সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে শিশু ভয় নয় সতর্কতা প্রয়োজন

  ডা. ছায়েদুল হক

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ সামাজিক জীব। সম্পর্ক তৈরির বাসনা এবং সম্পর্ক তৈরি করা হলো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। মানবদেহের মূলে আছে ডিএনএ এবং এই ডিএনএর গভীরে লুকানো থাকে সম্পর্ক গড়ার তাগিদ। তাই মানুষ সম্পর্ক গড়তে উন্মুখ হয়ে থাকে। এ কারণেই যখন মানুষ তার হাতের কাছে সহজেই সম্পর্ক গড়ার এই সামাজিকমাধ্যমটি পেল, সবাই একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শত চেষ্টা করেও সে নিজেকে বা সন্তানকে নিবৃত্ত করতে পারল না। সামাজিকতার ধারণাটাই পাল্টে যাচ্ছে। আগের মতো নির্দিষ্ট গ-িতে বিষয়টি সীমাবদ্ধ নেই। যদিও এর গভীরতা প্রশ্নাতীত নয়। তবুও এটাই বাস্তবতা, সামাজিকতার ধারণা পাল্টে যাচ্ছে এবং খুব দ্রুত। শিশুরাও এর থেকে মুক্ত নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার ভালো দিক, খারাপ দিক সবই আছে।

ভালো দিকে যেমনÑ শিশু বা তরুণদের জন্য এটি শুধুই সামাজিক যোগাযোগ নয়। এতে ওরা নিজেদের মধ্যে তথ্য-উপাত্ত আদান-প্রদান করার সুযোগ পায় ফলে হোমওয়ার্ক বা গ্রুপ প্রজেক্টে লাভবান হয়ে থাকে। এ ছাড়া সৃষ্টিশীল কাজেও মাধ্যমটি সহায়ক ভূমিকা পালন করে। স্কুলে, খেলাধুলায় বা কোনো প্রোগ্রামে পরিচয় হলে সেই বন্ধুত্বকে ধরে রাখা সম্ভব হয়। অনেক লাজুক স্বভাবের ছেলেমেয়ে যারা এমনিতে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না বা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকে তাদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া একটি সুযোগ। এখানে একজন খুব সহজে নিজের পছন্দের বিষয় বা চিন্তাভাবনা অন্যের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে এবং এটি তাৎক্ষণিক বা অনটাইম।

ভালো দিক যেমন আছে, তেমনি সোশ্যাল মিডিয়ার খারাপ দিকেরও শেষ নেই। বিশেষ করে শিশুর ওপর এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব প্রবল। শিশুরা মানসিক প্রশান্তি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। ওরা মানসিক বিষাদগ্রস্ততায় বেশি ভুগে থাকে। যারা দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত ফেসবুকে থাকে তাদের মধ্যে এক ধরনের আত্মকেন্দ্রিকতার বিকাশ ঘটে। তারা নিজেদের নিয়ে এক ধরনের অতিরঞ্জিত আত্মতৃপ্তিতে ভোগে। তাদের মধ্যে অসামাজিক ও হিংস্র আচরণের প্রার্দুভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়। এ ছাড়া সাইবার বুলিংয়ের প্রতিক্রিয়া এদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এরা খুবই বিষাদগ্রস্ত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বন্ধু-বান্ধব বা আপনজনদের কাছ থেকে নেগেটিভ কমেন্ট বা তির্যক মন্তব্য এদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া প্রমোশন বা অ্যাডভার্টাইজমেন্ট খুব গভীরভাবে এদের প্রভাবিত করে থাকে। ফলে এরা বিভিন্ন ধরনের অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বা খাওয়া-দাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। সময়ের অপচয় একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ খারাপ দিক। একটি টুইট বা পোস্ট দেখে এবং কমেন্ট করে বেরিয়ে আসতে গড়ে প্রায় ১৫-২০ মিনিট সময় লেগে যায়। আরও একটি খারাপ দিক হলো হঠাৎ করেই পর্নো অথবা পর্নোটাইপ পোস্টের মুখোমুখি হওয়া এবং এই বয়সে এসব সাইটে আকৃষ্ট হওয়াটাই স্বাভাবিক। আরও একটি বিষয় গেম। উত্তেজনাকর বা ফ্যান্টাসিনির্ভর এই গেমগুলো এদের মনকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে যে, ওরা বাস্তব এবং ফ্যান্টাসিকে গুলিয়ে ফেলে। রাতে যত বেশি সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করবে তত বেশি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অধিকতর সময় ব্যয় করা মানে স্বাভাবিক খেলাধুলা এবং বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে বাস্তবে আড্ডা বা মেলামেশা কমিয়ে দেওয়া। এটি শারীরিক ও মানসিক বিকাশের অন্তরায়। এতে বই পড়ার অভ্যাসেও পরিবর্তন লক্ষণীয়।

এতসব খারাপ দিক থাকার পরও একজন বাবা-মা কি সন্তানের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার দরজা বন্ধ করে দেবেন? এটা কি বাস্তবসম্মত হবে। আসলে এ নিয়ে এখন প্রচুর মতভেদ চলছে। এ নিয়ে খুব বেশি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার সুযোগ এখনো হয়নি। তবে প্রযুক্তিকে রুখে দেওয়া বা প্রযুক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা কোনোটিই সম্ভব নয় বিধায় লক্ষ্য হতে হবে এর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং এর কুফল থেকে প্রজন্মকে রক্ষা করা। এ লক্ষ্যে বাবা-মা এবং পরিবারের সদস্যদেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

প্রথমেই মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর বেড়ে ওঠা বা বিকশিত হওয়া একটি সার্বিক চর্চার বিষয়। এতে শারীরিক ও মানসিক উভয়বিদ চর্চা যেমনÑ উন্মুক্ত মাঠে খেলাধুলা, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে আড্ডা বা সময় কাটানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাবা-মার প্রথম কাজ হবে সন্তানের পড়ালেখার ফাঁকে যেটুকু অবসর তার সদ্ব্যবহার করা। অর্থাৎ সন্তানের অবসর সময় যাপনে খেলাধুলা, বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়স্বজন, বিশেষ করে সমবয়সী কাজিন বা ভাইবোনদের সঙ্গে সাক্ষাতে সময় কাটানো, পাঠ্য বিষয়ের বাইরে পড়াশোনায় সময় দেওয়া, বেড়ানো, বিশেষ করে পরিবারের সঙ্গে ইত্যাদি বিষয় প্রাধান্য দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াকে সন্তানের জন্য উন্মুক্ত রাখা।

দ্বিতীয় কাজটি হলো সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সন্তানকে সহযোগিতা করা। যেমন দিনের কোন সময়টা, কতক্ষণ সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটাবে, বন্ধু নির্বাচনে কতটুকু সতর্কতা অবলম্বন করবে, অপ্রয়োজনীয় সাইট বা লিংক চিনতে ও পরিহার করে চলতে সহযোগিতা করা, সুযোগ থাকলে ওই লিংকগুলো বন্ধ রাখা, বিরূপ কোনো পোস্ট বা কমেন্টের মুখোমুখি হলে তা কীভাবে মোকাবিলা করবে তাতে সহযোগিতা করা, সন্তান কার সঙ্গে কখন কী বিষয় নিয়ে কতক্ষণ সময় কাটাচ্ছে এ ব্যাপারে বাবা-মাকে ওয়াকিবহাল থাকতে হবে এবং এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে সন্তানের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া থাকতে হবে। অন্যান্য সামাজিক বিষয়ের মতো এটিও এক ধরনের সামাজিক বিষয়। তাই সোশ্যাল মিডিয়াকে কখনো গোপনীয় বিষয়ের মতো ব্যবহার না করে পরিবারে যথাসম্ভব উন্মুক্ত পরিবেশে ব্যবহার করতে হবে। এ ব্যাপারে বাবা-মাকেও সৎ হতে হবে। যে বিষয়গুলো সন্তানের জন্য প্রত্যাশিত নয়, সেগুলো ব্যবহারে বাবা-মাকে আরও যতœবান হতে হবে। বাবা-মা প্রাপ্তবয়স্ক আর সন্তান অপ্রাপ্তবয়স্ক এভাবে না দেখে সর্বজনীন ভালো-খারাপ বিবেচনায় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

মোট কথা সোশ্যাল মিডিয়া সোশ্যালাইজেশনের জন্য নতুন দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে। বাবা-মা বা পরিবারের সদস্য ছাড়াও বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত বন্ধু-বান্ধবরা এখন সোশ্যালাইজেশনের বড় নিয়ামক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত। তাই সামাজিক এই মাধ্যমটিকে গুরুত্বহীন ভাবলে বা সঠিকভাবে মূল্যায়িত না করলে হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে। তরুণদের জন্য সামাজিক মাধ্যম বন্ধ নয় বরং যথাযথ ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে সহযোগিতা করা অধিকতর ফলপ্রসূ হবে।

ডা. ছায়েদুল হক : চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে