• অারও

কোটা এবং কটুকথা

  অঘোর মন্ডল

১৬ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৮, ২২:২১ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিদ্যা সম্পদ না পণ্য? প্রশ্নটা পুরনো। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় উত্তরটা অমীমাংসিত। কারণ শুধু শিক্ষাব্যবস্থা নয়, বাঙালির মানসিকতা এবং সেটা সমাজের সব শ্রেণির। শ্রেণিভেদে সেই মানসিকতায় ভিন্নতা আছে। কিন্তু আমাদের সমাজকাঠামোতে শিক্ষা এখন রীতিমতো পণ্য। হয়তো এর বিপক্ষেও অনেক যুক্তি আছে। তবে সামগ্রিকভাবে শিক্ষা এখন বাজারের পণ্য। ভিন্ন কিছু বলার মতো অবস্থা দেখা যাচ্ছে কি!

চাকরির বাজারে সেই শিক্ষা কীভাবে বিকানো হবে সেখানেও গলদ। গরমিল। যে কারণে কোটা নিয়ে কটুকথা! কোটা নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম, মিছিল-সেøাগান, অবরোধ-ভাঙচুর। সব মিলিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ত্রুটিপূর্ণ চেহারা ফুটে উঠল নাকি! উন্নয়নশীল দেশের সরণিতে ঢুকে পড়ার পর বাংলাদেশের রাস্তাঘাট কেন অবরুদ্ধ করতে হবে ছাত্রছাত্রীদের! কোটার কূটরাজনীতি কেন ঢুকে পড়বে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য়ের বাসভবনে! কেন ভাঙচুর হবে তার বাসভবন? সেই ভাঙচুরের সঙ্গে শিক্ষার্থী না সন্ত্রাসী কারা জড়িত তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত জরুরি। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক তাদের বিচারের আওতায় আনতেই হবে। কোটা সংস্কারের আন্দোলন আর উপাচার্যের বাসভবনে হামলা-ভাঙচুরকে একই চশমা দিয়ে দেখলে ভুল হবে। আর সেটা দেখতে চাইলেও চশমার লেন্স বাইফোকাল হতে হবে। কারণ সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ আছে। সেখানে সংস্কার হতে পারে। বাতিল হতে পারে। কিন্তু উপাচার্যের বাসভবনে ভাঙচুরের সঙ্গে তাৎক্ষণিক কিংবা নিকট-ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অভিপ্রায় থাকতেই পারে। তাই ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িতদের মুখোশ উন্মোচন করা দরকার।

আজকের এই সমাজে উচ্চশিক্ষার ডিগ্রিধারী মানুষের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও। সেটাই আজকের বাস্তবতা। আবার উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেটটাও খুব চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে! বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তার সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মানের তারতম্য অনেক। উচ্চশিক্ষিতের হার স্বাভাবিক গতিতে বাড়ছে নাকি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির কারণে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। মেধার চেয়ে বাবা-মায়ের অর্থের জোরে উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট পেয়ে যাচ্ছেন তারা। চাকরির বাজারে নিজেদের মেধা-যোগ্যতা প্রমাণে হোঁচট খাচ্ছেন। তারা ভুলে যাচ্ছেন, চাকরির বাজার শুধু সার্টিফিকেট দেখে না, যোগ্যতা, মেধাও খোঁজে। আর শেষ পর্যন্ত হতাশ সেই বিশাল শিক্ষিত বেকার গোষ্ঠী কোটা খোঁজেন। যে কারণে অনেকের মতে, বিভিন্নভাবে কোটা পদ্ধতির অপব্যবহারও হয়েছে।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলনের ফল যদি হয় কোটা বাতিল, সেটা কতটা যুক্তিসঙ্গত হবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, তা নিয়ে আরও একবার ভাবা দরকার। সমতার ভিত্তিতে টেকসই উন্নয়নের কথা ভাবতে হলে সমাজের অনগ্রসর অংশের কথা ভাবতে হবে। তাদের টেনে তোলার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, সমাজের অগ্রসর শ্রেণিরও। কিছু দায়-দায়িত্ব তাদেরও নিতে হবে। তা না হলে সামাজিক দায়িত্ববোধ বলে কিছু থাকবে না আমাদের সমাজে। সব দায় সরকারের, রাষ্ট্রের এই দোহাই দিয়ে আমরা সবাই দায়মুক্তি নিলে অনগ্রসর গোষ্ঠী আরও পেছনে পড়ে যাবে। হয়তো রাষ্ট্র আর সরকারকে দোষ দিয়ে তারা দীর্ঘশ^াস ফেলবেন, যা একটা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের উন্নত রাষ্ট্র হয়ে ওঠার পথকে অবরুদ্ধ করবে। সেটা আমাদের কারো কাম্য হতে পারে না।

কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে আন্দোলনের ফল যদি হয় কোটা বাতিল, তা হলে আগামীতে আবার কোটা বৃদ্ধির আন্দোলন হলে তার ফল কী হবে শতভাগ কোটা! আবেগ নয়, আক্রোশ নয়, যুক্তি-তর্ক আর বাস্তবতার নিরিখে সব কিছু বিবেচনা করা উচিত। দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে তেমন বক্তব্য আশা করা নিশ্চয়ই দোষের কিছু নয়। কোটা সংস্কারের আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া সবাই রাজাকারের উত্তরাধিকারী হয়ে যেতে পারে না। ঢালাওভাবে সবাইকে রাজাকার বানানোর প্রবণতা সাতচল্লিশ বছর বয়সী বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

আবার মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়ে অনেকেই বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যাচ্ছেন। যারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, চেতনায় পুরোপুরি বিশ^াস করেন কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। স্বাধীনতার পর সাড়ে তিন বছরের মাথায় যারা স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির পিতার বুকে বুলেট চালিয়েছিলেন, তাদের অনেকের পরিচয় মুক্তিযোদ্ধা, কিন্তু তারা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ^াস করতেন? পেছন থেকে যারা সেই খুনিদের মদদ জুগিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় খেতাবও পেয়েছিলেন। আবার ’৭৫-পরবর্তী সময় অনেক বড় বড় মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তান ফেরত জেনারেলদের উপদেষ্টা হয়েছেন। মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন। ক্ষমতার অলিন্দে বিচরণ করছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে পেছন দিকে ঠেলে দিতে ভূমিকা রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশের গায়ে সাম্প্রদায়িকতার সিল মেরেছেন সংবিধান কাটাছেঁড়া করে। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে এত বছরে বিতর্ক এড়ানো গেল না, এটাও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক ধরনের ভাগ্যের পরিহাস। তবে এটাও ঠিক, সবাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর বাঙালির মুক্তির জন্য অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন তা নয়। কেউ কেউ পাকিস্তানকে রক্ষার জন্যও অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। তারাও আজ মুক্তিযোদ্ধাদের মিছিলে ঢুকে পড়েছেন কিনা, সেটা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব, আত্মীয়তা আর সাধারণ ক্ষমার অপব্যাখ্যা দিয়ে রাজাকার-আলবদরদের অনুপ্রবেশ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ঘটলে তার পরিণাম আরও খারাপ হতে পারে।

কোটা সংস্কার বা বাতিল যাই হোক, সেটা হতে হবে যৌক্তিক, সময়োপযোগী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণমানসের কল্যাণে, সাম্য আর সুবিচারের ভিত্তিপ্রস্তরে লেখা। শিক্ষাকে বাজারি পণ্য বানালে, চাকরির বাজার সেই শিক্ষা এক সময় আর দেখবে না। দেখবে না প্রচুর অর্থ ব্যয়ে অর্জিত উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট। তাই শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে আপস করলে আগামীতে হা-হুতাশ বাড়তে পারে উচ্চশিক্ষার ডিগ্রিধারীদের। কোটা সংস্কারের আন্দোলন তখন কোটা ফেরানোর আন্দোলন হয়ে ফিরতে পারে। রাগে-ক্ষোভে-ভাবাবেগে কোটা বাতিল করার আগে শ্রেণিবৈষম্যের কথাটাও মাথায় রাখা উচিত।

শিক্ষা সম্পদ। সেই সত্যটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে আপস করা যায় না। মেধা বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ, পরিকাঠামো জরুরি। তা হলে সরকারি চাকরির জন্য কোটা বাতিল বা কোটা সংস্কারের আন্দোলন করার দরকার পড়বে না। কারণ মেধা দিয়েই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে দেশের বাইরেও উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ঠিকানা খুঁজে নিতে পারবেন তারা। সেখানেও আছে চাকরির বড় বজার। উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে চাকরির জন্য হা-হুতাশ করতে হবে না। কোটা সংস্কারের আন্দোলনও করতে হবে না। আবার আন্দোলন করতে গিয়ে গণহারে রাজাকারের অপবাদও নিতে হবে না।

শিক্ষা ব্যবসায়িক পণ্য হয়ে গেলে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষগুলোর কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ে। তাদের আন্দোলন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। সমাজে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ে। অন্যায়-অপরাধ সবই বাড়ে। এই বাড়-বাড়ন্তকে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার একটাই রাস্তা; শিক্ষাকে সম্পদে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া।

সেটা অবশ্যই সরকারকে নিতে হবে। না হলে অহেতুক আন্দোলন হবে। সরকারকে বিব্রত করার রাজনৈতিক চেষ্টা হবে। আন্দোলনকারীরা ‘রাজাকার’Ñ এই বুলেট ছুড়ে যারা সরকারের অবস্থান আক্রমণাত্মক বোঝাতে চাইলেন, তাদের ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগের অনেক কারণ থেকে যায়। আক্রমণের বুলেট নয়, বরং আলোচনার হেলমেট ব্যবহার করাই ভালো আন্দোলন-অবরোধের উত্তাপ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে। জনভোগান্তি কমাতে।

য় অঘোর মন্ডল : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে