উপমহাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা একটি পর্যালোচনা

  এম সাখাওয়াত হোসেন

১২ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এ বছরের মাঝামাঝি থেকে আগামী বছরের মাঝামাঝি উপমহাদেশের তিনটি বৃহত্তর দেশ বাংলাদেশ, ভারত আর পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের তারিখ ধার্য করা হয়েছে জুলাই ২৫, ২০১৮ সালে। এর পর আশা করা যায় বাংলাদেশের নির্বাচনও এ বছরের শেষদিকে অনুষ্ঠিত হবে। তেমনটাই নির্বাচন কমিশনের আগাম ঘোষণায় মনে হয়। ভারতে নির্বাচন তো সারা বছরই লেগে থাকে; হয় স্থানীয়, না হয় রাজ্য বিধানসভার আর না হয় বিধানসভা ও লোকসভার উপনির্বাচন। এরই মধ্যে আগাম নির্বাচনের তোড়জোড় চলছে। কয়েকটি রাজ্যে ভালো করলেও হালের কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভার উপনির্বাচনে ৭০ শতাংশ জনপ্রিয়তায় রয়েছে বলে কথিত বিজেপির ধস নেমেছে। কর্নাটকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পরও মিত্রহীন বিজেপি সরকার গঠন করতে পারেনি। রাজ্যপাল সরকার গঠনে গড়িমসি করার কারণে সুপ্রিমকোর্ট মাত্র একদিনের সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। ভারতের সুপ্রিমকোর্ট বলে কথা। সুপ্রিমকোর্ট এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা বারবার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে যেমন সমুন্নত রেখেছে, তেমনি নির্বাচন কমিশনকে তার কাজে সহযোগিতা করছে বলে ক্রমেই ভারতীয় নির্বাচন কমিশন আফ্রো-এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে স্বাধীন এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বলে স্বীকৃত।

এমনকি পাকিস্তানের সুপ্রিমকোর্টও নির্বাচন কমিশনের হাতকে শক্তিশালী করে থাকেন। ইদানীং এক আদেশে বলেছেন, সরকারি খরচে এবং সরকারি কাজের নামে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না। অন্য এক আদেশে বলেছেন, রাজনীতিবিদদের নিরাপত্তা তাদের নিজেদের দায়িত্ব।

বস্তুতপক্ষে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন উপনিবেশ-উত্তর আফ্রো-এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে প্রথম স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং নির্বাচনী আইনগুলো অন্তত এই উপমহাদেশের প্রায় সব ক’টি দেশই অনুসরণ করেছে। সর্বশেষ নেপাল। নেপালের আইন ভারতের অনুসরণে হলেও ওই দেশের আর্থ-সামাজিক পরিবেশের কারণে কিছুটা তফাত রয়েছে। তবে নেপালের স্বাধীন নির্বাচন কমিশনও ভারতের অনুসরণে তিনটি ভালো নির্বাচন উপহার দিয়েছে। ২০১৭ সালের নেপালের সংবিধানের প্রথম নির্বাচনটি দেশে-বিদেশে যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছে। ওই নির্বাচনে শাসক দল নেপালি কংগ্রেস তৃতীয় স্থানে থাকার কারণে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মতে, নেপালের নির্বাচন কমিশন ওই নির্বাচনে যথেষ্ট বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিল। নেপালে একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ও প্রথমবারের মতো প্রাদেশিক নির্বাচন হয়েছিল।

আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশন গঠন এবং নির্বাচনী আইন তৈরি হয়েছিল ভারতের অনুসরণে। একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী আইন আরপিও-১৯৭২ (জচঙ-১৯৭২)-এর বহু ধারা হুবহু ভারতীয় আরপিএ (জচঅ)-এর এবং সংবিধানের নির্বাচন (ঊষবপঃরড়হ) ব্যাপারটি ভারতীয় সংবিধানের আদলেই। অবশ্য পরে আরপিওতে অনেক সংশোধনী হয়েছে। বড় ধরনের সংশোধনী প্রথমে আসে ২০০১-এ এবং সবচেয়ে কার্যকরী সংশোধনী আনা হয় ২০০৮ সালে। ওই সময়ে ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের আচরণবিধি এবং নির্বাচনী আইনের বহু কার্যকরী ধারাকে আমাদের দেশের উপযোগী করে সংযোজন করা হয়েছিল। পরে আমাদের ২০০৮ সালের সংশোধিত আরপিওর কয়েকটি ধারা সংযোগের জন্য সুপারিশ করেছিল, যার কিছু কিছু বিধি এবং নির্দেশ আকারে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ ধরনের আদান-প্রদান এবং একে অন্যের ‘ভালো দিকগুলো’ (এড়ড়ফ ঢ়ৎধপঃরং) গ্রহণ করার প্রথা সারা বিশ্বেই রয়েছে। এরই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ২০১০ সালে গঠিত হয়েছিল সার্ক নির্বাচন কমিশন ফোরাম এবং এর প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল মে ৩০, ২০১০ সালে। এর পর ভারতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এ ফোরামের সম্মেলন।

যাহোক এ ধরনের আদান-প্রদান এবং একে অন্যের নির্বাচনী আইনের অনুসরণীয় দিকগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় আসিয়ান (অঝঊঅঘ) দেশগুলোর মধ্যে। তথাপি এই উপমহাদেশে এ ধারা বহাল থাকা উচিত।

ভারতের নির্বাচন এবং নির্বাচনী আইন ও তার প্রয়োগ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয় পাকিস্তানে। পাকিস্তানের আইন বিষয়ের গবেষণা সংস্থা পিলদাত (চরষফধঃ : চধশরংঃধহ ওহংঃরঃঁঃব ড়ভ খবমরংষধঃরাব উবাবষড়ঢ়সবহঃ ধহফ ঞৎধহংঢ়বৎবহপু)

পাকিস্তানের স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের কার্যক্ষমতা এবং নির্বাচনী আইন সংস্কার করে প্রায়োগিক ক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করে আসছে। এই গবেষণা কেন্দ্রে এক গবেষণাপত্রে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তুলনা করে ওই দেশের নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী ও কার্যক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করে আসছিল। অনুরূপ আরও অনেক সিভিল সোসাইটি সংগঠন পাকিস্তানের গণতন্ত্রের ভিত মজবুত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের অধিক ক্ষমতায়নের বিষয় তুলে ধরেছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পার্লামেন্টারি কমিটি গঠন করা হয়েছিল নির্বাচনী আইন সংশোধনী এবং নির্বাচন কমিশনের সুপারিশগুলো কার্যকর করার জন্য।

অন্যদিকে নির্বাচনকালীন পাকিস্তানের সংসদ অনেকটা বাংলাদেশের বর্তমানে বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা গ্রহণ করে, যাতে নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে। ১৯৯০ থেকে পাকিস্তানে দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থাকলেও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ২০১০ সালে ১৮তম সংবিধান সংশোধনীতে আরও কিছু বিধিবদ্ধতা যোগ করা হয়েছিল। অভিজ্ঞতার আলোকে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিরপেক্ষ ও কার্যকর রূপ দিতে পাকিস্তানের সংবিধানে ২০১২ সালে ২০তম সংশোধন আনা হয়। যার মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ২২৪(এ) সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়োগের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা রধ করে সংসদে দেওয়া হয়। অনুচ্ছেদ ২২৪(বি) সংযুক্ত করা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিয়োগের প্রক্রিয়া সংবিধানে যুক্ত করা হয়।

অনুচ্ছেদ ২২৪(বি)-তে অনুসৃত রয়েছে, সংসদের নেতা প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদে বিরোধী দলের নেতা মিলে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের জন্য চারটি নামের মধ্যে একজনকে সর্বসম্মতিক্রমে নিয়োগের জন্য নির্ধারিত করবেন। যদি ঐকমত্য না হয় তবে ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের উভয়পক্ষ থেকে সমসদস্য সমন্বয়ে কমিটি গঠিত হবে এবং তাদের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে। সেখানেও যদি ঐকমত্যে পৌঁছতে না পারে সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ওই লিস্ট থেকে একজনকে নিয়োগের জন্য নির্ধারণ করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে নিয়োগের জন্য। সংসদীয় কমিটি অথবা দুই বেঞ্চের নেতাদের ঐকমত্যে পৌঁছার জন্য তিন দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে নির্ধারণ করতে হলে মোট চার দিনের সময়ের মধ্যেই নিয়োগ দিতে হবে। ২০১২ সালে সংবিধানের নতুন সংস্কারের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনকে এ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা এই উপমহাদেশে এক বিরল বিষয়। ২০১৩ ঐকমত্য না হওয়ায় নির্বাচন কমিশন মীর হাজার খান খুসোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়েছিল। তিনি কেন্দ্রীয় শরিয়াহ কোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পর সর্বসম্মতিক্রমে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নাসিরুল মুলক তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী নিয়োজিত হয়েছেন। প্রায় একই প্রক্রিয়ায় প্রাদেশিক ছয় সদস্যের তত্ত্বাবধায়ক মুখ্যমন্ত্রীও নিয়োগ হয়ে থাকেন।

ইতোমধ্যেই রাজনীতিবিদরা বিশেষ করে সরকারি দল ও বিরোধীরা একমত না হওয়ার কারণে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়। নির্বাচন কমিশন পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানে মুখ্যমন্ত্রী নির্ধারিত করেছে প্রাপ্ত নামের মধ্য থেকেই।

অনেক আলোচনা, গবেষণা এবং বিতর্কের পর পাকিস্তানের পুরনো নির্বাচনী আইন রদ করে নতুন নির্বাচনী আইন ‘ইলেকশন অ্যাক্ট ২০১৭’ (ঊষবপঃরড়হ ধপঃ ২০১৭) জারি করা হয়েছে। নতুন আইনে সংবিধানে দুই সংশোধনীর প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের কাঠামোতে যেমন পরিবর্তন আনা হয়েছে, তেমনি নির্বাচন কমিশনের হাতকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। নতুন আইনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যপ্রণালি বিন্যাসিত রয়েছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যক্রম মনিটর করার ক্ষমতাও নির্বাচন কমিশনকে ওই আইনের আওতায় ন্যস্ত করা হয়েছে।

এক কথায় পাকিস্তান নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনী সময়ের জন্য ‘সুপার ইনপোজড’ বা সরকারের তদারকির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যেমনটা ভারতীয় নির্বাচন কমিশন করে থাকে। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন ২০১১ সালে এ ধরনের সুপারিশ করেছিল, যা আলোর মুখ দেখেনি।

নির্বাচন কমিশনকে উচ্চ আদালতেরও সমান ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে নির্বাচনসংক্রান্ত যে কোনো নির্দেশনা দেওয়ার। আইনের বিধান মোতাবেক নির্বাচন কমিশন যে কোনো সংসদীয় এলাকার নির্বাচন বাতিল করার ক্ষমতা রাখে।

মহিলা ভোটারদের ভোট প্রদানের উৎসাহ জোগানের জন্য নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী যাতে সর্বাত্মক উদ্যোগ নেয় সে কারণে আইনে বিশেষভাবে ব্যবস্থার উল্লেখ রয়েছে। নির্বাচনী আইনের অনুচ্ছেদ ৯ বিধৌত রয়েছে যে, মহিলাদের ভোটদানে বাধা প্রদান করা অথবা অন্যান্য কারণে যদি কোনো কেন্দ্রে মোট ভোট সংখ্যার ১০ শতাংশ অথবা সমগ্র সংসদীয় আসনে মোট প্রদত্ত ভোটের দশ ভাগের নিচে নারীদের ভোট পড়ে থাকে সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ওইসব পোলিং স্টেশন এবং ক্ষেত্রবিশেষে সমগ্র আসনে ভোট বাতিল করতে পারবে। এ কারণে মহিলা ভোটার উপস্থিতি এবং ভোট প্রদানের পরিসংখ্যানের দায়িত্ব বর্তায় পোলিং অফিসার ও প্রিসাইডিং অফিসারের ওপর।

পাকিস্তানের নতুন আইনে সমগ্র নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও আয়ত্তে রাখার জন্য জেলা অথবা সমঅঞ্চলে একজন ডিস্ট্রিক্ট রিটার্নিং অফিসারকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অপরদিকে প্রত্যেক সংসদীয় আসনের জন্য একজন রিটার্নিং অফিসার এবং একজন সহকারী রিটার্নিং অফিসারের নিয়োগ দেওয়া হয়। ডিস্ট্রিক্ট রিটার্নিং অফিসার সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা অথবা ডিস্ট্রিক্ট পর্যায়ের বিচারককে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। অপরদিকে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয় নিজেদের কর্মকর্তা অথবা সরকারি কর্মকর্তা এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থা থেকে।

ডিস্ট্রিক্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা সব রিটার্নিং অফিসারের সমন্বয়ে পোলিং স্টেশন স্থাপন, প্রিসাইডিং অফিসার ও অন্যান্য অফিসার নিয়োগ এবং তার আওতাধীন নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা করেন। সম্পূর্ণ ডিস্ট্রিক্ট বা জেলার নিরাপত্তা সমন্বয় এবং আচরণবিধির প্রয়োগসহ আইন ও বিধি দ্বারা বিধৌত কার্য সম্পাদন করে থাকেন। রিটার্নিং অফিসার তার অধীনের সংসদীয় আসনের প্রচারণা থেকে ভোট গ্রহণ এবং ফলাফল একত্রীকরণের দায়িত্ব সম্পাদন করেন। এ ব্যবস্থায় রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষে একটি আসনের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অধিকতর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ইতোমধ্যেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ডিস্ট্রিক্টের অতিরিক্ত দায়রা বিচারককে ডিস্ট্রিক্ট রিটার্নিং অফিসর নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।

বাংলাদেশ ছাড়া উপমহাদেশের তিনটি দেশেই অনুরূপভাবে রিটার্নিং কর্মকর্তা অধিক কার্যকর করার জন্য নিয়োগ করা হয়।

বাংলাদেশের নির্বাচনী আইনেও বর্তমান অবস্থায় নির্বাচন কমিশন যে কোনো সরকারি কর্মকর্তা অথবা প্রয়োজনে বিচার বিভাগের জেলার বিচারককে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই বিচার বিভাগের সঙ্গে আগাম পরামর্শের প্রয়োজন হবে। একই আইনে একটি জেলায় একাধিক রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের অবকাশ রয়েছে। প্রত্যেক সংসদীয় আসনের জন্য আলাদা রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের প্রবিধান রয়েছে আরপিও (জচঙ-১৯৭২)-এর ধারা ৭ অনুযায়ী।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী আগামীতে যেভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক এবং সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও সর্বজনে গৃহীত করতে হলে আরপিওর অধিক সংস্কারের প্রয়োজন যেমন রয়েছে, তেমনি বিভিন্ন ধারা প্রয়োগ করার পরিকল্পনা এখনই করতে হবে। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশের আইন ও বিধির অনুসরণীয় ধারাগুলোকে ক্ষতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের। যদিও সময় কম তবে নির্বাচন কমিশনকে বর্তমান আইনের ধারার এবং আরও যুগোপযোগী করে ব্যবস্থা নিতেই হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আগামী নির্বাচনও সংসদ বহাল অবস্থাতেই অনুষ্ঠিত হবে, সে ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের এবং মন্ত্রিপরিষদের যারা নির্বাচন করবেন তাদের প্রভাব কীভাবে নিয়ন্ত্রিত করা হবে তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন কতখানি সজাগ জানা নেই।

উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের বিচার বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে যেভাবে শক্তি জোগায় এমন কোনো বিচার বিভাগীয় কার্যক্রম উল্লেখ করার মতো নেই। গাজীপুর নির্বাচন যেভাবে ব্যাহত হয়েছে সে অভিজ্ঞতা একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে কতখানি সহায়ক হবে তা দেখার বিষয়।

ভারতের বিচার ব্যবস্থার কথা বাদ দিলেও নির্বাচনী বিষয় নিয়ে পাকিস্তানের উচ্চ আদালত যেসব নির্বাচনী বিষয়ে নির্দেশ এবং রায় দিয়েছে তাতে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনাকে জোরদার করার জন্য। হালেই সুপ্রিমকোর্ট নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে যে, প্রার্থীর নমিনেশন ফরমের সঙ্গে এফিডেভিটের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্যাদি প্রকাশ করতে হবে। এসব নির্দেশ এবং রায় নির্বাচন কমিশনের হাতকে যেমন শক্তিশালী করে, তেমনি স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে।

যাহোক পরিসংহারে উল্লেখ্য যে, উপমহাদেশের অন্যান্য দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার যে উন্নতির প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে সেখানে আমাদের অবস্থান কোথায় তা বিবেচ্য বিষয়। ২০০৮ সালে নির্বাচনী আইনের এবং আচরণবিধির ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছিল। ওই আইন এবং বিধির এখন অনেক পরিবর্তন ও সংস্কার প্রয়োজন। কারণ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থাপনায় আকাশ-পাতাল ব্যবধান হয়েছে। আমাদের মতো দেশে বর্তমান সংবিধানের অধীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে কী ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয় সে বিষয়ের ওপর কোনো গবেষণাপত্র নেই। ২০১৪ সালের নির্বাচনের ওপর কোনো গবেষণা হয়েছে কিনা বা নির্বাচন কমিশনের নির্মোহ বিশ্লেষণ অথবা নাগরিক সমাজের কোনো গবেষণা এবং কেসস্টাডি হয়েছে বলে মনে হয় না।

এসব বিষয়ে নির্মোহ গবেষণা না হলে নির্বাচন কমিশনের হাতকে শক্তিশালী করতে বেগ পেতে হয়। তথাপি নির্বাচন কমিশন আগামী নির্বাচন কীভাবে পরিচালিত এবং নিয়ন্ত্রণ করবে তা নিয়ে তাদের খুব গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। হালের একটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সুখকর হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়নি। তদুপরি রিটার্নিং অফিসার এবং আচরণবিধি পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক বর্তমান নির্বাচন কমিশনের জন্য সুখকর নয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত শরিকদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া শ্রেয়।

নির্বাচনী বিষয়ে একজন শিক্ষানবিস ও গবেষণারত হিসেবে আমি মনে করি, নির্বাচন কমিশন উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারে। এরই উদ্দেশ্যে সার্ক ফোরাম গঠিত হয়েছিল।

য় এম সাখাওয়াত হোসেন : সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক

[email protected]

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে