শাবাশ বাংলাদেশ সারাবিশ্ব অবাক তাকিয়ে রয়

  মাহফুজুর রহমান

২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:৩৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭১ পেরিয়ে যাত্রা শুরু তলাহীন একটি দেশের। প্রতিবছর বাজেটের সময় ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দেশের অর্থমন্ত্রীদের ঘুরতে হয়েছে দেশে-দেশে। অশিক্ষা আর খিদে ছিল আমাদের নিত্যসঙ্গী। দুই যুগ আগেও আমরা বিশ্বাস করতে পারিনি, এই আমাদের বাংলাদেশ হয়ে দাঁড়াবে এশিয়ার চমক। অবাক বিস্ময়ে পৃথিবী তাকিয়ে থাকবে আমাদের দিকে। পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা তাদের সরকারের কাছে করুণ সুরে মিনতি জানিয়ে বলবে, আমরা সুইডেন হতে চাই না, আগামী পাঁচ বছরের ভেতর আমাদের অন্তত বাংলাদেশ বানিয়ে দাও।

বাংলাদেশের সফলতার গল্প আজ মানুষের মুখে মুখে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ম্যাজিকটা যেন খোদ সরকারও ভাবতে পারছে না। বাজেটে বিগত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭.৪ শতাংশ। বছরের প্রথম নয় মাসে তথ্য বিশ্লেষণ করে জানানো হয়েছিল, এবার প্রবৃদ্ধির পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেড়ে দাঁড়াবে ৭.৬৫ শতাংশ।

নয় মাসের এই প্রাক্কলনকেও মিথ্যা করে দিয়ে চূড়ান্ত হিসাবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৭.৮৬ শতাংশে। এটি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ০.৪৬ শতাংশ বেশি। তথ্যটি জানার সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতর থেকেই বেরিয়ে এসেছে একটি বাক্য : বাহ! শাবাশ বাংলাদেশ।

দরিদ্র বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে বহু বছর আমরা অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটিয়েছি। আমাদের সব দুঃখ মুছে গেছে। আজ চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, জয় বাংলা। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, জয় বঙ্গবন্ধু। এই স্বাধীন দেশটির স্থপতি আজকের এই সমৃদ্ধি দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তার প্রিয় দেশের সমৃদ্ধি আজ অনেকের কাছেই ঈর্ষার বিষয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০০৮ সালের দিকে পাখা মেলতে শুরু করে। তখনো অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেননি, বাংলাদেশ উন্নয়নের দৌড়ে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে মাত্র কয়েক বছরেই এগিয়ে যাবে। পাকিস্তানের জিডিপির প্রবৃদ্ধির চেয়ে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে প্রতিবছর ২.৫ শতাংশ বেশি। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে পাকিস্তানের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.৭ শতাংশ, যা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ২.১৬ শতাংশ কম। ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭.৩৬ শতাংশ; এটিও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হারের পেছনে রয়েছে।

এ তো গেল জিডিপির প্রবৃদ্ধি হারের কথা। আমাদের জন্মনিয়ন্ত্রণও অনেকাংশেই সফল। বর্তমানে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বছরে ১.১ শতাংশ। অন্যদিকে পাকিস্তানের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় ২.০ শতাংশ। এই বিষয়টিকে বিবেচনায় আনা হলে দেখা যাবে পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার বছরে ৩.৩ শতাংশ বেশি। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশ ২০২০ সালের মধ্যে মাথাপিছু জিডিপি নিয়ে পাকিস্তানের আগে চলে যাবে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ভূখ-ের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। আর পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল ৫ কোটি। ২০১৬ সালে এই সংখ্যায় পরিবর্তন এসেছে। এই সালে পাকিস্তানের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি ৩০ লাখে। আর বাংলাদেশের জনসংখ্যা হয়েছে ১৬ কোটি ৩০ লাখ। আবার বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ুও বেড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর। অন্যদিকে এই গড় আয়ু ভারতে ৬৮ বছর এবং পাকিস্তানে ৬৬ বছর।

বাংলাদেশের এই সার্বিক অগ্রগতির পেছনে প্রধান কারণগুলো হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বা ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং সরকারের সদিচ্ছা। দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মেয়েশিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ঘরের বাইরে কাজ করার যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে এতে নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে। সমাজে নারীদের ইতিবাচক ভূমিকা নিশ্চিত হয়েছে এবং তারা সমাজ ও অর্থনীতির অগ্রসরতায় অবদান রাখতে পারছেন। এই নারীর ক্ষমতায়ন প্রকারান্তরে শিশুশিক্ষা ও শিশুস্বাস্থ্য রক্ষায় অবদান রেখেছে। আমরা পেয়েছি মেধাবী ও স্বাস্থ্যবান শিশু। এই শিশুরাই এখন অনেকে বড় হয়ে দক্ষতার সঙ্গে ডিজিটাল বাংলাদেশের হাল ধরতে পারছে।

এক সময় বাংলাদেশে ‘ব্রেনড্রেন’ বলে একটা কথা চালু ছিল। আমাদের মেধাবী মানুষরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ডিগ্রি নিয়ে বিদেশে চলে যেতেন। এখন এই ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়েছে। আমি অনেক ক্ষেত্রেই দেখেছি, ত্রিশ বছর আগে যে মেধাবী মানুষটি দেশত্যাগ করেছিলেন, তার ছেলে বা মেয়ে ফিরে এসেছে বাংলাদেশে। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। দেশে শিক্ষার মানে বিশেষ পরিবর্তন এসেছে। প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, দেশে কারিগরি শিক্ষার ওপর অধিকতর জোর দেওয়া হবে। তার এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশ দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবে বলেই আমার বিশ্বাস।

বাংলাদেশের মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ব্যাপক হারে বেড়েছে। এই কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ ব্যাংকের। মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং, স্কুল ব্যাংকিং, পথশিশু ব্যাংকিং, দশ টাকার হিসাব ইত্যাদি নানা উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে দেশের একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মানুষকে ব্যাংকিং লেনদেনে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছে তারা।

বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত এক সাম্প্রতিক তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশের ব্যাংক হিসাবধারী প্রাপ্তবয়স্ক লোকরা ৩৪.১ শতাংশ লেনদেন করেছে ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে। দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার গড়ে ২৭.৮ শতাংশ। বাংলাদেশের মানুষ ব্যাংকে হিসাব খোলে তা সচল রাখতে এবং নিয়মিত লেনদেন করতেও অগ্রসর বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ দেশে ব্যাংক হিসাবগুলোর ভেতর নিষ্ক্রিয় হিসাব হচ্ছে ১০.৪ শতাংশ। অন্যদিকে ভারতে নিষ্ক্রিয় ব্যাংক হিসাবের শতকরা হার হচ্ছে ৪৮ শতাংশ। উল্লেখ্য, গত ছয় মাসে হিসাবে কোনো লেনদেন সংঘটিত না হলে হিসাবটিকে নিষ্ক্রিয় হিসাব বলে ধরা হয়।

সরকারের সদিচ্ছার জন্যই এখানে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। দেশ-বিদেশের উদ্যোক্তারা এ দেশে শিল্প স্থাপনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এ ধরনের শিল্প স্থাপনের ফলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। দারিদ্র্যের বিষম চক্র থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসে উন্নয়ন আকাশের মেঘমুক্ত পরিবেশে ভেসে বেড়ানোটা এখন যেন অভ্যাসে পরিণত হতে চলেছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তৈরি পোশাকশিল্প এবং রেমিট্যান্স। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এখন বৃহৎ শিল্পে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় শপিংমলে অত্যন্ত খান্দানি কায়দায় এখন ঝুলে থাকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দ্বিতীয়। দেশের আইন-কানুন বেশ শক্ত এবং যুগোপযোগী। দেশের অগ্রগতির প্রয়োজনে সরকার কোনো আইন প্রণয়নেই পিছপা হয় না। এর সুফল অবশ্যই অর্থনীতি পাচ্ছে এবং পাবে।

এই উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে প্রত্যক্ষ করেও অনেকেই প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশের এই অগ্রগতি টেকসই হবে কিনা? এই প্রশ্নটির জবাব দেওয়া খুব সহজ নয়। প্রতিটি দেশেই অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুরুর দিকে লুটপাট, দুর্নীতি, পাচার ও স্বেচ্ছাচারিতার ইতিহাস দেখা যায়। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে আশার বিষয়, বর্তমান সরকার এ ধরনের দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বলে দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে। আর এর সুফল ভোগ করছে আমাদের অর্থনীতি।

দেশের অর্থনীতির জন্য আর একটি বড় ধরনের হুমকি হচ্ছে ধর্মীয় উগ্রবাদী মনোভাব। এর মধ্যে বাংলাদেশে বেশ কয়েক দফা এরূপ উগ্র জঙ্গিবাদ চাঙ্গা দিয়ে উঠলেও সরকার কঠোর হস্তে সেসব দমন করেছে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ কাজে অত্যন্ত তৎপর। ধর্মীয় উগ্রবাদ মাথা তুলে দাঁড়ালে দেশের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অগ্রগতি চরমভাবে ব্যাহত হয়। যুগে যুগেই এটি প্রমাণিত হয়েছে। দু-একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।

হাজার বছর আগে বাগদাদ ও দামেস্ক এলাকায় ইসলাম ধর্মের খলিফারা রাজত্ব করতেন। তখনকার দিনে এসব শহর ছিল বিশ্বের মধ্যে সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের চারণভূমি। গবেষণা ও আবিষ্কারের জন্য এই এলাকাই ছিল সবচেয়ে উর্বর। কিন্তু ইসলামি উগ্রবাদিতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার পর এসব এলাকা এখন পেছনে পড়ে গেছে এবং অনেকটা অচ্ছুত বলেই বিবেচিত হচ্ছে।

পাকিস্তানের ইতিহাসও অনেকটা সে রকমই। স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের অর্থনীতি অনেকটাই উন্নয়নমুখী ছিল। ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের অর্থনীতি ছিল এগিয়ে। কিন্তু ধর্মীয় উগ্রবাদিতা তাদের সেই অগ্রগতিকে খুবলে ধরেছে।

বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক অগ্রগতি টেকসই রাখতে হলে প্রধানতই সরকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে জনগণেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সামনে দেশের নির্বাচন আসছে। জনগণকে অবশ্যই যোগ্য ও সৎ মানুষদের খুঁজে বের করতে হবে। পরীক্ষিত মানুষদের কাছেই দিতে হবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব। ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এই দেশ বাংলাদেশ। জাতির পিতার রক্তে ভেজা আমাদের পবিত্র জন্মভূমি। এই দেশটি আমরা সুখী ও সমৃদ্ধিশালী অবস্থায় পরবর্তী প্রজন্মের হাতে রেখে যাব, নির্বাচনকে সামনে রেখে এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।

মাহফুজুর রহমান : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

[email protected]

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে