প্রেমের দশাও ব্যাংকের মতো শোচনীয়

  জয়া ফারহানা

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভালোবাসা এবং ব্যাংক। উভয়ের দশা এক। শোচনীয়। ব্যাংকে আমানত রেখে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় কখন তা হাওয়া হয়ে যায়। ভালোবাসার সম্পর্কেও সুরক্ষা শব্দটি হাওয়া। নিশ্চয়তা নেই কোনো। সন্ধ্যায় যে জুটি সিনেপ্লেক্সে সিনেমা দেখে এলো, সকালে উঠে এদেরই একজন হয়তো দেখবে সঙ্গীর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে সে ব্লকড। কেন ব্লকড সে উত্তরও পাওয়ার সুযোগ নেই। অনেক অনুসন্ধানের পর জানা গেল কারণ অতি তুচ্ছ। আবার সকালে যে ব্যাংকে আপনি অ্যাকাউন্ট খুলে এলেন সন্ধ্যায় নিউজ পোর্টাল খুলে হয়তো দেখবেন ব্যাংকে মোট আমানত যা ঋণ দেওয়া হয়েছে তার দ্বিগুণ। ডেঞ্জারজোনে চলে গেছে ব্যাংক। ব্যাংক যেমন যখন-তখন ডেঞ্জার জোনে চলে যাচ্ছে, সম্পর্কও তেমন। সকাল-সন্ধ্যা ব্যাংক ভাঙছে। সম্পর্কগুলোও ভাঙছে সকাল-সন্ধ্যা। ব্যাংকগুলো আছে আমানতকারীদের আস্থাহীনতায়। সম্পর্কগুলোও তাই।

ভালোবাসার মতো বিশুদ্ধ অনুভূতির সঙ্গে ব্যাংকের মতো বাণিজ্যিক কর্মকা-ের সাদৃশ্য খুঁজে নেওয়া অনেকের পছন্দ হবে না। ভালোবাসার অবস্থা শোচনীয় এই মন্তব্যও ভালো লাগবে না। হয়তো এর কারণ নিজেরা যতই অশুদ্ধবাদী হই, কিছু কিছু অনুভূতিকে আমরা আবার বিশুদ্ধ দেখতে চাই। ভালোবাসা তার একটি। যারা পিউরিটান, তাদের কাছে ভালোবাসায় তিল পরিমাণ বিচ্যুতি বা স্খলনও অসহনীয়। এমন এক পিউরিটান ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ভালোবাসার সম্পর্কের কাছে বঙ্কিমের যে দাবি তাকে এখন ইউটোপিয়া মনে হবে। আপনি বলবেন, বঙ্কিমের মৃত্যুর সঙ্গে কি তবে বিশুদ্ধ ভালোবাসাদেরও মৃত্যু হয়েছে? দেখুন সব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম আছে। বিশুদ্ধ প্রেমিকযুগলও নিশ্চয়ই আছে এখনো। কিন্তু আমরা দেখাতে চাইছি ভালোবাসার মূল প্রবণতার দিকটি। ব্যতিক্রম বাদ দিলে ভালোবাসার মূল ধারা যেদিকে ধাবমান তা অনেকটাই পশ্চিমা চরিত্র নিয়েছে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভালোবাসার সঙ্গী বিশ্বস্ত থাকবেন এটা খুবই স্বাভাবিক চাওয়া। সব দেশে, সব কালে, সব সময়ে। কিন্তু চাওয়া অনুযায়ী যে, সব সময় সবকিছু ঘটবে তাই বা ভাবছেন কেন? সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান মৌলিক শর্ত বিশ্বস্ততায় বিপর্যয় ঘটেছে। এটাই বাস্তব পরিস্থিতি। ভালোবাসার সম্পর্কে সঙ্গী এবং সঙ্গিনী নানা কারণে বিশ্বস্ত থাকছেন না। উদাহরণ দিই। ধরা যাক, অহনার সঙ্গে অনলের সম্পর্কের মেয়াদ ছয় মাস। সাত মাসের মুখে অহনার সঙ্গে দেখা হলো সজলের। সজল ক্রাস খেল অহনার ওপর। এমন পরিস্থিতিতে ষাট-সত্তরের দশক হলে অহনা সরাসরি সজলকে নাকচ করে দিত। ২০১৮ সালে সজলকে খারিজ করে দেওয়ার চিন্তা অহনার কাছে নিতান্ত বোকামি। কারণ অহনা অঙ্ক করে দেখেছে সজল তার ক্যারিয়ারে কিছু প্লাস করতে পারবে। কাজেই সজলের সঙ্গে কিছু সময় কাটালে যদি ক্যারিয়ারের উন্নতি হয় তো একটু কথা বললে সমস্যা কী। তা ছাড়া সজলের সঙ্গে এ সম্পর্ক তো নিছক বন্ধুত্বের। অনলেরই বা এমন পজেসিভনেস কেন থাকবে যে, সে ছাড়া অন্য আর কারো সঙ্গে কথাই বলতে পারবে না অহনা? ওই একই ব্যাপার ঘটে অনলের ক্ষেত্রেও। যে কোনো মুহূর্তে সজলের চোখ অহনার চেয়ে গহনা, সহনাকে রূপসী ভেবে বসতে পারে। গহনার সঙ্গে কথা চলাকালীন ফোন ওয়েটিং পেলে অহনা যতখানি ইমোশনাল হয়ে ওঠে, এতদিনে তাতে সজল বোরড। অহনা এখন তার কাছে নিতান্ত এক অর্ডিনারি ছিঁচকাঁদুনি চরিত্র। অহনার সেন্টিমেন্টকে ব্যঙ্গ করে সে নাম দিয়েছে সেন্টু অহনা। অহনার যৌক্তিক অভিযোগগুলো পরিণত হয়েছে প্যানপ্যানানিতে। অথচ ভালোবাসা খানিকটা অত্যাচার চায়। অত্যাচার করেও। এখনকার ভালোবাসা হয়েছে হিসাবের। আত্মসর্বস্ব প্রেমিক-প্রেমিকারা ভালোবাসার অত্যাচারকে ডমিনেটিং ভাবে। ভালোবাসা এখন কমার্স স্ট্রিম। এতে আছে অ্যাকাউন্টিং, ম্যানেজমেন্ট, মার্কেটিং। একবিংশ শতকের জুটিরা ভালোবাসার নামে ম্যাক্সিমাম মার্কেটিং এবং মিনিমাম ডেলিভারিতে বিশ্বাসী। অর্থাৎ ভালোবাসার প্রচার এবং প্রকাশে তারা যতখানি পারদর্শী, ভালোবাসা দেওয়ার ব্যাপারে ঠিক ততটাই কৃপণ। চারপাশে এমন কোনো ভাগ্যবতী রজকিনীর দেখা পান, যার জন্য বারো বছর ছিপ হাতে প্রতীক্ষায় আছে কোনো চ-ীদাশ? বারো বছর একনিষ্ঠভাবে মাত্র একজনের জন্য প্রতীক্ষায় থাকা নিতান্ত অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে এখন। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা মানসিক অসুস্থতা হিসেবেও চিহ্নিত হতে পারে।

দুই.

শুনতে ভালো লাগে না। মানতেও মনটা একটু হোঁচট খায়। কিন্তু কঠিন সত্যকে ভালোবাসলে আপনাকে স্বীকার করতে হবে যে, প্রেম একটি পণ্য এবং তার একটি বাজারও আছে। এই বাজারে প্রেমিক ও প্রেমিকার মূল্য নির্ধারণ হয় কীভাবে তাও জানা যাক। অর্থবিত্ত, প্রভাব, বৈভব, ক্ষমতা, খ্যাতি, রূপ, যশÑ এসব তো অবশ্যই একেকটি সূচক। তবে ভালোবাসার ক্ষেত্রে ভালো ভাষার কি কোনো ভূমিকা আছে? ভালোবাসার সঙ্গে ভালো ভাষার কি কোনো সম্পর্ক আছে? থাকলে কতটুকু? ব্যর্থতম প্রেমিকরাই নাকি ব্যর্থতম কবি। যদি তাই হয়, তা হলে ভালো ভাষার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক আছে বলা যাবে না। কারণ কবিদের আয়ত্তেই সবচেয়ে বেশি ভালো ভাষা থাকে। ভালো ভাষা দিয়ে যদি ভালোবাসা পাওয়া যেত, তা হলে কবিতায় প্রেমিক কবিদের এত হাহাকার, এত আর্তনাদ এবং প্রেমিকার বিরহে এত ব্যাকুলতার অনুভব খুঁজে পাওয়া যেত না। আবার হতে পারে ভালোবাসার সাধনার চেয়ে ভালো ভাষার সাধনায় অধিকতর মনোসংযোগ করতে গিয়ে ভালো ভাষা যতদিনে কবির আয়ত্তে আসে, ভালোবাসা ততদিনে অন্যের আঙিনায় চলে যায়। প্রশ্ন উঠতে পারে প্রেমের ক্ষেত্রে ভালো ভাষা কী? প্রেমিক-প্রেমিকারা তাদের আবেগের সমতুল্য ওজনদার ভাষা শুনতে চান, বলতেও চান। ভালোবাসার এই এক মহত্ত্ব। ভালোবাসা ভালো ভাষা তৈরি করে। প্রেমাস্পদের প্রতিই মানুষ সবচেয়ে ভালো ভাষা ব্যবহার করে। কখনো তার যে ভাষাজ্ঞান এবং ভাষাবোধ সেই সাধ্যের বাইরে গিয়েও করে। প্রতিদিনের যে ভাষাপ্রেম তা থেকে প্রেমিক-প্রেমিকাকে মুক্তি দেয়। প্রেমের ভাষা দৈনন্দিনের ভাষা থেকে ভিন্ন। প্রেমপত্রের গদ্যও ভিন্ন। যেন প্রায় সাহিত্য। প্রেমে তীব্র আবেগ থাকে। ভাষায় সেই আবেগ প্রতিফলিত হয়।

তবে আশ্চর্য এই যে, জনপ্রিয়তম প্রেমের সংলাপের অধিকাংশই আবেগঘন অনুভূতির নয়। ‘তুমি যদি আজ আমাকে ওথেলোর মতো গলাটিপে মেরে ফেলতে’Ñ এই বিপজ্জনক সংলাপ শুনে কৃষ্ণেন্দু রিনা ব্রাউনকে ভালোবেসেছে। এক মুহূর্তে কী হয়ে গেল কৃষ্ণেন্দুর। যেন একটা প্রকা- উঁচু বাঁধ টলতে টলতে হেলে-ঢলে সশব্দে ভেঙে ভূমিসাৎ হয়ে গেল। বাঁধ ভেঙে পড়ল আর উন্মত্ত জলস্রোত ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো জীবনের সব আবেগ ঝাঁপিয়ে পড়ল রিনা ব্রাউনের ওপর। সেদিন থেকে রিনা ব্রাউনকে উন্মাদের মতো ভালোবাসে কৃষ্ণেন্দু। ভালোবাসায় ভালো ভাষার তেমন ভূমিকা নেই হয়তো।

কালাচাঁদ আশ্চর্য ছেলে। সামান্য কৌতুকে হা হা হাসে। দুরদার সিঁড়ি ভেঙে নামে। অশুদ্ধ গ্রাম্য উচ্চারণ। অসংকোচে কথা বলে। অহরহ প্রশ্ন। প্রমিত কেনকে উচ্চারণ করে কেনে বলে। অথচ এই অকাট্য গ্রাম্য ছেলেটিরই কিনা প্রেমে পড়ল কলেজের সবচেয়ে ফ্যাশনসচেতন রিনা ব্রাউন। তবে কি আশ্চর্য ছেলেদের বাজারদর বেশি? আশ্চর্য মেয়েদেরও কি প্রেমের বাজারে মূল্য বেশি? জানা নেই।

এই মুহূর্তে পৃথিবীর যত কোটি মানুষ প্রেমজ সম্পর্কের মধ্যে আছেন, তাদের প্রত্যেকের প্রেমে পড়ার কারণ ভিন্ন ভিন্ন। একজন যে কারণে অন্যের প্রতি প্রেমের আকর্ষণ বোধ করছেন, অন্য আরেকজন ওই একই কারণে বিকর্ষণ অনুভব করতে পারেন।

দ্রুতগামিনী, দ্রুতহাসিনী, দ্রুতভাষিণী, মিষ্ট স্বভাব দেখে কবি উপন্যাসের রাজার ভালো লেগেছিল ঠাকুরঝিকে। ছিপছিপে ঠাকুরঝি, ঠিক যেন ভেজা একটি কাশফুল। সপ্তপদীর কৃষ্ণেন্দু আবার রিনা ব্রাউনকে পছন্দ করছে ঠিক তার বিপরীত রূপের জন্য। স্ট্রেইঞ্জ গার্ল! আশ্চর্য বন্য! কী হাসতে পারে! কী প্রচ- রাগ! কী মদ খায়! কী সিগারেট টানে! ভালোবাসার অনুভূতি বিচিত্রই বটে। কেউ নিখুঁত পলিশড নখ পছন্দ করেন তো কারো আবার পছন্দ নখের ডগায় নিকোটিনের দাগ। বিপরীত সাংস্কৃতিক রুচি এবং বিপরীত রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রেমের ক্ষেত্রে বাধা কিনা। উত্তর পাওয়া যাচ্ছে শেষের কবিতায়। যেখানে খুব করে মিল, সেখানেই মস্ত বিরুদ্ধতা। বৈপরীত্য প্রেমের ক্ষেত্রে ইতিবাচক সূচক হিসেবে কাজ করে।

প্রেমিকার রূপ প্রেমিকের উন্মাদনার একটি প্রধান অনুষঙ্গ। জগদ্বিখ্যাত প্রেম উপাখ্যানগুলোয় প্রেমিকার মোহনীয় রূপের তীব্র প্রকাশ দেখি। এই ধারার বাইরে প্রেমিকার রূপে আরেকটি নতুন মাত্রা সংযোজন করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। এই রূপবতীদের নাম মায়াবতী। যে প্রেমিকাকে ধরা যায়, ছোঁয়া যায়, জীবন্ত বলে অনুভব করা যায়, নানাভাবে সেই অনুভূতির বর্ণনা আছে হাজার হাজার। সবই হৃদয় উদ্দীপক, সন্দেহ নেই।

তিন.

প্রেমিক হিসেবে দেশে দেশে সর্বাধিক খ্যাতিমানদের তালিকায় কার স্থান প্রথম? পশ্চিমে রোমিও। প্রাচ্যে কৃষ্ণ। পারস্যে মজনু, ফরহাদ। এতসব বিখ্যাত প্রেমিকের ভিড়ে আজকের ভালোবাসার এই দিনে কারো কি ডাকাত বংশের দলিত জন কবিয়াল নিতাই চরণের কথা মনে পড়বে?

প্রেমিক নিতাই চরণ শ্মশানের ভেতর বসন্তের চিতার পাশটিতে বসিল। কেন? নিতাই চরণ শুনেছে, দেহ ঘর সংসার স্বজন পৃথিবী হারিয়ে অসহায় মানুষের আত্মা নাকি মলিনের মমতায় অনেক সময় কেঁদে কেঁদে ফেরে। গভীর নিশীথ রাতে বসন্ত যদি একবার আসে চিতার পাশে! তার অনেক রূপের অনেক সাধের দেহখানির সন্ধানে! ভাবতেই বুকখানা স্পন্দিত হয়ে উঠল নিতাই চরণের। চিতার পাশে বসে মনে মনে বলল বসন এসো! ... বসন এসো! ... বসন এসো! কিন্তু বসন আসিল না। সমস্ত রাত্রি শ্মশানে শিয়াল, কুকুর এবং শ্মশানচারীদের মধ্যে কেটে গেল। গাছে শকুন কাঁদল। গঙ্গার জলে কত জলচর সশব্দে ঘাই মারল কিন্তু কোনো কিছুর মধ্যেই বসনের আভাস মিলল না। চোখ মুছে বিচিত্র হেসে নিতাই কবিয়াল গলা ছেড়ে গাইলÑ এই খেদ আমার মনে, ভালোবেসে মিটল না সাধ, কুলাল না এ জীবনে/ হায় জীবন এত ছোট কেনে!

চার.

স্বীকার করে নেওয়া ভালো ভালোবাসা বিষয়ে বিপুল পরিমাণ অজ্ঞতা নিয়ে এ লেখা। প্রাজ্ঞ-বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞরা বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নিশ্চয়ই বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। বুদ্ধিমানরা সব কাজেই সতর্ক, সাবধানী ও বিচক্ষণ। বোকারা সিদ্ধান্ত নেয় কোনোরকম চিন্তাভাবনা না করে। শতভাগ অসাবধানতার সঙ্গে। সব রকম অজ্ঞতা-মূর্খতা নিয়ে। রূপ রস বর্ণ গন্ধ ছন্দ গীতি স্বাদ মাধুর্য মন স্নেহ প্রেম সান্ত¡না করুণা যন্ত্রণা বিরহ এবং মিলনের সীমাহীন পরিসরের যে ভালোবাসা মোটে হাজারসংখ্যক শব্দ দিয়ে তাকে ধরতে চাওয়া মূর্খতা ছাড়া কী।

য় জয়া ফারহানা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে