’৭০-র ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ও ঐতিহাসিক নির্বাচনের স্মৃতিকথা

তোফায়েল আহমেদ

১২ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০১৭, ১৭:৪৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭০-র ১২ নভেম্বর আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াল ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসে ১০ লক্ষাধিক লোক মৃত্যুবরণ করেছিল। অনেক পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। অনেক পরিবার তাদের আত্মীয়স্বজন, বাবা-মা, ভাই-বোন হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিল। প্রতিবছর যখন ১২ নভেম্বর আমাদের জাতীয় জীবনে ফিরে আসে, তখন বেদনাবিধুর সেই দিনটির কথা স্মৃতির পাতায় গভীরভাবে ভেসে ওঠে।

সেদিন আমি ছিলাম জন্মস্থান ভোলায়। বঙ্গবন্ধু আমাকে আসন্ন নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। নির্বাচনের ক্যাম্পেইনে ব্যস্ত ছিলাম আমার নির্বাচনী এলাকায়। কয়েকদিন ধরেই গুমোট আবহাওয়া ছিল। বৃষ্টি এবং সেই সঙ্গে ছিল ঝড়ো বাতাস। এ রকম দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শামসুদ্দীন আহমেদ মিয়া, মাওলানা মমতাজুল করিম, মোস্তাফিজুর রহমান মিয়াসহ অন্যান্য নেতাকে নিয়ে আমার নির্বাচনী এলাকাসহ ভোলায় ব্যাপক গণসংযোগ করি। আমার নির্বাচনী এলাকা ছিল ভোলা থানা, দৌলতখান থানা, তজুমদ্দিন থানা। তখন মনপুরা ইউনিয়ন হয়নি। কিন্তু মনপুরার তিনটি ইউনিয়নও আমার নির্বাচনী এলাকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর একটি এলাকা ছিল বোরহানউদ্দিন, লালমোহন এবং চরফ্যাশন। আমার নির্বাচনী এলাকাটি বড় ছিল। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু যখন আমাকে প্রস্তুতির নির্দেশ দেন তখন আমার বয়স মাত্র ২৬।

’৬৯-র উত্তাল গণআন্দোলনে যে গণবিস্ফোরণ ঘটে তাতে ২৫ মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন এবং জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতাসীন হন। এ সময় মার্শালল’র মধ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তীকালে সামরিক কর্তৃপক্ষ জুন মাস থেকে ঘরোয়া রাজনীতি দেয়। ’৭০-র ৭ জুন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগে যোগদান করি। ’৭০-র জানুয়ারির ১ তারিখ রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহৃত হয়। তখন আমি ছাত্রলীগের সভাপতি এবং ডাকসুর ভিপি। ছাত্রলীগের উদ্যোগে আমার নেতৃত্বে সেদিন প্রথম জনসভা করি পল্টনে। তখনই বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেছিলেন, ‘তুই ভোলা যাবি। সব এরিয়া সফর করবি। আমি তোকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেব।’ এ কথাটা ভীষণভাবে আমার হৃদয়কে আলোড়িত করে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো ভোলা সফরে যাই এবং ভোলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে- তখন ভোলায় রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট কিছুই ছিল না, ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাই। বঙ্গবন্ধু ১৭০০ টাকা দিয়ে একটা মোটরবাইক আমাকে কিনে দিয়েছিলেন। এই মোটরবাইক ছিল আমার বাহন। ভোলার মনপুরার সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন মহান ব্যক্তি বসরতউল্লাহ চৌধুরী- আমরা যাকে শাহজাদা ভাই বলে শ্রদ্ধা জানাতাম- তার একটি জিপ ছিল। এই জিপটি তিনি ’৭০-র নির্বাচনে আমার নির্বাচনী কাজে ব্যবহারের জন্য দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ভোলায় তার বাড়িটি আমার নির্বাচনী কর্মকা- পরিচালনার জন্য দিয়েছিলেন। তখন ভোলায় আমার কোনো বাসা-বাড়ি ছিল না। আমি শ্বশুরবাড়িতে থেকে রাজনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালনা করেছি। বসরতউল্লাহ চৌধুরী অর্থাৎ শাহজাদা ভাইর বাসায় আমার নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপন করি। শাহজাদা ভাইর কথা আমার ভীষণভাবে মনে পড়ে। তিনি ছিলেন উদার হৃদয়ের এক চমৎকার মানুষ। তার কৃতী সন্তান আজ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজিমউদ্দীন চৌধুরী। আমি যখন নাজিমউদ্দীন চৌধুরীকে দেখি তখন আমার শাহজাদা ভাইয়ের কথা ভীষণভাবে মনে পড়ে।

এপ্রিল মাসে ভোলার ৭টি উপজেলায় নির্বাচনী সভা করি। কখনো হেঁটে কখনো বা মোটরবাইক চালিয়ে বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়েছে। কারণ রাস্তা নেই, জিপ চলে না। যেখানে জিপ চলে সেখানে জিপের মধ্যে- শামসুদ্দীন চাচা, মাওলানা মমতাজুল করিম, মোস্তাফিজ মাস্টার, রিয়াজুদ্দীন মোক্তার- চারজন প্রবীণ নেতাকে নিয়ে সব জায়গায় যেতাম। কারণ আমি ছিলাম ছোট। বয়স খুব কম। বয়স্ক নেতাদের নিয়ে গেলে মানুষ সন্তুষ্ট হতো। যেখানে যেতাম মানুষ আমাকে দেখতে চাইত। কারণ আমার এই সময়টা ছিল ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থানের পর। যে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমি মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলাম। পত্রপত্রিকায় বিভিন্নভাবে আমার সেই সংগ্রামী দিনগুলোর কথা প্রচারিত হয়েছিল। ভোলার যেখানেই গিয়েছি হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছে। তাদের সামনে বক্তৃতা করেছি। এভাবে যখন ১৭ এপ্রিল ৭টি জনসভা শেষে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে বাবাকে জানালাম, বাবা, বঙ্গবন্ধু আমাকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে এমএনএ পদে মনোনয়ন দিতে চেয়েছেন। তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘তুই এত অল্প বয়সে এমএনএ হবি। তোর বয়স মাত্র ২৬। আর আমার পরিবারের কেউ কোনোদিন রাজনীতি করেনি। এমনকি ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বারও কেউ হয়নি। তুই একসঙ্গে এমএনএ হয়ে যাবি।’ আমি বাবার দোয়া নিয়ে ঢাকায় ফিরে এলাম।

উপকূলীয় দুর্গত এলাকা ভোলা, রামগতি, হাতিয়া, সন্দ্বীপ সফর শেষে হোটেল শাহবাগে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘দুর্গত এলাকা আমি সফর করে এসেছি। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে লাখ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করে। এভাবে আমরা মানুষকে মরতে দিতে পারি না। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এখনো দুর্গত এলাকায় আসেননি। আমরা যে কত অসহায় এই একটা সাইকোন তা প্রমাণ করেছে। আরও একবার প্রমাণিত হলো, বাংলার মানুষ কত অসহায়! একবার পাক-ভারত যুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে। আরেকবার এই ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রমাণিত হলো। তাই আমরা এভাবে আর জীবন দিতে চাই না। আমরা স্বাধিকারের জন্য, আমাদের মুক্তির জন্য আত্মত্যাগ করতে চাই।’ আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এই নির্বাচনে আমি অংশগ্রহণ করব। এই নির্বাচন হবে আমার জন্য একটা গণভোট। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হবে কে বাংলাদেশের নেতা এবং কীভাবে এই অঞ্চল পরিচালিত হবে।’ ভোলাসহ উপকূলীয় দুর্গত এলাকা সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু যে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করে বাংলার মানুষকে তিনি এক কাতারে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমি তখন আর্তের সেবায় উৎসর্গিত। উদয়াস্ত কাজ করছি। ভোলাসহ দুর্গত এলাকার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু প্রতিনিয়ত আমার খোঁজখবর নিতেন। দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে সাহেবজাদা ইয়াকুব খান এলেন ভোলায়। আমি তার সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমাকে গাড়িতে তুলে নিলেন। ১৪ দিন পর অর্থাৎ ২৬ নভেম্বর সি প্লেনে চেপে ভোলায় এলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। নামলেন চকিঘাটে। আমি চকিঘাটে গেলাম। চকিঘাট থেকে তিনি দৌলতখান গেলেন। চারদিকে হাজার হাজার লোক। প্রেসিডেন্টের গাড়িতে ছিলেন সাহেবজাদা ইয়াকুব খান, পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক, আর ছিলেন গভর্নর আহসান। আমাকে প্রথমে ঘটনাস্থলে যেতে দিতে চাইছিল না। মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে তাদের দাবির মুখে আমাকে যেতে দেওয়া হয়। পরে সাহেবজাদা ইয়াকুব আমাকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে বললেন, ‘হি ইজ মিস্টার তোফায়েল।’ জেনারেল ইয়াহিয়া বলেছিলেন, ‘হু ইজ তোফায়েল? স্টুডেন্ট লিডার তোফায়েল!’ তিনি বললেন, ‘ইয়েস, স্টুডেন্ট লিডার তোফায়েল।’ ইয়াহিয়া খান আমাকে ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের জন্য কী করতে পারি?’ আমি ইংরেজিতেই উত্তর দিয়ে বলেছিলাম, তবুও তো আপনি এসেছেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট দুর্গত এলাকায় এসেছেন ঘটনার ১৪ দিন পর। আপনি এখনো নদীতে ভাসমান ও রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষের মৃতদেহ দেখতে পাবেন। এই হলো আমাদের বাঙালিদের অবস্থা। তখন এদিক-ওদিক তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আমার পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেন।’ বললাম, আমি কেন ঘোষণা দেব? আপনার কর্মকর্তারা রয়েছেন। আপনি যা দান করবেন তা তাদের বলেন ঘোষণা করতে। তখন প্রবেশনারি অফিসার সাদাত হুসাইন- যিনি পরে ক্যাবিনেট সেক্রেটারি হয়েছিলেন- তিনি একটি জিপের ওপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, ‘পাকিস্তানের মহামান্য প্রেসিডেন্ট আপনাদের জন্য ২৫ হাজার টাকা সাহায্য হিসেবে বরাদ্দ করেছেন।’ সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত জনসাধারণ চিৎকার দিয়ে উঠল- ‘না’ ‘না’ ‘না’। আমি দুহাত তুলতেই মানুষজন সবাই শান্ত হয়ে গেল। ইয়াহিয়া খান চলে গেলেন। সেনাবাহিনী রিলিফ তৎপরতা আরম্ভ করল। তার পর ভোলায় এলেন ভোলারই কৃতী সন্তান মোকাম্মেল হক। এর পর আনিসুজ্জামান সিএসপি, সুলতানুজ্জামান খান- যিনি ছিলেন খুলনার কমিশনার। বরিশাল তখন খুলনার অধীনে। আইয়ুবুর রহমান ছিলেন বরিশালের ডিসি। তিনি এলেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দুর্গত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আর্তের সেবা করেছি। মনে পড়ে রাস্তা দিয়ে যখন হেঁটে যেতাম মানুষ আমাকে ঘিরে ধরত। একবার একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল। চকিঘাটায় আমি যখন গেলাম তখন বেলুচ রেজিমেন্ট সেখানে ডিউটি করে। দায়িত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার দুররানী। তার অধীনে ওখানে একটি ক্যাম্প স্থাপিত হয়। আমি যখন তাদের স্পিডবোটে উঠি আমাকে নামিয়ে দেওয়া হয়। মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওই স্পিডবোটের চালককে বেদম প্রহার করে। তখন বেলুচ রেজিমেন্টের সৈনিকরা আমাকে গুলি করতে উদ্যত হলে হাজার হাজার মানুষ দেশি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সৈনিকদের রুখে দাঁড়ায়। পরে আমি বঙ্গবন্ধুকে ঘটনাটি জানিয়ে বলি, এ রকম একটি ঘটনা ঘটেছে। ভোলায় সেনাবাহিনী রাখার কোনো দরকার নেই। পরে ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বঙ্গবন্ধু ভোলা থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করার ব্যবস্থা করেন। এর পর জেনারেল রাও ফরমান আলী ও ব্রিগেডিয়ার দুররানী ভোলা যান এবং আমার সঙ্গে মিটিং করে এক বিদায়ী কুচকাওয়াজের মাধ্যমে ভোলা থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহৃত হয়।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ঘূর্ণিঝড় দুর্গত অসহায় মানুষের জন্য এলাকায় এলাকায় ক্যাম্প করে যে ব্যাপক ত্রাণকার্য সেদিন আমি পরিচালনা করেছি তা আমার বাকি জীবনে চলার পথের পাথেয় হয়ে আছে। জাতীয় চার নেতার অন্যতম শ্রদ্ধেয় নেতা তাজউদ্দীন ভাই এক বিরাট লঞ্চভর্তি ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ভোলা এসেছিলেন ত্রাণকার্যে। তার থেকে কিছু তিনি বিলি করতে পেরেছেন বাকিগুলো রেখে এসেছিলেন আমার কাছে। সেগুলো আমি বিলিবণ্টন করেছি। খাবার পানি, মুড়ি, চিঁড়া, ওষুধপথ্য বিলি করেছি দুর্গত এলাকায়। এ ছাড়া এসেছিল দামি সব কম্বল এবং শাড়ি-কাপড়। এর সবই অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। তখন যোগাযোগব্যবস্থা একদম বিচ্ছিন্ন। আমার আসনসহ ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত উপকূলীয় এলাকার জাতীয় পরিষদের ১৭টি আসনে পূর্বঘোষিত ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচন স্থগিত করা হয়। অবশ্য সুষ্ঠুভাবে ত্রাণকার্য পরিচালনার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ইতোমধ্যেই জনসাধারণের ব্যাপক সমর্থন পাই। মানুষ আমাকে বুকে টেনে মাথায় তুলে নিত। ভীষণভাবে আদর করত। এই স্মৃতি জীবনে ভোলার নয়। মানুষের জন্য কেউ যদি কিছু করে মানুষ যে তার জন্য কী করতে পারে তা চিন্তা করা যায় না। পরবর্তীকালে আমার নির্বাচন হয়েছিল ১৭ জানুয়ারি। তার আগে বঙ্গবন্ধু আমাকে ডেকে নিয়ে আসেন। সারা বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সফর করেন। আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলাম। একই ট্রেনে গিয়েছি। তার পাশে থেকেছি। একই জনসভায় বঙ্গবন্ধুর আগে বক্তৃতা করেছি। আবার তিনি বক্তৃতা করার সময় চলে গিয়েছি আরেক জনসভায়। বঙ্গবন্ধু যখন এক জনসভা শেষ করে আরেকটিতে আসছেন তখন আমি চলে গেছি আরেকটি জনসভায়। এভাবে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলাম। নির্বাচনের দিনও আমি বঙ্গবন্ধুর পাশে। বিদেশি সাংবাদিকরা যখন জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আপনি কতটি আসনে জয়ী হওয়ার আশা করেন?’ বঙ্গবন্ধু উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি অবাক হব যদি আমি দুটি আসনে হারি।’ সত্যি দুটি আসনেই আমরা হেরেছিলাম। জাতীয় পরিষদে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে আমরা বিজয়ী হয়েছিলাম।

আমার নির্বাচন হয় ১৭ জানুয়ারি ’৭১-এ। ’৭১-র ৩ জানুয়ারি যে শপথ অনুষ্ঠান হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সেখানে আমিও শপথ গ্রহণ করি। যদিও তখনো নির্বাচিত হইনি। নির্বাচিত হয়েছি ১৭ জানুয়ারি। নির্বাচনী ফল ঘোষণার পর জানলাম ৭২ হাজার ভোট পেয়েছি। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৬ হাজার ভোট। আমি তার থেকে ৬৬ হাজার ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়েছি। যিনি ’৫৭ সালে একটি উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করেছিল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তখন পূর্ব পাকিস্তানে ১৩টি উপনির্বাচন হয়েছিল। ১২টিতে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছিল। একটিতে বিজয়ী হতে পারেনি। সেটি হলো ভোলা। সেই ভোলা থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন শাহ্ মতিয়ুর রহমান। তিনি নেজামে ইসলাম পার্টি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ’৭০-এ তিনি একই পার্টি থেকে আমার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আমি যখন তজুমদ্দিন তখন আমার নির্বাচনী ফল ঘোষিত হয় এবং মাত্র ২৭ বছর ১ মাস ১৫ দিন বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হই। তজুমদ্দিন থাকা অবস্থায় বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছার নামে একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিই। এর পর ঢাকা ফিরে আসি। এর মধ্যে কয়েকবার গভর্নর আহসান ভোলা গিয়েছিলেন। বঙ্গমাতার নামে যে স্কুল করার পরিকল্পনা করেছিলাম তিনি সেখানে ৬ হাজার টাকা দান করেছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর সেই স্কুলটি সরকারি স্কুল হয়েছে। আমি ভোলা শহরে বঙ্গমাতার নামে স্বাধীনতার পর একটি কলেজ করেছি। কলেজটির নাম ফজিলাতুন্নেছা মহিলা কলেজ। যেটায় এখন অনার্স, এমএ সবই আছে। সেটাও সরকারি কলেজ হয়েছে।

স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে বঙ্গবন্ধু প্রথম যান ভোলা। ’৭০-এ তিনি দেখে এসেছিলেন জলোচ্ছ্বাস-ঘূর্ণিঝড়বিধ্বস্ত ভোলা। ১৪ ফুট জলোচ্ছ্বাসে সবই ভেসে গিয়েছিল। যে জায়গায় বেড়িবাঁধ ছিল না, সেই স্থানকে জিরো পয়েন্ট বলতাম আমরা। সেখান দিয়েই প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করেছে এবং নিমেষের মধ্যে সব তলিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু ছোট্ট একটি হেলিকপ্টারে করে ভোলা এসেছিলেন। আমি বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী ছিলাম। ভোলা গিয়ে সেই জিরো পয়েন্ট থেকে বঙ্গবন্ধু মাটি কেটেছেন এবং বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেছেন। ভোলা থেকে তিনি রামগতি গিয়েছেন এবং সেখানেও তিনি বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্বোধন করেছেন। আজকে বেড়িবাঁধ দিয়ে আমরা জলোচ্ছ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকি, ঘূর্ণিঝড় হলে আমরা এখন সাইকোন শেল্টারে আশ্রয় গ্রহণ করি। আগে এই সাইকোন শেল্টারকে বলা হতো ‘মুজিব কেল্লা’। এটা বঙ্গবন্ধুই করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু চরকুকরী-মুকরী গেছেন, সেখানে সাইকোন শেল্টার করেছেন। সেখানে জনসাধারণকে ডিপ টিউবওয়েল দিয়েছেন। বনায়ন করেছেন। বনায়ন করে জলোচ্ছ্বাস ঠেকানোর জন্য উপকূলীয় এলাকায় বঙ্গবন্ধু বনায়ন করেছিলেন। যেটা আজকে ফরেস্ট হয়েছে। এটা বঙ্গবন্ধুর অবদান। বঙ্গবন্ধু ভোলাকে খুব পছন্দ করতেন। মনপুরায় তিনি ‘চিন্তানিবাস’ নামে একটি আবাসস্থল করতে চেয়েছিলেন। তার কাজও শুরু হয়েছিল। বসরতউল্লাহ সাহেব একটি দীঘি কেটে মাটি ভরাট করে এই কাজটি শুরু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যখন যুগোসøাভিয়া সফরে গিয়েছিলাম তখন দেখেছি মার্শাল টিটো একটা দ্বীপে থাকতেন। দ্বীপটার নাম ছিল ‘বিরুনী’। ওখান থেকে বঙ্গবন্ধু মনে করলেন আমার ভোলায় অনেক দ্বীপ। একটা দ্বীপে আমি এ রকম একটা আবাসস্থল করব। যেখানে বিদেশিরা গেলে তাদের সঙ্গে মিটিং করব। কিন্তু তিনি এটা করে যেতে পারেননি। মনপুরায় অবকাশ যাপন কেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল বঙ্গবন্ধুর। ’৭৫-র ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সবকিছু স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। আলী মিয়া মাস্টার ছিলেন মনপুরার চেয়ারম্যান। তিনি আমার খুব প্রিয় মানুষ ছিলেন। তার পরিবারে ২৭ জন সদস্য ছিল। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের পর দেখা গেল তিনি একাই বেঁচে আছেন, আর কেউ-ই নেই। কত প্রিয় মুখ আমি হারিয়েছি। যার সঙ্গে গতকাল দেখা হলো আজ আর তাকে আমি পাইনি। ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, রামগতি, কুতুবদিয়া, মহেশখালীসহ দেশের উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। এ ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। প্রতিবছর ১২ নভেম্বর যখন ফিরে আসে তখন স্মৃতির পাতায় সেদিনের সেই দিনগুলোর কথা ভেসে ওঠে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি পোস্টার হয়েছিল সোনার বাংলা শ্মশান কেন? এই পোস্টারটিতে ’৭০-র ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের কথাই ব্যক্ত হয়েছিল। দুটি ঘটনা বাংলার মানুষকে পথ দেখিয়েছে। এক, ’৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধ। যখন আমরা ছিলাম ‘অরক্ষিত’। আর ’৭০-র ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস যখন আমার ছিলাম ‘অসহায়’। বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করেছিলেন তার মূল লক্ষ্য ছিল শোষণহীন অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। সেই দায়িত্বটা এখন বর্তেছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার স্কন্ধে। তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে চলেছেন। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রতিবছর আগে বাংলাদেশে লাখ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করত, ঘরবাড়ি হারাত। সেসব এখন আর নেই। ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টে বাংলাদেশের ভূমিকা আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রশংসনীয়। যে কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করার যে ব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলেছি তা এখন সারা বিশ্বের জন্য মডেল হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ আমাদের অনুসরণ-অনুকরণ করতে পারে। বাংলাদেশে এখনো প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস হয়, কিন্তু যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি আগে হতো এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গৃহীত পদক্ষেপের কারণে আগের মতো ক্ষয়ক্ষতি হয় না। এটাই হলো বঙ্গবন্ধুর বাংলার স্বাধীনতার সফলতা।

তোফায়েল আহমেদ : আওয়ামী লীগ নেতা, বাণিজ্যমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে