বাংলার আকাশে ফের ১১-র ঘনঘটা

  মোস্তফা কামাল

২৩ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০১৭, ০০:৩৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

কাকতালীয় এবং ঘটনার পরম্পরায় দেশে আবারও ১১-র ছড়াছড়ি। জেঁকে বসার মতো একের পর এক পিছু লেগেছে ১১। ঐতিহাসিকভাবে ১১-তে ভালো-মন্দের অনেক ঘটনা এ দেশে। বিচ্ছিন্ন বা সেই ধারাবাহিকতায় ফের ১১-ঘনঘটা তাই আশা জাগাচ্ছে। ছড়াচ্ছে উৎকণ্ঠাও। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ক্যারিকেচারটা আপাতত ১১ দিয়ে শেষ হওয়ায় সংখ্যা নিয়ে উৎসাহীদের মধ্যে এ নিয়ে বাৎচিত একটু বেশি। এ ছাড়া আশপাশের কিছু ঘটনায়ও কীভাবে যেন প্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে ১১।

এসকে সিনহার বিরুদ্ধে অভিযোগ সংখ্যাও ১১। বিদেশে অর্থপাচার, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, নৈতিক স্খলনসহ ১১ অভিযোগ বাংলাদেশের বিচারাঙ্গনের ইতিহাসে নতুন ঘটনা। ৩০ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতিদের বঙ্গভবনে চায়ের আমন্ত্রণে ডেকে নিয়ে অভিযোগগুলোর দালিলিক প্রমাণাদি হস্তান্তর করেন রাষ্ট্রপতি। সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার সৈয়দ আমিনুল ইসলামের স্বাক্ষর করা দুই পৃষ্ঠার বিবৃতিতে জানানো হয়েছে এসব তথ্য। প্রধান বিচারপতি ও উচ্চ আদালতের আরও কয়েক ঘটনায়ও কাকতালীয়ভাবে ১১-র ছড়াছড়ি। এসকে সিনহার বিদেশ গমনের ফাইলেও ১১। রাষ্ট্রপতি এ ফাইলে স্বাক্ষর করেন ১১ অক্টোবর। এসকে সিনহার দেশত্যাগেও ১১-র সংযোগ। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি ঢাকা ছাড়েন ১৩ অক্টোবর রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে।

এদিকে ১১-র সংযোগ এসকে সিনহার অন্যতম কীর্তি ষোড়শ সংশোধনী ও বাতিলের রিভিউ তৈরিতেও। রিভিউ আবেদন তৈরিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের নেতৃত্বে কাজ করছে ১১ সদস্যের কমিটি। যদ্দূর জানা গেছে, তাদের এ রিট দাখিলের সম্ভাব্য তারিখও পড়তে পারে ১১-তে। আগামী ১১ নভেম্বর দাখিল হতে পারে রিভিউটি। এর আগে রাষ্ট্রপক্ষ রায়ের সার্টিফায়েড কপি তোলার তারিখও ছিল ১১। গত ১১ অক্টোবর রায়ের সার্টিফায়েড কপি তুলেছে সরকারপক্ষ। রায় প্রদানকারী বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর গত ১ আগস্ট ৭৯৯ পৃষ্ঠার ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণার আপিলের রায়ের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। এর আগে গত ৩ জুলাই প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগ সংক্ষিপ্ত রায় দেন। তবে পূর্ণাঙ্গ রায়ে ১১-র সম্পৃক্ততা। উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে অর্পণসংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্টের ১৬৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ হয় গত বছরের ১১ আগস্ট।

উচ্চ আদালতে এর ফলোআপে সিনহাসহ দুর্গতির শিকারের সংখ্যাও ১১। বাকি দশজন তার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত। তার প্রস্থানের পর পরই খড়গ নামল তাদের ওপর। সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, প্রধান বিচারপতির একান্ত সচিব আনিসুর রহমান, আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার জাকির হোসেন, হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার সাব্বির ফয়েজসহ সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন ১০ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন জেলায় বদলি করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা।

১১-র উপস্থিতি নির্বাচন কমিশনের চলমান সংলাপেও। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহায়তা পাওয়ার আশায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসি সংলাপ শুরু করে ২৪ আগস্ট থেকে। ৪০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পর্যায়ক্রমিক সংলাপ শেষ হয়েছে বৃহস্পতিবার। তাদের সঙ্গে প্রতিদিন সংলাপ শুরু হয় বেলা ১১টায়। দলগুলো মোট ৫৭৮টির মতো দফা প্রস্তাব করেছে। পর্যালোচনায় দেখা, সেখানে নির্বাচনের সময় দলনিরপেক্ষ সরকার চেয়েছে ১১টি দল। এর ঘোর আপত্তি জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। এর বিপরীতে নির্বাচনকে অধিকতর সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য করতে আওয়ামী লীগ দিয়েছে ১১টি প্রস্তাব। তাদের ১১ দফার বেশিরভাগেই অনীহা বিএনপির। তাদের দাবি, এটি দুরভিসন্ধিমূলক।

বাংলাদেশের রাজনীতির খোল-নলচে গুঁড়া করা দুর্বিপাকের আলোচিত তারিখও ১১। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ২২ জানুয়ারির একতরফা সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেদিন দেশে জারি হয় জরুরি অবস্থা। সেদিনের ক্ষমতার পালাবদলের পর জরুরি ক্ষমতার আওতায় রাজনৈতিক কর্মকা- নিষিদ্ধ হয়েছিল। দেশজুড়ে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির স্বার্থে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। সেই সন্ধ্যায় জরুরি অবস্থা কার্যকরের পর রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ঢাকাসহ সব মহানগরী ও জেলা শহরে চলে কারফিউ। সেই সঙ্গে সমানে ধরপাকড়। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবরণে গঠিত হয় সেনানিয়ন্ত্রিত ‘অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।’ ওয়ান-ইলেভেনের ওই পটপরিবর্তন নানা অস্বস্তির জন্ম দেয় বড় দুটি দলের মধ্যে। সেই দুই বছরে দল ভাঙা-দল গড়া, কিংস পার্টি জন্মানোর ‘খেলা’ও ওই সময়ে দেখে জনগণ। দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় বহু রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীকে। চেষ্টা করা হয় শীর্ষ দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে বিতাড়নের। মাইনাস টু নামের ওই এজেন্ডা বাস্তবায়নে মাঠে নামেন দুই দলের বাঘা বাঘা নেতা। উপস্থাপন করেন সংস্কার প্রস্তাব। এক পর্যায়ে গ্রেপ্তার হন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াও। শুরুতে কিছুদিন মানুষ ইয়াজউদ্দিন, ফখরুদ্দীন, মঈনউদ্দিনের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সমর্থন করে। তবে তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। জোরদার হতে থাকে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি। শেষ পর্যন্ত দুই নেত্রীকে মুক্তি দিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে এক্সিট পায় সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি। ওয়ান-ইলেভেন বা ১/১১ নামের সেই সিডরের ক্ষত আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। জের টানার পাশাপাশি প্রতিবছর সেই ওয়ান-ইলেভেন পালন হচ্ছে বাংলাদেশে।

গোটা বিশ্বকে নাড়া দেওয়ার তারিখের অঙ্কও ১১। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা। ইতিহাসে তার পরিচিতি ৯/১১ নামে। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখে সন্ত্রাসীরা যাত্রীবাহী চারটি বিমান ছিনতাই করে একযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ও ভার্জিনিয়ার পেন্টাগনে হামলা চালায়। দুই ঘণ্টার মধ্যে ভবন দুটি মাটিতে ধসে পড়ে। ওই হামলায় নিহত হয় অন্তত তিন হাজার লোক। ধ্বংস হয় প্রায় এক হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ ও অবকাঠামো। এ হামলার জন্য সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আল কায়েদাকে দায়ী করা হয়ে থাকে। এর জের টানছে সারা বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি। ৯/১১ হামলার প্রতিবাদেই জঙ্গিবাদবিরোধী যুদ্ধ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেই যুদ্ধের অংশ হিসেবে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করা হয়। তবে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ নানা ফরম্যাটে চলছে বিশ্বজুড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি পালিত হচ্ছে নানান আয়োজনে।

১১-র সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো-মন্দ অনেক কিছু সম্পৃক্ত। ১১-এর আগে-পরে ভালো-খারাপের তথ্য ইতিহাসে বিস্তর। স্বাধীনতার বীজও ১১যুক্ত। ১৯৬৯ সালে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়। ’৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পেশ করে তাদের ১১ দফা। ঐতিহাসিক সেই ১১ দফাই পরে ফুলে-ফলে ভরে ওঠে ’৭০-৭১ এ। মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয় ১১টি সেক্টরে। সংখ্যাটির আবেদন তুঙ্গে বুঝতে পেরে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে তখন ছোটখাটো কমিটি হতো এ ১১ দিয়ে। ১১ যোগ করে লেখা হতো গল্প-কবিতা। এই ধারা চলেছে মুক্তিযুদ্ধের পর অনেকদিন। রণাঙ্গনের ১১ জন চৌকস মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে চাষী নজরুল সাড়া জাগানো চলচ্চিত্রও তৈরি করেছিলেন ‘ওরা ১১ জন’ নামে।

১১ একটি সংখ্যামাত্র। সংখ্যাতত্ত্বে এর বিশেষ কোনো শক্তি বা মাহাত্ম্য নেই। তবে নানান ঘটনাদৃষ্টে একে নিয়ে এত বিশ্লেষণ। তার পরের সংখ্যাটি বিপজ্জনক। ১২ বা ১২টা বেজে যাওয়া বাঙালি সমাজে পরিচিত নেতিবাচক অর্থে। তার পরের ১৩ সংখ্যাটি আরও বিপজ্জনক। অমঙ্গলের। ব্রিটিশ কালচারে ১৩ দুর্ভাগ্যের। দুনিয়ায় আনলাকি থার্টিনের ভাগীদার হতে চান না কেউই। কথায় আছেÑ সব ভালো তার, শেষ ভালো যার। আমরা শেষটাও ভালো দেখতে চাই। কারণ ১১-র আগে-পরে ভালো কিছুর উদাহরণ ভূরি ভূরি। ভরসা সেখানেই। আমরা ভালো কিছুর দিকে যাচ্ছি বা মন্দ উতরে গেছি, সেই আশাই তো করব।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে