তদন্তের নামে মিথ্যাচার

  ইকবাল খন্দকার

১২ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১২ আগস্ট ২০১৭, ০০:১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটা সময় ছিল, যখন তদন্ত শব্দটা শুনলেই আমরা নড়েচড়ে বসতাম। রাজ্যের কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করতাম বিশেষ কিছু শোনার জন্য, জানার জন্য। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা নেই। এখন তদন্ত শব্দটা আমাদের মধ্যে তেমন কোনো কৌতূহল জাগায় না। বরং কোনো ব্যাপারে তদন্ত শুরু হয়েছে শুনলেই আমাদের দন্ত বের হয়ে যায়। ঠাট্টা করে বলিÑ তদন্ত কমিটিতে যারা আছে, তাদের খুঁজে বের করার জন্য কদিন পর আরেকটা তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। আমাদের ঠাট্টা যখন সত্যি হয় না, মানে তদন্ত কমিটির সদস্যরা যখন হারিয়ে যান না বরং তদন্তকাজটা সমাধা করে একটা রিপোর্ট তৈরি করতে সক্ষম হন, তখনো আমরা কৌতূহলবোধ করি না। কারণ আমরা শতভাগ নিশ্চিত থাকি, তদন্তটা কোনো না কোনোভাবে, কারো না কারো মাধ্যমে অবশ্যই প্রভাবিত হয়েছে। রিপোর্ট প্রকাশের পর দেখা যায় আমরা যা ভেবেছিলাম, তাই হয়েছে। তদন্তের প্রতি এই যে আমাদের আস্থাহীনতা, এটি দিন দিন কেবল বেড়েই চলেছে। অকারণে বাড়ছে না। একেকটা ঘটনা ঘটছে আর একটু একটু করে কমছে। এসব ঘটনার সঙ্গে নতুন করে যোগ হলো মিয়ানমারের ঘটনাটি। জাতিসংঘ অভিযোগ করেছিল, রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন করে তাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করার অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার এ অভিযোগ মেনে নেয়নি। বরং তদন্ত কমিটি গঠন করে সত্যিই রোহিঙ্গারা নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার কিনা, এটা খতিয়ে দেখার জন্য। দীর্ঘ আট মাস ধরে তদন্ত করে তারা। তদন্ত শেষে গত রবিবার ইয়াঙ্গুনে সাংবাদিকদের কাছে তদন্ত দলের প্রধান ও মিয়ানমারের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট মিন্ট সিউ দাবি করেন, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন হয়নি। সরকার পক্ষের তদন্ত দলের কাছ থেকে কী ধরনের রিপোর্ট পাওয়া যেতে পারে, এই ধারণা কমবেশি সবারই ছিল। তবু এক-আধটু আশা হয়তো কেউ কেউ জিইয়ে রেখেছিলেনÑ যদি সঠিক তথ্যটা বের হয়ে আসে! কিন্তু সেই আশার গুড়ে কড়কড়ে বালি পড়ল। আরও একবার প্রমাণিত হলো, তদন্ত মানেই প্রহসন, তদন্ত মানেই মিথ্যাচার। কখনো বেশি, কখনো কম। রোহিঙ্গাদের ওপর কতটা অমানবিক নির্যাতন চলেছে, সেটা মিয়ানমার সরকার না জানলেও অথবা জেনেও না জানার ভান করলেও বিশে^র হৃদয়বান মানুষদের জানার বাকি নেই। তবে কে জানল, কে জানল না সেসবের তোয়াক্কা না করে মিয়ানমার সরকার যদি বড় গলায় বলতÑ আমার দেশের মানুষের ওপর আমি যা খুশি চালাব, তাতে কার বাপের কী! আমাদের কিছু বলার বা করার ছিল না। তা হলে কেন আট মাস ধরে কষ্ট করে তদন্তটা চালানো হলো, ঠিক বোঝা গেল না। ব্যাপারটা আমাদের সামনে পুরনো সেই প্রবাদকেই জীবন্ত করে তোলেÑ সালিশ মানি, তালগাছ আমার। অর্থাৎ তদন্ত করতে সমস্যা নেই, তবে ফলাফল সেই একটাই থাকবেÑ আমরা নির্দোষ। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট মিন্ট সিউ নিজেদের ‘নির্দোষ’ বলেই ক্ষান্ত হননি। আরও কিছু মূল্যবান কথাও বলেছেন। সেই মূল্যবান কথার সারমর্ম এমনÑ বিদ্রোহীরা অর্থাৎ রোহিঙ্গারাই উল্টো সহিংস কর্মকা- চালিয়েছে। এটাকেই বোধহয় বলেÑ চুরি তো চুরি আবার সিনা জুরি। সিনা জুরির এখানেই শেষ নয়। তিনি বলেনÑ রোহিঙ্গারা যদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের মুখে পড়ত, তা হলে অভিযোগ জানানোর জন্য আমরা যে আদালতের দরজা খোলা রেখেছিলাম, সেখানে অবশ্যই অভিযোগ জানাতে আসত। কিন্তু এ পর্যন্ত কেউ অভিযোগ জানাতে আসেনি। খুবই চমৎকার যুক্তি। এই যুক্তি শুনে মনে পড়ে গেল আমাদের এলাকায় ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার কথা। ঘটনাটা ছাগল নিয়ে। বর্তমান সময়ে ছাগল নিয়ে যে দেশজুড়ে তোলপাড় হচ্ছে, এর সঙ্গে আবার এই ঘটনার ছাগলকে কেউ মেলাতে যাবেন না যেন। অবশ্য ঘটনার ছাগলটার বরাত খুব মন্দ ছিল। কে বা কারা যেন এটাকে জবাই করে খেয়ে ফেলেছিল। কিন্তু কে খেয়েছিল, এটা বের করতে না পারলে যেহেতু বিচার চাওয়া যাবে না, তাই ছাগলের মালিক ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু করল তদন্ত। তার তদন্তটা গতানুগতিক তদন্তের মতো কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়নি বলে প্রকৃত অপরাধীর নাম বেরিয়ে এলো। ছাগলের মালিক গেল চেয়ারম্যানের কাছে। বলল, আপনার ছেলেই আমার ছাগল খেয়েছে। চেয়ারম্যান বললেনÑ শনিবার দিন অপরাধীর বিচার হবে। আমার ছেলে বলে আমি একচুলও ছাড় দেব না। চেয়ারম্যানের কথা শুনে ছাগলের মালিক তো বটেই, পুরো এলাকার লোক খুশিতে গদগদ হয়ে গেল। বলতে লাগলÑ দেখো, ন্যায়বিচারক কাকে বলে। নিজের ছেলের ব্যাপারে ছাড় নেই। অনেক অপেক্ষার পর এলো সেই কাক্সিক্ষত শনিবার। লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল প্রাইমারি স্কুলের মাঠ। চেয়ারম্যান এলেন। কিন্তু যে লোকটার অভিযোগের ভিত্তিতে এত বিশাল আয়োজন, সেই ছাগল মালিককেই কোথাও দেখা গেল না। দীর্ঘসময় ধরে অপেক্ষা করা হলো তার জন্য। সে এলোই না। এবার চেয়ারম্যানের চামচারা বলতে লাগলÑ সে মনে হয় ভুল করে আপনার ছেলের নামে অভিযোগ করেছিল। এখন নিশ্চয়ই ভুল বুঝতে পেরেছে, বুঝতে পেরেছে আপনার ছেলে নয়, বরং এই ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত, তাই আসছে না। সবাই যে যার বাড়িতে চলে গেল। সপ্তাহদুয়েক পর চেয়ারম্যানের সঙ্গে ছাগল মালিকের দেখা। চেয়ারম্যান জিজ্ঞেস করলেনÑ ওইদিন এলে না কেন? নিশ্চয়ই কাজটা আমার ছেলে করেনি, অন্য কেউ করেছিল, তাই আসোনি। ঠিক? মালিক বললÑ জি না চেয়ারম্যান সাব। আমি পা নিয়ে হাঁটতে পারছিলাম না, তাই আসতে পারিনি। চেয়ারম্যান জিজ্ঞেস করলেনÑ কী হয়েছিল তোমার পায়ে? মালিক বললÑ আমি যাতে সালিশে যেতে না পারি, এ জন্য আপনার ছেলের লোকজন আমাকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে ঘরের ভেতর বেঁধে রেখেছিল। পাঠক, সপ্তাহদুয়েক পরে হলেও জানা গিয়েছিল ছাগল মালিক কেন সালিশে আসেনি। কিন্তু রোহিঙ্গারা কেন সরকারের বসানো অভিযোগকেন্দ্রে অভিযোগ করতে আসেনি, সেটা কখনই জানা যাবে না। কারণ সেই চেয়ারম্যান ন্যায়পরায়ণ হলেও মিয়ানমার সরকারের কেউই ন্যায়পরায়ণতার ধারে-কাছেও নেই। ক্ষমতাসীন দল এনএলডির প্রধান অং সান সু চিকে নিয়ে আমরা কত আশাই না করেছিলাম। কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিয়ে তিনি যেসব কথা বলেছেন বা বলছেন, এসব কথা প্রমাণ করেÑ সব শিয়ালের এক ডাক। অথচ তিনি চাইলেই রোহিঙ্গাদের জন্য এমন কিছু করতে পারতেন, যা রোহিঙ্গাদের জন্য হতে পারত আশীর্বাদস্বরূপ, আর তার নিজের জন্যও হতে পারত বিশে^র মানুষের মনে পাকা আসন গেড়ে নেওয়ার উপলক্ষ। মিয়ানমারে মানবতা ব্যাপক হারে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, এটা বোঝার জন্য প্রতিষ্ঠিত মানবতাবাদী হওয়ার দরকার নেই। যার ন্যূনতম বোধশক্তি আছে, সে-ই এটা উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু সু চি কিংবা মিয়ানমারের তদন্ত দল, কারো উপলব্ধিতেই কোনোকিছু ধরা পড়ছে না। তার মানে তাদের বোধশক্তিও সুস্থ নেই, চোখও সুস্থ নেই। এ অবস্থায় বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে থাকা ছাড়া অবশ্য কিছু করার থাকে না। আমরাও বিস্মিত, হতভম্ব। যদি আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণ নেই, তবু আমরা আশা করতে চাই সু চিসহ মিয়ানমার সরকারের কর্তাব্যক্তিদের বিবেক জাগ্রত হবে। যে অন্ধরা আট মাস ধরে তদন্তকাজে নিয়োজিত ছিল, তারা তাদের চোখের আলো ফিরে পাবে। আবার শুরু হবে তদন্ত। প্রমাণিত হবে অসহায় রোহিঙ্গারা কতটা নির্মমতার শিকার। তার পর বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে নির্যাতনকারীদের। বিশ^বাসী অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখবে কতটা কঠিন হতে পারে মানুষের ওপর নির্যাতনের বিচার। মুখে মুখে তখন ছড়িয়ে পড়বে এই অমীয় বাণীÑ

‘সবার উপরে মানুষ সত্য

তাহার উপরে নাই।’

য় ইকবাল খন্দকার : কথাসাহিত্যিক ও টিভি উপস্থাপক

iqbalkhondokar@yahoo.com

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে