ঈদযাত্রায় দুর্ভোগের শঙ্কা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৩ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ০০:১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদযাত্রায় মহাসড়কে চরম দুর্ভোগের আশঙ্কা করা হচ্ছে। একদিকে বৃষ্টির কারণে ভালো রাস্তা বেহাল, অন্যদিকে নিম্নমানের সংস্কারের খোলস বেরিয়ে আসছে। অথচ সামনে কোরবানির ঈদ। চলবে পশুবাহী পরিবহন। যদিও ঈদের ৭ দিন আগে দেশের সব মহাসড়ক যান চলাচলের উপযোগী করতে নির্দেশ দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। কিন্তু দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই রাস্তার অবস্থা সঙ্গিন হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে রাস্তার অবস্থা এতটা খারাপ যে, বাস আজ ঢাকা থেকে ছাড়লে ওই বাস আগামীকাল ঢাকায় ফেরে। খানাখন্দের কারণে গর্তে পড়ে বিকল হচ্ছে দামি বাস। ফলে অনেকে গাড়ি বের করছেন না।

সর্বশেষ সরকারি হিসাবে মহাসড়কের ৩৫ শতাংশই ভাঙাচোরা। জেলা সড়ককে হিসাবে ধরলে দেশের মোট সড়কের ৩৭ শতাংশই বেহাল। মহাসড়কের এ অবস্থার জন্য টানা বৃষ্টিকে দায়ী করছেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) কর্মকর্তারা। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এমএএন ছিদ্দিক সম্প্রতি আমাদের সময়কে বলেন, বৃষ্টির কারণে সড়ক-মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ঈদের আগে খানাখন্দ সব ভরাট করে মহাসড়ককে যান চলাচল উপযোগী করা হবে।

বৃষ্টির কারণে মহাসড়ক বেহাল হয়ে পড়েছেÑ এ দাবিকে অযৌক্তিক মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামছুল হক। তিনি বলেন, মেরামতের নামে ইট-বালি ফেলা হয়। এতে লাভ কিছুই হয় না। দুর্ভোগ থেকেই যায়। পৃথিবীর কোথাও বর্ষা এলেই সড়ক সংস্কার করা হয় না; শুধু বাংলাদেশে হয়। যথাযথ মান বজায় রেখে কাজ করলে প্রতি বর্ষায় সংস্কারের প্রয়োজন পড়ার কথা নয়। তবে সওজের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মফিজুল ইসলাম রাজ খান আমাদের সময়কে বলেন, পৃথিবীর অন্য দেশের মতো আমাদের দেশের অবস্থা তুলনা করা যাবে না। আমাদের দেশে টানা বৃষ্টি হয়। এর সমাধানে প্রথমেই নজর দিতে হবে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে। প্রয়োজনে পাম্প বসাতে হবে, যাতে দ্রুত সময়ে পানি নিষ্কাশন করা যায়। কারণ পানি জমে থাকায় রাস্তা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অনিয়ম ও মানসম্মত সড়ক নির্মাণ না করার কারণেই প্রতিবর্ষায়ই দুর্ভোগ হয়। উত্তরবঙ্গে মহাসড়কের অবস্থা আগে থেকেই খারাপ ছিল। টানা বৃষ্টিতে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বৃষ্টিতে রাস্তায় কাজ করে খুব একটা লাভ হয় না। সংস্কারকাজ করলেও ভারী বৃষ্টি হলে তা টিকিয়ে রাখা মুশকিল।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী ২৬ আগস্টের মধ্যে মহাড়কের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার কাজ শেষ করতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে। বৃষ্টির কারণে রাস্তাঘাট মেরামত করা যাচ্ছে না। তাই আসন্ন ঈদযাত্রায় মহাসড়কে মহাদুর্ভোগের শঙ্কা রয়েছে। ঈদ সামনে রেখে সওজ দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে, তবে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় আরও আগেই হাটিকুমরুল থেকে বগুড়া পর্যন্ত মহাসড়ক মেরামতের নির্দেশ দিয়েছিল। বরাদ্দ দেওয়া হয় ছয় কোটি টাকা; কিন্তু কাজ হয়নি। সংস্কারের টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে বুধবার সওজের সিরাজগঞ্জ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হেনা মোস্তফা কামালকে সিরাজগঞ্জ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। মন্ত্রী নিজেই জানান, কাজে অনিয়ম হয়েছে; সংস্কারকাজ ঠিকভাবে হয়নি। তিনি ১০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেন।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার বগুড়ার মহাস্থানগড়ে একটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের ১০ জেলার সড়ক যোগাযোগে ভোগান্তি আরও বেড়েছে। গত দুই মাসের টানা বৃষ্টিতে সড়কের অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে পড়েছে যে, নষ্ট হওয়ার ভয়ে দামি বাস পথে নামাচ্ছেন না মালিকরা। নির্মাণকাজের কারণে চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গার অবস্থা আগে থেকেই খারাপ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপ্রান্তে ঢাকা-এলেঙ্গা মহাসড়কের দশাও বেহাল। গাজীপুরের জয়দেপুরের ভোগড়া থেকে চন্দ্রা হয়ে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। গত ঈদে এ মহাসড়কে ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। তবে এবার বৃষ্টিতে সড়কের অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ হয়ে পড়ায় প্রতিদিনই দীর্ঘ যানজট হচ্ছে। ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু (যমুনা সেতু) পর্যন্ত যেতেই ছয়-সাত ঘণ্টা সময় লাগছে। এবার ঈদেও এ পথে ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে। কয়েক দিন পরেই উত্তরবঙ্গ থেকে গরুবাহী ট্রাক আসা শুরু হবে, তখন পরিস্থিতি আগের তুলনায় খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাস মালিক ও চালকরা।

গত কিছু দিনের বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন মহাসড়কে ছোট-বড় গর্ত ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী সেতু থেকে চৌরাস্তা অংশের অবস্থাও বেহাল। বৃষ্টি হলেই এ পথের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে যায়। গত ঈদের পর সড়কের দুই পাশে অস্থায়ী নর্দমা নির্মাণ করা হলেও পানি নিষ্কাশন হচ্ছে। গত ঈদের আগে টঙ্গী সেতু থেকে চৌরাস্তা অংশে ইট ফেলে গর্ত ভরাট করা হয়। তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। বৃষ্টিতে আবার বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কেও বৃষ্টিতে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। তবে মহাসড়কের চেয়ে খারাপ রাজধানী থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের। সায়েদাবাদ থেকে যেসব বাস সিলেট যায়, সেগুলো নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভুলতা হয়ে যেতে হয়। ভুলতা হয়ে যেসব বাস চলছে, তারাও শান্তিতে নেই। সেখানে ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ চলছে। এ কারণে এ পথেও দীর্ঘ যানজট হচ্ছে। গত ঈদুল ফিতরের সময় দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে এ পথের যাত্রীদের। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের অবস্থাও ভালো নয়। মহাসড়কের দৌলতদিয়া ঘাট থেকে রাজবাড়ী সদর উপজেলার বসন্তপুর পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার এবং রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের ৪৯ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। দৌলতদিয়া থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত বেহাল সড়কের কারণে শুধু খুলনা বিভাগের ১০ জেলার যাত্রীদের ভুগতে হবে আসন্ন ঈদযাত্রায়।

সূত্রমতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ শেষ হয়েছে গত জুনে। বৃষ্টিতে ক্ষতি হলেও ১৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কে কোথাও ভাঙাচোরা নেই। কিন্তু এ পথেও ভুগতে হচ্ছে যাত্রীদের। মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হলেও কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী সেতু এখনো দুই লেনের। সরু সেতুতে টোলপ্লাজায় গাড়ির দীর্ঘ সারির কারণে নিয়মিত যানজট। এ তিন নদীতে বিদ্যমান সেতুর পাশে নতুন সেতু নির্মাণের কাজ চলছে, শেষ হবে ২০২১ সালে। এর আগে এ মহাসড়কের পুরো সুফল মিলবে না।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে