তারুণ্য এবং মনন

  কাজী রাফি

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১২:১৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

তারুণ্য কী? তারুণ্যভরা মননের প্রকৃতি এবং ধরন কেমন? বর্তমান বিশ্বের আধুনিকমনস্ক মানুষ হিসেবে আমরা জানি যে, তারুণ্য বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। মানবের মনন এবং অন্তর্লোকের আনন্দলোকের সঙ্গে তারুণ্যের রয়েছে নিবিড় এক যোগসূত্র। তার মানে মননের গড়ন, সতেজতা আর প্রাণপ্রাচুর্যতা তারুণ্যের সবচেয়ে বড় উপাদান। প্রশ্ন জাগে মনের এই সতেজতার উৎস কী কী হতে পারে? এই সতেজতা আর প্রাণবন্ততার উৎস অনেক কিছুই হতে পারে। বনের ধারে ফুটে থাকা সামান্য এক বুনোফুল, আবেগ ধরে নাড়া দেয় এমন কোনো সংগীত অথবা কবিতা, প্রিয় কোনো উপন্যাস, কোনো কল্পনাপ্রবণতা, দৃশ্যকল্প এমনকি বৃষ্টিলগ্নে মায়ের হাতের প্রিয় রান্না। উৎস যাই-ই হোক, এই উৎসের উৎসবমুখরতার সেই মনন নামের উনুনে আগুন দেয় কিন্তু ভালো ভালো গ্রন্থ। অর্থাৎ আমাদের মননের মানদ- যা জীবনের এই উৎসবকে উপলব্ধি করার জন্য প্রস্তুত করে তা নির্ধারণ করার মাধ্যম হলো বই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ পাওয়ার ধরন পাল্টাতে থাকে। কিন্তু ভালো গ্রন্থ মনের যে প্রকৃতি গড়ে দেয় সেই প্রকৃতিই একজন মানুষকে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার আনন্দ-অভিযোজনের প্রক্রিয়াকে সঠিকভাবে রপ্ত করতে শেখায়।

একটা কথা অদ্ভুত শোনালেও সত্য যে, অন্য অনেক উপাদানের সঙ্গে উপন্যাস/গল্প/কবিতা একটা জাতির মনন নির্ধারণ করে দেয়। সে জন্যই মহান সব কবিতা আর উপন্যাসগুলো সে দেশের ভাষাকেই শুধু স্থায়িত্ব দেয় না, তা মানব অনুভবের সূক্ষ্মতা ধারালো করে, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে। উপন্যাসের চরিত্রগুলো রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়েও অনেক সময় পাঠককে বেশি প্রভাবিত করে। কারণ শক্তিশালী সেই চরিত্রগুলো পিতা-মাতা, বন্ধু অথবা শিক্ষকের চেয়েও আপন হয়ে অজান্তেই তার সঙ্গে বাস করে।

সংস্কৃতি একটা জাতির সুস্থ মনন তৈরির কারখানা। তবু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি থাকা সত্ত্বেও তার চর্চা কমে যাচ্ছে। ভালো মানের গ্রন্থপাঠ হচ্ছে কম। সস্তা মানের উপন্যাস, নাটক অথবা গল্প-কবিতার চর্চার ফলে সস্তা মননের একটা জাতি তৈরি হয়। বর্তমানের অনেক নাটক অথবা উপন্যাসে আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করি, গল্পের চরিত্রগুলো কেউ কোনো কাজ করছে না, হয় একে অন্যের প্রতি বিষোদ্গার করছে, না হলে শুধু কথা বলছে (অমৃত কোনো কথা নয়, স্রেফ প্যাঁচাল)। নাটকের নায়ক-নায়িকা সেজেগুঁজে শুধু স্থান পরিবর্তন করছে, আর হাঁসের মতো প্যাঁক প্যাঁক করে শুধু কথা বলছে। তাদের কথোপকথন এক সময় ঝগড়ায় গড়াচ্ছে। তাদের অভিনয়-অভিব্যক্তিতে জীবন সংশ্লিষ্টতা নেই, বাংলা উচ্চারণে মমতা নেই। কর্মের ওপর দাঁড়িয়ে নেই কোনো চরিত্র! আদর্শ তো নয়ই, এই চরিত্রগুলো পাঠকের বা দর্শকের পছন্দ হলেও ক্ষতি কিছু একটা হয়েই যায়।

স্মার্টফোনে স্মার্ট হওয়ার কৌশল হিসেবে অনবরত মিথ্যা বলা, মুখে ফুসকে দাড়ি রাখা, অনেক তরুণের মাঝেও এই প্রবণতা আজ লক্ষণীয়। মগ্নতা ছাড়া ভালোবাসা, সাধনা ছাড়া সফলতা, পরিশ্রম ছাড়া অর্থ উপার্জন, বই ছাড়া আত্মার পরিশুদ্ধি যে হয় না, এ কথাগুলো তরুণদের হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। তাদের বুঝতে হবে, জীবনের সময় বড় সংক্ষিপ্ত তাই তা সবচেয়ে মূল্যবান। সারাক্ষণ চোখের সামনে (টিভি, ফেসবুক নামের দূরবর্তী এক জীবনের রঙিন অংশটুকু, বিলবোর্ড, ল্যাপটপ সর্বত্র) রঙিন জীবন দেখে অভ্যস্ত অনেক তরুণ ভুলেই গেছে; জীবনটা আসলে সাদা-কালো। প্রকৃতির সবুজে, রিমঝিম বৃষ্টির ছন্দে, সাঁঝের আলো-আঁধারিতে এমনকি প্রেমিকার মায়া-স্পর্শে স্রোতে গা ভাসানো এই তরুণদের সত্তা আর মায়ালোক খুঁজে পায় না।

তাই-ই যদি হয়, তা হলে আমাদের ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। প্রশ্ন জাগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলার মহান কবিদের কবিতা অথবা তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর ছোটগল্পের কিংবদন্তি স্রষ্টা হাসান আজিজুল হকÑ তাদের মতো অসংখ্য কথাশিল্পীর অনবদ্য সৃষ্টি তা হলে আমাদের মননকে উন্নত স্তরে নিল কই? সহজভাবে আমার কাছে এর উত্তর হলো, আমাদের মহান গ্রন্থগুলো হয়তো সেভাবে আসলেই পঠিত হয় না, যেভাবে সস্তা উপন্যাসগুলো পঠিত হয়। তবে এর আরও একটি কারণ হতে পারে, আমাদের পুঁথিপাঠের ইতিহাস আমাদের কানকে শুধু শোনার জন্য প্রস্তুত করেছে। গ্রামের শীতল ছায়ায় বসে আমাদের পূর্বপুরুষদের পুঁথিপাঠ শোনার যে অভ্যাস তাই-ই আমাদের ডিএনএতে প্রোথিত। শোনার অথবা মুখে বলার জন্য আমরা যেভাবে অভ্যস্ত, পড়ার জন্য আমাদের মানসিকতা সেভাবে গড়ে ওঠেনি।

উপন্যাস আর গল্প পাঠের জন্য যে শহুরে সংস্কৃতি প্রয়োজন সেই মাত্রার আর্বানাইজেশন-কালচার আমাদের দেশে গড়ে উঠলে ভালো মানের গ্রন্থ পাঠের পাঠক বেড়ে যাবে এবং সার্বিকভাবে আমাদের মনন উন্নত হবে। উন্নত মননের অধিকারী একজন মানুষই অন্যায়-অবিচারের প্রতি যেমন সোচ্চার হতে জানেন, তিনি তেমনি ঘুষ খাওয়াকে ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। সমৃদ্ধ মননের একজন মানুষ শুধু একজন পদবিধারী অথবা ক্ষমতাধর অথবা পয়সাওয়ালা মানুষ হওয়ার চেয়ে সত্যিকারের একজন ভালো মানুষ হওয়ার তাগাদা বা প্রয়োজন অনুধাবন করেন। আর এসবই তারুণ্যভরা মননেরই প্রতীক।

আর প্রিয় এই অনুভবের সঙ্গে বাস করার জন্য বই-ই একজন মানুষের প্রিয় বন্ধু। অনেকেই মনে করেন আগামী স্মার্ট প্রজন্ম কাগজের মোটা ভারী বই নয়, বরং ল্যাপটপে হাজার হাজার বই নিয়ে ঘুরবে। হয়তো তা-ই হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো তরুণদের কম্পিউটার এত নিরীহ নয়। ল্যাপটপ নামের যন্ত্রটিতে ফেসবুক আর উদ্ভিন্ন এক জগতের হাতছানিও থাকবে। এখানে প্রবেশ করামাত্র বইয়ের চেয়ে বরং ল্যাপটপের পেটে সংরক্ষিত সেই উদ্ভিন্ন জগৎটাই তরুণদের কাছে মোহনীয় মনে হবে। বইয়ের চেয়ে আকর্ষণীয় ওই জগৎটাই তরুণদের জীবন থেকে কেড়ে নেবে তাদের মূল্যবান সময়। পৃথিবীতে এইডস ছড়ানোর ইতিহাসটা আমরা অনেকেই জানি। মানব চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়ার নতুন এক ইতিহাসের দিকে পৃথিবী হয়তো ধাবমান।

আমরা এমন সমাজ চাই না, যে সমাজের তরুণদের মাথাভর্তি তথ্য, পেটভর্তি জটিলতা, হৃদয়ভর্তি স্বার্থ, মনভর্তি সন্দেহ আর চোখভর্তি লেন্স। আমরা সেই সমাজ চাই, যে সমাজের তরুণরা পাশে বাস করা প্রিয় মানুষদের দিকে মমতামাখা চোখে তাকায়। প্রাণোচ্ছল এসব তরুণের জন্য পড়শি আর বয়সীদের পথচলা আনন্দমুখর হয়ে ওঠে। পাতার মর্মর শোনার জন্য, ঝরনার ছন্দ শোনার জন্য যে তরুণরা পাহাড় অতিক্রম করে। প্রিয় নারীর জন্য সারারাত শরীর ভিজিয়ে নেয় শিশিরে।

আমরা সেই তরুণ চাই, যারা সমৃদ্ধ এবং প্রিয় গ্রন্থের সান্নিধ্যে জীবনরস খুঁজে নেয়। মানুষের চেয়েও জীবন্ত এসব গ্রন্থ তারা যেমন লালন করবে, বস্তাপচা প্যাঁচালগুলোকে তেমনি তারা আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলবে। আমাদের তরুণরা প্রাণময়তায় জীবনটাকে উপভোগ করবে। মাথাভর্তি তথ্য নিয়ে দূরবর্তী কোনো জীবন নয়, আলোহীন-স্পন্দনহীন যে জীবন তাকে নয়, তারা আলিঙ্গন করবে এই পৃথিবীর অনন্য মায়ালোক, এর কিচিরমিচির জেগে ওঠা ভোর। তারা ফিরবে বিকালের ম্লান আলোয়... ঘাসে শুয়ে শুয়ে হয়তো মাত্র একটা বই পড়ার স্মৃতিলোকে। তরুণদের নিশ্চিত জানা প্রয়োজন যে, যা কিছু জীবন্ত, অদৃশ্য কিছু তার চেয়ে মহৎ নয় কখনই।

সাধনা-আরাধনা শব্দ থেকে বঞ্চিত জীবন ঠিক মানুষের জীবন নয়। হতে পারে না। তারুণ্য মানে জীবনের গতিকে তীব্রভাবে উপলব্ধি করা, ত্যাগ করার অনন্য মানসিকতাকে হৃদয়ে ধারণ করা। কবিতাকে মননে বেঁধে সুরের বাঁশিটাকে আকুল আবেগে বাজানো। ইয়াবা সেবন করে, মদ-গাঁজায় আসক্ত হয়ে শরীর নামের মন্দিরটাকে যারা সেই অনন্য অনুভবের মাত্রা উপলব্ধি করার সক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে তারা স্রষ্টার মহান ত্যাগের মহিমাকে, এই জীবনের অনন্য-অপূর্ব আনন্দ গ্রহণ থেকেও বঞ্চিত হয়। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম বলেছিলেন, ‘হাজার বন্ধুর চেয়ে একটা ভালো গ্রন্থ থাকা ভালো। আর একজন ভালো বন্ধু একটা লাইব্রেরির সমান।’

একটা দেশের সমৃদ্ধি তার সমৃদ্ধ অর্থনীতির ওপর আপাতদৃষ্টিতে নির্ধারিত হলেও দূরভবিষ্যতে সেই জাতির প্রকৃত সফলতা আসে তাদের আচরণগত উৎকর্ষের ওপর। আর আচরণগত উৎকর্ষ নির্ভর করে সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক পরিস্থিতি, মানুষের সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যকে নিবিড়ভাবে পরিচর্যা, ভাষাচর্চা তথা সাহিত্য এবং শিল্প-সংস্কৃতির মানের ওপর। আমাদের আচরণ যত হবে তারুণ্য তথা প্রাণময় আমাদের মননের উৎকর্ষ তত বিস্তৃত হবে বিশ্বজুড়ে। আমাদের তারুণ্যভরা মনন সমাজ থেকে সব পঙ্কিলতা, হিংসা-দ্বেষ বিতারণ করবে। নিয়ে আসবে আলোর পরশ বোলানো স্নিগ্ধ ভোরÑ এই প্রত্যাশা।

কাজী রাফি : কথাসাহিত্যিক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
close