২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়

রাজনৈতিক উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে

  আবুল মোমেন

১১ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

২০০৪ সালের একুশ আগস্টের গ্রেনেড হামলা নিঃসন্দেহে এক নৃশংস ফৌজদারি অপরাধ। যেহেতু দেশের প্রধান একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়েছিল তাই একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হামলা হিসেবেই গণ্য করা যায়। ফৌজদারি অপরাধের আইনি বিচার হতে হবে।

আবার এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার ষড়যন্ত্র কাজ করে থাকলে তাও তা উদ্ঘাটিত হওয়া প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক মতাদর্শিক ভিন্নতা থাকবে, মত ও পথের পার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু সে কারণে ভিন্ন মতের নেতৃত্বকে হত্যার মতো অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া যায় না।

বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক মতাদর্শিক ভিন্নতার কারণে হত্যার অপরাধ আগেও ঘটেছিল। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানপন্থি রাজনৈতিক দল ও কিছু জনগোষ্ঠী মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের নির্বিচারে হত্যা করেছিল। এ ছাড়া ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগসহ আরও নানা অপরাধে তারা যুক্ত ছিল। এরা ছিল একাত্তরের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী। এরপরে ১৯৭৫ সালের আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল একই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকেই।

একই বছর ৩ নভেম্বর জেলের ভেতর তাজউদ্দীন আহমদসহ চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করার পেছনেও ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে একই রকম রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রেরই ফল ২০০৪ সালের একুশ আগস্টের গ্রেনেড হামলা। প্রতিবার এসব হামলার প্রত্যক্ষ শিকার হয়েছে আওয়ামী লীগ-মুক্তিযুদ্ধের সময় হয়তো আরও নানা স্তরের ও মাত্রার গণতন্ত্রকামী প্রগতি চেতনার মানুষও এদের হামলার শিকার হয়েছিল। কিন্তু বাকি তিনবারই এককভাবে হামলার শিকার আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও অন্য নেতৃবৃন্দ।

১৯৭৫ সালে হামলার শিকার হয়ে আওয়ামী লীগ কুড়ি বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল। আর যদি ২০০৪ সালে হামলাকারীদের উদ্দেশ্য সফল হতো, তা হলেও দলের ভাগ্য আগের বারের চেয়ে খারাপ বৈ ভালো হতো না। ফলে এসব হামলার বিষয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভিতরে ব্যাপক উত্তেজনা, আবেগ এবং আগ্রহ থাকাই স্বাভাবিক।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিএনপির অস্তিত্ব ছিল না। ’৭৫-এর হত্যাকা-ের সময় বিএনপি গঠিত না হলেও এই হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটেই বিএনপির জন্ম। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে আদর্শ করে ও কট্টর ইসলামি বিপ্লবপন্থি রাজনীতির সমর্থন নিয়ে বিএনপির উত্থান ঘটেছিল। বঙ্গবন্ধু ও জেলহত্যার খুনিরা জেনারেল জিয়া ও তার সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। ফলে এ দুই হত্যাকাণ্ডে আলোচনায় জিয়াউর রহমানের নাম উঠে আসে। তা ছাড়া একাত্তরের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সময় লক্ষ্য করা গেছে যে, বিএনপি এর প্রক্রিয়াকে বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। এদের বিচার নিয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি।

তা ছাড়া সাজাপ্রাপ্ত অনেক যুদ্ধাপরাধী তো তাদের ২০০১-২০০৬ আমলের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। আবার ২০০৪ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থেকে এমন হীন নৃশংস হত্যাযজ্ঞের যথোচিত নিন্দা জানায়নি। বরং তখন মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ফলে ইতিহাসের এসব ঘটনা বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অবস্থানকে একেবারেই বিপরীত মেরুতে ঠেলে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের দিক থেকে প্রতিটি ঘটনাতেই বিএনপির দিকে অভিযোগের আঙুল উঠেছে। দুটি বড় দলের পারস্পরিক মনোভাব, সম্পর্ক ও অবস্থান যদি এমন সাংঘর্ষিক হয়, তা হলে সেদেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ কঠিন হয়ে পড়ে।

এই চারটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার জাতির জন্য ছিল ইতিহাসের দায়। এখন বিচারিক আদালতে এগুলো মীমাংসিত হয়েছে। জেলহত্যার বিচার না হলেও পনেরো আগস্টের খুনিদের ধারাবাহিক অপারেশনের অংশ হিসেবে এরও একটি আইনি পরিণতির ইঙ্গিত আমরা পাই। কথা হলো, ফৌজদারি অপরাধের বিচার আইনি আদালতে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হলেও রাজনৈতিক মতভিন্নতা বা মতাদর্শের ভ্রান্তি এ পথে নিষ্পত্তি করা যায় না। এর জন্য জনগণের আদালতেই আসতে হয়। ক্ষমতায় থেকে বিএনপি এসব অপরাধের বিচার কখনো আটকে রেখেছিল, কখনো ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে সময়ক্ষেপণ করেছিল। এখন আর সে সুযোগ নেই। গ্রেনেড হামলা মামলাটি এখন উচ্চ আদালতে যাবে এবং যথানিয়মে তার চূড়ান্ত রায়ও আমরা পাব।

ইতিহাস নানা উত্থান-পতন ও ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অবশেষে জাতিকে কোন পরিণতির মোহনায় এনে দাঁড় করায় এখন সেটাই দেখার বিষয়। আলোচনার শুরুতে ব্যক্ত নেতিবাচক পরিণতিই কি ঘটবে নাকি বাঙালি এবার দেখবে ইতিহাসের বকেয়া মিটিয়ে দেশ নতুনভাবে যাত্রা শুরু করবে। ন্যূনতম আদর্শের ভিত্তিতে বড় দুই দলের নেতৃবৃন্দ কি এবার সমঝোতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য আলাপে বসতে পারবে? তারা কি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরস্পরের প্রতি সহনশীল ও উদার হতে পারবে?

আমরা জানি পারিবারিক নেতৃত্বের যে ধারা তথা উত্তরাধিকারের রাজনীতিতে যে অভ্যস্ততা তা থেকে বেরোনো কঠিন। তারেক জিয়ার শাস্তি মেনে নিয়ে কর্মীদের সামনে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়া সহজ কাজ নয়। তবে আরেক দিক থেকে ভাবলে তারেক জিয়ার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বে উত্তরণের এক কঠিন চ্যালেঞ্জিং পর্ব এসে হাজির হয়েছে। তিনি বিভিন্ন দেশের গণমানুষের প্রকৃত নেতাদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে উত্তরণের সুযোগ নেবেন নাকি পলাতক জীবনে নির্বাসিত রাজনীতিকের জীবন কাটাবেন সেটা তাকেই ভাবতে হবে। তার দিক থেকে আইনের পথে ন্যায়বিচারের সংগ্রাম অবশ্যই অব্যাহত থাকবে।

১৯৭৫ বা ২০০৪-এর মতো পর্দার আড়ালে কলকাঠি নাড়া নয়, প্রকাশ্য রাজনীতিতেই তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিহিত আছে। আমাদের অনভ্যস্ত চিন্তায় অসম্ভব মনে হলেও গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পরে নতুন করে রাজনৈতিক ভাবনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে বিএনপির জন্য কাজটা কঠিন আবার জরুরিও বটে। দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে এ দায় আওয়ামী লীগেরও। নয়তো দেশে গণতন্ত্রের সংকট, রাজনৈতিক আদর্শের অবক্ষয় এবং সংঘাতময় পরিবেশ ও পরস্পর অবিশ্বাসের সংস্কৃতি কেবল বাড়তেই থাকবে। সেই বাস্তবতা কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না। তাতে দেশ ও ভবিষ্যৎ উভয়ই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেই থাকবে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে