দুর্নীতি নামের বিষবৃক্ষের ফল তা হলে ‘কুল’!

  অঘোর মন্ডল

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষগুলো সম্পর্কে এ দেশের জনমানসে যে ধারণা তা খুব স্বচ্ছ। উজ্জ্বল। সেই দাবি জোর গলায় করা যায় না। বরং বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে যেসব তথ্য বেরিয়ে আসে, তাতে গলার আওয়াজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। কখনো কখনো অস্ফুট স্বরে গলা থেকে বেরিয়ে পড়ে, ‘হায় রাজনীতি! হায় দুর্নীতি!’

আরও একটু স্পষ্ট করে বললে বলতে হবেÑ রাজনীতি, ক্ষমতা আর দুর্নীতি। এই তিনের দুর্দান্ত যুগলবন্দি দেখার দুর্ভাগ্য এ দেশের মানুষের বারবার হয়েছে। কখনো স্বৈরাচার নামে। কখনো গণতন্ত্রের লেবাসে! অবিশ^াস্য হলেও সত্য, এ দেশের ইতিহাস সেই তথ্যই দিচ্ছে। সাতচল্লিশ বছরের এই বাংলাদেশে তিন-তিনজন সরকারপ্রধান দুর্নীতির দায়ে জেলে গেছেন। আবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ বহুবার শীর্ষে থেকেছে। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা সেটাকে বলেছেন অপপ্রচার। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার ষড়যন্ত্র। ক্ষমতায় থাকা লোকগুলো বলেন অপপ্রচার। আর ক্ষমতার বাইরে থাকা লোকগুলো সেটাকে বানান ক্ষতাসীনদের ঘায়েল করার হাতিয়ার। দেশের সাধারণ মানুষ একরাশ বিস্ময় নিয়ে শুনতে থাকে রাজনীতিবিদদের সেই তরজা।

দুর্নীতির ইতিহাস এ দেশের সাধারণ মানুষের নিরন্তর দুঃসহ স্মৃতির অবলম্বন। দেশ স্বাধীনের পর হতাশায়-ক্ষোভে-দুঃখে জাতির পিতা নিজেই বলেছিলেন, ‘সবাই পায় সোনার খনি। আর আমি পেয়েছি চোরের খনি!’ নিজের ব্যক্তিগত সততা-ভাবমূর্তির স্বচ্ছতা এবং জনগণের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল বলেই বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ওটা বলা সম্ভব হয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তার চারপাশে ঠগজোচ্চর ভিড় করেছে। তার মৃত্যুর পর সত্যিই দেখা গিয়েছিল, সেই ঠগজোচ্চর, অপরাধী, ক্ষমতালোভী মানুষগুলো আবার ক্ষমতায়! তফাত শুধু তাদের দলীয় সাইনবোর্ডে।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে থেকে দুর্নীতির দায়ে প্রথম কারাবাস করতে হয়েছে খন্দকার মোশতাককে। তার পর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। যার দুর্নীতি শুধু জনশ্রুত নয়। প্রমাণিত। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর তাকে জেলে যেতে হয়েছে। আটাশ বছর পর এক পৃথিবী মানুষ দেখল এবং জানল বাংলাদেশের আরেকজন সাবেক সরকারপ্রধানকে দুর্নীতির দায়ে জেলে যেতে হলো! বিশ^বাসীর কাছে বার্তাটা পরিষ্কার, বাংলাদেশের দুর্নীতি নিয়ে যেসব কথা শোনা গেছে তা একেবারে সারবর্তাহীন নয়। দেশের জন্য এটা খুব ভালো বার্তা তা নয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায়কে আদালতের বারান্দা থেকে রাজনীতির বিশাল ময়দানে টেনে আনার চেষ্টা হচ্ছে। আর সেটা করছেন রাজনীতিবিদরা। বিএনপি এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দুই দলই চাইছে এই রায়ের রাজনৈতিক ব্যবহার। ব্যবহার এবং অপব্যবহারের মাঝখানের সীমারেখা আমাদের বেশিরভাগ রাজনীতিবিদের অজানা। যে কারণে দুর্নীতি এত প্রবলভাবে ঢুকে পড়েছে রাজনীতিতে। শুধু রাজনীতি নয়। রাষ্ট্র, সমাজ সব জায়গায় একই অবস্থা, যা একটা কল্যাণকামী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য মোটেও শুভকর নয়।

জেলে থেকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একাধিক জায়গা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার ছেড়ে দেওয়া আসনে তার মন্ত্রিপরিষদের প্রভাবশালী লোকজন পরবাসী হয়ে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে এসেছিলেন। তাতে কি এরশাদ দুর্নীতিবাজ ছিলেন না দাবি করা যাবে! যদি তাই হয়, তা হলে তার বিরুদ্ধে করা আন্দোলন-সংগ্রামকে উপহাস করা হবে। এরশাদের দুর্নীতির সাইনবোর্ড বুকে নিয়ে কারওয়ান বাজারের জনতা টাওয়ার দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। সেই টাওয়ারের ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে রাজনীতিতে এরশাদকে ব্যবহার করা শুরু হয়েছে আরও আগে। যে কারণে গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত এরশাদ আবার বিভিন্নভাবে ক্ষমতার বিভিন্ন অলিন্দে! ক্ষমতার অংশীদারিত্ব পেয়ে এরশাদের দলের লোকজনও এখন এ দেশের মানুষকে ইতিহাসের বাণী শোনাচ্ছেন! আমরা মুগ্ধ শ্রোতার মতো শুনছি। কারণ দেশের দুটি বড় রাজনৈতিক দলই এরশাদকে ব্যবহার করেছে ক্ষমতায় থাকা আর ক্ষমতায় যাওয়ার অনুঘটক হিসেবে!

এরশাদের দুর্নীতির সাক্ষী হয়ে কারওয়ান বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা জনতা টাওয়ারের ব্যবহার শুরু হয়েছে। আবার দুর্নীতির দায়ে দ-িত হয়ে এরশাদ যে কারাগারে ছিলেন বেশ কিছুদিন আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা নাজিমউদ্দিন রোডের সেই জেলখানারও আবার ব্যবহার শুরু হয়েছে। নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারের বাসিন্দা এখন খালেদা জিয়া। একাধিকবার যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। খালেদা জিয়ার কারাবাস নিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির এক সংসদ সদস্য বলেছেন, ‘এটা ইতিহাসের প্রতিশোধ!’ কারণ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় এরশাদকে দুর্নীতির দায়ে জেল খাটতে হয়েছিল।

সত্যিই কি ইতিহাসের প্রতিশোধ! নাকি ইতিহাসের সঙ্গে এক ধরনের পরিহাস! এরশাদের লোকজনের কাছ থেকেও এখন এ দেশের মানুষের ইতিহাসের বাণী শুনতে হচ্ছে! হায় রাজনীতি। হায় ক্ষমতা। রাজনীতিবিদরা যাই বলুন, ইতিহাস নির্মম। নিষ্ঠুর। তবে সেই ইতিহাসেরও পশ্চাৎগতি হয়। সে কারণে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দলের একজন এমপি খালেদা জিয়ার কারাদ-ের পর বিদেশি পত্রিকায় বলেছেন, ‘জেলখানায় এরশাদ একটা কুলগাছ লাগিয়ে এসেছিলেন। এতদিনে তাতে ফল ধরেছে। জেল কর্তৃপক্ষকে বলব, কারাবিধিতে আপত্তি না থাকলে সেই কুল যেন তারা খালেদাকে খেতে দেন!’ এ কথা বলা এবং এরশাদের লাগানো কুলগাছকে টেনে আনলে এরশাদের গা থেকে দুর্নীতিবাজের তকমা খসে পড়বে তা নয়। বরং এটা রাজনীতিবিদদের ইতিহাস নিয়ে পশ্চাৎমুখী চিন্তার বহির্প্রকাশ। ইতিহাসের পশ্চাৎগতি আছে। তবে সেটা হচ্ছে ব্যতিক্রম। আজ এরশাদ এবং তার লোকজন আবার ক্ষমতার কিছু অংশীদারিত্ব পাচ্ছেন এটা ইতিহাসের পশ্চাৎগতি। তবে ইতিহাসের এই পশ্চাৎগতি শেষ কথা বলে না। অগ্রগতি শেষ কথা বলে। খালেদা জিয়াও ইতিহাসের পশ্চাৎগতির সঙ্গে তাল রেখে পা ফেলতে গিয়ে এরশাদের সঙ্গে চারদলীয় জোট করেছিলেন। শেখ হাসিনার সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য খুব কাছাকাছি চেয়ারে বসে সভা-সমাবেশ করেছিলেন। সে সময় জেলখানা, ছোট কুলগাছের কথা কি তিনি এবং তার লোকজন ভুলে গিয়েছিলেন! স্বৈরাচার-সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধে খালেদা জিয়া বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছিলেন। ইতিহাসের পশ্চাৎগতি অনুসরণ করে রাজাকারদের গাড়িতে পতাকা তুলে দিয়েছিলেন! আজ খালেদা জিয়া জেলে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাইরে। পরিবর্তিত সময়ে শুধু কুলগাছটা বড় হয়েছে। তাতে ফল ধরেছে। তবে এটাও ঠিক, এই দেশ দুর্নীতিমুক্ত হয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ দূর হয়ে গেছে। স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি বলে যারা ছিলেন তারা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছেন, ইতিহাসের খুব অগ্রগতি হয়েছে তাও নয়।

এতিমের টাকা মেরে খাওয়া আদালতের চোখে আপাতত দুর্নীতি। দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের জন্য খালেদা জিয়ার কারাবাস সতর্কবার্তা, এটা ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের চোখে। কিন্তু হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে সোনালী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া, বেসিক ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা লুটপাটের যে খবর বেরিয়েছে, তা কি কোনো বার্তা দিচ্ছে! যদি দেয় সেটা কী আমরা পড়তে পারছি? দলকানারা পড়তে পারবেন না এটাই স্বাভাবিক। দলদাসরা সেই কেলেঙ্কারির দায় কাঁধে বয়ে বেড়াবেন এটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তবে অস্বাভাবিক লাগে যখন অনিয়ম-দুর্নীতির দায় এড়াতে সরকারের দায়িত্বশীল লোকজন অন্যকে দোষ দিয়ে পার পেতে চান। জনতা ব্যাংককে একজন সাবেক চেয়ারম্যান ডুবিয়েছেন। অনিয়ম করেছেন। কিন্তু সেই লোককে যিনি নিয়োগ দিয়েছিলেন তিনি কী ব্যাংক ডুবছে দেখে চোখ বন্ধ করেছিলেন! জনমনে এই প্রশ্ন জাগছে। হয়তো ব্যাংক আইন-নিয়ম-রীতি-প্রশাসনিক পদ্ধতি-প্রক্রিয়া তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। তবে তাদের মনে একটা ধারণা জন্ম নিচ্ছে, অনিয়ম কোথাও না কোথাও হচ্ছে। তা না হলে মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল একজন সদস্য কেন ‘ডুবিয়েছেন’ শব্দটা উচ্চারণ করবেন! এক একজন এক একটা ব্যাংক ডুবাচ্ছেন। আর দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা চেয়ে চেয়ে দেখছেন। আইন আর সময় আগামীতে তাদের অন্যভাবে দেখবে না তো!

পুনশ্চ ইতিহাসের হয়তো পশ্চাৎগতি আছে। তবে অগ্রগতি হচ্ছে তার শেষ কথা। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা ইতিহাসকে ব্যবহার করেন শুধু অতীত দিয়ে বর্তমানকে আড়াল করতে। ইতিহাসের ‘অ্যারো মার্ক’ দেখে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে না পারলে পরিত্যক্ত কারাগারও ঠিকানা হয়ে যায়। আর সেখানের একটা ‘কুলগাছ’ দেখিয়ে বলার সময় আসেনি এই রাষ্ট্র, সমাজ থেকে দুর্নীতির ‘বিষবৃক্ষ’ উপড়ে ফেলেছেন আমাদের রাজনীতিবিদরা। দুর্নীতির বিপ্রতীপে আমাদের রাজনীতিবিদদের অবস্থান। সেটা স্পষ্ট স্বরে বলার অপেক্ষায়ই থাকতে হচ্ছে এখনো আমাদের।

অঘোর মন্ডল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে