বিএনপি যদি নির্বাচনে না যায়

  রাহাত খান

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৩:৪৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে কী বোঝায়? এ রকম বোঝায় নাকি যে, ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি রাজনৈতিক দলকে তাদের দেওয়া সমুদয় শর্ত মেনে নির্বাচনে জয়ী করতে হবে? ক্ষমতায় বসিয়ে দিতে হবে? অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে কি এই ধরনের তালিতাপ্পা মারা রাজনীতি বোঝায়?

বিএনপি মনে করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হলে তাদের দেওয়া কতিপয় শর্ত মেনে নিতে হবে। যেমন, এক. পার্লামেন্ট ও সরকার নির্বাচনের আগে ভেঙে দিতে হবে। দুই. দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে। তারাই দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারবে। কিংবা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাচনী সরকার গঠনের আগে ছুটিতে পাঠাতে হবে। সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে রাষ্ট্রপতির অধীনে।

বিএনপি নামে রাজনৈতিক দলটি বন্দুকের নল থেকে বেরিয়েছিল। তারা রক্তপাত ও গ্রেনেড-রাজনীতি বড় ভালোবাসে। আরও ভালোবাসে বিচারহীনতার ‘সংস্কৃতি’। এই দল বিরোধী দলে থাকাকালে সব সময় শর্ত দেয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে। ২০১৪ সালে দিয়েছিল। এবারও দিয়েছে।

তাদের দেওয়া বেশিরভাগ শর্ত সংবিধানবিরোধী। তবে বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় বসাতে দেশের একশ্রেণির অতি প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক পণ্ডিত এ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা দিয়ে চলেছেন। আগে বলেছেন, এখনো বলেন যে, সংবিধান দিয়ে কী হবে? দেশকে বাঁচাতে হবে স্বৈরাচারী ১৪ দলীয় সরকার তথা আওয়ামী লীগ সরকারের হাত থেকে। গণতন্ত্র উদ্ধার করতে হবে। দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে। দেশ যদি ধ্বংসের পথে ধাবিত হয়, গণতান্ত্রিক অধিকার মানুষ এভাবে হারাতে থাকে, তা হলে কী হবে সংবিধান দিয়ে? মানুষ কি সংবিধান ধুয়ে খাবে?

যিনি নিজেকে (প্রায় এককভাবে) সংবিধানপ্রণেতা বলে দাবি করেন, যখন-তখন সংবিধানের দোহাই দিয়ে কথা বলেন, তিনি পর্যন্ত গ্রেনেড-রাজনীতির তথাকথিত পণ্ডিতদের সুরে কথা বলেন। বিএনপির পণ্ডিত মানে বেশিরভাগ দেশবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর পাণ্ডা। এতে তথাকথিত ‘সুজন-কুজন’ সবাই আছে। আছে তাদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। এদের আমি ‘পণ্ডিত’ বলেছি বটে। তবে পাণ্ডা বললেই যথার্থ হয়। এরা সংবিধান মানে না, বিএনপি-জামায়াতের দেওয়া শর্ত মানে। তাদের হাহাকার উন্নয়ন দিয়ে কী হবে যদি গণতন্ত্র না থাকে?

কথাটা ঠিক। উন্নয়ন থাকতে হবে, গণতন্ত্র থাকতে হবে, আইনের শাসন থাকতে হবে। বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার সব কায়েম করে ফেলেছে এমনটা হয়তো বলা যায় না। তবে উন্নয়নের পাশাপাশি দেশে যে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার চর্চা চলছে, সেটা নিছক কথার কথা নয়। সেটা বলতে গেলে দৃশ্যমান। তবে কিনা যারা চোখ থাকতেও অন্ধ, তারা দেখবেন কী করে? তারা যে দেশের সংবিধানের বদলে বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় আনার জন্য সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কতিপয় শর্তই মেনে নেবেন, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির ব্যাখ্যা দিতে বিএনপি নিউইয়র্ক গিয়েছিল। হ্যাঁ, বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিবই বটে। তবে এর পেছনেও রয়েছে ক্ষুদ্র এক পাদটীকা। কিছুদিন আগে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দেখতে জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশে এসেছিলেন। বিএনপি তাদের চোখে বিরাজমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বোঝাতে জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে একটা সাক্ষাৎকার চেয়েছিল। টাইট শিডিউলের কারণে বিএনপিকে সেই সময়টুকু জাতিসংঘ মহাসচিব দিতে পারেননি। নিউইয়র্কে ফিরে গিয়ে তাই বিএনপিকে সেই দিতে না পারা শিডিউল পুনর্ধার্য করে নির্দিষ্ট দিনে নিউইয়র্কে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

বিএনপি এ নিয়ে নাটক কম করেনি। ভাব দেখিয়েছে যেন বা জাতিসংঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমন্ত্রণে খুব গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দিতে যাচ্ছে। একটা বৃহৎ রাজনৈতিক দল হয়েও বিএনপি যে রাজনীতিতে অপরিণতই রয়ে গেছে, তা বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হয় না।

জাতিসংঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে বাংলাদেশে বিরাজমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়, তা তো নয়। তারা হয়তো বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতি এ দেশের অনেকের চেয়ে বেশি ভালো জানেন। বিএনপি ক্ষমতায় যেতে পারলে বাংলাদেশ যে রাজনৈতিক বিচারে ভারতবিরোধী হয়ে দেখা দেবে, এ জ্ঞানটুকু নিশ্চয়ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আছে। কৌশলগত বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে ভারতবিরোধী কোনো দলকে ক্ষমতায় দেখতে চাইবে, এমনটা ঘটবে বলে মনে হয় না।

অবশ্য বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনে জনগণের ভোটে বিএনপি যদি নির্বাচিত হয়, তাতেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ ঘটবে না। কিন্তু বিএনপি কেন ভাবে, জাতিসংঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনে কলকাঠি নেড়ে তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে সেটা বোঝা দুঃসাধ্য। হ্যাঁ, ২০০১ সালে টুয়েসডে ক্লাব নামে ঢাকার কূটনীতিকপাড়ায় একটা অদৃশ্য প্ল্যাটফরম তৈরি হয়েছিল বটে এবং সে বছর ক্ষমতায় গিয়েছিল বিএনপি। তবে মনে রাখা দরকার, এটা ২০১৮ সাল। ২০০১ সাল নয়।

একটা সময়ে রাজনৈতিক দক্ষতার বিচারে বিএনপি-আওয়ামী লীগ ছিল উনিশ-বিশ। এখন সেই অবস্থান এতটাই বদলে গেছে যে, উনিশ-বিশ হয়ে গেছে আকাশ-পাতাল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছে। জঙ্গিমুক্ত দক্ষিণ এশিয়া গড়তে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। উন্নয়নের সুফল অনেকটা পৌঁছে গেছে গ্রামে। দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মৎস্য উৎপাদনে তৃতীয়। বাংলাদেশ এখন ৫০ বিলিয়ন রপ্তানি আয়ের দেশ। আর ১০-১৫ বছরের মধ্যে যদি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকে, হয়ে যাবে ১০০ কোটি বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের দেশ।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় সরকারকে ভোট না দিয়ে বন্দুকের নলে যে রাজনৈতিক দলের জন্ম, যারা দেশে গ্রেনেড এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু করেছিল, গরিষ্ঠ অংশের জনগণ তাদের ভোট দেবে কেন?

প্রশ্নটা তোলাই রইল। বলে নিই অতিসম্প্রতি বিএনপির তিন নেতার নিউইয়র্ক সফরের কথা। জাতিসংঘের মহাসচিব তাদের সঙ্গে দেখা করেননি। তার একজন সহকারী বিএনপির যত দুঃখ, দেশে গণতন্ত্রহীনতা এবং সরকারের ভয়াবহ নির্যাতনের কথা টুকে নিয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরেও ছোটখাটো অধিকর্তাদের কাছে বিএনপি প্রতিনিধি দলকে কথা বলতে হয়েছে। মির্জা ফখরুল লন্ডনেও একটা চক্কর দিয়ে ফের নিউইয়র্কে ফিরেছিলেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে নিশ্চয়ই কথা হয়েছে।

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে বিএনপির একটি ক্ষুদ্র প্রতিনিধি দলের নিউইয়র্ক সফর কতটা সাফল্য পেয়েছে, এ নিয়ে আমার নিজস্ব যা ধারণা তা না বলাই ভালো। আমি শুধু বিএনপিকে সবিনয়ে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, জাতিসংঘের মাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি মীমাংসার চেষ্টা আগেও হয়েছে। কোনো ফল পাওয়া যায়নি। হ্যাঁ, আমি তারেক রহমানের প্রসঙ্গেই বলছি। বিদেশে বসে দেশের বিরাজমান অবস্থা সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা কিছু বললে বরং নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করা হয়। অপমান করা হয় দেশের জনগণকে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, ১৪ দল সরকারের আমলে দেশের মানুষ যদি এতই অত্যাচারিত হয়ে থাকে, এতই যদি অধিকারহারা হয় তারা, তা হলে জনগণই তো নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে বদলে দিতে পারে। নির্বাচনে যায় না কেন বিএনপি। হয়তো যাবে। হয়তো যাবে না। ২০১৪ সালে বিএনপি যে অবস্থানে ছিল ২০১৮ সালেও একই অবস্থানে আছে। সেবার ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হয়নি বিএনপির। এবারও কি নির্বাচনে না গিয়ে বিএনপির খুব একটা লাভ হবে?

রাহাত খান : কথাশিল্পী ও সাংবাদিক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে