আমেনা থেকে এভ্রিল

  শান্তনু চৌধুরী

১০ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৭, ০০:৩৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

চারদিকে এত এত মানুষের ভিড়। বাসে ওঠা দায়। রাস্তায় চলা দায়। খাবারের দোকানে লাইন, ব্যাংকে লাইন, চাকরির বাজারে লাইন। পরীক্ষার হলে লাইন। সিনেমার টিকিট কাটার কিউতেও লাইন। কিন্তু এত এত মানুষের ভিড়ে সত্যিকারের মানুষ কোথায়। চারদিকে যেন বিকলাঙ্গ অন্ধ মানুষের ভিড়। একজন মানুষের সফলতা যেন আরেকজনকে ম্লান করে দেয়। তাই মানুষের জীবনে একটি যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়। এর পর প্রতিদিন জ্যামে, জটে ঘামে ভেজা গা। জীবনের বায়না শেষ হয় না। কিন্তু জীবনের বায়না মেটাতে গিয়েই ক্লান্ত হয়ে পড়েন কেউ কেউ। বাড়ছে মানুষের লালসা। বাড়ছে উত্তেজনা। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সেই সহনশীলতা। সে জন্য অবশ্য পরিবেশও কম দায়ী নয়। এখন বিকৃত আনন্দের মধ্যেই যেন সব সুখ। অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়াই যেন সার্থকতা। আর তাই নারী সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে গেলেও এভ্রিলকে এভিল বানানোর প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে নেই। পিছিয়ে নেই সবাই সবার পেছনে কাঠি নিয়ে বসে থাকতেও।

নিজের নাভিতে যে এত ঘ্রাণ হরিণ তা জানে না। জানলেই মৃত্যুর দিকে ছুটে আসত না। আবার এমনো হতে পারে, সেই জানাটাকে সে উপভোগ করতে চায়। প্রতিবাদ করতে চায়। তাই হয়তো চেয়েছিলেন জান্নাতুল নাঈম এভ্রিল। যিনি মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ খেতাব হারিয়েছেন তার কুমারীত্ব না থাকার কারণে। হায়রে কুমারীত্ব! এভ্রিল হয়তো জানতেন না, এখানে প্রেমিক নেই, যারা আছে সব পশুর আকৃতি। কুমারীত্ব বিষয়টা এক সময় বেশ বড় করে দেখা হতো এই উপমহাদেশে। নতুন বিয়ে করা বউয়ের কুমারীত্ব পরীক্ষার জন্য বাসর রাতে সাদা চাদর বিছিয়ে দেওয়া হতো। সকালে উঠে পরিবারের অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ পরীক্ষা করতেন সেখানে লাল রক্তের দাগ লেগেছে কিনা। কি নির্মম! ভালোবাসার দাম নেই, আছে রক্তের হোলি খেলার বিকৃত আনন্দ। এখনো মাঝে মাঝে কোথাও কোথাও এমন বিকৃতির সংবাদ আসে। ঘটে বাসর রাতেই ডিভোর্সের মতো ঘটনাও। সম্প্রতি তিউনিসিয়া নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। সেখানে বলা হয়েছে, তিউনিসিয়ার তরুণীরা বিয়ের আগে কুমারীত্ব নিশ্চিত করতে চান। তাই তারা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হাইমেন বা সতীচ্ছেদ পর্দা প্রতিস্থাপন করে থাকেন। দিন দিন এর চাহিদা বেড়েই চলেছে। সতীচ্ছেদ হলো এক ধরনের পর্দা, যা নারী-অঙ্গ আংশিকভাবে বন্ধ রাখে। এর উপস্থিতিকে তিউনিসীয় সমাজে ঐতিহ্যগতভাবে কুমারীত্বের চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই সাক্ষাৎকারে এক নারী বলেছেন, ‘দুই মাসের মধ্যে তার বিয়ে হবে। তিনি কুমারী নন। বিষয়টি তার হবু স্বামী ধরে ফেলবেন, এটা ভেবে তিনি চিন্তিত। তাই এখানে তিনি কুমারীত্ব ফিরে পেতে এসেছেন।’ তিউনিসিয়ায় কুমারীত্ব নিয়ে স্বামীর সন্দেহের কারণে বিয়ের পরপরই বিচ্ছেদের ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটে থাকে। উত্তর আফ্রিকায় নারী অধিকারের দিক থেকে তিউনিসিয়াকে শীর্ষস্থানীয় দেশ বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তবে ধর্ম এবং ঐতিহ্য অনুযায়ী এখানকার তরুণীদের বিয়ের আগ পর্যন্ত কুমারী থাকতে হবে। বিয়ের পর কোনো নারী কুমারী নন এটা প্রমাণ হলে তিউনিসীয় আইন অনুযায়ী ওই নারীর স্বামী তাকে তালাক দিতে পারেন। যাক সে দেশের কথা। এভ্রিল কুমারী নন বলে তার কাজ থেকে কেড়ে নেওয়া হলো মুকুট। এই বিচারে নারীর শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপের মূল ভাবনা দেহ। যদিও বলা হয়ে থাকে মানসিক সৌন্দর্যও বিচার করা হয়। শরীরের মাপ ‘৩৬-২৪-৩৬’ এটিই যেন পরিচয়। বুকের মাপ হতে হবে ৩৬, কোমর ২৪ ইঞ্চি আর নিতম্ব ৩৬ ইঞ্চি। এর বেশি হলেই নারী তুমি অযোগ্য! আর বয়সে ‘কচি’। এসবে হয়তো খুব বেশি সমস্যা ছিল না এভ্রিলের। কিন্তু সমস্যা হলো তার কুমারীত্ব নিয়ে। এটা প্রকাশ্যে যেহেতু প্রমাণের উপায় নেই। (যদিও এসব প্রতিযোগিতা নিয়ে নানানজন নানাকথা বলেন) তাই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দিয়ে বের করা হলো এভ্রিল ‘অনাঘ্রাতা’ নন। এমনিতে যদি সতীচ্ছেদ পর্দার কথা বলে থাকি সেটা শারীরিক সম্পর্ক ছাড়াও অন্য অনেক কারণে হতে পারে। নারীরা এখন আর মহলে বন্দি নেই। প্রতিনিয়ত প্রতিটি প্রতিযোগিতায় তারা লড়ে যাচ্ছেন পুরুষের সঙ্গে সমানতালে। সে কারণে ওই পর্দারও আর বালাই নেই। খুব গোঁড়া না হলে চিন্তাও করেন না। কিন্তু মিস ওয়ার্ল্ড পূজার নিয়ম বলে কথা। ধরে নিলাম এভ্রিল মিথ্যাচার করেছেন। নিয়ম মানেননি। কিন্তু আমরা কি তার জীবন সংগ্রামের কথা একবারও ভেবেছি। চট্টগ্রামের চন্দনাইশের বরমা ইউনিয়নের সেরেন্দি গ্রাম থেকে এসেছিলেন জান্নাতুল নাঈম ওরফে আমেনা। তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল এক কাপড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তিনি মানেননি। চেয়েছিলেন আরও বড় পরিসরে নিজেকে দেখতে। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেকে ভাঙার। নিজেকে নতুন করে তৈরি করতে চান বলেই তিনি মহলে আবদ্ধ থাকেননি। ঢাকায় এসে বাইক চালিয়ে নিজেকে পরিচিত করেছেন বাইকার হিসেবেও। বন্ধুরা তাকে ডাকতেন, ‘মাফিয়া গার্ল’ নামে। শব্দটা আপত্তিকর হলেও বেশ পুলক অনুভব করতেন তিনি। এভ্রিল তার জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছেন। আমেনা থেকে এভ্রিল হয়েছেন। গ্রাম্য মেয়ের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নিজেকে যোগ্য করে তুলেছেন। কিন্তু আমাদের সমাজ তা মেনে নেবে কেন। তাই আমরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছি। শুধু তার ওপর নয়, আরও কয়েকজন নারী, যারা এই প্রতিযোগিতায় ছিলেন তার বংশলতিকা বের করা নিয়ে যেন তৎপর হয়ে উঠেছি। মেয়েরা যে সাফল্য পাচ্ছেন সেটা বড় কথা নয়। বড় হয়ে উঠেছে তার যাপিত জীবনের গল্প। যেনতেনভাবে তাকে নগ্ন করার চেষ্টা। যেন অবৈধ সঙ্গম ছাড়া কোনো সুখ নেই।

একজন চিত্রপরিচালক (নারী) ফেসবুকে লিখেছেন, ‘একটি মেয়ে বিবাহ করিয়া যতক্ষণ স্বামী সংসার ধর্ম নিয়ে থাকেন ততক্ষণ সে বিবাহিত। আর যদি সে সেখান থেকে অব্যাহতি নেয় তবে সে আবার অবিবাহিত। এটাই সত্য। মানলে মানো না মানলে ভাগো। ভালো লাগা না লাগার ওপর কারো হাত নাই। বিবাহ কোনো আমৃত্যু শর্ত নয়। সংসার করা ছাড়াও জীবনে মূল্যবান কাজ আছে। যার যখন সময় হবে তখন করবে। বিবাহ, জন্ম-মৃত্যু তো আল্লাহর হাতেই। কেন এখন মনে পড়ছে না। নাকি মিস বাংলাদেশ দেখলেই সুড়সুড়ি হয়ে যায়...।’ সত্যিই তো কারো কোনো অর্জন আমরা মেনে নিতে পারি না। অনেকে বলছেন, অন্তর শোবিজের প্রচারের একটি কৌশল হতে পারে এটি। নইলে কেই বা জানত এমন প্রতিযোগিতার কথা। এক সময় উগ্রবাদীরা লেগেছিল এর বিরুদ্ধে। এর পর থেকে যা হতো অনেকটা গোপনে। এখন আবার আলোচনায়। এভ্রিলের মুকুট কেড়ে নেওয়া হলো মিথ্যা তথ্যের কারণে। এভ্রিল লিখলেন, ‘আমি এখানে (মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা) মুকুটের জন্য আসিনি। যে বার্তা দিতে এসেছিলাম সেটার কারণেই আমার জেতা মুকুটটা চলেই গেল। মানে বাল্যবিবাহ। এটাই আমার একমাত্র খুঁত। তাই বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য যত ধরনের কাজ করা দরকার সব চেষ্টাই চালিয়ে যাব। যেন কোনো মেয়ের স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পর সেটা ভেঙে না যায়।’ তিনি ছিলেন আবেগাপ্লুত। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নিয়ম আবেগ মানে না। তাই নতুন বিজয়ী ঘোষণা করা হলো জেসিয়াকে। কিন্তু আবারও আমরা হামলে পড়লাম তার ওপর। নানা ট্রল করে ব্যতিবস্ত করে তুলতে লাগলাম। তিনিও বাধ্য হলেন ফেসবুকে স্ট্যাটার্স দিয়ে জানাতে, ‘কিছু পেজ, গ্রুপ আর প্রোফাইল, যারা আমাকে নিয়ে মজা করছেন, তাদের সাবধানতা অবলম্বন করতে বলব। আমার অনুরোধ, সিরিয়াস হোন, সময় নষ্ট করবেন না আর আমাকে নিয়ে মজা করা বন্ধ করুন।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জেসিয়া ইসলামের চেহারা আর দাঁত নিয়ে নানা ট্রল করা হয়। এসব ট্রল দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। ব্যঙ্গ করে অনেকেই নানা মন্তব্যও করেছেন। তার মানে আমরা এমনই। এভ্রিল পর্ব শেষ হতে না হতেই জেসিয়া। এরই মধ্যে আরও খবর বিয়ের কারণে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েছেন দ্বিতীয় রানার জান্নাতুল সুমাইয়া হিমিও। আবার নতুন দ্বিতীয় রানারআপ হওয়া চমককে নিয়ে আলোচনা চলছে ফেসবুকে। তিনিও বিবাহিত বলে জোর আলোচনা। পরে চমক ফেসবুকে জানান, ‘ছেলেটি আমার স্বামী নয়, প্রেমিক। সে নিজেও স্ট্যাটাসে জানিয়েছে, আমি তার প্রেমিকা। কেউ কি আমাদের বিয়ের ছবি, কাবিননামার ছবি কোথাও দেখাতে পেরেছে? পোস্টটি তো অনেক আগে থেকেই ছিল। তা হলে ফলাফল বের হওয়ার পর কেন সেটি নিয়ে আলোচনা? অথেনটিক কোনো প্রমাণ নেই।’ তার মানে কাউকে শান্তিতে থাকতে দিতে নেই। কেবলই অন্যকে আসন থেকে নামানো আর নবতর সিংহাসনে যাওয়া ছাড়া যেন গতি নেই। এখন না আবার কেউ বলে বসেন, প্রেমিক থাকলেও তো ভার্জিনিটি হারাতে পারেন। সে কারণে চমককেও চমক দেখিয়ে বাদ দেওয়া হলো!

শান্তনু চৌধুরী : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

shantanu.reporter@gmail.com

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে