নিরাকমাখা গাঁয়ের পথে

  আজাদুর রহমান

০৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:৩৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

আখতারুজ্জামান বয়াতি মাউথপিস হাতে নেচে নেচে গাইছেন-
ও বাংলার কিষান ভাই
চলো আমরা ধান কাটিতে যাই।
নতুন ধানের চিড়া মুড়ি
ভালোবাসে বুড়াবুড়ি ॥

নিজের বাঁধানো গানে আখতার সুর তুলে হেলেদুলে গান করেন। তিনিই দলের ওস্তাদ। গানের কলি ধরে তিনি খানিক এগিয়ে নিয়ে যান তারপর লম্বা একটা টান দিয়ে ছেড়ে দেন। সহগায়েনরা তখন সেই কলির দ্যোতনা তুলে কোরাসে গলা মেলান। কোরাসের জনেরা গলা মেলানোর পাশাপাশি শামিয়নার তলে টেবিলে রাখা তবলা, হারমনি, বাঁশি একটানা বাঁজিয়ে চলেন। তাদের মুখের কাছে স্ট্যান্ডে করে মাইক্রোফোন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাত দিয়ে তালযন্ত্র বাজানোর পাশাপাশি এরা জায়গামতো একযোগে সুর তোলেন। একজন আবার শেষ অন্তরায় নাঁকি সুরে দ্যোতনা দেন। এসব বাজবাজনার মধ্যে রহিমুদ্দি গলায় ঢোল ঝুলিয়ে দমাদম আওয়াজ তোলেন। তারপর নাড়ার মাঠে ঘুরে ঘুরে তালে তাল রেখে পা মেলান। নৃত্য করেন। তার কা-কীর্তিগুলো দেখার মতো। নাচতে নাচতেই তিনি দপ্ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন, তারপর বিশেষ ভঙ্গিমা দিয়ে দর্শকদের কুর্নিশ করে তড়াং করে উঠে দাঁড়ান। পরানদহের কৃষকরা হৈ তুলে কুর্নিশের জবাব দেন। হৈ শুনে কিষাণ-কিষাণিদের গাদাগাদি থেকে পোলাপানরা দ্বিগুণ উৎসাহে চিৎকার করে ওঠে। সেসব আমুদে হৈ চিৎকারের উৎসাহ পেয়ে রহিমুদ্দি দ্বিগুণ আহ্লাদে লাফাতে থাকেন। যেসব মহিলারা এতক্ষণ দূরের জমির আঁইলে দাঁড়ানো ছিল তারাও এগিয়ে এসে মজমা জমায়। আখতার বয়াতির গান শেষ হয় না। রোদ গাঢ় হতে থাকে। মানুষের আগ্রহ কমে না। বহুদিন পর সহজাত আনন্দবোধে জেগে ওঠে পরানদহের পুরো পাথার। গানের ফাঁকে একদল কৃষক কাঁচি হাতে পাশের জমিতে নেমে ধান কাটতে আরম্ভ করেন। গানে গানে তাদের ধান কাটা চলে। তারপর গানের সুরের সঙ্গে গেরুয়া আবাদের মৌ মৌ গন্ধে একাকার হয়ে যায় পরানদহের পাথার...। কৃষি দিবস পালন করতে গিয়ে পহেলা অগ্রাহণের এ দৃশ্যটি যেন বহু বছর পর ক্ষণিকের জন্য ফিরে আসে পরানদহে। এটি পরানদহের প্রকৃত চিত্র নয়।

পরানদহ গ্রামটা চ্যাপ্টা ধরনের। গ্রামের মাঝ দিয়ে খাল বয়ে গিয়ে একসময় ইছামতিতে পড়েছে। লোকে একে গ্রামের নাম ধরে ডাকে- পরানদহ খাল। খালকে অনুসরণ করতে গিয়ে গ্রামটা আর গোলগাল হয়ে থাকেনি, বরং খালের দুপাড়কে ধরতে গিয়ে খানিকটা থ্যাবড়া হয়ে গেছে। খালের ওপর সিমেন্টের পাকা ব্রিজ। ব্রিজ পার হলেই খালের বাতা বয়ে উত্তর-দক্ষিণে ছিমছাম বাজার। কয়েকটা ঝুপড়ি দোকান, চায়ের স্টল আর মাটিতে পাত পাতানো কাঁচা সবজির দোকান নিয়ে গেঁয়োবাজার। শহুরে বাজারের থেকে তফাত হলোÑ এখানে ভালো কলা ও মানকচু পাওয়া যায়। চায়ের দোকানে ভিড় বেশি। দিনের বেলাতেই স্টলে বিদ্যুতের বাতি জ্বলছে। ওদিকে পুরো রাস্তা ধরে গোধূলির নরম আলোয় বেচাকেনা করা মানুষের আনাগোনা। একটা ঝাঁপতোলা মনোহারী মুদি দোকানের পায়ার সঙ্গে কাঠের পুরনো টেবিলে কাপ-পিরিচ রেখে একটা চ্যাংড়া মতোন ছোকড়া কেরোসিনের স্টোভ বসিয়ে চা বানাচ্ছে। ক্যাশবাক্সের লাগোয়া জলচৌকির ওপর সাদাকালো টেলিভিশনে ছবি চলছে। পর পর পাতানো চার-পাঁচটা বেঞ্চে বসে কয়েক সারি গ্রাম্যলোক গভীর মনোযোগে দোকানে বাংলা ছবি দেখছে। পরানদাহের এ পাশটার সঙ্গে পূর্ব দিকের অংশকে মেলানো যায় না। শহরের হাওয়া এসে লেগেছে এখানে এবং উন্নতির একপর্যায়ে এসে গ্রাম-শহরের মাঝামাঝি এটা আধখ্যাঁচড়া জনপদে পরিণত হয়েছে। মনে পড়ে গ্রামটাকে সবিস্তারে দেখা হলে দক্ষিণ দিকে গিয়েছিলাম। কাঁচাপথের কিনার ধরে রেইনট্রি গাছের সারি। মাঝে মাঝে ছোট-বড়ো খেজুরগাছ। ছোট গাছগুলো পাতা ছড়িয়ে পথেই ঝুলে গেছে। কাঁটা বাঁচিয়ে সাবধানে মোটরসাইকেল চালাতে হচ্ছে। ধূধূ পাথারের দিগন্তজুড়ে গেরুয়া আবাদ সোনার মতো হলুদ হয়ে আছে। কোথাও কোথাও খাঁজকাটা নিচু জমিতে বক পড়েছে। পাথারের মধ্যেও পুকুর আছে। মূল জনপদ ফেলে বেশ কিছুদূর আসার পর দুই বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা হয়। হাতের ইশারা দিতেই বৃদ্ধদ্বয় কাঁচি হাতে জমিন থেকে উঠে আসেন। বেশ কিছু আলাপ হয়। একসময় মকসেদ সরদার পুরনোদিনের কথা তোলেন। তারপর পাশের দাঁড়ানো ছবদেলকে সাক্ষী মেনে বলা শুরু করেনÑ ‘আগে গ্রামে অনেক ধরনের আনন্দ ছিল। আমরা সাগরভাসা যাত্রা করতাম। ধান কাটা হলে ফের জারি ও জরিনার পালাগান হতো।’ সবদেল আরও খানিক যোগ করেনÑ ‘আগের মতো সেসব মান্যগণ্যও আর নাই। বেশিরভাগ পোলাপানরাই এখন ঝাঁউলি টাইপের। মুরিব্বিদের কোনো মানাগুনা নাই; খালি টিভি-ভিসিপি ওগা (ওসব) দেইখ্যা বেড়ায়। তা ছাড়া এই যে গ্রাম দেখতিছেন, এয়ি তো এখন আর গ্রাম নাই-গাঁজা হিরো থেকে সবটি নেশাপানি পাবেন এহানে।’ বৃদ্ধদের এ রকম খোলামেলা মন্তব্য শুনে মনটা ক্রমেই কালো হয়ে যায়। এ কী হচ্ছে গ্রামে! সত্যিই কি আমাদের স্বপ্নময় সহজ গ্রামগুলো বদলে গেছে। একটা দুর্ভাবনা নিয়ে ওদের বিদায় জানাই। তারপর আরও উত্তরের গোদাখালী গ্রামের গভীরে ঢুকে যাই।

বাংলাদেশের কৃষক সমাজের নিজস্ব একটি সংস্কৃতি আছে। কৃষি যুগের শুরু থেকে কৃষিকর্মের পরতে পরতে মিশে কৃষকদের জীবনাচারে যুক্ত হয়ে আছে এই সংস্কৃতি। প্রথম বীজ বপনের দিন এর উদ্বোধন হয়েছে। কৃষকদের চলনবলন, জীবনযাপন পদ্ধতি, বেঁচে থাকার সংগ্রাম, আনন্দবেদনার প্রকাশনা, কথোপকথন, ভাষা, ভাববিনিময়, মনমর্জি ইত্যাদি স্বতন্ত্রভাবে তিলে তিলে যোগ হয়ে হয়ে যুগের পরিক্রমায় তৈরি হয়েছে নতুন এক কৃষিসংস্কৃতি। চাষিদের লোকজ এই সংস্কৃতির সঙ্গে ভদ্রলোকদের সংস্কৃতি কিংবা অন্য কোনো পেশাগত সংস্কৃতিকে এনে মেলানো যায় না।

যে মানুষের কাছে আনন্দ বলতে পালাগান বড়জোড় যাত্রাপালা, সেই মানুষ হঠাৎ করেই আকর্ষণীয় এবং হালের ভিডিওর মুখোমুখি হচ্ছে। কিছুদিন পর হয়তো এটি খুব সাধারণ একটি বিষয় হয়ে যাবে গ্রামীণ জীবনে। আধুনিকতার সঙ্গে গ্রামজীবনে যেমন নেমে আসছে নানা অপসংস্কৃতি, তেমন গ্রামের মানুষরা নিজেদের অজান্তেই হারাতে বসেছে লোক-ঐতিহ্যের আদি সম্পদগুলো।

ভাবতে ভাবতে ঝাপসা হয়ে আসে পুরনো পরানদাহ। রাজারামপুরে সূর্য ডোবে। উৎসবের তেজ কমে গেলে আদিবাসীরা দূরবর্তী হয়। তখন ঢিলে হাওয়ায় ভেসে আসে ঝুমের গান-

ভালাকে মাঁজে বাসাকে পিছে
ভালাকের বাসা নাহি মানায়
রাজা গারিব গৈই না
হায় হায়রে বাসাবাসি
নাহি মানায় হারিয়ে ডোমরে

কার্তিকের সবুজ ধান মাসান্তে সোনালি, মাঠে মাঠে নুয়ে আছে তাদের প্রাণ। গেরুয়া আবাদ ভিড় করে দাঁড়িয়ে পড়েছে পাথার থেকে পাথারে। এ অঞ্চলের আদিবাসীরা ধান কাটার দিনকে নবান্ন বলে না, বলে নবান। আকাশ সংস্কৃতির সুলভ বিনোদনের সুবাদে নবান্নের মতো লোকজউৎসবও তেমন আর আমল পায় না। শহুরেরা স্টেজ বানিয়ে নগুরে কায়দায় নবান্ন উৎসব করে বটে, কিন্তু তাতে প্রাণ থাকে না। অথচ এক যুগ আগেও গাঁওগ্রামে ধান কাটার মৌসুম এলে নবানের হিড়িক ছুটে যেত। নতুন ধানের উদ্বোধনে ধুম লাগত লোকজীবনে। আত্মীয়স্বজনের পারস্পরিক নিমন্ত্রণে কদর পেত পিঠা, পায়েস, চিড়া, মুড়ি। গাঁয়ের ছেলেমেয়েরা সদ্য ধান কাটা জমিতে চড়–ইভাতি করত। দৃশ্যগুলো দ্রুত বদলে গেল। কালের হাওয়ায় গ্রামজীবনেও এখন পাল্টা স্রোত বইতে শুরু করেছে। অজপাড়াগাঁয়ে পিঠাপুলির স্বাদ যেন ক্রমেই পানসে হয়ে আসছে। এখন শরবতের পরিবর্তে কোকা-কোলা দেওয়া হয়। চা-বিস্কুট-চানাচুরের সঙ্গে কোনো কোনো বাড়িতে সম্ভব হলে ফাস্টফুডের ব্যবস্থা হয়ে থাকে। পরিবর্তনের শেষপাতে এসে একমাত্র আদিবাসীরাই জিইয়ে রেখেছে নবানের উৎসব। নবান তাদের জীবনে এখনো আনন্দের এক অনবদ্য আয়োজন।

-ফেরার পথে কয়েকটা টেলিভিশনওয়ালা দোকান দেখি। কিন্তু সেসবে আর মন লাগে না। শহরের রাস্তা পেতে পেতে এখনো ছয় কিলোমিটার। কুয়াশার সঙ্গে জোছনা নেমেছে। পাথারের ভেতর খাঁজকাটা পুকুরেও আলো পড়েছে। বিলের কিনার ধরে যাওয়ার সময় শেষবার রাজারামপুরের পাথার আমাকে স্পর্শ করে নেয়। সুদূরে চেয়ে মনে মনে বলি, আমরা তো গ্রামে ফেরার জন্যই অপেক্ষা করি।

আজাদুর রহমান : সাহিত্যিক ও গবেষক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে