মুক্তামণির হাতে সফল অস্ত্রোপচার

তিন কেজি মাংসপিণ্ড অপসারণ

  দুলাল হোসেন ও আমিনুল ইসলাম

১৩ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ০০:১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিরল রোগে আক্রান্ত শিশু মুক্তামণির হাতে গতকাল দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। বড় ধরনের সফল এই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার হাত থেকে অপসারণ করা হয়েছে প্রায় তিন কেজি মাংসপি-। বর্তমানে শিশুটিকে রাখা হয়েছে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ)। তবে এখনো সে শঙ্কামুক্ত নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অবৈতনিক উপদেষ্টা ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, মুক্তামণির অস্ত্রোপচার সফল হলেও এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না হওয়ায় তার ফুসফুস ও লিভারে সমস্যা রয়েছে। তাই এখন এগুলোর চিকিৎসা করতে হবে।

এদিকে অস্ত্রোপচারটি সফল হওয়ায় চিকিৎসকদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, আমি গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি মুক্তামণির শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। সব কিছু অবহিত করার পর প্রধানমন্ত্রী আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, মুক্তামণির হাত রাখা যাবে কিনা। আমি ওনাকে জানিয়েছিলাম, আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে। আজ (শনিবার) অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের পরিচালক ডা. জুলফিকার আলী লেনিন বিষয়টি শেখ হাসিনাকে ফোনে অবহিত করেন। তখন প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত খুশি হয়ে একটি মেসেজের মাধ্যমে অস্ত্রোপচারের সঙ্গে যুক্ত সব চিকিৎসকে ধন্যবাদ জানান। চিকিৎসকদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও।

মুক্তামণিকে ১২ জুলাই ঢামেক হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তার রোগটিকে বিরল রোগ বলা হলেও বায়োপসির পর ধরা পড়ে, তার রক্তনালিতে টিউমার হয়েছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে যাকে হেমানজিওমা বলা হয়ে থাকে। মেয়েটিকে এ রোগ থেকে পরিত্রাণ দিতে গতকাল অস্ত্রোপচার করা হয়। ঢামেক হাসপাতালের ২০ সদস্যের একটি চিকিৎসক দল এতে অংশ নেন। প্রায় দুই ঘণ্টায় তার হাত থেকে প্রায় তিন কেজি পরিমাণ মাংসপি- অপসারণ করেন তারা। পরীক্ষার জন্য সেগুলো পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।

এর পরই পুরো প্রক্রিয়াটি তুলে ধরে এক সংবাদ সম্মেলন করেন চিকিৎসকরা। এতে ডা. সামন্ত লাল সেন ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ঢামেক হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের পরিচালক ডা. জুলফিকার আলী লেনিন প্রমুখ। ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা ধরে চলে তার হাতের অস্ত্রোপচার, যেটি সফল হয়েছে। মুক্তামণি এখন ভালো আছে। তার হাতের ডিজিজ (পোরশন রোগাক্রান্ত অংশ) অপসারণ করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। অস্ত্রোপচারে পর তার জ্ঞানও ফিরেছে; সে কথা বলেছে। এ সাফল্য আমাদের একার নয়; বার্ন ইউনিটসহ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের (এনআইসিভিডি) সমন্বিত সফলতা এটি। আশা করছি তার হাত ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তবে প্রাথমিক সাফল্য পেলেও এখানেই শেষ নয়। তাকে আরও অন্তত ছয়টি অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে।

মুক্তামণি আবার এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে কিনাÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা তার হাতের মাংসপি-ের বেশিরভাগ অংশই ফেলে দিয়েছি। আপনারাও জানেন ওর শরীরের বেশ কিছু অংশে রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। সেগুলো আমরা রিমুভ করব। তবে এটুকু বলতে পারি, হাতের যে অংশ থেকে মাংসপি- ফেলে দিয়েছি, সেখানে আর এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

মেয়েটি এখন কেমন আছেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে বার্ন ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম বলেন, আমরা যতটা প্রত্যাশা করেছিলাম, সে তার চেয়েও ভালো আছে। তবে ঝুঁকিমুক্ত নয়। অন্তত ৫ থেকে ৬ সপ্তাহ অবজারভেশনে থাকবে। কারণ অস্ত্রোপচারের পর তার হাতে রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা রয়েছে।

পরবর্তী অস্ত্রোপচারের বিষয়ে তিনি বলেন, একেকজন মানুষের শরীরের মেকানিজম একেক রকম। ওর একটা অপারেশন হয়েছে। শরীরের কিছু ডিঅ্যারেঞ্জমেন্ট আছে। তার শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী অস্ত্রোপচারের বিষয়টি।

এ সময় ডা. জুলফিকার আলী লেনিন বলেন, মুক্তামণির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী সব সময় খোঁজখবর রেখেছেন। তিনি আজকের বিষয়ও সব কিছু জানেন। আমাদের দিক থেকে মেয়েটিকে যত দিন প্রয়োজন হবে, তত দিন সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।

১২ বছর বয়সী মুক্তামণির চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই। প্রয়োজন হলে তাকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। এর পরই ডা. সামন্ত লাল সেন সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখানকার চিকিৎসকরা কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দেন। সেগুলোর রিপোর্ট দেখে হাসপাতালটির চিকিৎসকরা মুক্তার চিকিৎসা দিতে রাজি হননি। এর পরই দায়িত্বরত চিকিৎসকরা শিশুটির হাত থেকে বায়োপসির জন্য মাংসপি- কেটে নেন, যা পরীক্ষার পর গত ৭ আগস্ট রাতে রিপোর্ট আসে। এ নিয়ে পরদিন ১৩ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড বৈঠকে বসে। সেখানেই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত হয়।

মুক্তামণির বাড়ি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কামারবায়সা গ্রামে। ইব্রাহীম হোসেনের দুই যমজ সন্তানের মধ্যে হীরামণি বড় ও মুক্তামণি ছোট। জন্মের প্রথম দেড় বছর ভালোই ছিল তারা। এর পর মুক্তার ডান হাতে একটি ছোট মার্বেলের মতো গোটা দেখা দেয়, যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এক সময় আক্রান্ত ডান হাত তার দেহের সব অঙ্গের চেয়েও ভারী হয়ে ওঠে। তার এ অবস্থার খবর গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর গত ১১ জুলাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে