মতিভ্রষ্ট প্রণববাবু ও উপমহাদেশের রাজনীতি

  অজয় দাশগুপ্ত

১২ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটা খবর দেখে মনটা সত্যি ভারী হয়ে গেল। প্রণব মুখোপাধ্যায় আমাদের দেশের কেউ নন। তার পরও বাঙালি। তিনি যখন ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন আনন্দে বুক ভরে গিয়েছিল। একজন বাঙালি ভারতের রাষ্ট্রপতি এই খুশি আমার মতো অনেককেই স্পর্শ করেছিল। আমি নানা কারণে গান্ধিকে পছন্দ করলেও ইতিহাসে তার নামে যে কয়েকটা মন্দ কথা চালু তার একটির জন্য কখনো তাকে ভালোবাসতে পারিনি। তার কারণেই নাকি সুভাষ বসু ভারতীয় রাজনীতিতে নেহরুর জায়গা নিতে পারেননি। একজন বাঙালি নেতার প্রতি গান্ধির এই বিদ্বেষ হয়তো আমাদের ইতিহাসকেই ভিন্নপথে চালিত করেছিল। কারণ সুভাষ বসু যদি কংগ্রেসের সম্পাদক হতেন তবে তার হাতে উপমহাদেশের চেহারা কেমন হতো জানি না, হয়তো বাংলা বিভাগ আর সাম্প্রদায়িকতা আমাদের জীবনকে এতটা কলুষিত করতে পারত না। ভোটে জেতার পরও সুভাষ বসুকে সে পদ দেওয়া হয়নি। দীর্ঘকাল পর ভারতে প্রণববাবু রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর খেদ ঘুচেছিল আমাদের। প্রণববাবু আমাদের দেশের বন্ধুও বটে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তার। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সর্বস্বহারানো দুকন্যার প্রতি তার স্নেহ ও মমতার কথা সব সময় মনে করেন শেখ হাসিনা। সবাই জানি, প্রণববাবু দেশপ্রধান থাকায় আমাদের রাজনীতির দুষ্টচক্রও সুবিধা করতে পারেনি।

শুধু প্রধানমন্ত্রী কেন, কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গেও তার চমৎকার সম্পর্ক, সম্পর্ক আছে দেশের বহু নামিদামি মানুষের সঙ্গে। কিছুদিন আগে তিনি যখন রাষ্ট্রপতি নন তখন এসেছিলেন আমাদের দেশে। তার জ্ঞানগর্ভ ভাষণ আর সূর্যসেনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে পুলকিত হয়েছিলাম। সিংহাসনে থাকাকালীন না পারলেও বাঙালি বাবু পরে এসে রাউজানে সূর্যসেনের ভিটেমাটি দেখে গিয়েছিলেন। আজীবন কংগ্রেসের নিমক খাওয়া কংগ্রেসের টিকিটে সাংসদ হওয়া প্রণববাবু এবার কী কারণে কোন ভোল পাল্টালেন সেটাই বুঝতে পারছি না। মনে আছে ইন্দিরা গান্ধির পরাজয় ও কঠিন সময়ে তিনি ছিলেন তার ঘোর সমর্থক ও পরামর্শদাতা। তাকে অনেকে চানক্যের সঙ্গেও তুলনা করেন। সেই চানক্যসম প্রণববাবু কী কারণে হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে এতটা নিবিড় হচ্ছেন?

অওগওগ প্রধান আসাফুদ্দিন ওয়াসি বলছেন, কংগ্রেস শেষ হয়ে যাচ্ছে এটাই তার প্রমাণ। তিনি প্রশ্ন করেছেন, ৫০ বছর যিনি কংগ্রেসের সঙ্গে ছিলেন সে দল থেকে ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, তিনি যখন আরএসএস হেডকোয়ার্টার দেখতে যান নাগপুরে তাদের সভায় যোগ দেন তখন এই দলের কি আর কোনো ভবিষ্যৎ আছে? না তাদের আর কিছু বলার থাকে? ভারতের রাজনীতিতে এ ঘটনা যতটা বিস্ময় ও হতাশার সৃষ্টি করেছে, ততটা করেছে আমাদের মনে। বিজেপির শাখা এই রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের প্রতিষ্ঠাতাকে ভারতের একজন শ্রেষ্ঠ সন্তান বলে মন্তব্য করেছেন। সঙ্গে অবশ্য সহনশীল ভারতের ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু যেভাবেই দেখা যাক বা যেভাবেই বলা হোক এটি ভারতের দীর্ঘ ঐতিহ্য অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার বিরুদ্ধে। প্রণববাবুর মতো মানুষকে এমন জায়গায় দেখার কথা ছিল না ভারতের। কিন্তু আজ তা সত্যি। ভারত আমাদের বড় প্রতিবেশী। ইতিহাস-ঐতিহ্যে আমরা পরস্পরের সহযোগী। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিশাল বড় ভূমিকা আছে তাদের। আজ ভাবি সেদিন যদি পরিবেশ এমন হতো আর এই রাজনীতি চলমান থাকত আমরা কি ভারতের সমর্থন পেতাম? যে ভারত গণতন্ত্র আর মানবতার জন্য সেদিন আমাদের পাশে ছিল আজ কি তা পারত? পারত বলে তো মনে হয় না। মুক্তিযুদ্ধ ছিল মহান এক চেতনার নাম। যে চেতনা, যে আদর্শ পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হওয়ার পথ সুগম করেছিল তার নাম একটাই, মানবিকতা। সে আদর্শ কি আজকের ভারত লালন করে আদৌ? মোদি ক্যারিশমার চাপে দিশেহারা ভারত আমাদেরও অস্থির করে তুলেছে প্রায়। অথচ সেখানে চলছে আরেক যাত্রা। যার নতুন প্রমাণ প্রণববাবু। প্রণববাবুর মতো মানুষ হিন্দু আদর্শে উদ্বুদ্ধ হবেন কী হবেন না সেটা তার ব্যাপার। কিন্তু গত ৫০ বছর কংগ্রেসের ফসলে বড় হয়ে ওঠা প্রণববাবু হঠাৎ কেন মত বদলাচ্ছেন? কেন তিনি সাম্প্রদায়িক শক্তির দিকে ঝুঁকছেন? এটা কি কেবলই আর একবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য? রাষ্ট্রপতি তো তিনি হয়েছেনই। সে লোভ তো তার থাকার কথা নয়। এর পেছনে নিশ্চয়ই আরও কারণ আছে। আদর্শ বলে আসলে এখন আর কিছু কাজ করে না। উপমহাদেশের সব কটি দেশের তুলনায় বরং আমরাই এগিয়ে। আমাদের অন্তর্জগতে যা থাক রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এখনো আমরা অসাম্প্রদায়িক। আমাদের দেশেই হয়েছে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিচার। ধর্মান্ধ রাজনীতি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, শাস্তি হয়েছে। ফাঁসি হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারত আজ মোড় নিচ্ছে অন্যদিকে। তাদের দেশের প্রবীণ নেতা প্রণব মুখোপাধ্যায়ও বিজেপি তথা সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন। এর পেছনে কি এটাই মূল কথা যে চাকা ঘুরছে? চাকা কি আসলেই পেছনের দিকে যাবে? এতকালের সভ্যতা, আদর্শ, ইতিহাস কি পারবে না এ থেকে দেশ ও সমাজকে বাঁচাতে? জাতিসত্তা আজ এক চরম বিপদে। ভারতে যদি এমন হয় বা হতে থাকে একদিন কি আমাদের দেশের মৌলবাদ বা সাম্প্রদায়িক শক্তিও সেদিকে ঝুঁকবে না? আজ যারা মানুষের চাপে দুমড়ে-মুচড়ে একাকার তারা নির্জীব হলেও মরে যায়নি। এসব ঘটনা তাদের শক্তি জোগাবে। তারা ধরে নেবে একদিন আমরাও পারব। আমাদের দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদরা এমনিতেই এক বয়সে পথ হারাতে ভালোবাসেন। ধর্মান্ধতা, বয়স সব মিলে তখন তাদের সামনে আরেক জগৎ। সেদিকটাকেই উসকে দিলেন প্রণববাবু।

তিনি কেবল একজন ব্যক্তিমানুষ নন। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি তিনি। বাংলার মানুষ। যে মাটিতে অরবিন্দ, বিবেকানন্দ, বিদ্যাসাগর, রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের জন্ম। যে মাটি লালনের। সে মাটির মানুষ আজ সামান্য গদির কারণে সাম্প্রদায়িক নেতার বন্দনা করছেন এটা মানা যেমন কষ্টের, তেমনি ভয়াবহ অশনিসঙ্কেতও বটে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিকদের সাবধান হতে হবে। সবচেয়ে বেশি সাবধান হতে হবে আওয়ামী লীগ ও প্রগতিশীলদের। তারা পরাজিত হলে মুক্তিযুদ্ধের দেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভাবতেই শিউরে উঠি। এক সময় বাহ বাহ বলা প্রণববাবুকে এখন কেন জানি ছি ছি বলতে ইচ্ছে করছে। আর যাই হোক সাম্প্রদায়িকতা এই উপমহাদেশকে আরও একবার বিভক্ত করুক, উত্তেজনাপ্রবণ করুক এটা আমরা কেউই চাই না।

জয় হোক শুভবুদ্ধির।

য় অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে