্থায় অপর দুই নারীর সঙ্গে তার স্ত্রী ফাতেমা এবং ১৪ বছরের সন্তান তাহরীম কাদেরীকে আটক করা হয়। তাহরীম বর্তমানে গাজীপুরের কিশোর সংশোধনাগারে রয়েছে। আর ফাতেমা রয়েছেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখানে কেঁদে কেঁদে সময় পার করছেন তিনি।

কারাসূত্র জানিয়েছে, ফাতেমা এখন প্রায়ই বলেনÑ জঙ্গিবাদের ভুলপথে চলে তার সাজানো সংসার ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। স্বামী হারিয়েছেন; দুই ছেলেরও ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

গতকালের অভিযানে নিহত তানভীর কাদেরীর ছেলে কিশোরপুত্র আফিফ কাদেরীকে জঙ্গি আস্তানায় রেখে পুরোপুরি জঙ্গিবাদে দিক্ষা দেওয়া হয়েছিল বলে জানায় পুলিশ।

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে