ভ্যাট আইন ছড়াচ্ছে অসন্তোষ উদ্বিগ্ন ভোক্তা-ব্যবসায়ী

  রুমানা রাখি

২০ মে ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২০ মে ২০১৭, ০০:২৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হচ্ছে নতুন ভ্যাট আইন। এই আইন কার্যকর হলে অনেক খাতেই নির্ধারিত হরে ভ্যাট দিতে হবে। যদিও এই হার এখনও চূড়ান্ত হয়নি, তবে আইনে আছে ১৫ শতাংশ। ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের চাপে এই হার আরও কিছুটা কমে আসতে পারে। তবে সেটি ১০ বা ১২ শতাংশের মধ্যেই থাকতে পারে বলে জানা জানা গেছে। আইনটি কার্যকর হলে প্রায় সব খাতেই ভ্যাট দিতে হবে। এতে পণ্যের দাম বাড়বে; বেড়ে যাবে ভোক্তাদের জীবনযাত্রার মানও। পণ্যের দাম বাড়লে ভোক্তারা পণ্য কম কেনেন। তখন ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন। এ কারণে ভ্যাট আইনের কারণে উদ্বিগ্ন ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন ভ্যাট আইনের প্রয়োগ আরও পিছিয়ে দিতে। সরকার এতে কোনোক্রমেই রাজি নয়। আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার।

এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। এই অবস্থায় নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করা হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ওপর। এ ছাড়া ভোক্তারা সরকারকে দেওয়ার জন্য যে পরিমাণে ভ্যাট দিচ্ছে ব্যবসায়ীদের কাছে, সে পরিমাণে ভ্যাট সরকারের কোষাগারে যাচ্ছে না। এগুলো সরকারের হিসাবে নেওয়ার সক্ষমতাও নেই প্রশাসনযন্ত্রের। ফলে ভোক্তাদের দেওয়া ভ্যাটের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ী ও ভ্যাট কর্মকর্তাদের পকেটে।

নতুন আইনে ভ্যাটের হার প্রায় সব খাতে ১৫ শতাংশ আরোপের কথা বলা হয়েছে। এর ফলে প্রায় সব খাতেই পণ্যের দাম বাড়বে। বর্তমানেও নির্দিষ্ট কিছু খাতে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপিত রয়েছে। তবে এই হার মূল্য সংযোজনের ওপর নেওয়া হয়। অর্থাৎ যেখানে যে পরিমাণে মূল্য সংযোজন হয়, সেখানে সে হারে ভ্যাট নেওয়া হয়। এর ফলে বিভিন্ন পর্যায়ে সর্বনিম্ন দেড় শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট রয়েছে। এ ছাড়া আরও কিছু খাতে আড়াই, সাড়ে ৪, ৫, বা ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপিত রয়েছে। এগুলো ১৫ শতাংশ হয়ে গেলে পণ্যের দাম বেড়ে ভোক্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সূত্র জানায়, নতুন ভ্যাট আইন কার্যকরের ফলে যেসব পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে মূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে; ভোক্তাদের স্বস্তি দিতেই সেসব খাতে ১০ বা ১২ শতাংশ ভ্যাট আরোপের বিষয়টি এখন বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে ভ্যাটের হার কমলেও ভোগান্তি কমছে না মানুষের। ভ্যাটের হার দুই সংখ্যার মধ্যে আবদ্ধ থাকলে দেশি ব্র্যান্ডের কাপড়চোপড়, ভোজ্যতেল, চিনি, সুপার শপ, নির্মাণসামগ্রীর রড, বিদ্যুৎ বিল, সোনার গয়না ইত্যাদি ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি হারে ভ্যাট দিতে হবে। ফলে এগুলোর দাম বাড়বে।

আগে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁ সেবার বিনিময়ে ভ্যাট দিতে হতো ১৫ শতাংশ। তবে পাড়া-মহল্লায় এমন শত শত রেস্তোরাঁ আছে, যেগুলো শীতাতপনিয়ন্ত্রণ নয়। মধ্যবর্তী ও নিম্ন-মধ্যবর্তীদের জন্য এসব রেস্তোরাঁ। এসব রেস্তোরাঁয় খাবারের বিলের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট ছিল আগে। তবে ১ জুলাইয়ের খাবারের এসব রেস্তোরাঁর ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। তাতে ৫০০ টাকার খাবার কিনলে ভ্যাট দিতে হতো ৭৫ টাকা। তবে নতুন আইনে ভ্যাট আইনে যদি হার কমিয়ে ১০ শতাংশ হয়, তবে ৫০০ টাকা খেলে অতিরিক্ত ভ্যাট দিতে হবে ৫০ টাকা। আর ভ্যাট যদি ১২ শতাংশ হয়, তবে ভ্যাট দিতে হবে ৬০ টাকা। যেখানে আগে দিতে হতো মাত্র ৩৫ টাকা।

নতুন আইনে ভ্যাট ফেরত দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সব খাতে ভ্যাট দিতে ১৫ শতাংশ হারে একই পণ্যে গড়ে যখন দেখা যাবে ১৫ শতাংশের বেশি ভ্যাট দেওয়া হয়েছে, তখন বাড়তি ভ্যাটের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। এই হিসাব পদ্ধতিটি এতটাই জটিল যে, অনেকেই এ সম্পর্কে জানেন না। এ ছাড়া সরকারের হিসাবে একবার টাকা গেলে সেটি ফেরত পাওয়া অনেক কঠিন। এসব কারণে এই সুবিধা নেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

এদিকে এনবিআর কর্মকর্তা বলছেন, নতুন আইন চালু হলে ভ্যাটের হার বাড়বে না, বরং কমবে। কেননা এতে ভ্যাট ফেরত দেওয়ার বিধান রয়েছে। তারা বলছেন, নতুন আইন অনুযায়ী সঠিকভাবে হিসাব রেখে ব্যবসায়ীরা রেয়াত নিলে জীবনযাত্রার মানে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

নতুন ভ্যাট আইন সাধারণ ভোক্তাদের জন্য অতিরিক্ত চাপ বলে মনে করেন নিউমার্কেট এলাকার ফুড ভিলেজ রেস্তোরাঁর মালিক মাঈনুল হাসান হিমেল। তিনি বলেন, বড় রেস্তোরাঁয় আগেই ১৫ শতাংশ ভ্যাট ছিল। তবে অনেক মালিক ভ্যাট পরিশোধ করতেন না। নতুন আইনে মালিকদের দায়বদ্ধতা বাড়বে। তবে মধ্যবত্তি ও নিম্ন-মধ্যবর্তীদের জন্য যেসব রেস্তোরাঁ আছে তাতে এই ভ্যাট অমূলক প্রেশার তৈরি করবে।

একই ভাবে আড়ং, দেশি দশ, প্রবর্তনা, সাদাকালো, কে ক্রাফট, বাংলার মেলা, ঐতিহ্যÑ এসব তৈরি পোশাকের নামকরা দেশি ব্র্যান্ডসহ বিদেশি ব্র্যান্ডের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত শোরুমে সেবা প্রদানের জন্য ক্রেতারা যত টাকার পণ্য কেনেন, তাতে ৪ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। অর্থাৎ ১ হাজার টাকার কাপড় কিনলে ভ্যাট দিতে হতো মাত্র ৪০ টাকা। তবে নতুন হিসাবে সেটা বেড়ে ১৫০ টাকা হবে। একই সাথে যদি হার কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয় তবে ক্রেতাকে গুনতে হবে ১০০ টাকা; আর ১২ শতাংশ করলে দিতে হবে ১২০ টাকা হারে ভ্যাট, যা মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য অতিরিক্ত চাপ হবে বলে মনে করেন বিক্রেতারা।

এ বিষয়ে দেশি ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতির সভাপতি ও সাদাকালোর কর্ণধার আজহারুল হক বলেন, ১৫ শতাংশ ভ্যাটে দেশি পোশাক কেনার আগ্রহ হারাবে ক্রেতা। তাছাড়া কাপড় তৈরি করা পর্যন্ত প্রতি স্তরেই এই ভ্যাট দিতে হবে ব্যবসায়ীদের। যেমনÑ তাঁতিকে সুতা-রং কিনতে অতিরিক্ত ভ্যাট দিতে হবে। বিনিময়ে তারা ভ্যাট সম্পর্কে অভিজ্ঞ না হওয়ায় ভ্যাট চালান দিতে পারবেন না। আবার ওই তাঁতি উপকরণ রেয়াতও নিতে পারবেন না। কারণ ওই তাঁতি যখন সুতা-রং কেনেন তখন তো রসিদ পান না। এ কারণে অতিরিক্ত খরচ তৈরি হবে তাঁতিদের, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়বে আর দাম বাড়বে দেশি কাপড়ের।

আসবাবপত্র ছাড়া ব্যক্তির জীবনধারণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নতুন ভ্যাট আইনে আসবাবপত্রের বিপণন কেন্দ্রগুলোর দাম বাড়বে। আগে যেখানে ৩০০ টাকার একটি আসবাবপত্র কিনতে অতিরিক্ত ভ্যাট দিতে হতো ৪ শতাংশ অর্থাৎ ১২ টাকা, সেখানে নতুন আইনে দিতে হবে ৪৫ টাকা। আর যদি ভ্যাট ১০ শাতংশ হয় তবে দিতে হবে ৩০ টাকা, আর ১২ শতাংশ হলে দিতে হবে ৩৬ টাকা, যা আগের অঙ্কের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।

একই ভাবে তেল ছাড়া রান্না করার কথা তো চিন্তা করা যায় না। নতুন ভ্যাট আইনটি ছুঁয়ে যাবে এই ভোজ্যতেলকেও। এখন সয়াবিন তেল ও পামঅয়েল আমদানিতে কোনো মূসক দিতে হয় না। ১ জুলাই থেকে ১৫ শতাংশ মূসক দিতে হবে। এতে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের আগেই বন্দর থেকে বেরোনোর আগেই ১৫ শতাংশ মূল্য বেড়ে যাবে। ভোক্তার কাছে আসা পর্যন্ত কয়েক স্তরে দাম বাড়বে ভোজ্যতেলের। শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকে বেশি দামেই ভোজ্যতেল কিনতে হবে।

গত বছর দুই দফায় বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে, যা ভোক্তাদের জন্য অতিরিক্ত চাপের তৈরি করেছে। আগের ভ্যাট আইনে বিদ্যুৎ বিলের ওপর এখন ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয়। নতুন আইনে তা বেড়ে তিনগুণ হবে। এর মানে হলো বিদ্যুৎ বিল ১০০ টাকা হলে ভ্যাট ১০৫ টাকা পরিশোধ করতে হয়। নতুন আইনে দিতে হবে ১৪৫ টাকা। ১০ বা ১২ শতাংশ হারে ভ্যাট নেওয়া হলেও তা ভোক্তাদের জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে।

অন্যদিকে রডসহ ইস্পাতসামগ্রীর ওপর ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে ভ্যাট ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। বর্তমানে প্রতিটন রডের জন্য ৯০০ টাকা ভ্যাট প্রযোজ্য রয়েছে। কিন্তু নতুন আইনে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট কার্যকর হলে তা বেড়ে সাড়ে ৭ হাজার টাকা হতে পারে। ফলে অবকাঠামো নির্মাণসহ সব ধরনের নির্মাণকাজের ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ে চার শতাংশ হারে অগ্রিম ভ্যাট (এটিভি) রয়েছে। পরবর্তীতে হিসাবপত্র দাখিল করে কেউ চাইলে ওই ভ্যাট সমন্বয় করার সুযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, নতুন ভ্যাট আইন ভোক্তাদের জন্য চাপ তৈরি করবে। রেয়াত সুবিধা ব্যবসায়ীরা পেলেও ক্রেতা অবধি পণ্য আসতে দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। এর জন্য বাড়তি টাকা দিতে হবে ভোক্তাদের। এতে মূল্যস্ফীতি হবে। তাই রেয়াতি হারে মূসক রাখার কোনো কারণই নেই। একই সাথে সব ক্ষেত্রেই এক হার হতে হবে। তবে ১৫ শতাংশ মূসক একটু বেশিই। এটা ১০ শতাংশ করা উচিত।

তবে আইনে মৌলিক খাদ্য, নির্ধারিত জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, গণপরিবহন সেবা, গণস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, কৃষি, মৎস্য চাষ, দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অবাণিজ্যিক কার্যক্রম, অলাভজনক সাংস্কৃতিক সেবাÑ এসব ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বাকি সব ক্ষেত্রেই আমদানি বা উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রি পর্যায়ে ভ্যাট বসবে।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের নবনির্বাচিত সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, গত এবং চলতি অর্থবছরে এরই মধ্যে অনেক পণ্যে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট নির্ধারণ করা আছে। একই সঙ্গে অন্য হারেও ভ্যাট আদায় হচ্ছে। ভবিষ্যতে সব পণ্যে ১৫ শতাংশ হারে অভিন্ন ভ্যাট চাই না। আমরা কিছু পণ্য ও খাতে হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট নির্ধারণ এবং কিছু পণ্য ও খাতে ভ্যাট এক্সেম্পশন (অব্যাহতি) চাই। আমরা রেয়াতের বিষয়ে নিশ্চয়তা চাই।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে