কে জাগে কে জাগায়

  ড. কাজল রশীদ শাহীন

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:২৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

এ রকম আন্দোলন এর আগে বিশ্ব দেখেছিল কিনা আমরা জানি না। যদি দেখেও থাকে তা হলে তার অবয়ব, কলেবর, ব্যাপ্তি, পরিধি আর শক্তি এ রকম ছিল না নিশ্চয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ঢাকার সড়কে এসেছিল অন্য এক রূপ। যার সঙ্গে কখনই পরিচিত ছিলাম না আমরা। ঢাকার সেই আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল না শুধু ঢাকাতেই। ছড়িয়ে পড়েছিল ঢাকার বাইরেও।

ঢাকা থেকে তেঁতুলিয়া, কুতুবদিয়া, সুনামগঞ্জ, টেকনাফ সর্বত্রই আছড়ে পড়েছিল সেই আন্দোলনের ফসল। জেগে উঠেছিল মানুষ। শত কষ্টেও সেই আন্দোলনকে তাই বাহবা জুগিয়েছে সব আপামর। জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এই আন্দোলনকে দেখেছেন শক্তির উদ্বোধন হিসেবে।

সংবাদপত্রগুলোও শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনকে সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে নানারকম-চমকপ্রদ সব হেডিংয়ে। ‘আঠারো এসেছে নেমে’, ‘জাগিয়া উঠেছে প্রাণ’, ‘তারুণ্যের স্পর্ধিত সাহস’ ইত্যাদি ইত্যাদি। জন রিডের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’-এর আলোকে লেখা হয়েছে ‘দুনিয়া কাঁপানো নয় দিন।’ অত্যুক্তি নয় মোটেই। কারণ বিশ্ব মিডিয়া আমাদের তরুণদের সেই আন্দোলনকে সত্যি সেভাবেই দেখেছেন। যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে খবর, খবরের বিশ্লেষণ, গতিপ্রকৃতি, পর্যবেক্ষণ আর ফলোআপ তুলে ধরেছেন অব্যাহতভাবে।

এসবই আমাদের আশাবাদী করে তুলেছিল। এসবই আমাদের সড়কের অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে নতুন স্বপ্ন ও প্রত্যয় ধারণের দুঃসাহস দেখিয়েছিল। আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। আমাদের বিশ্বাস প্রোথিত হয়েছিল। সড়ক বুঝি আর মানুষখেকো থাকবে না। তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরের মতো তারকারা স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে, সড়কের অব্যবস্থাপনার কারণে লাশ হয়ে ঘরে ফিরবে না। অথচ বাস্তবতা বলছে, আন্দোলনের পর এক মাস পেরিয়ে গেলেও সড়ক আছে সেই আগের মতো। তা হলে আমরা কি জাগিনি? নাকি জাগাতে ব্যর্থ হলো দুনিয়া কাঁপানো সেই আন্দোলন? এই লেখা সেসব বাস্তবতার আগপাশতলা তালাশ করার জন্যই।

১. মঙ্গলবার ১১ সেপ্টেম্বর। ধানমন্ডি এলাকার সাপ্তাহিক বন্ধ। তখন ঘড়ির কাঁটা সকাল নয়টা ছুঁইছুঁই। রবীন্দ্র সরোবর থেকে ফিরছি। আবাহনী মাঠের পাশ দিয়ে স্টার কাবাবের নাক বরাবর যাচ্ছি। সিগন্যাল পড়ায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটা গাড়ি। এমন সময় সব গাড়িকে ওভারটেক করে পুলিশের একটা গাড়ি সিগন্যাল উপেক্ষা করে বেরিয়ে গেল। যা দেখে সারিবদ্ধভাবে থাকা গাড়ির ড্রাইভার বলে উঠল, ‘আইনের লোকই বেআইনি কাজ করে।’ এখন যে দেশে আইনের লোকই বেআইনি কাজ করে সে দেশে দুনিয়া কাঁপানো আন্দোলন কেন, মহাবিশ্ব কাঁপানো আন্দোলনও যদি হয় তা হলে কি সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে?

২. সোমবার ১০ সেপ্টেম্বর। পান্থপথ সিগন্যাল। আমার গন্তব্য স্কয়ার হাসপাতাল থেকে ফার্মগেট। সিগন্যালে দাঁড়িয়ে আছে গাড়ি আর রিকশা-সিএনজির বহর। ফার্মগেটের দিকে যাওয়ার লেনটা যৌক্তিক কারণেই ফ্রি থাকার কথা। কারণ বামে যারা টার্ন করবে তারা এই সিগন্যালের মধ্যে পড়ে না। দেখা গেল একটা গাড়ি, যার গন্তব্য কারওয়ানবাজার অভিমুখে সেও অবলীলায় ওই লেন দখল করে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে যে গাড়ি, রিকশা কিংবা সিএনজির ফার্মগেটের দিকে যাওয়ার কথা সেও আটকে আছে। স্বভাবতই গাড়ির সারি বাড়তে বাড়তে স্কয়ার ছুঁইছুঁই হয়েছে।

যারা ফার্মগেটের দিকে যাবে তারা অনবরত হর্ন, বেল বাজানোর পাশাপাশি কথাও বর্ষণ করে যাচ্ছে। গাড়ির ড্রাইভারকে অকথ্য ভাষায় গালাগালও চলছে। এর মধ্যে একজন মোটরসাইকেল চালক, যিনি ওই প্রাইভেট কারের কারণে ফার্মগেটের দিকে যেতে পারছেন না। ড্রাইভারকে বকা দিতেই গাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন গাড়ির মালিক আর জুড়ে দিলেন তর্ক এবং পেশিশক্তি প্রদর্শনের আওয়াজ। এই যদি হয় আমাদের মানসিকতা তা হলে আন্দোলন নয় দিন কেন, নয় বছর ধরে চললেও সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে কি?

৩. হানিফ পরিবহনের ড্রাইভার ও হেলপারের কারণে মারা গেল পায়েল। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র পায়েল যেভাবে হত্যার শিকার হয়েছে তা ভাবলে শিহরিত হতে হয়। প্রশ্ন ওঠে ড্রাইভার-হেলপাররা কী মানুষ নাকি অন্যকিছু? পায়েল কী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেল, নাকি তাকে মেরে ফেলা হলো। প্রশ্ন হলো, এই যে হানিফ পরিবহনের ড্রাইভার ও হেলপারের কারণে এ রকম অমানবিক, বর্বরোচিত ঘটনা ঘটল, তার পর হানিফ পরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া কী। কী তাদের বোধোদয়।

তাদের কি একবারের জন্যও মনে হয়নি, ড্রাইভার-হেলপার নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা যে পদ্ধতি কিংবা প্রক্রিয়া অবলম্বন করেছেন, সেখানে বড় রকমের কোনো ক্রটি রয়েছে। তারা কি পায়েলের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর তাদের সব ড্রাইভার-হেলপার নিয়ে বসেছে। তাদের পরবর্তী করণীয় কী সেসব নিয়ে কোনো প্রকার আলাপ-আলোচনা করেছেন? তারা কি ড্রাইভার-হেলপারদের বিশেষ কোনো নির্দেশনা দিয়েছেন, কোনো প্রকার সতর্কবাণী শুনিয়েছেন, বলেছেন একবারের জন্যও এ ধরনের ঘটনা আর কারো ক্ষেত্রে ঘটলে আমরা নিজেরাই শাস্তির ব্যবস্থা করব, আইনের আওতায় আমরা আনার ক্ষেত্রে যা যা করা লাগে তাই-ই করব? হানিফ পরিবহন ড্রাইভার-হেলপার নিয়োগের সময় মানুষ নিয়োগ দেয়, কোনো খুনিকে নিয়োগ দেয় না। এসব প্রশ্নের উত্তর যদি না হয়, তা হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা আদৌ সম্ভব কি? আর যদি আমরা মনে করি এসব প্রসঙ্গের অবতারণা বাতুলতা ও সময়ের অপচয়মাত্র তা হলে দুনিয়া কাঁপানো আন্দোলনের ফসল কোনোদিনই সড়কে দৃশ্যমান হবে না।

৪. গণপরিবহনের ড্রাইভারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ির ড্রাইভারও হয়ে উঠছে বেপরোয়া ও নিয়ম ভাঙায় পারদর্শী। গণপরিবহনের মালিকের কাছে না হয় ড্রাইভারের কীর্তিকলাপ চোখে পড়ে না। কিন্তু ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক তো প্রায় সার্বক্ষণিকই এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু তারাও কি কখনো তার ড্রাইভারকে নিয়ম ভাঙার জন্য কিছু বলেছেন।

এ রকম রেকর্ড কি আছে ড্রাইভারের সড়কে করা কোনো অন্যায়ের কারণে তার চাকরিচ্যুত হয়েছে কিংবা আর্থিক দ- দেওয়া হয়েছে। এই যে ড্রাইভাররা কোনো কারণ ছাড়াই হর্ন বাজিয়ে শব্দদূষণ ঘটান। এ ব্যাপারে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীরা কি কখনো ড্রাইভারকে মৃদু ভর্ৎসনাটুকু পর্যন্ত করেছেন? নিশ্চয় নয়? তা হলে আপনি কীভাবে ভাবেন সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে? আমরা কীভাবে প্রত্যাশা করি সড়কে দুর্ঘটনা শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা সম্ভব না হলেও অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে?

৫. কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় আমরা যা যা দেখেছি সেখান থেকে আমরা কিছু শিক্ষা কি নিয়েছি। সেসব ঘটনার কোনো ফলোআপ আছে কি? আন্দোলন চলাকালে আমরা দেখলাম, পুলিশের গাড়ির লাইসেন্স নেই। পুলিশের গাড়ি যে ড্রাইভার চালাচ্ছেন তার ড্রাইভিং লাইসেন্স পর্যন্ত নেই। পুলিশের গাড়িতে শিক্ষার্থীরা বড় করে লিখে দিল ভুয়া। শুধু পুলিশ নয়, এ রকম একাধিক বাহিনী এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ব্যবহৃত গাড়ির কাগজপত্রে সমস্যা, চালকের লাইসেন্সে সমস্যা।

এখন প্রশ্ন হলো, সে সময় যেসব গাড়ি চিহ্নিত করা হয়েছিল, যেসব ড্রাইভারের লাইসেন্সে সমস্যা ছিল, তাদের বিরুদ্ধে কি কোনো প্রকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? বিভাগীয়ভাবে তাদের ব্যাপারে কোনো তদন্ত করা হয়েছে? ওই অভিজ্ঞতার আলোকে প্রত্যেকটা বিভাগের গাড়ির কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা, সে ব্যাপারে কোনো অনুসন্ধান চালানো হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি না হয়, তা হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে কীভাবে? তা হলে তো কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কষ্টটাই শুধু হলো। তারা শুধু শুধু মার খেল। কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা এলো না, আসার কোনো সম্ভাবনাও উঁকি দিল না।

৬. সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় যে আইন আসছে। সেই আইনকে তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই কার্যকর, সময়োপযোগী একটা আইন তার পরও এই লেখায় যেসব প্রসঙ্গ ও প্রশ্নের অবতারণা করা হলো তার উত্তর যদি না হয়, তা হলে এই আইন কি পারবে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করতে? যে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের সময় অন্যদের নিয়ম মানতে বাধ্য করল, তারাই এখন হামেশাই নিয়ম ভাঙছে। ফুটওভারব্রিজটা পর্যন্ত ব্যবহারে অনীহা প্রকাশ করছে।

৭. অতিসম্প্রতি বুলগেরিয়ায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিন মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ফেরিডুবির ঘটনা ঘটলে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। আর এখানে আমরা নিজেরাই কোনো ঘটনা থেকে শিক্ষা নিই না। আমরা নিজেরা জাগি না। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও আমাদের জাগায় না কিংবা জাগাতে বাধ্য করে না। কারণ তারা নিজেরাও জেগে নেই।

বুলগেরিয়া জেগে আছে, দক্ষিণ কোরিয়া জেগে আছে। আর আমরা শুধু আবৃত্তি করছি, ‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে?’ আমরা সকাল চাই, অথচ নিজেরাই জাগি না। আমরা দেশপ্রেমের কথা বলি অথচ দেশপ্রেমের জন্য যা করা দরকার তার ছিটেফোঁটাও করি না। মহামতি সক্রেটিস বলেছেন, ‘যার যা কাজ, সেটুকু সুন্দরভাবে সম্পন্ন করাই হলো দেশপ্রেম।’ এবং সেটা করতে ব্যর্থ হলে সেই দায় নিয়ে পদত্যাগ করাটাও দেশপ্রেম নিশ্চয়।

ড. কাজল রশীদ শাহীন : সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও গবেষক

[email protected]

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে